রত্নদীপা দে ঘোষ ‘র কবিতা

আজ ২৮ সেপ্টেম্বর কবি,গদ্যকার রত্নদীপা দে ঘোষের জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

চুরি

প্রতি রাতে আমি চুরি হই । আনচান স্বপ্নহকারের গন্ধ । দু চোখে আকাশ উঠে বসলে পিচফলের ঠোঁট গুছিয়ে নিই সংকল্পে … ঊরুতে রোমাঞ্চের স্তর , ডোডোপাখির দ্রিদিম আমাকে উত্তেজিত করে
আমাকে আদর করে ধাতুমূর্তির নদীরা , গালে গাল রাখে … খাদের অনেক নীচ দিয়ে অহিংস্র বৃক্ষরা  সুবস্ত্র বনভোজনের মতো ছুটোছুটি হুড়োহুড়ি করে আরোগ্যবিহীন চাঁদ উড়িয়ে নিয়ে যায় আমার চুল … এক এক করে বারোটি রাশি স্পর্শ , শব্দ আর ছায়ার মতো পৃথিবীর ঘোর থেকে গা নামায় … এতো আলো শ্যওলায় মাখা বিরাট ফোয়ারা , অর্ধবিষ্ণুর চিবুক … খনিজ সোনার বালুকা …
এতো নক্ষত্র চলাচল কাঁসরঘণ্টার ত্রয়োদশীতে …
আমি জ্বালিয়ে রাখি , নিজেকে সখি বৃন্দার মতো জাগিয়ে রাখি
ইশ্বর ফেটে গড়িয়ে যাওয়া ডিনামাইটের মতো বিশুদ্ধ রাখি
কুয়াশার কলস কাঁধে একঝাঁক বেথেলহেম জ্বেলে রাখি …
চুরি যাবার সময় আমি পবিত্র ক্রসের মতো ধারালো থাকি …

 

 

ইন্দ্রিয় 

নক্ষত্রের আলো বিশ্লেষণ করে পাওয়া যায় পাঁচ প্রকার ইন্দ্রিয় ।
চক্ষু , কর্ণ , নাসিকা, জিহ্বা এবং ত্বক । এই পাঁচ ইন্দ্রিয় ঘিরে প্রজাপতির সীমান্তট্রলার , অস্ফুট সন্ততির স্পেসমহলো …

চক্ষু 

তামা , আকরিক এবং পাতালের কনডেন্সড জল দিয়ে তৈরি চক্ষু বা চোখ । অল্পবয়েসিনী চোখে সুরেলা গয়না । জাদুজ্যোৎস্নায় পৃথিবীর সাদা রেলিং । একেকদিন রাতবিরেতে ঘুম ভেঙে চোখের বারান্দায় ঘন হয়ে আসে আস্তিনপতঙ্গ । জ্যামিতিতে দাঁড়ানো চোখের দরিয়ায় ছিপছিপে ঘুর্নি । যেভাবে তুফান গিলে খায় পাখিচর , কুণ্ডলী পাকিয়ে পাথরকুচিচোখে দস্তানা নামিয়ে রাখে যাবতীয় ঋতু , পলিমাটির সকলচিহ্ন । নকল পশম খুলে চেয়ে দেখো হে বৃদ্ধচক্ষু , হৃৎপিণ্ডের মায়াবী ধারে ঝুঁকে দাঁড়ানোই চৈত্রপ্রাণায়াম

কর্ণ 

কথ্য ভাষায় সূর্যের গিরিখাদ থেকে পার্থিব টিউন । সদ্যোজাত জোয়ারে ফিসফিসিয়ে ওঠে মৎস্যগন্ধা গোমতী । তার ডুমোডুমো শব্দগুলো শুনতে পাই স্পষ্ট । পূরবী লাগে যখন ফিনফিনে ঢেউয়ের মোজাইকবিস্তার এমনকি কান পেতে শুনি নাতিদীর্ঘ আয়ুহ্রদের ভাঙা বোতাম। চাঁদ সদাগর আর মনসার বাঁক পেরিয়ে হাফিজের পাণ্ডুলিপির শব্দে সিন্দবাদ জেগে ওঠে জাহাজের দ্রাঘিমায় … পালতোলা বালিকার রুখাশুখা চুল গাঁথে মুখচোরা বিনুনিশব্দ , খুশির লহমায় হরিণপায়ে দৌড়োয় সেফটিপিনপুতুল .. অলৌকিক মুক্তো গড়ার শব্দবিকেলে ধরা পড়ে অযুতকর্ণকুহর !

নাসিকা 

নাসিকা অর্থাৎ নাকের অবস্থান জোড়া দীঘির মাঝখানে । লম্বাটে রোদঘড়ির দুপাশে রেডিওছাউনি ঈষদুষ্ণ পায়রাশাওয়ার । প্রবল সূর্যের খিলানে একরোখা চুম্বনশস্য আলরেখা চুরমার করে পিছল মনুমেন্ট । ঘাসের সিঁড়ি যেমন কিশোরীর ছুটন্ত ঘ্রাণ …অর্চনা , বিশাখার নাকছাবিতে দীর্ঘসুনামিগন্ধ … মেতে থাকা ট্যুরিষ্ট আবাসের বেতঝুড়ি । পরিক্রমা শেষে ঘ্রাণতলে হাজির দলে দলে স্নায়ুতন্ত্র , মেডুলার বীজধ্বনি ।

জিহ্বা 

গীটারের মতো আদুরে , সরু সরু রেখায় জলফাৎনার তুমুল হর্ষ । কোলাহলো ভেঙে ভেঙে সাঁতার , গলে যাওয়া কোলাপসেবল্ । মোমবাতির মতো এ পাড়ের আকাশও চুঁইয়ে পড়ে ও পাড়ের নদীতে । যেন ঘড়ির দুটি কাঁটা । আনন্দের হোমপেজে হাঁকপাঁক এক সফল সাঁতারুর টুকরো ক্ষিধেমশাল । মেনুকার্ডে স্যালাডের জব্বর ক্রিং ক্রিং । উষ্ণ চিলিফিশেরর গায়ে বসানো ট্র্যাফিকলাল সিগন্যাল । রসালো আকারের কেবিন বিজ্ঞাপনে চেয়ে থাকে বোনচায়নার শিরা উপশিরা আর রুফটপকোরাস …

ত্বক 

বৃষ্টিমেয়ের ত্বকে উচ্ছ্বসিত ভাংরাবাতাস । যেন একফালি চাঁদ জড়ানো ধানের খোসাঅঘ্রান । স্পন্দনে খোদাই বনভিত্তিক দিনযাপন । উড়ালবেলার বেলকুঁড়ির ত্বক নদীমিউজিকে বোনা প্রত্নজ সানাই । কতো গান নৈশশিশিরের টিপসই । কেউ ত্বকে লিখছে থারমাসফাগুন , কারুর ত্বকে তামাম শিকারা , সব মুলতুবি থাক … চেয়েছি সুতীব্র আমলকীত্বকের পানশালা , সুগন্ধে আবাদ হোক্ বানভাসি । হেলাফেলার ত্বকে হুটহাট ঢুকে পড়া অশ্বত্থগাছ , ঘটিবাটি হারিয়ে রিফিউজি বাগানে গোখরোর ওম …

ফসলের ভারে প্রতিবন্ধী ইন্দ্রিয় কিছু আগুন দিই তোমাকে , কিছু ভারসাম্য … পঞ্চতট …লতানো পাতার নতমুখ … হিমসতেজ মৃত্যুর বিউগল …

ক্ষুধা অমা তৃষ্ণা হে ইন্দ্রিয়াসক্ত জীবন !

এসো মনখারাপ, বসো মনখারাপ

মন খারাপ হলে ব্যক্তিগত আকাশে যাই, ছুটোছুটি করি

মন খারাপ হলে ধারাপাতের বৃষ্টিঅঞ্চলে ঘোরাফেরা শুরু

মন খারাপ হলে কুহকের ম্যারাপ-বাঁধা কুহেলী

মন খারাপ হলে মারুবেহাগের বৃন্ত

অহরহ ভিজে যাওয়া আর কাকে বলে

মন খারাপ শুধু একটা বয়েস

মাত্রা ছাড়াই তার কাছে যাই,

ফুটি-ফুটি করি,

পাতা আর সবুজে

রোমকূপে রেখে আসি অমৃত-দাগ

মনখারাপ ঘরে প্রবেশ করেন

হাওয়ার কুচি পান করতে করতে

আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ

তারপর

বাতাসের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যান

তাঁর কথা ভাবতে ভাবতে সময় কেটে যায় হীরকের আঁচে

বসতের দুয়ারে ভারি হয় পাল্লার কাচ

মন খারাপ ফের প্রবেশ করেন আমার ঘরে

যে কোন সৃষ্টির সাথে মনখারাপ জড়িত।

যেমন বৃষ্টি মেঘলা সূর্য অস্ত। সবার সাথেই পৃথিবীর মন খারাপটি মিশে।

যে কোনো ছবিআঁকা খুলে দেখুন। তুলির মনখারাপ আপনার মুখে এসে ঝাপটা দেবে। গানের কথা বলি… গানের চাবাগানগুলিও আপ্নাকে সুরের চারাগাছ জড়িয়ে। মনখারাপের দুটি পাতা একটি কুঁড়ি… আপনাকে শোনাবে উন্মোচনের অভিমান … আপনি ‘ খারাপ’ ভুলতে চাইবেন। মন আপনাকে তা করতে দেবে না।

এমনকি কবিসম্মেলনগুলিতেও। মনখারাপই একমাত্র পাঠক। কবিতার ধোঁয়ায় সিগারেটের ডাঙায়। মানুষ আর গাছপালার স্বরে। কান্নার ভেতরে মিলিয়ে যাওয়া এক প্রাকৃত মনখারাপ।

পাঠ করে অপ্রাকৃত কবি।

মনখারাপের দিনগুলিতে তোমাকে পাইনে কাছে

বুড়ি-ছোঁয়ার খেলায় কখন হারিয়ে গিয়েছি

গতজন্মের কৃষ্ণচূড়া, বাঁশীতে কাঁপতে কাঁপতে

ফুটে উঠেছে। দিনভর্তি গা।

ধুলো মেখে যে মনখারাপটি তাকিয়ে আছে

সেই তাকানোর দিকে আমি তাকিয়ে আছি

কথা কইতে পারছি না

মনখারাপের সাথে কথা কওয়া মুখের কথা নাকি …

এবারের মনখারাপ সম্পর্কে কয়েকটি কথা …

১। মনখারাপটি দীর্ঘায়ু। অল্পবসনা। মারকাটারি সৌন্দর্য।

২। দোয়েলের অশ্রুসিক্ততা আর মনখারাপটির মেদ বৃদ্ধি হয় সমান হারে।

৩। মনখারাপটির বয়েস আইনত আঠারো নয় তবু কেমন যৌবনের বাড়-বাড়ন্ত।

৪। এটি সাহিত্যচর্চার বৃহত্তম পরিকল্পনা। বর্শাফলকে উদ্ভাসিত হোক।

৫। অসম্পূর্ণ। তবু আত্মপ্রকাশের সহযাত্রী আমার। আমাদের।

৭। মনখারাপটির অভ্যেস এক স্মৃতি-সম্পাদককে অনবরত পাঠককুল যুগিয়ে যাওয়া।

৮। এই মনখারাপিজ্যোৎস্নায় মনে পড়ে খুনখারাবিচাঁদ।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত