জন্ম শতবর্ষের দোড়গোড়ায় স্মরণ রবিশঙ্কর

Reading Time: 4 minutes
আজ ৭ এপ্রিল বিখ্যাত সেতার বাদক রবিশঙ্করের জন্মদিন। ইরাবতী বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে তাঁকে।
বারাণসী। ৭ এপ্রিল, ১৯২০। ঝালাওয়াড়ের দেওয়ান, ব্যারিস্টার শ্যামশঙ্কর চৌধুরী এবং হেমাঙ্গিনী দেবীর সন্তান রবীন্দ্রশঙ্কর চৌধুরীর জন্ম হল। আদি বাড়ি যশোহরের নড়াইল জেলার কালিয়াতে। শ্যামশঙ্কর বিলেত পাড়ি দেন এবং পুনর্বিবাহ করেন। রবীন্দ্রের জীবনের প্রথম দশ বছর কাটে বারাণসীতে, মায়ের কাছে। কলকাতায় প্রথম আসেন ১৯৩২ সালে। রবি যখন শিশু, দাদা উদয়শঙ্কর তখনই খ্যাতনামা নৃত্যশিল্পী। প্যারিসে তাঁর বাড়ি। ১৯৩০ সালে, রবি যখন মাত্র দশ, তখন তাঁকে এবং আর দুই পুত্র দেবেন্দ্র ও রাজেন্দ্রকে নিয়ে মা হেমাঙ্গিনী প্যারিস গেলেন। রবিশঙ্কর তাঁর দাদার নাচের দলে যোগ দেন, মূলত নৃত্যশিল্পী হিসেবে। বছর পাঁচেকে খ্যাতিও পেলেন। একই সঙ্গে বুঝতে পারলেন, সেতার এবং সরোদ বাজানোতেও তাঁর স্বভাবদক্ষতা। সেই দক্ষতা লোকের নজর কাড়ছিল বটে, কিন্তু কিশোর রবি নিজের ভিতরে টের পাচ্ছিলেন, কোথাও ফাঁক থেকে গেছে। সেই ফাঁক ভরল ১৯৩৭ সালে, যখন তিনি তাঁর বিলেতের ঝলমলে জীবন ত্যাগ করে মধ্যভারতের মইহারের বাসিন্দা হলেন, উস্তাদ আলাউদ্দিন খানের কাছে তালিম নিতে। সাত বছরের তালিম শেষে রবিশঙ্কর মঞ্চে এলেন। তত দিনে তিনি আলাউদ্দিন খানের জামাই— একুশ বছর বয়সে চতুর্দশী অন্নপূর্ণাকে বিবাহ করেছিলেন। একমাত্র পুত্র শুভেন্দ্রশঙ্কর (জন্ম ১৯৪২, মৃত্যু ১৯৯২)। ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই রবিশঙ্কর এবং তাঁর সতীর্থ, উস্তাদপুত্র আলি আকবর খান খ্যাতিমান। প্যারিসে উদয়শঙ্করের বাড়িতে বহু শিল্পী আসতেন, আলোচনা করতেন। তাঁরা প্রায় সকলেই বলতেন: নাচের সঙ্গে ভারতীয় সঙ্গীত চমৎকার লাগে বটে, কিন্তু শুধু সেই গান বা বাজনা বড় একঘেয়ে। ‘তাঁরা ভাল মনেই বলতেন, তবু আমার ভয়ঙ্কর রাগ হত। খারাপও লাগত— ভারতীয় সঙ্গীতের গভীরতা, প্রাচুর্যের পরিচয়ই পেলেন না ওঁরা।’ বলেছিলেন রবিশঙ্কর। পাশ্চাত্যের কাছে ভারতীয় রাগসঙ্গীতকে পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ তৈরি হল এই রাগ, এই খারাপ-লাগা থেকেই। সেখানেই রবিশঙ্কর ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের অন্য সব কিংবদন্তি শিল্পীর চেয়ে আলাদা হয়ে গেলেন। আর সবাই যখন ভেবেছিলেন যে ভারতীয় রাগসঙ্গীতের রসাস্বাদন করার জন্য শ্রোতাকে তৈরি হয়ে আসতে হবে, রবিশঙ্কর তখন নিজের শ্রোতা তৈরি করে নিলেন। তাঁর ছুৎমার্গ ছিল না। নিজের শিকড় থেকে বিন্দুমাত্র সরে না এসে, ভারতীয় সঙ্গীতের শাস্ত্রের প্রতি তিলপরিমাণ অন্যায় না করে কী ভাবে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে হয়, তিনি জানতেন। পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় তিনি বিদেশ সফর আরম্ভ করেন, ১৯৫৬ থেকে দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকতে আরম্ভ করেন। পাশ্চাত্যের শ্রোতাকে ভারতীয় সঙ্গীতের প্রতি আকৃষ্ট করার কাজ সহজ হয়নি। গোড়ায় অনেকে তাঁর অনুষ্ঠানে আসতেন নেহাত কৌতূহলবশে সাপ, হাতি আর সাধুর দেশের গানবাজনা কেমন হয়, শুনতে। ‘তাঁর বাজনার সঙ্গে বেড়ালের ডাকের কোনও ফারাক নেই’, এমন কথাও বলেছেন সেই আদি যুগের কিছু শ্রোতা। রবিশঙ্কর হাল ছাড়েননি। ১৯৫২ সাল থেকেই তাঁর সঙ্গে বেহালাবাদক ইহুদি মেনুহিনের পরিচয়। তাঁরা এক সঙ্গে বাজাতে আরম্ভ করেন। এই যুগলবন্দি বহু ইতিহাস তৈরি করেছে। তবে, পশ্চিমের তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে রবিশঙ্করের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মূল কৃতিত্ব যাঁর, তিনি বিটলস-এর লিড গিটারিস্ট জর্জ হ্যারিসন। ১৯৬৫ সালে তাঁর সঙ্গে রবিশঙ্করের পরিচয়। তিনি এতই মুগ্ধ হলেন যে রবিশঙ্করের শিষ্যই হয়ে গেলেন। সেতার শিখে বাজালেন বিটলস-এর নরওয়েজিয়ান উড অ্যালবামে। তার পর রোলিং স্টোনস, দি অ্যানিম্যালস, দ্য বার্ডস— রক সঙ্গীতের প্রথম সারির বহু দলই তাঁর সান্নিধ্যে এসেছে। ১৯৬৭’র মধ্যে রক-এর দুনিয়ায় রবিশঙ্কর কার্যত ধর্মগুরুর আসন পেয়ে গিয়েছিলেন। হ্যারিসন বলেছিলেন, রবি আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের দুনিয়ার ‘গডফাদার’। ১৯৬৭-র মন্টেরেই ফেস্টিভ্যাল, ১৯৬৯-এর উডস্টক— পপ, রকের দুনিয়ায় রবিশঙ্কর তখন অপরিহার্য। তাঁকে নিয়ে যখন এই উন্মত্ততা চলছে, তাঁর অনুষ্ঠানের প্রেক্ষাগৃহ ভেঙে পড়ছে তরুণ প্রজন্মের ভিড়ে, তাঁর আপত্তি সত্ত্বেও তাঁকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে সাইকোডেলিক মিউজিকের আবহ, সেই সময়ও তিনি এক বারও বিচ্যুত হননি তাঁর শিকড় থেকে, তাঁর তালিম থেকে। তিনি বিশুদ্ধ ভারতীয় সঙ্গীত বাজিয়েছেন— শুধু দেখেছেন, যাতে পাশ্চাত্যের দামাল শ্রোতারা তা বুঝতে পারে। ক্রমে তাঁকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে ভারতীয় সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ— এক সময় যাঁরা ড্রাগের নেশায় বুঁদ হয়ে আসতেন তাঁর অনুষ্ঠানে, তাঁরাই ক্রমে শিখেছেন কী ভাবে ভারতীয় সঙ্গীতকে উপভোগ করতে হয়। এখানেই রবিশঙ্করের কৃতিত্ব। তিনি প্রাচ্যের সমস্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে তাকে পাশ্চাত্যের সঙ্গে মিলিয়েছিলেন। হয়তো নেহাতই কাকতালীয়, কিন্তু মেনুহিনের সঙ্গে তাঁর প্রথম এবং তৃতীয় যুগলবন্দির অ্যালবামের নাম দুটি স্মরণীয়— ১৯৬৭ সালে ‘ওয়েস্ট মিটস ইস্ট’, আর ১৯৭৭-এ ‘ইস্ট মিটস ওয়েস্ট’। বলা যেতেই পারে, প্রাচ্য নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল, পাশ্চাত্য এসেছিল তার কাছে, এক যুগ করে প্রাচ্যই গেল পাশ্চাত্য-সঙ্গমে। ভারতীয় রাগসঙ্গীত বিশ্ব-নাগরিক হল। সম্মান এসেছে স্বাভাবিক নিয়মেই। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স-এর তিনি সাম্মানিক সদস্য। পদ্মবিভূষণ, দেশিকোত্তম এবং ম্যাগসাইসাই পুরস্কারে সম্মানিত। তিনটি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড, জাপানের সর্বোত্তম পুরস্কার ‘দ্য ফুকুওকা এসিয়ান কালচার প্রাইজ’। ১৯৮৬-তে রবিশঙ্কর মনোনীত হন রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে। ২০০২-এ ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স তাঁকে দেয় ‘লাইফটাইম অ্যাওয়ার্ড’। ১৯৯৯-তে পান ভারতের সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মান ‘ভারতরত্ন’। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও দ্রুত গতিতে বদলেছে। ষাটের দশকে অন্নপূর্ণার সঙ্গে বিচ্ছেদ। তার পর কমলা শাস্ত্রী, অনেক দিন জীবনসঙ্গিনী। এক সময় রবিশঙ্কর থাকতে শুরু করেন আমেরিকান কনসার্ট প্রযোজক সু জোনস-এর সঙ্গে। তাঁদের কন্যা নোরা জোনস আজ বিশ্রুত সঙ্গীতকার ও গায়িকা। পরে তাঁর অনুরাগিণী সুকন্যা রাজনকে রবিশঙ্কর বিবাহ করেন, অনুষ্কা তাঁদের কন্যা। রবিশঙ্কর কোনও ঘরানার সন্তান নন। সেনিয়া মাইহার ঘরানায় তাঁর তালিম বটে, প্রথম বিবাহসূত্রে তিনি সেই ঘরানার জামাই— কিন্তু তিনিই প্রথম উল্লেখযোগ্য শিল্পী, যিনি কোনও ঘরানাদার উস্তাদের সন্তান না হয়েও সঙ্গীতের দুনিয়ার শীর্ষে পৌঁছেছিলেন। তাঁর বাজনা আজীবন বিশুদ্ধতা বজায় রেখেছে, কিন্তু যেখানে যা ভাল, তিনি নির্দ্বিধায় তা গ্রহণ করেছেন, নিজের বাজনায় মিশিয়েছেন। যে ভাবে তিনি পশ্চিমের গায়ক-বাজিয়েদের সঙ্গে যুগলবন্দি করেছেন, তা ভারতীয় সঙ্গীতের দুনিয়ায় অ-পূর্ব। চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনাতেও তিনি সমান আগ্রহী ছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী, অপরাজিত, অপুর সংসার থেকে জোনাথন মিলারের অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড বা রিচার্ড অ্যাটেনবরোর গাঁধী— সবেতেই তিনি সমান স্বচ্ছন্দ। তিনি তাঁর যন্ত্রটিকেও সংস্কার করেছেন। ভারতীয় মার্গসঙ্গীতে এই খোলা হাওয়ার বড় অভাব ছিল। রবিশঙ্কর নিজের প্রতিভার জোরে সব দরজা-জানালা খুলে দিয়েছিলেন এই হাওয়ার জন্য। ‘নতুন কিছু করার দিকে আমার একটা স্বাভাবিক ঝোঁক আছে’, বলেছিলেন তিনি। তাঁর এই গ্রহিষ্ণু এবং চলিষ্ণু উত্তরাধিকার যদি তাঁর উত্তরপ্রজন্ম বহন করতে পারেন, তবেই ভারতীয় সঙ্গীত বাঁচবে। তিনি নিজের শিক্ষা, নিজের শিল্পের প্রতি প্রশ্নাতীত ভাবে আস্থাবান ছিলেন। এই আস্থাই তাঁকে বৃহৎ করেছিল, তাঁকে অচেনার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার, যুক্ত হওয়ার সাহস যুগিয়েছিল। এবং এই কারণেই গোটা দুনিয়ায় ভারতীয় সঙ্গীত আর রবিশঙ্কর প্রায় সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে। সংস্কৃতির বিশ্বে যথার্থ আন্তর্জাতিক মানের বাঙালির সংখ্যা অতি অল্প। রবিশঙ্কর তাঁদের এক জন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রভাব ও স্বীকৃতির সমন্বয়ে তিনি অনন্য। তিনি বিশ্বকে নিজের ঘর করেছিলেন, কিন্তু শিকড় বিস্মৃত হননি। বিশ্বমঞ্চে ভারতকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ভারতের প্রাচুর্যময় অথচ বদ্ধ সঙ্গীতের দুনিয়ায় এনেছিলেন আন্তর্জাতিকতার খোলা হাওয়া। তিনি আজীবন বাঙালি ছিলেন। বৃহৎ বাঙালি।    

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>