রতি ও আরতির দ্বন্দ্ব

শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল হলে গত ২৩ মে ২০১৯ সন্ধ্যায় প্রদর্শিত হলো মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়ের ‘নীলাখ্যান’ নাটকের পঞ্চাশতম প্রদর্শনী। মহাকাল নাট্য সম্প্রদায় প্রযোজিত এ নাটকটি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাপুড়ে’ কাহিনী আশ্রয়ে রচনা করেছেন আনন জামান এবং নির্দেশনা দিয়েছেন ইউসুফ হাসান অর্ক। নাটকটির পঞ্চাশতম প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে. এম. খালিদ এম.পি। এ নাটকের প্রথম মঞ্চায়ন হয়েছিল ১৪ আগস্ট ২০১৫ এ পরীক্ষণ থিয়েটার হলেই। নাটকটি অদ্যবদি দর্শকপ্রিয়তার তুঙ্গে। পঞ্চাশতম প্রদর্শনীর উপর ভিত্তি করে কাজী নজরুল ইসলামের গল্প প্রসঙ্গ, নাট্যরূপ, উপস্থাপন কৌশল, নাট্যউপাদান সমূহ, নান্দনিকতা পর্যালোচনাই লেখাটির মূল অভীষ্ঠ।  

‘সাপুড়ে’ কাহিনীটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাপুড়ে’ সিনেমার গল্পসংক্ষেপ। সৃষ্টিশীলতায় অনন্য, দ্রোহ ও প্রেমের অনবদ্য রূপকার কাজী নজরুল ইসলাম গত শতকের ত্রিশের দশকে সিনেমার দিকে বেশ ঝুঁকে পড়েন। সংগীত পরিচালনা, চিত্রনাট্যরচনা, অভিনয় ও পরিচালনাসহ নানা দিকে কাজ করেছেন তিনি। নানা তথ্যে পাওয়া যায় তিনি প্রায় একুশটি চলচ্চিত্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো ধ্রুব ( ১৯৩৩, গান রচনা, সুর ও সংগীত পরিচালনা, অভিনয়),  পাতালপুরী (১৯৩৫, গান রচনা, সুর ও সংগীত পরিচালক), গ্রহের ফের (সুর, সংগীত পরিচালনা), বিদ্যাপতি (কাহিনীকার, গান ও সুর), গোরা (১৯৩৮, গান রচনা, সুর, সংগীত পরিচালনা), সাপুড়ে (১৯৩৯, কাহিনী, গান, সুর, চিত্রনাট্য), সাপেড়া (১৯৩৯, হিন্দি, কাহিনী, গান রচনা, সুর), নন্দিনী (১৯৪১, গান রচনা, সুর), চৌরঙ্গী (হিন্দি, গান রচনা, সুর, সংগীত পরিচালনা) ইত্যাদি।

‘সাপুুড়ে’ চলচ্চিত্রটি ১৯৩৯ সালে মুক্তি পায়। বেদে সম্প্রদায় নিয়ে খুব সম্ভবত এটিই ভারতবর্ষের প্রথম সিনেমা। সিনেমাটির কাহিনী তৈরি করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। নিউ থিয়েটার্স প্রযোজিত এ সিনেমার পরিচালক ছিলেন দেবকী বসু। কাহিনী ছাড়াও এ সিনেমার গান রচনা, গানের সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। যদিও সিনেমাটির কোনো প্রিন্ট বর্তমানে পাওয়া যায় না। এ সাপুড়ে সিনেমাটি সেসময় অত্যন্ত ব্যবসা সফল ছিল। একই বছর এ সিনেমাটি ‘সাপেড়া’ নামে হিন্দিতেও নির্মাণ করা হয়। এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন- মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, মেনকা, আলাউদ্দিন সরকার, আগা আলীসহ প্রমুখ। হিন্দি সিনেমাটিতেও প্রায় একই অভিনেতা-অভিনেত্রী ছিলেন।

‘সাপুড়ে’ প্রদর্শনের পূর্বে সিনেমা হলে সিনেমাটির কাহিনী সংক্ষেপ ও গান দিয়ে ছাপা পুস্তিকা বিক্রি করা হতো। (নজরুল রচনাবলী, সপ্তম খন্ড, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, সম্পাদনা পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম, বাংলা একাডেমি, ২০১২, পৃষ্ঠা-৩৭১)। এ পুস্তিকায় বর্ণিত ‘সাপুড়ে’ সিনেমার কাহিনীই এ ‘নীলাখ্যান’ নাটকের মূল। নাট্যকার আনন জামান এ ‘সাপুড়ে’ সিনেমার কাহিনী সংক্ষেপকে নতুন মাত্রায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে নাট্য রূপায়ন করেছেন। কাজী নজরুল ইসলামের অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘হলুদ গাঁদার ফুল, রাঙ্গা পলাশ ফুল, এনে দে, এনে দে, নইলে বাঁধবো না বাঁধবো না চুল…’ এ গানটি এ সিনেমারই।

‘নীলাখ্যান’ নাটকটি মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়ের ছত্রিশতম প্রযোজনা। মহাকাল নাট্য সম্প্রদায় ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে প্রায় তিনযুগ পূর্ণ হতে চলল বাংলাদেশে নাট্যাঙ্গনে উপহার দিয়ে চলেছে একের পর এক দর্শক নন্দিত নাটক। তারা বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতির প্রতি অবিচল আনুগত্যে স্থিত।এ যাবৎ অবিরাম নাট্যচর্চায় মহাকাল নাট্য সম্প্রদায় ৪০টি নাট্য প্রযোজনা মঞ্চে এনেছে ও ইতোমধ্যে প্রযোজনাগুলোর ১০১৯ টি প্রদর্শনী সম্পন্ন করেছে এবং ২টি নাট্য প্রযোজনার শতাধিক মঞ্চায়ন এবং ১টি প্রযোজনার দেড়শততম মঞ্চায়ন সম্পন্ন করেছে। মঞ্চে ৪টি প্রযোজনা নিয়মিতভাবে মঞ্চায়ন করে যাচ্ছে।

কাহিনীটি এমন বেদিয়ার সর্দার জহর। জহরের বিষজয় সাধনায় মনসা কর্তৃক কাম নিষিদ্ধ। জহরের স্ত্রী বিন্তী রানী আড়ালি বিলে রাশি রাশি শাদা শাপলার বনে আত্মহত্যা করে। জহর আত্ম সংযম ধারণ করে থাকে। সাধনা সিদ্ধি পেতে চায়। একদিন সাপ ধরতে গিয়ে নদীর তীরে সাপেকাটা মৃতপ্রায় এক বালিকাকে দেখতে পায় জহর। মেয়েটিকে বাঁচিয়ে তুলে। নানা প্রতিকূলতায় জহরের সাধনায় নারী নিষিদ্ধ বলে স্মৃতিভ্রষ্টা বালিকা বালকের পরিচয়ে বেড়ে উঠে বহরে। বালিকা চন্দনের কাছে বিন্তীর সুরভীই যেন পায় জহর। ধীরে ধীরে ঋতুমতী হয়ে ওঠে চন্দন। চন্দনের নারীত্বের স্ফুরণে জহর যেন প্রেম, কামনায় পাগলপ্রায় হয়ে ওঠে। সাধনার সংযমের বাধ ভেঙ্গে যেতে চাইলেও অতি কষ্টে তা সংবরণ করে। সাধনায় পুনঃআত্মনিয়োগ করে জহর। এদিকে বেদিয়ার দলে চন্দনকে ঘিরে তৈরি হয় নানা বিচিত্রমুখী সংকট। চন্দনকে পুরুষ জ্ঞানে দলের মৌটুসী প্রেম নিবেদন করে। একদিন বেদিয়াদের উৎসবে আকস্মাৎ চন্দনের নারীত্বের পরিচয় উন্মোচন হয়ে পড়ে। চন্দনকে নিয়ে দলের অতিবৃদ্ধ ঘণ্টাবুড়োর নানা সতর্ক কানে না নিলেও ঘটতে থাকে সেইসব অনাকাঙ্খিত বিপদ। দলের ঝুমরো ভালোবাসে চন্দনকে। চন্দন প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে। এমনকি একসময় সাধনার বাধ ভেঙে যায় সর্দার জহরের। নিজের পালিত কন্যাতুল্য চন্দনকে বিয়েও করতে চায়। কিন্তু চন্দনের বুদ্ধিমত্তায় নিজের ভুল বুঝতে পারে জহর। নানা দ্ব›দ্ব, নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে চন্দন বেদিয়ার যুবক ঝুমরো সাথে পালিয়ে চলে যায়। প্রচন্ড প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে ওঠে জহর। জহরের প্রেরিত সাপের দংশনে ঝুমরো মৃতুমুখী হয়ে পড়ে। কিন্তু চন্দনের অনুরোধে ঝুমরোর বিষ নামিয়ে দেয় সর্দার জহর। জহরের অন্তরে বাজে চন্দন চেয়েছিল গাঢ় নীল রঙের ফতুয়া। অবশেষে বিষজয়ের সাধনায় মত্ত জহর একশএকতম সাপের দংশন নেয়। বিষে নীল হয়ে ওঠে জহর। এভাবেই নাটকের কাহিনি এগিয়ে চলে।

কাজী নজরুল ইসলামের মূল ‘সাপুড়ে’ কাহিনীতে জহর ছিল সর্পবিষজয়ী ব্রতচারী। আজীবন চিরকুমার থেকে নিষ্কামভাবে সিদ্ধিলাভে উন্মত্ত ছিলেন। জহর নারীস্পর্শকে সম্পূর্ণ সাধনা বিধ্বংসী বলে মনে করতেন। নাট্যকার আনন জামান বলেন, ‘শব্দে সুরে ভাবের বিত্ত বৈভব বিনির্মাণে বাংলা সাহিত্যে কী সঙ্গীতের ঐশ্চর্যকবি কাজী নজরুল ইসলাম। …‘সাপুড়ে’ গল্প পাঠের পর বেদিয়া জহর-ই আমার কাছে যা কিছু বেদনা বলবার- বলেছিল- আপনার চরিত্রের ভাবকথা আমি অনুলিপি করেছি মাত্র। সাপুড়ে গল্পের বেদিয়াদের ঝাঁপির ভেতর যা ছিল গোপন- সেই ঝাঁপি খুলে গোপন উন্মোচনের চেষ্টায় এ নবতর নাট্য আয়োজন।’ (নাটকের সুভ্যিনিয়র)

তিন দিক দর্শক বেষ্টিত মাঝখানে মঞ্চ। আবহমান বাংলা নাট্যের মঞ্চ বিন্যাসে সাধারণত চারদিকে দর্শকবেষ্টিত মধ্যমঞ্চ। এ মঞ্চটি ব্যক্তিক্রম। গ্রিক নাট্যমঞ্চের মতো তিন দিক বেষ্টিত দর্শক। মঞ্চের মাঝখান থেকে পিছন হয়ে উপর দিকে ঝুলানো এবং বাঁকা একটি সিড়ির সিম্বল। সিড়িটির গোড়ায় একটি ঘট। পাশেই একটি বাক্স। সিড়িটি দেখে কারও বুঝতে সমস্যা হয় না এটি সাধনার উঁচ্চ ধাপে পৌঁছানোর নৈর্ব্যক্তিক বিন্যাস।

ধর্মীয় কৃত্য শেষ হলে দেবী মনসাকে পূজা দিয়ে শুরু গল্পের শুরু। এক বেদে বহর। তার সর্দার গল্পের প্রধান চরিত্র। সর্দার মনসার সাধনায় রপ্ত। বিষ জয় করতে চায়। চারজন নারী অখন্ড মনসা দেবীরূপকে প্রকাশ করে। তখন মঞ্চটি হয়ে ওঠে মনসার মন্দির। এভাবেই কাহিনি উপস্থাপনে প্রবেশ করেন। বিষজয়ী সাধক জহর তখন বলে উঠে

‘ভক্তের সম্মুখ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না দেবি- জগতের সকল বিষই তো তোমার বশ- তোমার বাঁকা ভ্রমর ইশারায় মাটির উপর শূণ্যতার যে ছাঁদ- সেও বিষে হয়ে যায় নীল- কৃপা চোখে চাও দেবী- পূর্ণ করো ইচ্ছা।’

সর্দার জহর চরিত্রে অভিনয় করেছেন মীর জাহিদ। চরিত্রের অসাধারণ বিশ্বাসযোগ্যতা ছোঁয়ে ছিল তার অভিনয়ে। সর্দার মনসার সাধনায় সিদ্ধি পেতে চাওয়াটা মধ্যে তীব্রতা লক্ষ করা গেছে। তবে উক্তি-প্রত্যুক্তির মড্যুলেশনে আরো ভাষিক উৎকর্ষে পৌঁছাতে পারতো সংলাপগুলো। প্রত্যেকের পোষাকগুলো বহরের সাজেস্টিক। পোশাকে স্থান কালকে ফেলে জীবন চরিতটাই মূখ্য হয়ে ওঠেছে। নাটকের শুরু থেকেই পিছনে যন্ত্রীদল কখনো ঘটনার আবহ তৈরি করেছে যন্ত্রীদল; কখনো বৈচিত্র্যমুখী বোল ও সংগীতের দ্বারা নাটকটিকে করেছে প্রাণবন্ত। বিষজয়ী সাধনায় লোলুপ নারীসঙ্গ ত্যাগী জহর যখন বিন্তির চাওয়াকে অগ্রাহ্য করে তখন যেন অনবদ্য আরেক নাটকীয় সুর বেজে উঠে

জহর- মনসা তবে সত্য ভাষণ কহে- নারীতে হয় সাধন বিনষ্ট। যা তুই সম্মুখ থিয়া আমার। বিষ জয়ের ব্রতে যা কিছু আছে জোড়- তোর ঐ দিঘী ডোবা চোখ সবখানি ধরে দেয় টান- যা।…

বিন্তি- তবে তাই তোর ইচ্ছা- ভগমান হবি তুই। বহরের সব লোকে কহে- ও সত্য নয় ও স্বপ্ন- রাতের শেষ প্রহরে মনসার প্রহেলিকা। মনে নাইরে বেদিয়া আসমান যখন মেঘে মেঘে কালো- আমার খোপা খুলে দিয়ে কয়েছিলি- তুই সুন্দর তার থিয়া- ও মেঘ বান্ধি দিমো তোর চুলে।

কৃত্য, মনসার বন্দনা, বেদে দলের নাচের পরেই জহরের মৃতপ্রায় চন্দনকে প্রাপ্তি দিয়ে শুরু হয় ঘটনার অনুপ্রবেশ। বাংলার আবহমান অভিনয়রীতির বৈশিষ্ট্যে বর্ণনাত্মক চরিত্রাভিনয়ে উপস্থাপিত হয়েছে নাট্যটি। অভিনয়ে বাংলার আবহমান বর্ণনাত্মক ধারা সঙ্গে পাশ্চাত্যের চরিত্রাভিনয়ের মিশ্রণ ঘটেছে। সর্দারের নদীতে খুঁজতে যাওয়া লাশ প্রাপ্তিতে চমৎকার একটি নাটকীয় মূহুর্ত তৈরি করেছেন নির্দেশক। দর্শকের মধ্যে এক যাদুকরী মোহ তৈরি করে। সমস্ত নাট্যটির মধ্যে কোরিওগ্রাফিও দর্শকে বৈচিত্রে ভাসিয়েছে। বেদেদের সাপ ধরতে যাওয়া, সাপ ধরাসহ নৃত্যগীত অসাধারণ ভালো লাগা তৈরি করেছে। চন্দনকে নিয়ে দলের মধ্যে যে কৌতুহল তা অত্যন্ত পরিমিত বিন্যাসে উপস্থাপিত।

চন্দন চরিত্রের অভিনয়ও অত্যন্ত প্রাণবন্ত। কোনাল চৈতি সাথী চরিত্র রূপায়ন করেছেন। চন্দনের আকুতি দর্শকের হৃদয় ছোঁয়ে যায় যদি না কহ- তবে থাকি না- ঘরে না হয় ঠাই- উঠানেই না হয় থাকি। নাইরলের তেলে রক্ত চন্দন ভিজিয়ে তোমার বীণ লেপে দেবো- ঘন জালের দুগ্ধ দিবো সাপে।’ শুভ্রকান্তি ফুল এ চন্দন এক ধরনের ইনারবিউটি ছড়িয়ে যায় দর্শকের মধ্যে। মাথায় একটি পাগড়ি দিয়ে বালকের বেশ উপস্থাপন করেছেন। সাধনান্মুখ জহরের কামনা বাসনায় নীল পর্দার সিম্বল ব্যবহৃত হয়। নীল কাপড় টানায় একদিকে বিষের সাধনা এবং অন্যদিকে কামনা বাসনার উন্মুত্ততা কী প্রকাশ করে! তারপর উপর থেকে প্যাঁচানো নীল পর্দা নেমে আসে। বোঝা যায় জহর বিষ-নীল যন্ত্রণা জয়লাভের জন্য সাধনায় ঊর্ধ্বমুখী। চন্দনের ঋতুমতী ঘটনায় মিউজিক অসাধারণ। মূল কাহিনীতে এ অংশটুকু না থাকলেও নাট্যকার দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করতেই সম্ভবত এ দৃশ্যের অবতারণা করেছেন। চন্দন নিয়ে মৌটুসীর ভাবনাটি অত্যন্ত বিনোদিত করে দর্শককে। মৌটুসীর অভিনয়ও সংলাপ প্রাণবন্ততা উপভোগ্য।

চরিত্রাভিনয়ের সাথে বর্ণাত্মক ধারায় কাহিনি উপস্থাপিত হতে থাকে। চন্দনের অনুভূতিশীলতা বোঝাতে শাদা কাপড় টেনে একপাশ টেনে চন্দনের বুকের উপর দিয়ে নিয়ে যায়। সে সময় উপর থেকে জোসনা বল ঝরে পড়ে।

বহরের নৃত্যগীত অসাধারণ। নাচগুলোর মধ্যে সত্যিকারের নৃত্যশিল্পীদের মতোই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল। নাচতে নাচতে প্রকাশিত হয়ে পড়ে চন্দন ছেলে নয়; নারী। মিউজিকের সাথে অসাধারণ উপস্থাপিত হয়ে ওঠেছে দৃশ্যটি। সর্দার জহর চন্দনকে বিয়ে করতে চায়। কথোকপথন, অভিনয়, আবহে অসাধারণ দ্বদ্ব তৈরি হয়েছে দৃশ্যটিতে। অতিপ্রাকৃত বৃদ্ধ বারবার সচেতন করিয়ে দেয় সবাইকে। নানা ঘাত প্রতিঘাতে মনসার ঘট ভেঙে ফেলে সর্দার জহর।

নাটকটি দেখতে দেখতে প্রশ্ন জাগে নারীসঙ্গ সত্যিই সাধনাকে নষ্ট করে দেয় কী। শেষ পর্যন্ত চন্দন আগ্রহেই ঝুমরোর সাথে পালিয়ে যায় চন্দন। বনে চলে যায় যেখানে শুধু দুজন দুজনকে ঘিরেই বাঁচবে বলে। গান, বর্ণনা, নৃত্য, কথোপকথনের এক ঐকতানিক সূরে একীভূত হয়ে ওঠেছে নাট্যটিতে। নাট্যটি উপস্থাপনে অত্যন্ত পরিমিতিবোধের পরিচয় পাওয়া গেছে। এ সময় উপজাতির কাঠি নৃত্য উপস্থাপিত হয়। নাচের সময় উপর থেকে সাদা পলিথিন পড়ে। জহর যেন প্রতিহিংসা আগুনে আত্মহারা হয়ে ওঠেছে। কিন্তু চন্দন পিতৃতুল্য ও ওস্তাদ জহরকে অনুরোধ করে ঝুমরোকে বাঁচাতে। একে একে জড় হতে থাকে বেদে বহরের লোকজন। ঝুমরোকে বাঁচিয়ে দেয় জহর। এ সময় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয় সর্দার জহর। সর্দার নিজেই সাপের বিষের ছোবল নিয়ে বিষের যন্ত্রণায় নীল হয়ে ওঠে

‘মৃত্যু জেনেই নিয়েছি দংশন। পূর্বেই সাঙ্গ হয়েছে সাধনা মনসার ছলে।… খুব যতনে লালন করেছি তোরে- প্রতি ভোরে ঝাঁপি খুলে নিরীখিয়া দেখিয়াছি সাপে- বিষ দাঁত ভাঙা আছে কিনা তার। মনে সংশয় যদি ঝাঁপি থিয়া এসে কাটে তোরে।… আমি জল কাঁদায় গড়া- তাঁতে মন আছে মায়া আছে- প্রাণ দিয়ে প্রেম করলাম জয়, সাধন করলাম পূর্ণ।’ মৃত্যু যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে ওঠে জহর। আর নেপথ্যে নজরুলে সেই বিখ্যাত গান বাজতে থাকে-‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব দেব না আমারে ভুলিতে।’ এক অসাধারণ বিয়োগান্তক পরিবেশের  মধ্য দিয়ে নাট্যটির পরিসমাপ্তি ঘটে।

নির্দেশক ইউসুফ হাসান অর্ক বলেন, ‘কাহিনীটির প্রেক্ষাপট বেদে বহর হলেও কবি নজরুল এর অন্তরেতে এমন একটি সার্বজনীন বীজ ভাসিয়ে দিয়েছেন যা স্পষ্টতই গোটা মানবকূলের সর্বকালকে ছুঁয়ে যায়। … এ নাট্যে অভিনেতা নিজেই চরিত্র ও পরিস্থিতির বিবরণ উপস্থাপন করেন মঞ্চক্রিয়া সহযোগে। একে শুদ্ধ চরিত্রাভিনয় না বলে আমরা ‘বর্ণনাত্মক চরিত্রাভিনয়’ বলছি। এ অভিনয় আমাদের আবিষ্কার নয়। আমাদের ঐতিহ্যে পালাকার-গায়েন-বয়াতিগণ এভাবেই অভিনয় করেন।’ (নাটকের সুভ্যিনিয়র)

নাটকটির নামকরণ করা হয়েছে ‘নীলাখ্যান’। দীনবন্ধু মিত্রের নাটক ‘নীলদর্পণ’ এর অসাধারণ জনপ্রিয়তায় নীল বলতে প্রথমতই নীলকরদের নীল চাষের চিত্র চোখে ভেসে ওঠে। সনাতন ধর্মীয় পুরাণে বিষে শিবের নীলকণ্ঠ হয়েছিল বটে। কিন্তু বিষক্রিয়ায় নীল হওয়া কী বাস্তবে দেখা যায়! দলীয় সুভ্যিনিয়রে উল্লেখ আছে এ নাটকটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাপুড়ে’ গল্প অবলম্বনে। এ প্রবন্ধে কাহিনীর উৎসমূল পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে। এক্ষেত্রে নাট্যকার, নিদের্শক ও দলীয় প্রচার পত্রে বিভ্রান্তি না রেখে সঠিক ও সহজতর তথ্য সংযোজন প্রয়োজন ছিল। সবমিলিয়ে পরিমিতিবোধ সম্পন্ন শৈল্পিক প্রযোজনা ‘নীলাখ্যান’ নাটকটি। বিষয়বস্তু, উপস্থাপন চিন্তন, অভিনয়, আবহ ও কর্মদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। নাটকটির উপস্থাপন সুখ দর্শন অনুভূতি তৈরি করেছে তা নিঃসন্দেহে কৃতিত্বের সাক্ষর বহন করে। আমরা নাটকটির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।

 

 

 

.

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত