| 1 মার্চ 2024
Categories
ধারাবাহিক রাজনীতি সময়ের ডায়েরি

যুক্তিচিন্তা-সপ্তম পর্ব : কেন জীবন দিতে হল তাসলিমাকে?

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

অ.

“আমি ছেলেধরা না, আমি ছেলেধরা না”—শরীরের নিঃশেষ হয়ে আসা সবটুকু শক্তি একসাথে করে চিৎকার করছিলেন তাসলিমা। দ্রুতই তার কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়ে যায়। আর কোন আতঙ্ক নেই, আত্মরক্ষার চেষ্টা নেই। মুহূর্তে সকল আলো নিভে যায় তার! তখনও তার নিশ্চল, প্রাণহীন দেহকে আঘাত করে চলেছেন কিছু উন্মত্ত মানুষ। ২০ জুলাই ২০১৯। ঢাকার উত্তর বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। মানুষের অবিশ্বাসের কাছে হেরে যান সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করতে আসা তাসলিমা বেগম রুনু।

ছেলেধরা গুজবের সেই সময়ে তাসলিমার মৃত্যু নাড়া দিয়েছিল সারা দেশের মানুষকে। কেন এমন হল? মানুষ কীভাবে এত নির্বোধ আর নির্মম হতে পারে? কেন এভাবে প্রাণ হারাতে হল একজন মাকে?

বেদনায় বিক্ষোভে এই প্রশ্নগুলো তখন ছিল মানুষের মুখে মুখে। এর কোন সহজ, স্পষ্ট, একক উত্তর কারও জানা নেই। জানতে চাইলে বিরোধী দল বলবে, সরকার ব্যর্থ; রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সুশাসনের অভাবের কথা বলতে পারেন। এভাবে ন্যায়বিচার না থাকা, সামাজিক অস্থিরতা, অসুস্থ জনমনস্তত্ত্ব, মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকে শুরু করে জিনগত অপরাধ প্রবণতা পর্যন্ত আলোচনা বিস্তৃত করা যায়।

অচেনা একজন নারী স্কুলে ঢুকতে গেলে সেখানে অপেক্ষারত অভিভাবকরা তার পরিচয় এবং এখানে আসার উদ্দেশ্য জানতে চান। তাসলিমা তার সন্তানকে স্কুলে ভর্তির খোঁজ নিতে আসার কথা বললেও ছেলেধরা গুজবে আতঙ্কগ্রস্ত অভিভাবকদের তিনি তা বিশ্বাস করাতে পারেননি। অভিভাবকরা তাকে ছেলেধরা হিসেবে সন্দেহ করেন। বছরের মাঝামাঝি সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করার কথা বলা এবং সম্ভবত মানসিক চাপে বিভ্রান্ত হয়ে বাসার ঠিকানা বলতে গিয়ে ভুল করায় অভিভাবকদের সন্দেহ আরও বাড়তে থাকে। তাসলিমা তার স্কুলে আসার উদ্দেশ্য যে সন্তানের স্কুলে ভর্তির বিষয়ে খোঁজ নেওয়া তা আর কোনভাবেই বিশ্বাস করাতে পারেন না। যেহেতু তিনি এটি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন, উত্তেজিত অভিভাবকদের একাংশ এবং আশেপাশের জনতা ধরেই নেন যে, তাসলিমা একজন ছেলেধরা। এরপর সৃষ্টি হয় সেই মর্মান্তিক ইতিহাস।

তাসলিমা যে সত্যিই তার সন্তানের ভর্তির ব্যাপারে স্কুলে এসেছেন—এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে না পারলেও, তিনি যে একজন ছেলেধরা, সে বিষয়ে উত্তেজিত অভিভাবকরা মনে একটুও সন্দেহ রাখেননি, একেবারে নিশ্চিত সত্য বলে বিশ্বাস করেছেন!

আ.

করোনাভাইরাস নিয়ে আলাপের শেষ নেই। করোনাভাইরাস মহামারী, নাকি তথ্যমহামারী—কোনটি বেশি সংক্রামক—তা নিয়ে গণতথ্য বিশ্লেষকদের নানা মত শোনা যায়। কতজন যে কত তথ্য আর কত ব্যাখ্যা হাজির করছেন, কে জানে তার কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল! সাধারণ ফেসবুকবিজ্ঞানী থেকে শুরু করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্ববিখ্যাত গবেষকের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যেন পিংপং বলের মতো অনবরত লাফাচ্ছে!

করোনাভাইরাস কী ড্রপলেট আকারে নির্দিষ্ট দূরত্বে ছড়ায়, নাকি এরোসল আকারে বাতাসে ভেসে থাকতে পারে—তা নিয়ে ভিন্নমত আছে গবেষকদের মধ্যে। যেহেতু ভাইরাস ব্যাটা (বেটিও হতে পারে, আমি শিওর না!) অনাহুত এক নতুন মেহমান, তার স্বভাব-চরিত্র এখনও সেভাবে পরীক্ষা করে জানা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক তথ্যের পক্ষেই নিশ্চিত প্রমাণ নেই। যদি নিশ্চিত প্রমাণ না থাকে যে, করোনাভাইরাস এরোসল হিসেবে বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে, করোনাভাইরাস এরোসল হিসেবে বাতাসে ভেসে বেড়ায় না? যেহেতু প্রমাণ নেই, অতএব আমরা ধরে নিলাম যে, ভেসে বেড়ানোর তত্ত্ব ভুল। এবার কয়েকদিন পরে নতুন কোন গবেষণায় যদি প্রমাণিত হয় যে, তত্ত্বটি ঠিক ছিল, তখন?

ই.

তখন আমরা নিকলা গ্রামে থাকি। একবার প্রতিবেশী তোফাজ্জল ভাইদের বাড়িতে অনেক দূর থেকে দূরসম্পর্কের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে এক তরুণ বেড়াতে এসেছিলেন। বাড়ির কেউ তাকে চেনেন না। তখন তো আর আজকের মোবাইল-ফেসবুকের যুগ না, যে চাইলেই খোঁজ নেওয়া যায়। তাকে রাতে কাছারি ঘরে একা ঘুমাতে দেওয়া হয় এবং রাত শেষ হওয়ার আগে ভাই-ভাবীদের শোরগোলে ঘুমভেঙ্গে গেলে ছুটে গিয়ে জানতে পারি, ঘরের কিছু জিনিসপত্রসহ সেই অচেনা তরুণ নিখোঁজ!

সকালে কেউ কেউ অচেনা লোককে বিশ্বাস করে বাড়িতে থাকতে দেওয়ার ‘বোকামীর খেসারত’ হিসেবে ঘটনাটির ব্যাখ্যা করেন। আগের সন্ধ্যায় অচেনা তরুণটির সৎ অথবা চোর—কোন পরিচয়ই যখন প্রমাণিত হয়নি, তখন কোনটাকে সত্য বলে ধরে নেওয়া সঙ্গত হত?

ঈ.

কোন একটি বিষয়কে সত্য বা অসত্য হিসেবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এরকম প্রশ্নের মুখে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে হামেশাই পড়তে হয়, মাঝে মাঝে পস্তাতেও হয়।

কোন একটি বক্তব্যের পক্ষে যদি প্রমাণ না থাকে, তাহলে কি তা মিথ্যা হয়ে যায়? অথবা কোন বক্তব্যকে মিথ্যা প্রমাণ না করতে পারলেই কি তা সত্য হয়ে যায়?

প্রথম ঘটনায় তাসলিমা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেনেনি, তাতে প্রমাণ হয় না যে তিনি ছেলেধরা। যদিও নির্দোষ প্রমাণ করতে না পারাকেই দোষী হওয়ার পক্ষে প্রমাণ হিসেবে ধরে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। তাকে প্রাণ দিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হয়।

দ্বিতীয় উদাহরণে করোনাভাইরাসের বাতাসে ভেসে থাকার প্রমাণের অনুপস্থিতি নিশ্চিত করে না যে, এই দাবি সত্য বা মিথ্যা, এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। হয়তো পরের কোন গবেষণা নিশ্চিত সত্য জানাবে। এমনও হতে পারে, এ বিষয়ে গবেষণা থেকে নিশ্চিত সত্য পাওয়াই যাবে না, বিষয়টি অজানাই থেকে যাবে।

তৃতীয় অভিজ্ঞতায় অচেনা তরুণকে সৎ মানুষ হিসেবে ধরে নিলেও পরে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এটি অবশ্য সত্যও প্রমাণিত হতে পারত।

উ.

এই যে বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ না থাকলেই তাকে মিথ্যা ধরে নেওয়া বা বক্তব্যকে মিথ্যা প্রমাণ না করতে পারলেই তাকে সত্য ধরে নেওয়া—আমাদের আলোচনা, বিশ্বাস, সিদ্ধান্ত বা আচরণে বহু ক্ষেত্রেই এর চর্চা হয়ে থাকে। এটাকে বলা যায় ‘অজ্ঞানতার ছদ্মযুক্তি’। ইংরেজিতে এ ধরনের ছদ্মযুক্তিকে বলে Appeal to ignorance, যা ল্যাতিনArgumentum Ad Ignorantiamথেকে এসেছে।

প্রকৃতপক্ষে আমরা যে বক্তব্যের সত্যতা সম্পর্কে জানি না, তা সত্য হতে পারে, মিথ্যা হতে পারে, সত্যমিথ্যা জানতে ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে বা এর সত্যতা অজানাও থেকে যেতে পারে। না জানাটা কোনকিছুকে সত্য বা মিথ্যা বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে না। মনে রাখা দরকার, প্রমাণ না থাকা, না থাকাকে প্রমাণিত করে না।

 

 

 

 

 

আগের পর্বগুলো ও লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত