যুক্তিচিন্তা-নবম পর্ব : আপনি গান করেন, নাকি ছবি আঁকেন?

অ.

তখনও ব্যক্তিগত চুল-দাড়ির উপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাদের বিকাশের স্বাধীনতা এখনকার তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী ছিল। সম্ভবত ১৯৯৯ সাল। আপাতদীর্ঘ চুল-দাড়ি এবং শীর্ণদেহের আমি দাঁড়িয়েছিলাম করটিয়াসাদত কলেজে ক্যান্টিনের বারান্দায়। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। অচেনা এক তরুণ এসে জিজ্ঞেস করলেন, “ভাই, আপনি কি গান করেন”? আমি উত্তরে “না” বললে তিনি জানতে চাইলেন, “ছবি আঁকেন”? আমি আবারও “না” উচ্চারণ করলে তিনি কিছুটা হতাশ এবং কিছুটা অবাক হয়ে শেষ প্রশ্ন করলেন, “তাহলে আপনি কী করেন”? আমি একইসাথে দ্বিধান্বিত এবং বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকালে তিনি “আচ্ছা ভাই, কিছু মনে কইরেন না” বলে চলে গেলেন।

আমি তার শেষ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দ্বিধান্বিত ছিলাম, কারণ আমি তখন ‘খুশকির জন্য মাথা চুলকানো’ থেকে শুরু করে ‘রাষ্ট্রের বিপ্লবী রূপান্তরের জন্য আকাশমণিতলায় আড্ডামারা’ পর্যন্ত নানাবিধ কাজ করে থাকি। কৌতুহলী তরুণের তথ্যতেষ্টা মেটানোর জন্য কোন কাজের কথা জানানো উপযুক্ত হবে তাৎক্ষণিকভাবে তা বুঝতে পারছিলাম না। অন্যদিকে তিনি আমাকে নির্দিষ্ট দুইটি পরিচয়ের একটির মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। একজন শীর্ণকায়, লম্বা চুলদাড়িওয়ালা তরুণ হয় গান গায়, নয়তো ছবি আঁকে—এই ছিল তার পূর্বধারণা এবং তিনি সেই ধারণা আমার ওপর আরোপ করার চেষ্টা করেন—এটাই ছিল আমার বিরক্তির কারণ।

আ.

আরেকটি ঘটনায় আমি কিঞ্চিৎ অবাক হয়েছিলাম। নিরাপদ সড়কের দাবিতে ঢাকার রাস্তা তখন কিশোর শিক্ষার্থীদের দখলে। তাদের আন্দোলনের শেষ দিকে কিছু গুজব নিয়ে এক‌টি সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশ এবং হাতুড়ি-হেলমেটধারী সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়, অনেকে আহত, রক্তাক্ত হন। নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সশস্ত্র নিপীড়নের কাছে পরাজিত হয়। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে আমি ফেসবুকে লিখেছিলাম “পৃথিবীর অসভ্যতম প্রতিষ্ঠানের নাম রাষ্ট্র”। আমার ভাবনায় ছিল, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠানটি মূলত বলপ্রয়োগ করে টিকে থাকে এবং কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ভিন্ন রাষ্ট্র তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে সামর্থ্যের সবটুকু শক্তি প্রয়োগ করে তাকে নৃশংসভাবে দমন বা ধ্বংস করে। আমার সেই লেখার প্রতিক্রিয়ায় একজন ক্ষুব্ধ হয়ে আমাকে রাষ্ট্র ত্যাগ করার পরামর্শ দিলেন। তার যুক্তিটি হচ্ছে, রাষ্ট্রকে যদি তুমি অসভ্য মনে কর, অশ্রদ্ধা কর বা ভাল না বাস—তাহলে তোমার এই রাষ্ট্রে থাকা উচিৎ না, তুমি রাষ্ট্র ছেড়ে চলে যাও। Love it or leave it! এখন আমি রাষ্ট্র ছেড়ে কোথায় যাই? দুনিয়ায় রাষ্ট্র ছাড়া থাকার জায়গা আমি কোথায় পাই?

ই.

যুদ্ধংদেহী যুক্তরাষ্ট্রের সেই কথাটি নিশ্চয়ই মনে আছে সবার? সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে যারা আমাদের সাথে নাই তারা সন্ত্রাসীদের পক্ষে—এমনই বলা হয়েছিল তখন। অর্থাৎ যারা সন্ত্রাস দমনের নামে অন্য দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের হামলায় সমর্থন করছে না, তারা সবাই আল কায়েদা বা তালেবানদের মিত্র! কী আজব যুক্তি!

ঈ.

‘হয় অথবা নয়’, ‘এদিকে অথবা ওদিকে’, ‘বন্ধু অথবা শত্রু’, ‘ভালোবাসা অথবা ঘৃণা’, ‘সাদা অথবা কালো’—এরকম হাজারটা যুক্তি আমরা দেখে থাকি। হয় আওয়ামী লীগ, নয়তো বিএনপি; হয় পুরুষ, নয়তো নারী; হয় চাকরি, নয়তো বেকার; ‘হয় আস্তিক, নয়তো নাস্তিক’; ‘হয় সুন্দরবনে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র সমর্থনকারী, নয়তো দেশের শত্রু’—এভাবে আমরা প্রতিদিন মানুষকে দুইটি সীমিত বিকল্পের একটির মধ্যে ঢুকিয়ে দেই, যদিও এই ‘হয়’ আর ‘নয়’ এর মধ্যে বিস্তর ফাঁকা যায়গা থাকে, যেখানে অসংখ্য সত্য রয়ে যায়। লীগ-বিএনপির বাইরে অনেক দল বা রাজনৈতিক চিন্তা আছে, নারী-পুরুষের বাইরে ‘তৃতীয় লিঙ্গে’র মানুষ আছে, আস্তিক-নাস্তিকের বাইরে অজ্ঞেয়বাদী, প্রকৃতিবাদী আছে। সাদা-কালোর মাঝে থাকে বিশাল ধুসর এলাকা, বহুবর্ণীল রংধনু, ‘এটা অথবা ওটা’র ছোট্ট খুপরিতে তাদের কখনোই ঠেসে ঢুকানো যায় না।

দুয়েকটি তথ্য-উপাত্ত বা অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে সহজে একটি নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার আরাম, অর্থাৎঅতিসাধারণীকরণ অথবা কোন একটি বিষয়ের নানাদিক—পরিপ্রেক্ষিত ও প্রভাবক—বিশ্লেষণের ক্লেশ স্বীকারের অক্ষমতা বা অনিহা থেকে অতিসরলীকরণের প্রবণতা এরকম ‘এটা’ অথবা ‘ওটা’র ‘চিন্তাখোপ’ সৃষ্টি করে। এই পদ্ধতির চিন্তা কাঠামোকে বুদ্ধিবৃত্তিক চরমপন্থা বিকাশের ভিত্তি এবং কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা সহজ।

উ.

সত্যকে পরস্পরবিরোধী দুই বা তিনটি সীমিত বিকল্পের মধ্যে আটকে ফেলার এই চর্চা বা পদ্ধতিকে বলা যায় ‘সাদা-কালোর ছদ্মযুক্তি’, যাকে ইংরেজিতে বলে False Dilemma Fallacyবা False Dichotomy Fallacy। এ ধরনের ছদ্মযুক্তি প্রকৃত সত্যকে প্রকাশিত হওয়ার বা চেনার পথ মারাত্মকভাবে সংকীর্ণ করে দেয়। আমরা যদি সত্যের সবগুলো সম্ভাবনাকেই উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেই, তাহলেই হয়তো দেখা মিলবে আসল সত্যের।

 

 

 

আগের পর্বগুলো ও লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত