রঞ্জিত সরকারের তিনটি কবিতা

কোজাগরী

কেউ সাথে নেই আজ
আমার একলা জাগা রাত
আজ নিজের ভেতর খোঁড়ে দেখা,
মাটির ঢেলা, আপন আবাস
নিজের সাথেই নিজের মাখামাখি।
রাত হয়েছে পেছন ফেরে কাত
আজ নিজের মধ্যেই জলতরঙ্গ খেলা
বুকের ভেতর সূর্যশিশির শঙ্খিনী ভোর
একলা জাগা
আমার একলা জাগা রাত।

আজ জল কলকল মেঘমল্লার শ্রাবণ ধারাপাত
আধ -পোড়া চাঁদ, একলা আকাশ
বৃষ্টিদহন, রাই চলেছে বন
আজ নিজের সাথেই নিজের জাগরণ
আর ভাটায় দিলেম তোমায় নির্বাসন।

আজ আকাশগঙা রাতের তারা
নিশি পাওয়া পড়শি বাড়ি প্রেম
আজ দিয়েছে আড়ি
কেউ সাথে নেই, একলা জাগা
আজ আমার একলা জাগা রাত।

 

 

কতোটা জীবন

কতোটা জীবন পেরিয়ে এসেছি,
কতোখানি বাকী?
এই এক জীবনেই পেরিয়ে এসেছি
কতো না অন্য জীবন।

এক জনমে জোড় শালিক হয়ে
যাপন করেছি পাখির জীবন,
আরেক জনমে হিয়ার মাঝারে ছায়া পেতে
রাখি পেয়ে গেছি আমি অনাবিল
বৃক্ষ – জীবন। মরুময় প্রান্তরে
হাবেলির আলো – অন্ধকার জুড়ে
ভোগের থালিকা হাতে
হয়েছি কখনো জিপসি বালিকা।

আমি পেরিয়ে এসেছি মৃত্যু কতোবার!
ধানসিঁড়ি নদীটি মরে যায় যেভাবে
পুরাতন বৃক্ষ থেকে ছায়া মরে যায়
চাঁদ থেকে জ্যোৎস্না মরে যায়
ঘাস থেকে লাবণ্য মরে যায়
প্রেম থেকে বিরহ মরে যায়,
স্বপ্ন মরে যায়।
পাথরে পরান বান্ধি
শিশিরের দানায় কষ্ট জমিয়ে রেখে
পথের কিনারে
ফিরে যাই আমি অহল্যা জীবনে।

আমার নিজস্ব অভিজ্ঞানে
জেনে গেছি আজ
স্বপ্নেরও অকাল বৈধব্য আছে
মৃত্যুরও অকাল মৃত্যু রয়েছে।

 

এক পাতা খেরোখাতা

চিতাকাঠ জ্বলে বেনোজলে ভেসে
হারাতে হারাতে হারাই আমার
জীবন, অচল আধুলি, সঞ্চয়ে নেই কড়ি পারানির।
সামনে নদী কল্লোল
বন উতরোল
কুমারী লতা ছুঁয়েছিলো চোখ
হৃদয় অঞ্জনে মেখে।

কতো মাধুকরী ভোর পার হয়ে এসে কতো শিশিরের হিম জমে জমে
কষ্টের পাপড়ি মেলে পদ্ম-কোরক।
চাঁদের আগুনে পোড়ে কতো কোজাগরী রাত ভোর হয়ে আসে
কতো অসুখ জেগে জেগে অ- সুখে
ঘুমায়, ঘুমায়।

ভাসতে ভাসতে জলে
আমি কী ফিরবো ফের
পাতবো নোঙর আমার উঠোনে!
আমার শৈশবের নদী ধলাই,
মায়ের আদর মাখা আদিগন্ত মাঠ, মরে যাওয়া বিহানের রোদ,
আর আমার আর আমার পিতা
অদম্য কৃষক, তাঁর শুদ্ধ ব্যাকরণ

পাঠ জীবনের ” ঘোড়ায় চড়িল,
আছাড় খাইল, আবার উঠিল”।
আর আমি ভুলে ভুলে, ভুল পুঁথি পাঠে
ভুল জীবনেই কাটালাম
সমস্ত জীবন।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত