যুক্তিচিন্তা-দাদশ পর্ব : লাউ-বোয়ালের তরকারি কেন এত স্বাদের?
গল্পটি সম্ভবত অনেকেরই শোনা। গ্রামের দরিদ্র পরিবারের দুই শিশু গল্প করছে-
-জানস, লাউ দিয়া বোয়াল মাছের তরকারি খুব স্বাদ!
-তুই খাইছস?
-না।
-তাইলে কেমনে বুঝলি?
-মামা কইছে। মামা হামিদপুর হাটে গিয়া দেখে, একজন লোক হোটেলে লাউ বোয়ালের তরকারি দিয়া ভাত খাইতাছে! খুব স্বাদ লাগতাছে!
গল্পটি যিনি বলেছিলেন, বলা শেষে তিনি হেসেছিলেন। সম্ভবত শিশুটির বোকামি তার হাসির উৎস। আমি তার প্রত্যাশা পূরন করতে পারিনি। আমার একেবারেই হাসি পায়নি, বরং লাউ-বোয়াল খেতে না পাওয়াশিশুর মলিন মুখ কল্পনা করে মন খারাপ হয়েছিল। এটা দেখার ভিন্নতা। এছাড়াও গল্পের আরও একটি দিক ভেবে দেখা যায়।
লাউ দিয়ে রান্না করা বোয়াল মাছের তরকারি যে খুব সুস্বাদু—এটি তারা কীভাবে বুঝলেন? কিসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলেন? মামা হাটে একজনকে খেতে দেখেছেন এবং দেখে মনে হয়েছে যে, তরকারিটা সুস্বাদু। তাদের নিজেদের যাচাই করার সুযোগ হয়নি, একজনের ভাললাগা থেকেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তাদের বোকামি নিয়ে না হয় হাসাহাসি করা যাবে, কিন্তু অজানা বিষয়ে আপনি আমি কীভাবে সিদ্ধান্ত নেই? জগতের সব বিষয় তো আর যাচাই করে দেখা সম্ভব না। ফলে কিছুসংখ্যক উপাত্ত থেকেই একটা সাধারণ সিদ্ধান্তে আসতে হয়। এটাকে বলে সাধারণীকরণ।
যেমন, বিদেশ থেকে আসা একজন মানুষ তিন মাস বাংলদেশে ঘুরেছেন। তিনি দেশের যতগুলো হোটেলে খেতে গেছেন অধিকাংশ হোটেলেই বেশিরভাগ মানুষকে হাত দিয় ভাত খেতে দেখেছেন। তার এই দেখারভিত্তিতে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ হোটেলে হাত দিয়ে ভাত খায়। তিনি যেহেতু বাংলাদেশের অনেকগুলো জায়গায়, ধরে নেই ৩০টি জেলাতে, অনেকগুলো হোটেলে, মনে করি ১১০টি হোটেলে, অধিকাংশ মানুষকে, ধরি ৯০ ভাগকে, হাত দিয়ে ভাত খেতে দেখেছেন, তাই ধরে নেওয়াযায়, তার এই সাধারণীকরণ যথাযথ।
একবার একজন সিএনজি চালক বলছিলেন, “ময়মনসিংহের মানুষ খুব টাউট”। কেন তার এরকম মনে হল—জানতে চাইলে তিনি বললেন, “প্রথম যেবার ময়মনসিংহ যাই, বাসস্ট্যান্ডে নামার পরই আমার পকেট থেকে মানিব্যাগ চুরি হয়েছিল”। তার হারানো মানিব্যাগের বেদনায় বেদনার্ত হয়েও বলা দরকার, মাত্র একটি ঘটনা বা উপাত্ত থেকে পুরো একটি জেলার মানুষকে টাউট বলাটা তার উচিৎ হয়নি। বাস্তবে ময়মনসিংহের মানুষ ‘টাউট’ হতে পারে বা নাও হতে পারে, যে প্রক্রিয়ায় তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা ভুল। এই যে একটি বা সামান্য কিছু উপাত্ত থেকে একটি সার্বিক বা সাধারণ সিদ্ধান্তে আসা—এটাকে বলে অতিসাধারণীকরণ। সংখ্যা এবং গুণগতভাবে প্রতিনিধিত্বশীল স্যাম্পল বা উপাত্ত না থাকলে এ ধরনের অতিসাধারণীকরণ ঘটে।
“আমার তিন মামা ৩৭ বছর ধরে ধূমপান করেন। কই কারোই তো ক্যান্সার হয়নি! ওদিকে অহিদ স্যার সারা জীবন সিগারেটে টান দেন নাই। অথচ মারা গেলেন ফুসফুসের ক্যান্সারে। আসলে ক্যান্সারের সাথে ধূমপানের কোন সম্পর্ক নেই।” এধরণের অতিসাধারণীকরণ আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি। এই জাতি খারাপ, ওই দল নোংরা, তাদের কোনও বুদ্ধি নাই—এরকম হাজারটা অতিসাধারণীকরণের উদাহরণ দেওয়া যায়।
“হাঁড়ির একটি ভাত টিপলে সব ভাতের খবর পাওয়াযায়”—প্রচলিত এই প্রবাদটির সত্যতা আমি নিজে যাচাই করে দেখেছি বহুবার। ভাত রান্নার ক্ষেত্রে এই প্রবাদ আমাকে অনেকবারই সহায়তা করেছে। কিন্তু এই প্রবাদের মর্মার্থ অন্যত্র প্রয়োগ করতে গেলেই বাঁধে গণ্ডগোল।
হাঁড়ির সকল ভাত একই অবস্থায় থাকে, কারণ চাল, হাঁড়ি, পানি, আগুন, তাপ—সবকিছু একইরকম থাকে থাকে। চালের অবস্থা পরিবর্তনে যা কিছু প্রভাবক, চলক বা Variable হিসেবে কাজ করে, তা সব চালের ক্ষেত্রে একইরকম হওয়ায় সব চালের অবস্থাও একইরকম থাকে। কিন্তু সকল ঘটনা, বিষয়, ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই চলক বা প্রভাবক এক থাকে না। তাই একটি ঘটনা, বিষয় বা একজন ব্যক্তির উপাত্ত থেকে একইরকম সকলের ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্তে আসা যায় না। যদিও আমরা সেটা অনেক সময়ই করে থাকি।
যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের চর্চাকে ‘অতিসাধারণীকরণের ছদ্মযুক্তি’ বলা যায়, যাকে ইংরেজিতে Hasty Generalization Fallafy বা Faulty Generalization Fallacy বলা হয়।
কবি ও লেখক