Ranu_Bhanu The Poet and his Muse

ইরাবতী প্রবন্ধ: শিলং : রবি ও রাণু । ইশতিয়াক আলম

Reading Time: 19 minutes

জিৎভূম : শেষের কবিতার আঁতুরঘর

শিলং শহরের কেন্দ্রবিন্দু পুলিশ বাজার থেকে রিলবং অনধিক চার কিলোমিটার। ঢেউ খেলানো পাহাড়ি পথে ট্যাক্সি পৌঁছে দেয় দশ মিনিটে। কাছাকাছি এসে বাঁক ঘুরতে চিনতে পারি। ড্রাইভার রাজু চৌধুরীকে নামিয়ে দিতে বলি। বাড়ির উলটোদিকে নেমে দেখতে থাকি। সেই একই রকম রয়েছে, কাঠের গেট, গেটফলকে লেখা ‘জিৎভূম’, গেটের একপাশে বিরাট গোলাপ গাছ। যেমন শিলংয়ের অধিকাংশ বাড়িতে দেখা যায়, গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য নকশাকাটা গেট। ফুলের বাগান। বাংলো ধরনের বড় চৌচালা টিনের ঘর। এককোমর সমান উঁচুতে মেঝে, সামনে টানা লম্বা বারান্দা। শীতের সকালের উজ্জ্বল আলোয় ঝকঝক করছে জিৎভূম। 

কল্পনায় দেখি আলখাল্লা পরা দীর্ঘদেহী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেরিয়ে এলেন। তার আগে তরুণী রাণু। গায়ের রং ফর্সা, অপূর্ব দেহবল্লরী। রাস্তায় সে চঞ্চলা হরিণী। রবীন্দ্রনাথ তাকালেন রাণুর দিকে। চোখে জিজ্ঞাসা, কোন দিকে? রাণুর ফর্সা মুখে হাসি, চোখের ইশারায় দেখালো বাঁ দিক। সে এগিয়ে গেছে কয়েক পা, রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে হাত বাড়াল। রবীন্দ্রনাথের বয়স বাষট্টি, কিন্তু তাঁর আলখাল্লাপরা দীর্ঘ দেহে বয়সের কোনো ছাপ নেই। লম্বা পা ফেলে হাত বাড়িয়ে দিলেন রাণুর দিকে। রাণু হাত জড়িয়ে ধরে ভানুদার গা ঘেঁষে সামনের দিকে পা বাড়াল।

কিছু দূরে যেতে যেতে দুজনের হাত মিলে গেল, ওরা কাছে কাছে এলো ঘেঁষে। নির্জন পথের ধারে নিচের দিকে চলেছে ঘন বন। সেই বনের একটা যায়গায় পড়েছে ফাঁক, আকাশ সেখানে পাহাড়ের নজরবন্দি থেকে একটুখানি ছুটি পেয়েছে। তার অঞ্জলি ভরিয়ে নিয়েছে অস্তসূর্যের শেষ আভায়। সেইখানে পশ্চিমের দিকে মুখ করে দুজনে দাঁড়াল। অমিত লাবণ্যর মাথা বুকে টেনে নিয়ে তার মুখটি উপরে তুলে ধরলে লাবণ্যর চোখ বোজা, কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আকাশে সোনার রঙের উপর চুনি-গলানো পান্না-গলানো আলোর আভাসগুলি মিলিয়ে যাচ্ছে; মাঝে মাঝে পাতলা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে  সুগভীর নির্মল নীল, মনে হয় তার ভিতর দিয়ে, যেখানে দেহ নেই শুধু আনন্দ আছে সেই অমর্ত্যজগতের অব্যক্ত ধ্বনি আসছে। ধীরে অন্ধকার হল ঘন। সেই খোলা আকাশটুকু, রাত্রিবেলায় ফুলের মতো, নানা রঙের পাপড়িগুলো বন্ধ করে দিলে। অমিতের বুকের কাছে থেকে লাবণ্য মৃদুস্বরে বললে, চলো এবার। কেমন তার মনে হলো, এইখানে শেষ করা ভালো। অমিত সেটা বুঝলে, কিছু বললে না। লাবণ্যর মুখ বুকের উপর একবার চেপে ধরে ফেরবার পথে খুব ধীরে ধীরে চলল।

অমিত ও লাবণ্য জীবিত কেউ নয়; রবীন্দ্রনাথের বেশি বয়সের (৬৮ বছর) সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত এবং পঠিত রোমান্টিক  উপন্যাস শেষের কবিতার প্রধান চরিত্রদ্বয় বা নায়ক-নায়িকা। বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে। দক্ষিণাত্যের কুন্নর শহরে মে ১৯২৮ সালে রচনা শুরু, শেষ হয় ২৫শে জুন ১৯২৮ সালে ব্যাঙ্গালোরে আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের বাড়িতে। রচনাকালে উপন্যাসের নাম ছিল ‘মিতা’, বই প্রকাশকালে নামকরণ হয় শেষের কবিতা। এই উপন্যাসের ১৭টি পরিচ্ছেদের মধ্যে ১৩টি পরিচ্ছেদের পটভূমি পাইন-দেবদারু ঘেরা, শৈলশহর শিলং। হাতধরাধরি করে গল্প করতে করতে হাঁটা লাবণ্য-অমিতই কি পাঁচ বছর আগের রাণু ও ভানুদাদা (রবীন্দ্রনাথ  ঠাকুরকে রাণুর প্রিয় সম্বোধন) নয়?

একটা গল্প বা একটা উপন্যাস বা একটা নাটক রচনার পেছনে লেখকের জীবনের কোনো না কোনো অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই থাকে।

রাণু বা প্রীতি অধিকারী যখন প্রথম চিঠি জুলাই ১৯১৭-তে লেখেন রবীন্দ্রনাথকে তখন তাঁর বয়স এগারো, রবীন্দ্রনাথের ছাপ্পান্ন। আর শিলংয়ে যখন দুজন হাতধরাধরি করে হাঁটছেন তখন তাঁদের বয়স যথাক্রমে সতেরো এবং বাষট্টি। একজন সুন্দরী ও উচ্ছল তরুণী, অন্যজন বয়সী হলেও বার্ধক্যের ছাপ তাঁর শরীরে লাগেনি। মনে না, শরীরেও না। কবির নিজেরই কথা। কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন এলমহার্স্টকে।

দুজন মানব-মানবী নির্জন পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে যদি আরো ঘনিষ্ঠ হন তো সেটাই খুব স্বাভবিক। সেটাই হয়তো হয়েছিল। নভেম্বর ১৯২৪ সালে প্রিয় ভানুদাদাকে লেখা চিঠিতে রাণু জানাচ্ছে, ‘একদিন ভানুদাদার সমস্ত আদর পেয়েছি। আমার সমস্ত শরীর ছেড়ে সে আদর আমার মনকে ভরে দিয়েছিল।’

রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়বারে শিলং আসেন ২৬শে এপ্রিল ১৯২৩ সালে। গ্রীষ্মের ছুটিতে রবীন্দ্রনাথের যাওয়ার কথা ছিল দেরাদুনে, সপরিবার। শেষ পর্যন্ত সেখানে যাওয়া হয় না। তার বদলে আসেন শিলংয়ে। এবারে সঙ্গীদলে যোগ দিয়েছেন সপ্তদশী রাণু। সঙ্গে পুত্র রথীন্দ্রনাথ, রথীন্দ্রনাথের স্ত্রী প্রতিমা দেবী, তাঁদের পালিত কন্যা পুঁপে, বড় হলে যার নাম হয় নন্দিনী, ছোট মেয়ে মীরা, মীরার মেয়ে বুড়ি, একজন ম্যানেজার, ভৃত্য সাধুচরণ, উৎকলবাসী পাচক তুলসী। দলে ছিলেন একজন বিদেশিনী, আমেরিকান। সেবার ব্রত নিয়ে শান্তিনিকেতন আসেন ১৯২২ সালের শেষ দিকে, নাম মিস গ্রেচেন গ্রিন। ডাক্তার নন, প্রথম মহাযুদ্ধের সময় রোগীদের সেবা করেছেন। এই অভিজ্ঞতা নিয়ে শান্তিনিকেতনের কর্মযজ্ঞে যোগ দিয়েছেন। কাদাপানি ভেঙে রোগীদের বাড়ি গিয়েছেন। অসহ্য গরমেও সেবা করা থেকে দূরে থাকেননি। ২৪শে মার্চ পর্যন্ত তিনি শান্তিনিকেতনে থাকেন। কবির দলের সঙ্গে চীনে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে ফিরে যান নিজ দেশ আমেরিকায়। এই মিস গ্রিন এ-বাড়িতে থাকতেন না। তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল পার্শ্ববর্তী অন্য একটি কুঠিতে।

রবীন্দ্রনাথের সেজোভাই হেমেন্দ্রনাথের জামাই ডা. দেবেন্দ্রনাথের বাড়ি জিৎভূম ২০০ টাকায় ভাড়া নেওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথরা এবার এ-বাড়িতে কাটান ৪০ দিন।

বাড়িটি বড় কিন্তু ঘর বেশি নেই। বাড়ির সবচেয়ে বড় ঘরটিতে রবীন্দ্রনাথ – ঘরে চওড়া খাট, জানালার কাছে লেখার টেবিল, ঝুলবারান্দা, যেখানে দাঁড়ালে দেখা যায় ফুলেভরা বাগান। তিনদিকে পাইন আর দেবদারু গাছ। কবির পাশের ঘরে মেয়ে বুড়িকে নিয়ে মীরা। এই ঘরে রাণুও। বারান্দার অন্যপ্রান্তে রথী-প্রতিমা ও পুঁপে। আমরা জানি রথীর সঙ্গে যখন প্রতিমার বিয়ে হয় তখন সে ছিল বিধবা। সে ঠাকুরবাড়ির মেয়ে। রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথের মেজোভাই গিরীন্দ্রনাথের পৌত্রী বিনয়নী দেবীর বিধবা কন্যা প্রতিমা এবং পুঁপে পালিত মেয়ে। পুঁপে যখন ছোট তখন তার মায়ের কঠিন অসুখ হয়, সন্তান পালনে অক্ষম। পুঁপের পিতা গুজরাটের ব্যবসায়ী চতুর্ভুজ দামোদর রবীন্দ্রনাথের ভক্ত, সেই সূত্রে শান্তিনিকেতনে নিয়মিত যাতায়াত। রুগ্ণ স্ত্রী এবং পুঁপেকে নিয়ে তিনি শান্তিনিকেতনে আশ্রমবাসী হন। পুঁপে গুজরাটি শব্দ, অর্থ পুতুল। পুতুলের মতোই টুকটুকে রং, ফুটফুটে চেহারা। আশ্রমের সবাই আদর করে, সবচেয়ে বেশি প্রতিমা দেবী। নিঃসন্তান প্রতিমা বাবামশাই রবীন্দ্রনাথের অনুমতি প্রার্থনা করলে সাদর সম্মতি পাওয়া যায়। পুঁপের নবজন্ম হয়, রথী-প্রতিমার পালিত সন্তান হয়ে। নাম হয় নন্দিনী (১৯২২-৯৫)।

শিলংয়ে প্রায় প্রতিদিনই প্রতিমা দেবী বাড়ির মেয়েদের নিয়ে আশেপাশে বেড়াতে বের হন। এই দলে থাকে না রাণু। তার ভালো লাগে কবিসঙ্গ, হাত ধরে পাহাড়ি রাস্তায় গল্প করতে করতে হাঁটা।

রাণু বেশিরভাগ সময়ই বাগানে নয়তো সময় কাটায়, কবি থাকলে, কবির ঘরে। কখনো কখনো শুয়ে পড়ে কবির শূন্য বিছানায়। শান্তিনিকেতনে, জোড়াসাঁকোতে তার চলাফেরা ছিল এমনি। রথী-প্রতিমা এসব দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে থাকা মেয়ে মীরা এমনটি দেখে অভ্যস্ত নয়। তার ওপর বাড়িতে শান্তিতে নেই সে। বড় দুই বোনেরও তাই। দ্বিতীয় মেয়ে রেনুকা মারা যায় অল্প বয়সে, মাত্র তেরো বছর বয়সে। বড় মেয়ে মাধুরীলতা অসুখে ভুগে ৩২ বছরে। রথীন্দ্রনাথের মা মারা যান ২৩শে নভেম্বর ১৯০২ সালে। মা-মরা মেয়ে মীরাকে বিয়ে দেওয়া হয় নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে ১৯০৭ সালে। আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিবিদ্যার স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জামাই নগেন্দ্রনাথকেও পাঠানো হলো আমেরিকায় কৃষিবিদ্যা শেখার জন্য। এতেও শান্তি পায়নি মীরা।

একদিন কবি ঘরে নেই, বাইরে গিয়েছেন। মীরা দেবী রাণুকে কবির খাটে শুয়ে থাকতে দেখে কথা শোনায়। রাণু চোখের পানি লুকিয়ে সারা বিকেল মন খারাপ করে থাকে।

রবীন্দ্রনাথের প্রথম শিলংযাত্রা

সঙ্গিনীর খোঁচায় বর্তমানে ফিরি। রাস্তার ওপাশে কাঠের গেট, গেটফলকে লেখা জিৎভূম। গেটের বাইরে বাঁধানো প্রস্তরফলকে লেখা –

Here lived

RABINDRANATH  TAGORE

in April, May, June 1923

His famous drama Rakta Karabi

and

Poem Shillonger Chite etc.

were written here.

রবীন্দ্রনাথ শিলং এসেছেন তিনবার –

প্রথমবার ১১ই অক্টোবর ১৯১৯ সালে। উঠেছিলেন ব্রুকসাইড গ্লাস হাউসে। সঙ্গে ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। ছিলেন তিন সপ্তাহ। শান্তিনিকেতনে ফিরেছিলেন সিলেট হয়ে। 

দ্বিতীয়বার ২৬শে এপ্রিল ১৯২৩ সালে। চল্লিশ দিন থেকে ফিরে যান ১৪ই জুন ১৯২৩ সালে। সঙ্গে ছিলেন পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও রাণু। ছিলেন মোট ৪০ দিন।

তৃতীয়বার আসেন ১৯২৭ সালে আহম্মদাবাদের বিখ্যাত ধনী আমবালা সারাভাইয়ের আমন্ত্রণে। তিনি আপল্যান্ড রোডে দুটি বাড়ি ভাড়া নেন। সলোমন ভিলাতে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ। থাকেন মে-জুন মাস। পরে এই বাড়ির মালিকানা বদল হয়, বাড়ির নামও বদলে হয় ‘সিডলী হাউস’।

একজন কাজের লোকের দেখা পেয়ে তার মাধ্যমে খবর পাঠাই ভেতরে। মধ্যচল্লিশের দুই যুবক বেরিয়ে এলেন। আমাদের পরিচয় পেয়ে সবিস্ময়ে বললেন, কলকাতা থেকে শত শত বাঙালি শিলংয়ে বেড়াতে আসেন; কিন্তু তাঁরা কেউ এদিকে আসেন না। আর আপনারা বাংলাদেশ থেকে এসে খুঁজে বের করেছেন রবীন্দ্রনাথ কোন বাড়িতে ছিলেন একশ বছর আগে! দুজনের একজন বিমল চক্রবর্তী, বাড়ির বর্তমান মালিক কোনো তথ্য দিতে পারলেন না। তাঁদের তাড়া আছে, এক্ষুনি বেরুবেন তাই বসতে বলার সৌজন্যও দেখালেন না। তবে আমরা পুলিশ বাজারে ব্রডওয়ে হোটেলে উঠেছি জেনে পৌঁছে দিলেন তাঁদের সঙ্গে। আসার পথে রিলরং এলাকাতেই পাইনঘেরা একটা কাঠের বাড়ি দেখিয়ে ঝুলন দত্ত নামের দ্বিতীয়জন জানালেন, এই বাড়িতেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন। বাড়ির নাম জানা ছিল, ব্রুকসাইড গ্লাস হাউস। 

রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার এসে ওঠেন এ-বাড়িতে, ১১ই অক্টোবর ১৯১৯ সালে। সেবারে ছিলেন তিন সপ্তাহ। শান্তিনিকেতন থেকে রওনা হয়ে কলকাতা সান্তাহার হয়ে গুয়াহাটি। তখন গুয়াহাটিতে ব্রিজ হয়নি। ব্রহ্মপুত্র পার হতে হয়েছিল ফেরিতে। তবে পাকশীতে পদ্মানদীতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ হওয়ায় আগের মতো দামুকদিয়া-সাঁড়া ফেরি দিয়ে পদ্মা পার হতে হয়নি। পথে পদে পদে বিড়ম্বনা হয়েছিল, যা রবীন্দ্রনাথ রাণুকে জানিয়ে দেন পৌঁছুবার পরদিন তাঁর বাষট্টিসংখ্যক দীর্ঘ চিঠিতে (১২ই অক্টোবর ১৯১৯) :

১২ অক্টোবর ১৯১৯

কল্যাণীয়াসু,

রাণু কাল এসে পৌঁছেছি শিলঙ পর্বতে। পথে কত যে বিঘ্ন ঘটল তার ঠিক নেই। মনে আছে বোলপুর থেকে আসবার সময় মা গঙ্গা আমাকে জল কাদার মধ্যে হিঁচড়ে এনে সাবধান করে দিয়েছিলেন? কিন্তু মানলুম না, বৃহস্পতিবারের বারবেলায় কৃষ্ণ প্রতিপদ তিথিতে রেলে চড়ে বসলুম। দুদিন আগে রথী আমাদের একখানা মোটরগাড়ি গৌহাটি স্টেশনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, ইচ্ছা ছিল সেই গাড়িটাতে করে পাহাড়ে চড়ব। সঙ্গে আমাদের আছে দিনুবাবু এবং কমল বৌঠান, এবং আছেন সাধুচরণ, এবং আছে বাক্স তোরঙ্গ নানা আকার এবং আয়তনের, এবং সঙ্গে চলেছেন, আমাদের ভাগ্যদেবতা, তাঁকে টিকিট কিনতে হয় নি। সান্তাহার স্টেশনে আসাম মেলে চড়লুম, এমনি কশে ঝাঁকানি দিতে লাগল যে, দেহের রস রক্ত যদি হত দই তাহলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই প্রাণটা তার থেকে মাখন হয়ে ছেড়ে বেরিয়ে আসত।

আর্দ্ধেক রাত্রে বজ্রনাদ সহকারে মুষলধারে বৃষ্টি হতে লাগল। গৌহাটির নিকটবর্ত্তী স্টেশনে যখন খেয়া জাহাজে ব্রহ্মপুত্রে ওঠা গেল তখন আকাশ মেঘে আচ্ছন্ন কিন্তু বৃষ্টি নেই। ওপারে গিয়েই মোটরগাড়িতে চড়ব বলে খেয়েদেয়ে সেজেগুজে গুছিয়ে গাছিয়ে বসে আছি – গিয়ে শুনি ব্রহ্মপুত্রে বন্যা এসেচে বলে এখনো ঘাটে মোটর নামাতে পারে নি। এদিকে বেলা দুটোর পরে মোটর ছাড়তে দেয় না। অনেক বকাবকি দাপাদাপি ছুটোছুটি হাঁকডাক করে বেলা আড়াইটের সময় গাড়ি এলো, কিন্তু সময় গেল। তীরের কাছে একটা শূন্য জাহাজ বাঁধা ছিল সেইটেতে উঠে মুটের সাহায্যে কয়েক বাল্তি ব্রহ্মপুত্রের জল তুলিয়ে আনা গেল … স্নান করবার ইচ্ছা। ভূগোলে পড়া গেছে পৃথিবীর তিন ভাগ জল এক ভাগ স্থল, কিন্তু বন্যার ব্রহ্মপুত্রের ঘোলা স্রোতে সেদিন তিনভাগ স্থল একভাগ জল। তাতে দেহ স্নিগ্ধ হল বটে কিন্তু নির্ম্মল হল বলতে পারি নে।

বোলপুর থেকে রাত্রি এগারোটার সময় হাওড়ার তীরে কাদার মধ্যে পড়ে যেমন গঙ্গাস্নান হয়েছিল, সেদিন ব্রহ্মপুত্রের জলে স্নানটাও তেমনি পঙ্কিল। তা হোক্, এবার আমার ভাগ্য আমাকে ঘাড়ে ধরে পুণ্যতীর্থোদকে স্নান করিয়ে নিলেন।

কোথায় রাত্রি যাপন করতে হবে তারি সন্ধানে আমাদের মোটরে চড়ে গৌহাটি শহরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া গেল। কিছু দূরে দিয়ে দেখি আমাদের গাড়িটা হঠাৎ ন যযৌ ন তস্থৌ। বোঝা গেল আমাদের ভাগ্যদেবতা বিনা অনুমতিতে আমাদের এ গাড়িটিতেও চড়ে বসেচেন, – তিনিই আমাদের কলের প্রতি কটাক্ষপাত করতেই সে বিকল হয়েছে। অনেক যত্নে যখন তাকে একটা মোটর গাড়ির কারখানায় নিয়ে যাওয়া গেল তখন সূর্য্যদেব অস্তমিত। কারখানার লোকেরা বললে “আজ কিছু করা অসম্ভব কাল চেষ্টা করে দেখা যাবে।” আমরা জিজ্ঞাসা করলুম, রাত্রে আশ্রয় পাই কোথায়? তারা বল্লে ডাকবাংলোয়। ডাকবাংলোয় গিয়ে দেখি সেখানে লোকের ভিড় – একটিমাত্র ছোট ঘর খালি তাতে আমাদের পাঁচজনকে পুরলে পঞ্চত্ব সুনিশ্চিত।

সেখান থেকে সন্ধান করে অবশেষে গোয়ালন্দগামী স্টীমারঘাটে একটা জাহাজে আশ্রয় নেওয়া গেল। সেখানে প্রায় সমস্ত রাত বৌমা এবং কমলের ঘোরতর কাঁশি আর হাঁপানি – রাতটা এই রকম দুঃখে কাট্ল। পরদিনে প্রভাতে আকাশে ঘন মেঘ করে বৃষ্টি হতে লাগ্ল। কথা আছে সকাল সাড়ে সাতটার সময় মোটর কোম্পানির একটি মোটর গাড়ি এসে আমাদের বহন করে পাহাড়ে নিয়ে যাবে। সে গাড়িখানা আর একজন আর এক জায়গায় নিয়ে যাবে বলে ঠিক করে রেখেছিল – সেখানা না পেলে দুঃখ আরো নিবিড়তর হবে তাই রথী গিয়ে নানা লোকের কাছে নানা কাকুতি মিনতি করে সেটা ঠিক করে এসেছেন – ভাড়া লাগবে একশো পঁচিশ টাকা – আমাদের সেই হাতী কেনার চেয়ে বেশি।

যা হোক্ পৌনে আটটার সময় গাড়ি এল – তখন বৃষ্টি থেমেচে। গাড়ি ত বায়ুবেগে চল্ল, কিছু দূরে গিয়ে দেখি, একখানা বড় মোটরের মালগাড়ি ভগ্নঅবস্থায় পথপার্শ্বে নিশ্চল হয়ে আছে – পূর্ব্বদিনে আমাদের জিনিসপত্র এবং সাধুচরণকে নিয়ে এই গাড়ি রওনা হয়েছিল – এই পর্য্যন্ত এসে তিনি স্তব্ধ হয়েচেন – জিনিস তাঁর মধ্যেই আছে, সাধু ভাগ্যক্রমে একটা প্যাসেন্জার গাড়ি পেয়ে চলে গেছে। জিনিস রইল পড়ে, আমরা এগিয়ে চললুম বিদেশে, বিশেষত শীতের দেশে, জিনিসে মানুষের বিচ্ছেদ সুখকর নয়। সইতে হল। যা হোক শিলঙ পাহাড়ে এসে দেখি পাহাড়টা ঠিক আছে, আমাদের গ্রহবৈগুণ্যে বাঁকে নি, চোরে নি, নড়ে যায় নি, আমাদের জিওগ্রাফিতে তার যেখানে স্থান ঠিক সেই জায়গাতেই সে স্থির দাঁড়িয়ে আছে। দেখে আশ্চর্য্য বোধ হল। এখনও পাহাড়টি ঠিক আছে, তাই তোমাকে চিঠি লিখচি, কিন্তু আর বেশি লিখ্লে ডাক পাওয়া যাবে না। অতএব, ইতি কৃষ্ণ তৃতীয়া ১৩২৬ 

[২৫ আশ্বিন ১৩২৬]                             

তোমার ভানুদাদা

রবীন্দ্রনাথ গ্রীষ্মের ছুটিতে শান্তিনিকেতন থেকে শিলং এসেছেন অবকাশ কাটাবার জন্য। অবকাশ মানে বিশ্রাম আর লেখালেখি। কবিগুরু শিলংয়ে এসেছেন জানলে বিভিন্ন শ্রেণির বাঙালি-অবাঙালিরা যখন-তখন দেখা করতে আসবে, কবিকে বিরক্ত করবে, তা হবে না। তাই কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ নিয়ম করে দিয়েছেন, সকাল-দুপুর-রাতে দেখা করা যাবে না। শুধু বিকেলে মাত্র দু-ঘণ্টা সময়, অন্য সময়ে দেখা করা যাবে না। ইংরেজদের দেখাদেখি ধনীদের মধ্যে চল হয়েছে টি বা ডিনার পার্টি। ডিনার পার্টিতে কবি যাবেন না। তবে এর ভেতর একদিন ডিনার পার্টিতে যেতেই হয়, কারণ আমন্ত্রণকারী আর কেউ নন ময়ূরভঞ্জের রানি চারু দেবী। তিনি আবার ব্রাহ্মসমাজের বিশিষ্ট নেতা কেশব সেনের কন্যা। তাঁদের সঙ্গে কবিগুরুর পূর্বপরিচয়ও আছে।

কবি এর মধ্যে একদিন তাঁর বিখ্যাত ও দীর্ঘ ছন্দবন্ধ কবিতা ‘শিলঙের চিঠি’ লিখে ফেলেন।

দুটি কিশোরী কবিকে অনুরোধ জানিয়েছিল চিঠির উত্তর দিতে হবে ছন্দে। কিশোরী দুজনের একজনের নাম শোভন, বয়স ১৩, গোপেন্দ্র নারায়ণের কন্যা এবং কবি অমিয় চক্রবর্তীর মাসতুতো বোন। দ্বিতীয়জনের নাম নলিনী, বয়স ১১, অধ্যাপক নিখিলনাথ মৈত্রের কন্যা।

কবির শিলংয়ের চিঠি :

গর্মি যখন ছুটল না আর পাখার

                    হাওয়ায় শরবতে,

ঠান্ডা হতে দৌড়ে এলুম শিলং নামক

                                  পর্বতে।

মেঘ-বিছানো শৈলমালা গহন-ছায়া

                                   অরণ্যে

ক্লান্ত জনে ডাক দিয়ে কয়, ‘কোলে

                    আমার শরণ নে।

শিলংয়ের বর্ণনা দিতে দিতেই কবিতার মধ্যে দুটি ছত্রে লেখেন –

বর্ণনাটা ক্ষান্ত করি, অনেকগুলো কাজ

                           বাকি,

আছে চায়ের নেমন্তন্ন, এখনো তার

                          সাজ বাকি।

কবিতার নিচে বাঁদিকে লেখা ‘জিৎভূম, শিলং, ২৯শে জ্যৈষ্ঠ ১৩০০’, অর্থাৎ ৯ই জুন ১৯২৩।

জিৎভূমে বসেই কবি লেখেন অ্যাবসার্ড নাটক যক্ষপুরী, পরে যার নাম হয় রক্তকরবী

এই জিৎভূমবাসের সময় কবির সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা করতে আসতেন অধ্যাপক রাধাকমল মুখোপাধ্যায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে এমএ এবং প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কলার। সেই সময় তাঁর বয়স তেত্রিশ। কিছুদিন আগে বোম্বাইয়ে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর গুলি চালিয়েছে পুলিশ। রাধাকমল সেখানকার শ্রমিকদের অবস্থা দেখে এসেছেন, তিনি সেসবের গল্প করেন। কবিও একাধিকবার ইউরোপ-আমেরিকায় গেছেন – শিল্প বিপ্লবের ফলে সম্পদের বৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু সম্পদের সুষম বিতরণ হয় না বলে গরিব শ্রমিকদের খুব বেশি উন্নতি হয়নি; সৃষ্টি হয়েছে মানবাধিকার সংকট। কবির মনে দানা বাঁধে নতুন নাটকের প্লট যক্ষপুরী, চূড়ান্ত করার সময় নাটকের নাম হয় রক্তকরবী

এই সময় শিলংয়ে আরো দুজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে কবির, তাঁদের একজন অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সেন, অন্যজন ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়। এ-দুজনও রক্তকরবী নাটকে স্থান করে নেন যথাক্রমে পুরাণবাগীশ ও চিকিৎসক হিসেবে।

নায়িকা নন্দিনী তো রয়েছে চোখের সামনে, রাণু। নায়ক রঞ্জন, সেও হাতের কাছে, এলমহার্স্ট। সে ইংরেজ, বাংলা জানে না। শান্তিনিকেতনে এসে শ্রীনিকেতনের দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নিয়েছে। রঞ্জনরূপী এলমহার্স্টের বাংলা বলতে অসুবিধা হবে বলে রক্তকরবী নাটকে রঞ্জনের কোনো সংলাপ রাখা হয়নি।

বালিকার প্রথম চিঠি

সকালের ডাকে একগাদা চিঠি এসেছে। চিঠি এলে দেরি না করে পড়ার অভ্যাস রবীন্দ্রনাথের। একটা চিঠি পড়া শেষ হলে কবির চোখ গেল জানালা গলিয়ে শ্রাবণের মেঘভরা আকাশের দিকে। 

আবার পড়লেন, শেষের লাইনটি পড়ে তাঁর দাড়ি-গোঁফ ভরা মুখ হাসিতে ভরে উঠলো, ‘আপনি যদি আসেন তবে আপনাকে, আমাদের শোবার ঘরে, শুতে দেব।’

নাম লিখেছে রাণু, শুধু রাণু। পদবী নেই, ঠিকানা লিখেছে; কিন্তু সেখানে নেই কোনো পদবী, কী করে, কোন ক্লাসে পড়ে – তার উল্লেখ নেই। কিন্তু তাগাদা আছে, ‘আমার চিঠির উত্তর শি¹ির দেবেন।’

কবি অনেক আমন্ত্রণ পান, দেশে এবং বিদেশ থেকে। কিন্তু কেউ শোবার ঘরে শুতে দেবে বলে লোভ দেখিয়ে আমন্ত্রণ করেনি। আবার পত্রলেখিকার জোর কত, ‘আমার চিঠির উত্তর শি¹ির দেবেন’।

কবি আবার হাসলেন। এমন চিঠির উত্তরে বিলম্ব করা যাবে না। এমনিতেই তিনি মনে করেন, যে চিঠি লেখে সে উত্তরও প্রত্যাশা করে, সেটা তার অধিকার। উত্তর না দেওয়া অপরাধ। কবি ঠিক করলেন এখুনি উত্তর দেবেন।

কিন্তু তা হলো না। কিছু ঝামেলা এলো যা নিষ্পত্তি করা জরুরি। ব্যস্ততায় কেটে গেল দুদিন। যখন সময় পেলেন তখন চিঠিটা খুঁজে পেলেন না। উত্তর দিতে গেলে ঠিকানা লাগে, উত্তর দিতে আরেকবার পড়া লাগবে চিঠিটা; কিন্তু পাওয়া গেল না চিঠিটা।

মাসখানেক পরে অন্য কিছু খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এলো শোবার ঘরে শুতে দেবার আমন্ত্রণের চিঠি। আবার পড়লেন রাণুর

প্রথম চিঠি :

[জুলাই ১৯১৭]

[কাশী]

প্রিয় রবিবাবু

আমি আপনার গল্পগুচ্ছের সব গল্পগুলো পড়েছি, আর বুঝতে পেরেছি কেবল ক্ষুধিত পাষাণটা বুঝতে পারিনি। আচ্ছা সেই বুড়োটা যে ইরাণী বাঁদীর কথা বলছিল, সেই বাঁদীর গল্পটা বলল না কেন? শুন্তে ভারী ইচ্ছে করে। আপনি লিখে দেবেন। হ্যাঁ?

আচ্ছা জয়পরাজয় গল্পটার শেষে শেখরের সঙ্গে রাজকন্যার বিয়ে হল। না? কিন্তু আমার দিদিরা বলে শেখর মরে গেল। আপনি লিখে দেবেন যে, শেখর বেঁচে গেল আর রাজকন্যার সঙ্গে তার বিয়ে হল। কেমন? সত্যিই যদি শেখর মরে গিয়ে থাকে, তবে আমার বড় দুঃখ হবে। আমার সব গল্পগুলোর মধ্যে মাষ্টারমশায় গল্পটা ভাল লাগে। আমি আপনার গোরা, নৌকাডুবি, জীবনস্মৃতি, ছিন্নপত্র, রাজর্ষি, বৌ-ঠাকুরাণীর হাট, গল্প সপ্তক সব পড়েছি। কোন কোন জায়গায় বুঝতে পারিনি কিন্তু খুব ভাল লাগে। আপনার কথা ও ছুটির পড়া থেকে আমি আর আমার ছোটবোন কবিতা মুখস্থ  করি। চতুরঙ্গ ফাল্গুনী ও শান্তিনিকেতন শুরু করেছিলাম, কিন্তু বুঝতে পারলাম না। ডাকঘর, অচলায়তন, রাজা, শারদোৎসব এসবো পড়েছি। আমার আপনাকে দেখতে খু উ উ উ উ উ উব ইচ্ছে করে। একবার নিশ্চয় আমাদের বাড়িতে আসবেন কিন্তু। নিশ্চয় আসবেন কিন্তু। না এলে আপনার সঙ্গে

আড়ি। আপনি যদি আসেন তবে আপনাকে আমাদের শোবার ঘরে শুতে দেব।

আমাদের পুতুল দেখাব। ও পিঠএ আমাদের ঠিকানা লিখে দিয়েছি। 

শ্রাবণ ১৩২৪

রাণু।

235 Agast- kund

Benares city.

আমার চিঠির উত্তর শিগ্গির দেবেন।

নিশ্চয়।

কবি হেসে উত্তর লিখতে বসলেন –

১৯ আগষ্ট ১৯১৭

শান্তিনিকেতন

বোলপুর

কল্যাণীয়াসু

তোমার চিঠির জবাব দেব বলে চিঠিখানি যত্ন করে রেখেছিলেম কিন্তু কোথায় রেখেছিলুম সে কথা ভুলে যাওয়াতে এত দিন দেরি হয়ে গেল। আজ হঠাৎ না খুঁজতেই ডেস্কের ভিতর হতে আপনিই বেরিয়ে পড়ল।

তোমার রাণু নামটি খুব মিষ্টি – আমার একটি মেয়ে ছিল, তাকে রাণু বলে ডাক্তুম, কিন্তু সে এখন নেই। যাই হোক্ ওটুকু নাম দিয়ে তোমার ঘরের লোকের বেশ কাজ চলে যায় কিন্তু বাইরের লোকের পক্ষে চিঠিপত্রের ঠিকানা লিখ্তে মুস্কিল ঘটে। অতএব লেফাফার উপরে তোমাকে কেবলমাত্র রাণু বলে অভিহিত করাতে যদি অসম্মান ঘটে থাকে তবে আমাকে দোষ দিতে পারবে না। বাড়ীর ডাক নামে এবং ডাকঘরের ডাক নামে তফাৎ আছে যদি ভবিষ্যতে চিটি লেখো তবে সে কথাটা মনে রেখো।

শেখরের কথা জিজ্ঞাসা করেচ। রাজকন্যার সঙ্গে নিশ্চয়ই তার বিয়ে হত কিন্তু তার পূর্ব্বেই সে মরে গিয়েছিল। মরাটা তার ভুল হয়েছিল কিন্তু সে আর তার শোধরাবার উপায় নেই। যে খরচে রাজা তার বিয়ে দিত সেই খরচে খুব ধুম করে তার অন্ত্যেষ্ট সৎকার হয়েছিল। 

ক্ষুধিত পাষাণে ইরাণী বাঁদির কথা জানবার জন্যে আমারও খুব ইচ্ছে আছে কিন্তু যে লোকটা বল্তে পারত আজ পর্য্যন্ত তার ঠিকানা পাওয়া গেল না।

তোমার নিমন্ত্রণ আমি ভুলব না – হয়ত তোমাদের বাড়িতে একদিন যাব – কিন্তু তার আগে তুমি যদি আর-কোনো বাড়িতে চলে যাও? সংসারে এই রকম করেই গল্প ঠিক জায়গায় সম্পূর্ণ হয় না।

এই দেখ না কেন, খুব শীঘ্রই তোমার চিঠির জবাব দেব বলে ইচ্ছা করেছিলুম কিন্তু এমন হতে পারত তোমার চিঠি আমার ডেস্কের কোণেই লুকিয়ে থাকত এবং কোনদিনই তোমার ঠিকানা খুঁজে পেতুম না।

যেদিন বড় হয়ে তুমি আমার সব বই পড়ে বুঝতে পারবে তার আগেই তোমার নিমন্ত্রণ সেরে আস্তে চাই। কেননা যখন সব বুঝবে তখন হয় ত সব ভাল লাগ্বে না – তখন যে-ঘরে তোমার ভাঙ্গা পুতুল থাকে সেই ঘরে রবিবাবুকে শুতে দেবে।

ইশ্বর তোমার কল্যাণ করুন।

ইতি

৩রা ভাদ্র ১৩২৪

শুভাকাঙ্খী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

জন্মদিনের আবরণ

পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন আশ্রমে রবীন্দ্রনাথ তাঁর শান্তিনিকেতন নামের বিদ্যালয় স্থাপন করলেন ২২শে সেপ্টেম্বর ১৯০১ সালে। সেখানে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ায় আগে স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর ইচ্ছায় বড় এবং মেজো দু-মেয়েরই বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। বড় মেয়ে মাধুরীলতার বয়স পনেরো। বিয়ে হলো কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর পুত্র শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীর সঙ্গে, বিহারে মজঃফরপুরে ওকালতি করে। বিহারীলালও কবি, ভেবেছিলেন মেয়ে সুখেই থাকবে । শ্বশুরবাড়িতে সে শান্তিতে থাকেনি। বিয়ের সময় পণ চাওয়া হয়েছিল কুড়ি হাজার টাকা। অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেয়ের ভালো পরিবারে বিয়ে হচ্ছে মনে করে সে-দাবি মেনে নেন পিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারপর মেয়ের হলো ক্ষয়রোগ। অবস্থার আরো অবনতি হয়। শুধু বেলা নয় (মাধুরীলতার ডাকনাম) রবীন্দ্রনাথও ও-বাড়িতে সমাদর পাননি। জামাই শরৎকুমার শ্বশুরকে দেখেও দেখে না। সামনে সিগারেট টানে, টেবিলের ওপর পা তুলে বসে থাকে।

ও-বাড়িতে যাওয়া মানে অপমানিত হওয়া। তারপরেও যেতে হয়। যান, অসুস্থ মেয়ে বেলাকে দেখতে। মেয়ের ঘরে গিয়ে মাথার কাছে বসে থাকেন, একটা হাত মুঠোর মধ্যে ধরে রাখেন। কখনো কখনো গুনগুন করে গান করেন মেয়ের অনুরোধে।

জ্যৈষ্ঠ মাসের এক গরমের দুপুরে বেলাদের বাড়ির কাছে যেতে তাঁর মনটা কেঁপে ওঠে। সদর দরজা খোলা, বাইরে কিছু লোক দাঁড়িয়ে নিচুস্বরে কথা বলছে। কেউ কিছু বলল না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠিকই বুঝলেন। বেলা আর নেই। হাতে ফুল ছিল, সদর দরজার কাছে রেখে ফিরে এলেন, দোতলায় উঠে মৃত মেয়ের মুখ না দেখেই।

বেলা মারা যায় ১৯১৮ সালের ১৬ই মে।

মনটা খুব খারাপ। ওইদিনই বিকালে চুপচাপ বেরিয়ে এলেন। পুত্র রথীর সঙ্গে দেখা হলেও তাকে কিছু না বলে রাস্তায় নামলেন।

ভাড়াগাড়ি নিয়ে এলেন ভবানীপুর। খুঁজে পেলেন পঁয়ত্রিশ ল্যান্ডডাউন রোড। সদর দরজা বন্ধ। দোতলায় রাস্তার দিকের এক জানালা খোলা। সেদিকে তাকিয়ে রবীন্দ্রনাথ ডাকলেন, রাণু-রাণু।

চকিতে একটা মুখ জানালায় দেখা দিয়েই সরে গেল। একটু পরেই নিচের দরজা খুলে গেল। দরজা খুলে দাঁড়িয়েছে এক অপূর্ব বালিকা, রাণু। ফর্সা, টানা চোখ, কোঁকড়ানো চুল। কিন্তু গায়ে কোনো পোশাক নেই তার।

সে এই প্রথম দেখল তার ভানুদাদাকে। দেখেই চিনেছে। এগিয়ে এসে কবির হাত ধরল। কবি বললেন, তুমি রাণু?

রাণুর পিছু পিছু নেমে এসেছে তার মা, পিসি, মামা।

পোশাকহীন রাণুকে দেখে তার মা দ্রুত বলে উঠলেন, ছিঃ, তুই এই ভাবে – যা ঘরে যা –

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ-পরিবারের পরিচিত। তাঁকে সমাদর করে দোতলায় নিয়ে বসানো হলো। রাণুর বাবা ফণীভূষণ অধিকারী কাশীর হিন্দু কলেজের দর্শনের অধ্যাপক, বাড়িতেই ছিলেন। তাঁর যাওয়ায় অবাক হলেও সবাই খুব খুশি হয়েছেন জানিয়ে একটা-দুটো কবিতা কিংবা গান শুন্তে চাইলেন।

কবি খুব কম কথা বললেন। কাউকে জানালেনও না যে আজ দুপুরে তাঁর বড় আদরের বড় মেয়ে মাধুরীলতা মারা গেছে।

ফিরে আসার সময় ফণীভূষণ অধিকারীকে বললেন, অধিকারী মশাই সবাইকে নিয়ে শান্তিনিকেতনে আসুন। ওখানকার জল-হাওয়া খুব ভালো। আপনার স্বাস্থ্যোদ্ধার হবে। ওখানে আপনারা থাকবেন আমার অতিথি হয়ে। 

এসেছিলেন রাণুর সঙ্গে দেখা করতে, দেখা হয়েছে; কিন্তু কথা হলো খুব কম। 

কাশীর রাণু নামের ১১ বছরের কিশোরী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিঠি লিখতে শুরু করে জুলাই ১৯১৭ সালে ‘প্রিয় রবিবাবু’ বলে। এই সম্বোধন বদলে যায় ৩৯ নম্বর চিঠি থেকে ‘আদরের ভানুদাদা’ বলে। রাণু চেয়েছিল, রবিবাবুকে সে এমন একটা নামে ডাকবে যে-নামটি হবে একান্ত তার। পৃথিবীর আর কেউ সে-নামে তাঁকে ডাকবে না। তখন নির্বাচিত হয় ‘ভানুদাদা’ নামটি। রবীন্দ্রনাথ কম বয়সে ভানুসিংহ ছদ্মনামে কিছু কবিতা ও গান লিখেছিলেন। দুজনেরই নামটা পছন্দ হলো। ভানুদাদা শুধু রাণুর। 

সেবার কলকাতায় দেখা হওয়ার পরে রাণুরা সবাই এক মাস শান্তিনিকেতনে কাটান কবির ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে। রাণুর মনে হয় পৃথিবীতে তাঁর ভানুদাদার মতো এমন আপন আর কেউ নেই।

কি অপরূপ সুন্দর মানুষটি! দীর্ঘকায়, শক্তিমান পুরুষ অথচ চোখ দুটি ভারী কোমল, মাথায় অনেক চুল, মুখভর্তি কাঁচা-পাকা দাড়ি, অথচ যখন হাসেন তখন মনে হয়, তাঁর শরীরে বয়সের কোনো ছাপই পড়েনি।

চিঠির পর চিঠি

রবীন্দ্রনাথ রাণুকে মোট চিঠি লিখেছেন ২০৮টি। প্রথম আট বছরে ১৫৮টি, পরের ১৬ বছরে ৫০টি। সবই সংরক্ষিত এবং  সংকলিত হয়েছে চিঠিপত্র গ্রন্থে।

দুজনের চিঠিপত্র আদান-প্রদানের যে প্রবল স্রোত তাতে ভাটা পড়ে রাণুর বিয়ের কথাবার্তা শুরু ও চূড়ান্ত হলে। রাণুর বিয়ের পরে (বিয়ে ২৮শে জুন ১৯২৫) রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লেখেন মোট তিনটি, ১৯৩৭ সালে একটি, ১৯৪০ সালে দুটি। এই সময়ে অর্থাৎ ২৮শে জুন ১৯২৫-এর পরে রবীন্দ্রনাথ রাণুকে চিঠি লেখেন ৪১টি, সবই ছোট চিঠি, সম্বোধন ভাষা বক্তব্য বদলে গেছে। গুরুজন যেমন লেখে স্নেহভাজনকে।

রাণু শিলং থেকে এসে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নাটক করেন। টিকিট কেটে দেখা নাটক বিসর্জন মঞ্চস্থ হয় বাণিজ্যিক নাট্যমঞ্চ এম্পায়ারে। ২৫শে আগস্ট থেকে পরপর তিনদিন। রবীন্দ্রনাথ হন জয়সিংহ, নায়ক। তখন তাঁর বয়স ৬২। এর আগে রবীন্দ্রনাথ যতবার বিসর্জন করেছন হয়েছেন রঘুপতি। এর কারণ কি এবারে নায়িকা অপর্ণার চরিত্রে সুন্দরী সপ্তদশী রাণু? রাণুকে রিহার্সালের সময় বারবার করে দেখিয়ে দেওয়া, এম্পায়ার মঞ্চে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া-আসা, এমনকি নাটকের আগে অপর্ণাকে সাজানো-মেকআপ সবই করেন রবীন্দ্রনাথ।

নাটকে রাণুর খুব প্রশংসা হয় ভালো অভিনয়ের জন্য। তার চেয়েও বেশি আলোচিত হন তাঁর সৌন্দর্যের জন্য। অনেক গুণমুগ্ধ সৃষ্টি হয়। সংকটও।

এই সময়ে কিছু নোংরা-চিঠিও চালাচালি হয়। সবই বেনামি। রাণুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নাম জড়ানো হয় সেসব চিঠিতে। রবীন্দ্রনাথ তখন আর্জেন্টিনার সান ইসিদ্রোতে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সান্নিধ্যে। লেখক অনুরূপা দেবীর ঘটকালিতে অতুল ঐশ্বর্যের অধিকারী, ব্রিটিশ সরকার-প্রদত্ত নাইটহুড উপাধিপ্রাপ্ত রাজেন মুখার্জির ছেলে বীরেন মুখার্জির সঙ্গে।

কথাবার্তা প্রায় চূড়ান্ত। রাণুকে এনে রাখা হয়েছে কলকাতায়। বিলেতি কায়দায় কোর্টশিপ হিসেবে বীরেন ঘোড়ায় চড়ে রাণুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। গাড়িতে পাশে বসিয়ে হাওয়াও খেতে যান।

এই সময়ে রাণুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নাম জড়িয়ে কদর্য নোংরা বেনামি চিঠি পাঠানো হয় রাণুর বাবা-মা এবং রাজেন মুখার্জির কাছে। রবীন্দ্রনাথ বিদেশ থেকে এসে বোম্বাইতে নেমে সেসব চিঠি পান। রাণুর মা তাঁকে পাঠানো নোংরা চিঠিসহ চিঠি দিয়ে সব জানান। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনে বহু বিরোধিতা ও বিরূপ সমালোচনা শুনেছেন; কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও নৈতিকতা নিয়ে নোংরা অভিযোগ এই প্রথম।

নোংরা চিঠিপত্র স্যার রাজেনের বাড়িতেও গেছে। তাঁরা যদি চিঠি পড়ে বিয়ে ভেঙে দেন? রবীন্দ্রনাথ খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন রাণুর কথা ভেবে।

কিন্তু সব সামলে নেন অসামান্য উদ্যোগ এবং তাঁর ব্যক্তিত্ব দিয়ে। চিঠি লিখে, আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসেন স্যার রাজেন ও লেডি যাদুমতি মুখার্জিকে। তাঁদের সঙ্গে আলোচনার পরে বীরেনের মত নেওয়া হলো। সে বিদেশে পড়াশোনা এবং চলাফেরা করেছে। রাণুর সঙ্গে কথা বলে পছন্দ করেছে। নামবিহীন চিঠিকে সে গুরুত্ব দিলো না। পাত্রপক্ষের ইচ্ছা ও নির্দেশনায় ধুমধামের সঙ্গে রাণুর বিয়ে হয় বীরেন মুখার্জির সঙ্গে তাঁদের ভাড়া করা বাড়িতে, তাঁদের ব্যবস্থায়।

রাণু রবীন্দ্রনাথকে মোট চিঠি লিখেছেন ১১৫টি। এর মধ্যে ৬৮টি সংরক্ষিত আছে। ৪৭টি সংরক্ষিত হয়নি। কেন এবং কারা সরিয়েছে রাণুর ৪৭টি চিঠি – তার ব্যাখ্যা নেই। যদিও অতিসাধারণ চিঠিও সযতনে রক্ষা হয়েছে শান্তিনিকেতনে।

চিঠি লিখতে লিখতে রাণু একাদশী থেকে অষ্টাদশীতে পৌঁছেন। ভানুদাদাকে তিনি আদর জানান, ভারী দুষ্ট, কবিকে পাঠাতে শুরু করেন চুম্বন, আগস্ট ১৯১৮ সালে ২৩ নম্বর চিঠি থেকে। এর পরবর্তী ২২টি চিঠিতে কবিকে রাণুর চুমু দেওয়া অব্যাহত থাকে। উত্তরে কবি কখনো চুমু বা শরীর স্পর্শনীয় কোনো শব্দ ব্যবহার করেননি; কিন্তু নিষেধও করেননি।

রাণুর ৪৭টি চিঠি সংরক্ষিত হয়নি। কী ছিল সেই চিঠিতে যার কারণে সেগুলো খোয়া বা হারিয়ে গেছে। একটি চিঠি সংরক্ষিত হয়নি; কিন্তু পাওয়া গেছে সুদূর ইংল্যান্ডে। সেটি বিবাহপূর্ব লেখা শেষ চিঠি। দীর্ঘ চিঠি। সংরক্ষিত আছে লিওনার্ড এলমহার্স্ট-প্রতিষ্ঠিত ডার্টিংটন হলের অভিলেখাগারে।

এই এলমহার্স্ট রাণু ও রবীন্দ্রনাথের মাঝে এসেছেন শান্তিনিকেতনে এবং ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো ও রবীন্দ্রনাথের মাঝে আর্জেন্টিনার সান ইসিদ্রোতে ত্রিভুজ প্রেমের তৃতীয় ব্যক্তির মতো। ইংরেজ যুবক এলমহার্স্ট আমেরিকায় কৃষি বিষয়ে পড়াশোনাশেষে শান্তিনিকেতনে আসেন এবং তাঁর আমেরিকান প্রেমিকা বিধবা ডরোথি ক্লেইটের দেওয়া পঞ্চাশ হাজার ডলার দিয়ে শ্রীনিকেতন গড়ে তোলেন তাঁরই নির্দেশনায়। আবার ১৯২৫-এ উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের সময় তিনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী ছিলেন, সেক্রেটারির দায়িত্ব পালনের নিমিত্তে।

২৮শে নভেম্বর ১৯২৪ সালে কবিকে লেখা রাণুর দীর্ঘ চিঠিতে ফুটে উঠেছে তাঁর আর্তি, তাঁর ভালোবাসা, রবি ও রাণুর মধ্যকার সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার কথা :

[নভেম্বর]

C/O Prof. P.B Adhikari

The Benaras Hindu University                                                                                                             

সোমবার

ভানুদাদা

অনেকদিন আপনার কোনো চিঠি পাইনি – একমাসের উপর হল। আপনি সিলোন থেকে একখানা চিঠি দিয়েছিলেন, মনে আছে কি ভানুদাদা? তাতে লিখেছিলেন যে আমাকে চিঠি লেখা বোধহয় আপনার পক্ষে আর সম্ভবপর হবে না।

সেই জন্যেই বোধহয় চিঠি পাইনি। একবার শুন্লাম যে আপনি পোর্ট সেইডে এক সপ্তাহ থাকবেন তারপর জেরুজালেম যাবেন। গেছেন কি ভানুদাদা? তারপর আবার কাগজে একদিন দেখলুম যে আপনি ম্যাডিডি এ start করেছেন। পেরুতে শুনেছিলাম আপনি 10th Dec-এ যাবেন। এ চিঠিখানা তবে পেরুতেই পাঠাই ভানুদাদা – আপনি রাগ করবেন না ভানুদাদা চিঠি আবার লিখ্ছি বলে। আপনি কেমন আছেন আর কোথায় আছেন এ খবরটুকুও কি খবরের কাগজ থেকে জান্তে হবে? খবরের কাগজও যে সব সময় পাই না। সূবিরদাদা যখন কোল্কাতায় যায়, তাকে বলে দিয়েছিলুম যে আপনার কোনো খবর পেলে আমাকে পাঠাতে। সেদিন সে এক্টুখানি  খবর পাঠিয়েছে যে আপনি পেরু যাবেন। ভানুদাদা, আপনার এক্টুখানি হাতের লেখা দেখ্তে আমার ভারী ইচ্ছা করে।

আপনি যখন আমার চিঠি পাবেন তখন কত শত শত লোকের মাঝখানে আপনি। আমি আপনার কে ভানুদাদা যে আপনি তখন আমাকে মনে করবেন? আমি সে আশাও করি না। কিন্তু যদি কোনোদিন রাত্তিরবেলা অন্ধকারে শুতে গিয়ে আমাকে একটিবারও মনে পড়ে ভানুদাদা তাহলে এক লাইনের একটা ছোট্ট চিঠি দেবেন ভানুদাদা যে সেদিন আমাকে মনে হয়েছে আপনার। আমি আপনার কে ভানুদাদা? আমি আপনার বন্ধুও নই, আর কেউ জান্বেও না, ভানুদাদা। আমাকে পথের মাঝখান থেকে আপনি একদিন কুড়িয়ে নিয়েছিলেন, তারপর যেই আপনার এক্টু খারাপ লাগ্ল পথেই ফেলে দিয়ে গেলেন।

ভানুদাদা – আমি কি বল্ব? ভালোবাসার কি একটা দাবি নেই? ভানুদাদা, আপনি কী আমাকে ক্ষমা র্কতে পারেন না? আমার যে ভারী কান্না পায় ভানুদাদা। ভানুদাদা, আমি ত বেশি কিছু অন্যায় করিনি। আমি চধৎরং-এ কি রকম কষ্ট পেয়ে আপনাকে চার পাঁচখানা চিঠি লিখেছি। ভানুদাদা – এক্টুও কি আপনাকে মুভ র্কল না?

ভানুদাদা, আমি কতসময় ভাবি যে অভিমান করে আপনাকে চিঠি লিখ্ব না, কিন্তু কি রকম একলা, কি রকম বুকে কষ্ট হয় তাই আজ আবার লিখ্ছি। ভানুদাদা, দয়া করেও কি এক লাইন লেখা যায় না? ভানুদাদা, কোলকাতা থেকে ফিরে এসেই আমার জ্বর হয়েছিল। আপনার চিঠি কখানা সেই সময়ই পাই। ভানুদাদা, আমি এত দোষ করেছি যে আপনাকে আমি আর ভালবাস্তে পাব না? ভানুদাদা, আপনিই ত কতবার বলেছেন যে আমাদের সত্যিকারের বিয়ে হয়ে গেছে। তবে আপনি কি বলে আমাকে এমনভাবে অপমান করেছেন? আমাকে চিঠিতে আপনি যত খুসী বকুন না কিন্তু মাকে কেন লিখ্লেন? ভানুদাদা, আমি আপনাকে কি বল্ব, আমি সেই সময়গুলো সেই দুপুরবেলা সেই সন্ধ্যে, সকাল, রাত্রি, সেই আপনার একেবারে কাছে বেস যখণ গল্প র্কতুম, সেই সময়গুলো ভাব্তে পারি না। বুক টন্টন্ করতে থাকে – এত কষ্ট হয় কিন্তু তবুও বারবার ভাব্তে ইচ্ছে করে। ভানুদাদা, সে সব হয়ত আপনার জীবনের একটী খেলার পালা কিন্তু আমার তা নয়। নয়, একেবারে নয়। নয়, একেবারে নয়। এ যদি আমার জীবনে মিথ্যে হয় ভানুদাদা তাহলে পৃথিবীতে সত্য কাকে বল্বে? আমি একটুখানি ভাল হতেই আমরা আলীগড় গিয়েছিলুম, সেখানে গিয়েই আমার আবার জ্বর আর কাশি হয়েছিল।

আর তার সঙ্গে বমি হত। তারপর, সেখানে থেকে আপনাকে একখানা চিঠি দিয়েছিলুম, পেয়েছিলেন কি? আমরা আগ্রা, মথুরা, বৃন্দাবন, ফতেপুর সীক্রা, আর আরো দুচার জায়গায় বেড়িয়ে কাল কাশী এসেছি। আপনি হয়ত শুনে খুসী হবেন। আজ কলেজ গিয়েছিলুম কিন্তু ভারী মাথা ব্যথা হয়েছিল তাই তাড়াতাড়ি চলে এলুম। ভানুদাদা, ভানুদাদা, আমাকে ভুলে যাবেন না। ভানুদাদা, আমাকে আর ভালবাস্বেন না? ভানুদাদা, আপনি যাই বলুন আমি কাউকে কিছুতেই ভালবাস্তে পারব না। আমি বুড়োদের কোনো খবর জানি না জানতেও চাইও না। সেই আমাকে তার জন্যেই ত আবার আপনি অবধি আমাকে ভালাবাসেন না। আমি ত আপনার পায়ে ছুঁয়ে বলেছি যে তাদের কোনো খবর নেব না।

আমি বিয়ে করব না। কখনই, কখনই না তাকে সে আমার পায়ে ধরে সাধ্লেও না। ভানুদাদা, আমি যত ভেবে দেখি, দেখি যে সে কাপুরুষ – আমি তার সঙ্গে আর কোনো রকম কিচ্ছু সম্বন্ধ রাখ্তে চাই না। ভানুদাদা, আগে আমার বুড়োর উপর একটুও রাগ হত না কিন্তু এখন মনে হলে ঘৃণা হয়। আমি কাউকেই বিয়ে করব না – আপনার সঙ্গে ত বিয়ে হয়ে গেছে। ভানুদাদা, আপনি হয়ত মানবেন না কিন্তু আমি মানি। আপনি আমাকে নাই ভালবাসেন। আপনি আমাকে নাই চিঠি দিলেন কিন্তু আমি ত মনে মনে জানব যে একদিন আমি ভানুদাদার সমস্ত আদর পেয়েছি। আমার সমস্ত শরীর ছেয়ে সে আদর আমার মনকে ভরে দিয়েছিল সে ভাবনাটুকু কেড়ে নেবার সাধ্য এ পৃথিবীতে কারুর নেই ভানুদাদা, আপনারও না। নাই বা আপনি চিঠি দিলেন, আমি ত জান্ব মনে মনে যে একটা secret আছে যা আমি আর ভানুদাদা ছাড়া এ পৃথিবীতে আর কেউ জানে না। সেই secret টুকুতে ত কারুর অধিকার নেই। ভানুদাদা, আপনাকে কত লোক ভালাবাসে, কত লোক আপনাকে চায়, কত শত শত লোক একটিবার আপনাকে চোখের দেখা দেখ্বার জন্যে দূর দূর দেশ থেকে আসে – আমি তাদের মাঝখানে কে ভানুদাদা? আমার এমন কোনো গুণ নেই যার জন্যে আপনার ভালবাসার যোগ্য হতে পারি।

এমন রূপও নেই ভানুদাদা যে আপনাকে মুগ্ধ করতে পারি। ভানুদাদা, আমার চেয়ে কত শত শত সুন্দরী মেয়ে আপনার ভালবাসা চায় তবুও ভানুদাদা আপনি আমাকে ভালবাসেননি। এখন যদি না ভালবাসেন তবে আমি কি বলব ভানুদাদা? আপনার জীবনের অনেক নূতনত্বের মধ্যে এ হয়ত একটা খেলা কিন্তু ভানুদাদা আমি যে আপনাকে ভারী ভালবাসি ভানুদাদা। আমার রূপ নেই গুণ নেই কিন্তু আমার মতন কেউ কখনও আপনাকে ভালাবাস্তে র্পাবে না। চাই না চাই না আমি প্রতিদান। একদিন ত পেয়েছিলুম একদিন আপনাকে ভালবাস্তে পেয়েছিলুম, ভানুদাদা, সে কথা ভাবতেই আমার এমন বুকে কষ্ট হয় কিন্তু তবুও কেবলি বার বার ভাবতেও ইচ্ছে করে। ভানুদাদা, মাঝে মাঝে বড় কষ্ট হয়। ভানুদাদা, আপনি আমাকে misunderstand করলেন বলে আর চিঠি দিলেন না এই কথা ভাব্তেও আমার কষ্ট হয়। ভানুদাদা, আপনি কি করে বুঝলেন? কিন্তু আমার এ কথা মনে হলেও এত একলা বোধ হয়। বোধহয় যেন এ পৃথিবীতে কেউ নেই যে আমাকে একটু sympathise করে। ভানুদাদা, আমি কখনও কাউকে বিয়ে র্কব না। বুড়োকে কখনই কখনই না। সে যদি আমার পায়ে ধরে সাধে তবুও না। সে কাপুরুষ এক sentimental লোক। আমি আর তার সঙ্গে কোনোরকম সম্বন্ধ রাখতে চাই না। তার চিঠির কথা মনে হলে আমার এমন লজ্জা করে ভানুদাদা। সে সত্যি লোভী, true ভালবাসা কাকে বলে ওদের সমস্ত বাড়ী একত্র র্কলে বোধহয় কেউ বলতে  পারে না। ভানুদাদা, আপনি আমার জন্যে যা করেছেন আমাকে একসময় ভালবাসতেন বলেই করেছেন। ভানুদাদা, বুড়ো আমার পায়ে ধরে সাধ্্লেও আমি ওকে বিয়ে করব না। ভগবান করেন ওর সঙ্গে যেন আমার এ জীবনে কখন না দেখা হয়। ও শনি। আপনার আর আমার জীবনের মাঝে এসেছিল – ভগবান করেন আবার যেন যেখানে ছিল সেখানে চলে যায়। ভানুদাদা, কার সাধ্য আমাকে আপনার কাছ থেকে দূরে রাখে। আমি তাকে যে সমস্ত চিঠি লিখেছিলুম, তার মধ্যে প্রায় অনেকগুলোই ও আমাকে ফিরত পাঠিয়েছিল সেগুলো পুড়িয়ে ফেলেছি। ওর সমস্ত চিঠি পুড়িয়ে ফেলেছি। ওর চিহ্ন মুছে যাক্, ধুয়ে যাক্। ভানুদাদা, দোহাই আপনার, আমাকে কখন বিয়ে করতে বলবেন না। আমি যেমন আছি থাক্ব। আপনি ছাড়া আমি কাউকে কখন ভালবাসতে র্পাব না। ভানুদাদা জানেন আমার র্মতেও ইচ্চে করে আপনার বুকের কাছে। ভানুদাদা, আমি যে কিরকম [করে?] চাই একটু আপনার হাতের লেখা দেখ্তে। ভানুদাদা আপনি একটু হাত দিয়ে ছুঁয়েও আমাকে একখানা কাগজ পাঠিয়ে দেবেন। ভানুদাদা, আমার মতন unfortunate বোধ হয় কেউ নেই এ পৃথিবীতে কেউ নেই।

আপনার কতদিন কোনো খবর পাইনি। ভানুদাদা, আপনি আমাকে misunderstand করলেন আর এমন করে ফেলে চলে গেলেন যেন আমি একটা পথের কুকুর। একটুখানি চিঠি লিখে খবর অবধি জানালেন না। কেন, কেন আমি এমনি কি দোষ করেছি যে আপনি এক লাইনের চিঠি লিখ্তে আমাকে ঘৃণা করেন। আমি আপনাকে কখনওই ঠকাইনি। সত্যি যদি না ভালবাস্তুম তাহলে আপনার খবর জান্বার আমার দরকার কি? ভানুদাদা – আপনার দুটী পায়ে ধরে বলছি – আমি কি রকম উৎসুক থাকি আপনার একটুখানি খবর জান্তে। আমি এত কাঁদি আপনি কি এক্টুও বোঝেন না? ভানুদাদা, যদিই দোষ করে থাকি তাহলে আপনি কি ক্ষমা র্কতে পারেন না? আপনি এতই নিষ্ঠুর? ভানুদাদা – আপনি না ভালবাসলে আমি বাঁচব্ কি করে? ভানুদাদা – আমি আর কখনই কখনই অভিনয় র্কব না। আমার অভিনয়ের কথা মনে হলে রাগ হয়। আমি আর কিচ্ছু চাই না কেবল আপনার ভালবাসা।

ভানুদাদা আমার ভারী মন কেমন করে। যদি সময় না পান্, আমাকে দয়া করে একলাইনও খবর দেবেন যে কেমন আছেন। আমরা কাশীতে এসেছি। মা, বাবা সকলে ভাল আছে। শুন্ছি দিলীপ কুমার রায় দু তিন [দিন] বাদে কাশীতে আমাদের বাড়ীতে আসবেন। এখানে একটা science conference হবে তাতেও  প্রশান্তবাবুরা অনেকে আস্বেন বোধহয় কোল্কাতা থেকে।

আর শুনছি অমিয়বাবু এসে নাগোয়াতে কোথায় আছেন। এসেই জ্বর হয়েছে – বোধহয় ম্যালেরিয়া। ভানুদাদা, ভানুদাদা, দোহাই ভানুদাদা, আমি যে ভারী চাই আপনার একটুখানিও খবর জান্তে। ভানুদাদা – আমি জানি আমার রূপও নেই, গুণও নেই তবু ভানুদাদা আপনি আমাকে ভালবেসেছিলেন। এখন আপনি আমার মনের কথা একটুও ভাবলেনও না – ভানুদাদা আপনার ত ভুল্তে একটুও দেরী হল না। দেয়ালীর দিন আমার জন্মদিন ছিল। ভানুদাদা – আমার প্রণাম আপনাকে চিঠিতে পাঠাচ্ছি। ভানুদাদা, একলাইন চিঠিও কি পাব না ভানুদাদা।

রাণু P.S গবাদা আমাকে ২/৩ খানা চিঠি আর ছবি দিয়েছিল। ভানুদাদা, আমি তখন বাধ্য হয়ে একটা ছোট্ট [চিঠি] দিয়েছি। তারপর গবাদা আবার দুটো ছবি পাঠিয়েছে। আমি আর লিখ্ব না ভাব্ছি। ভানুদাদা, আমি কখনই encourage র্কব না – ইচ্ছেও নেই। ভানুদাদা, আমার ভারী মন খারাপ থাকে – একখানা চিঠি কি দেবেন না ভানুদাদা?

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>