| 16 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

ছোট গল্প : লাল ল্যান্ডক্রুজার । ক্ষমা মাহমুদ

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

আগস্টের এক সকালে চেরী লাল ল্যান্ডক্রুজার গাড়ীটা দোতলা অফিসটার সামনে এসে থামলো।

শরতের অন্যান্য দিনের মতই মেঘ আর রোদের লুকোচুরি করা একটা সকাল। বিড়ালের তুলতুলে গায়ের মত নরম একটা আলো সকাল বেলাতে চারদিক লেপ্টে আছে। দুদিন আগেই টানা বৃষ্টি হওয়ায় ঠান্ডার একটা রেশ এখনও রয়ে গেছে। রেসের ঘোড়ার মত অবিরত ছুটে চলা ব্যস্ত এই শহরের সার্বক্ষণিক শব্দের ডামাডোলের মধ্যে এই পাড়াটা যেন অনেকটাই অন্যরকম। মেইন রোড ছেড়ে এই পাড়ায় ঢোকার গলিতে ঢুকে পড়লেই মনে হবে একেবারে পঁচিশ বছর আগের পুরনো শহরটা যেন আচমকা চোখের সামনে চলে এলো। খুব কমই চারতলা বাসা চোখে পড়ে এখানে।শহরজুড়ে ডেভেলপারদের হাতীর থাবা এড়িয়ে বড় বড় জায়গা ধরে গাছপালা ভর্তি এক একটা একতলা, দোতলা বাসা এখনও বহাল তবিয়তে টিকে আছে, কোথায় যেন মফস্বলের শহরের মত কোমল, ছায়াঘেরা একটা ব্যাপার এখনও ছড়িয়ে আছে পুরো এলাকাটা জুড়ে।

তবে আবাসিক এলাকার চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও অনেক বাড়িই আসলে বিভিন্ন অফিসগুলোর কাছে ভাড়া দেওয়া। দেশী-বিদেশী এনজিও গুলোই মূলত এখানে নিঃশব্দে কাজ কর্ম করে চলেছে। তবে তারাও পাড়াটার শান্ত ভাবটার সাথে মিলেমিশেই এখানে থাকে। একটা দুটো বাচ্চাদের স্কুল থাকাতে শুধুমাত্র সকালে স্কুলে ঢোকার আগে আর ছুটির সময় বাচ্চাদের কোলাহলে পুরো পাড়াটা যেন আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠে কোন এক ঘুমন্ত আদিম যুগ থেকে আছড়ে একেবারে এই শব্দ যুগে এসে পড়ে। মনে হতে পারে যে, বাকী সময় পুরোটাই বাসিন্দারা শামুকের খোলসের মধ্যে যেন ঢুকে বসে থাকে।

এখানেই সেদিন সকালে এক বিদেশী অফিসের নতুন কেনা লাল ল্যান্ডক্রুজার গাড়িটা এসে থামলো।

লাল চেরী’র মত সুন্দর গাড়িটা কিনেছিলেন অফিসটার সদ্য চলে যাওয়া পরিচালিকা যার নিজের সৌন্দর্যের ধারও এই গাড়ির থেকে কোন অংশে কম ছিল না। এই অফিসের কোন এক ক্রান্তিলগ্নে সফলভাবে হাল ধরে বিদেশী বসদের দারুণ আস্থাভাজন হয়ে ওঠা সৈয়দা লায়লা বানু প্রান্তিক মানুষদের জন্য কাজ করে যাওয়া এই এনজিও’র অফিসটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে এক টুকরো বিদেশ বানিয়ে ফেলেছিলেন। ভদ্রমহিলার আগের দৌড়াদৌড়ির চাকরীর তুলনায় এটা যেন এক টুকরো স্বর্গ হয়ে এসেছিল তার কাছে। উর্ধ্বতন হিসাবে তার কথাই এখানে শেষ কথা যদিও তবু গণতান্ত্রিক পরিবেশের একটা চেহারাও তাকে একটু বজায় রাখতে হয়েছে বৈকি নাহলে আবার বিদেশের হেড অফিসের কাছে তার ইমেজ সমস্যা হয়ে যেতে পারতো। তবে সময়মত হেড অফিসে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি’র রিপোর্ট ঠিকঠাক মত পাঠাতে পারলেই হলো, বাকীটা সময় দিব্যি আরামে পার করে দেয়া যায়; যা তিনি তার আগের আঠারো বছরের চাকরী জীবনে কখনই পাননি। অফিসটা এদিক থেকে ওদিকে সাজানো, মাঝে মাঝে বোর্ড মেম্বারদের নিয়ে পার্টি’র আয়োজন করে সামাজিক যোগাযোগটা একটু ঝালিয়ে নেয়া এবং তারও অবসরে ওপারে পাড়ি দেয়া মা-বাবার পুরনো জমকালো ছবি দেখেই বছর তিনেক তার এই অফিসে পার হয়ে গেলো।

অফিসের মূল কাজকর্ম দু’ তিনজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপর চাপিয়ে মাঝে মাঝে তাদের কাছ থেকে প্রকল্পের খোঁজ খবর নিয়ে দিন তার ভালোই কাটছিল। তবে বিদেশীদের কাছে তার কর্ম ব্যস্ততার প্রমাণ হিসাবে প্রকল্পের অধীন সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোর জীবন, প্রকল্পের টাকায় কতটা পাল্টালো তা দেখতে তাকেও কখনও কখনও প্রকল্প এলাকাগুলোতে একটু যেতেই হতো বৈকি! গাড়ি ভর্তি করে খাবার দাবার সাথে নিয়ে বেশ একটা পিকনিক পিকনিক ভাবের মধ্যে দিয়ে তার অতি ধামাধরা উর্ধ্বতন এক’ দু জনকে সাথে নিয়ে তিনি প্রকল্প পরিদর্শনে যেতেন। অফিস পরিচালনা বা প্রশাসনিক কাজকর্মে তার দক্ষতা থাকলেও গ্রামাঞ্চল আর শহরের বস্তির দরিদ্রমানুষগুলোকে কেন্দ্র করে তাদের প্রকল্পগুলো বাস্তবে কিভাবে চলে সে বিষয়ে খুব ভালো ধারণা না থাকলেও খুব সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে আনতে তার জুড়ি ছিল না। খেটে খাওয়া বাদামী কালো মানুষগুলোর মধ্যে তাকে যেন মনে হতো স্বর্গের উর্বশী। ছবিগুলোর সাথে সত্যি মিথ্যার মিশেলে বেশ মন গড়া গল্প বানিয়ে দারুণ সব সফলতার গল্প বুনতো অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যার মধ্যে কোন কোনটা তো বিদেশীদের মধ্যে খুব আলোড়ন তুলে ফেলতো। এদেশে প্রকল্প পরিদর্শণে এসে তারাও সেইসব কেসস্টাডি’র ‘সফল কেস’গুলোর কাছে যেয়ে ছবি তুলে বিদেশে তাদের উর্ধ্বতনদের কাছে প্রকল্পের দারুণ সফলতা তুলে ধরে ভালোই বাহবা পেতো। প্রকল্পের এই ‘সফল কেস’ গুলোকে সফল ভাবে তুলে ধরে বিশ্বে’র নানান জায়গা থেকে মোটা অংকের ফান্ড পাওয়াও নিশ্চিত হয়ে যেত। যদিও সেই আপাত সফল কেসগুলোর পরবর্তী জীবনের গল্প আর কতটা সফল থাকতো অধিকাংশ সময়ই তা আর জানা যেত না।

তবে এভাবে চলতে গিয়ে মূল প্রকল্প অনেকটাই কক্ষচ্যুত হয়ে কোন রকমে টেনে হিচঁড়ে চলছিল। প্রকল্পের টাকার মূল দাবিদার দারিদ্র পীড়িত প্রান্তিক মানুষগুলোর জন্য বরাদ্দ কমে গিয়ে পুরনো গাড়িবহরের সাথে নতুন লাল রঙের ল্যান্ডক্রুজার, নীল রঙের কিয়া গাড়ি যোগ হলো। যেন মহোদয়া তিন মাসে একবার হলেও শীততাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়ে গরীব মানুষগুলোর কাছে যেয়ে তাদের অবস্থার কি কি পরিবর্তন হলো, সেটা চাক্ষুষ করে আসতে পারেন।

সব কিছু ছকে বাঁধাই চলছিল, গোল বাঁধলো তখনই, যখন ঐদেশে বেশ আগে থেকে করে রাখা তার অভিবাসন প্রক্রিয়াটা হঠাৎ করেই একদম নিশ্চিত হয়ে গেল। উন্নত বিশ্বের বাসিন্দা হয়ে থাকার ইচ্ছার কাছে এক হালি বছর ধরে সাজানো এই ছোট্ট সাম্রাজ্যে ‘র রানী হয়ে থাকার ইচ্ছেটা জলাঞ্জলি দিতেই হলো তার।

তবে তার সাজানো গোছানো এই সাম্রাজ্য ছেড়ে তিনি চলে গেলেও তার ক্ষমতা যেন কিছুটা হলেও এখানে বজায় থাকে সেটা নিশ্চিত করার অনেক ব্যবস্থাই তিনি করলেন। বিদেশীদের সাথে কৌশলী শলা পরামর্শ করেই বন্দোবোস্ত হলো কে এই পদের পরবর্তী যোগ্য ব্যক্তি হবেন। অফিসের ভেতরে‌ যে এই পদের যোগ্য কেউ ছিলনা তা নয়, কিন্তু সৈয়দা লায়লা বানু যেহেতু তাদেরকে একটু বেশীই চিনে ফেলেছিলেন তো তাদের উপর ভরসা করতে আর ইচ্ছা হয়নি বরং চেয়েছিলেন নতুন কেউ আসুক যার মাধ্যম বিদেশে বসেও কিছুটা হলেও তার নিয়ন্ত্রণ এই অফিসের উপর হয়তো থাকতে পারে, যদি তার পছন্দমত কাউকে এখানে বসিয়ে দিয়ে যাওয়া যায়! বলা তে যায় না এমনকি তিনি নিজেওতো আবার ফিরে আসতেই পারেন। জীবনে কখন কি ঘটে কিছুকি বলা যায়!

তবে এসব করতে গিয়ে নিজে উচ্চশিক্ষিত হয়েও এমন একজন মানুষকে নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা করে গেলেন লায়লা বানু, যার শিক্ষাগত যোগ্যতা অফিসের অতি সাধারণ কর্মকর্তাদের থেকেও কম। পরোক্ষ ভাবে হলেও এখানে তার ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা ছাড়া, এই অফিসের নতুন পরিচালক হিসাবে এমন এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়ার পেছনে আর কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। বিদায়ী পরিচালক যাওয়ার আগে নতুন পরিচালকের জন্যে একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয়পর্বের অনুষ্ঠান করে যেতে চাইলেও সময় স্বল্পতায় না কি ইচ্ছাকৃত… সেটাও আর হয়ে ওঠেনি। শুধুমাত্র একদিনের জন্যে নতুন পরিচালক এই অফিসে এসে তার সাথে জরুরি আলাপগুলো সেরে ফেলার সুযোগ পেয়েছিলেন কিন্তু অন্যান্য সবার সাথে তার আনুষ্ঠানিক পরিচয় ঘটার অবকাশ সেদিন আর হয়নি। কথা হয়েছিলো যেদিন প্রথম এখানে অফিস করবেন সেদিনই না হয় সবার সাথে পরিচিত হওয়া যাবে।


আরো পড়ুন: ক্ষমা মাহমুদের গল্প অতলস্পর্শ

অফিসের বিশ বছরের পুরনো ড্রাইভার হরিলাল কুন্ডু ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে লাল ল্যান্ডক্রুজারের দরজাটা খুলে ধরলো। এই অফিসে তার বিশ বছরের চাকরী জীবনে এই নিয়ে এরকম চার জনকে সে দরজা খুলে দিয়েছে। আরো কয়েকজন ড্রাইভার অফিসে থাকলেও কাকতালীয়ভাবে এই দায়িত্বটা কেমন করে জানি তার উপরেই বর্তে যায় সবসময়। তবে ব্যাপারটা সে ভালোই উপভোগ করে। সবাইকে হাসিমুখে এখানে ঢুকতে দেখলেও, সে জানে বিদায়টা হাসিমুখে নাও হতে পারে।

ছয় ফুট উচ্চতার লম্বা চওড়া মানুষটা মুখে মৃদু একটা হাসি নিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন । মনের ভেতরে কি চলছে বাইরে থেকে দেখে সেটা বোঝার কোন উপায় নেই। ঘাড়টা ঘুরিয়ে চারপাশটা একটু দেখে নিলেন। একটা ফরমাল কালো প্যান্টের সাথে ক্যাসুয়াল গ্রামীনচেক এর নীল ও ঘিয়ে স্ট্রা‌ইপের হাফ শার্টে তাকে বেশ মানিয়েছে। চুলটা একটু সাবেকী স্টাইলে ব্যাকব্রাশ করা। ক্লিন শেভড। অফিসের ভেতর থেকে কেউ বের হয়ে আসেনি সামনে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে, যেন কেউ জানেই না তিনি এসেছেন।

কিন্তু বাস্তব হলো অফিসের প্রতিটা কক্ষে স্টাফরাও যার যার মত করে একটা উৎকন্ঠা আর কৌতুহল নিয়ে অপেক্ষা করছে তার জন্যে, কেউই ঠিক নিশ্চিত নয় যে আসলে ঠিক কিভাবে তার সাথে পরিচয়পর্বটা ঘটবে। অফিস জুড়ে কানাকানি, ফিসফাস আর কেমন যেন এক থমথমে অস্বস্তিকর অবস্থা। তিনি আসার আগেই কেমন করে জানি অফিসের সবার কাছে তার সিভিটা ফাঁস হয়ে গেছে, সেটা এখন কয়েকজনের হাতে হাতে এবং সেই সূত্রে সবার কানে কানে। সবাই অপেক্ষা করছে তিনি আসবেন, একটু পরেই এসে পৌছাবেন এখানে, এই অফিসে। কিন্তু তার সাথে যেচে গিয়ে কুশল বিনিময় করার ব্যাপারে কেউই আগ্রহী হলো না। ভাগ্যে যা আছে তা অবধারিতভাবে মেনে নেওয়ার মত করে সবাই তাকে উর্ধ্বতন হিসাবে আপাতত: মেনে নেবে বটে কিন্তু সেটা যেন ঠিক মনে নেওয়া নয়। তার সিভি সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে যে, সকলের সমীহ আদায়ের জন্য এরকম একটা বিদেশী অফিসের উর্ধ্বতন হিসাবে যে পরিমাণ ডিগ্রী তার দরকার ছিল, সেটা তার নেই।

তবে তাকে কিন্তু সেটা নিয়ে মোটেও বিচলিত মনে হলো না। শ্যামলা মুখে এক চিলতে হাসি নিয়ে গাড়ী থেকে নেমে কাউকেই সামনে না দেখে অবাক হলেও সেটা বোঝা গেল না তার মুখ দেখে। ড্রাইভার হরিলালও একটু অপ্রস্তুত ভাবটা গোপন করে এগিয়ে গিয়ে তাকে অফিসের অন্যতম পুরানো

একজন গুরুত্বপূর্ণ উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাবর সাহেবের রুমে প্রথমে নিয়ে গেলো। বিদেশ থেকে এমবিএ ডিগ্রীধারী বাবর সাহেবের যোগ্যতা নিয়ে কারো দ্বিমত নেই এবং অফিসে তিনি বেশ জনপ্রিয়ও, সকলের সাথে সৌহার্দ্য বজায় রেখে চলতে জানেন। কিন্তু তার মত যোগ্য লোক থাকতে শুধু দেশীয় বিকম পাসের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে লোকটি পরিচালক হিসাবে এখানে কিভাবে নিয়োগ পেলেন এই ব্যাপারে অন্যেদের মত তিনিও অন্ধকারে এবং পেছনে পেছনে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বেশ উচ্চকিতও। তবে ঐ পদ না পেলেও অফিসে আপাতদৃষ্টিতে এটাই প্রতীয়মান হচ্ছে যে লোকটির অন্যতম শক্ত প্রতিদ্বন্ধী তিনিই হতে যাচ্ছেন। সৌজন্যের খাতিরে লোকটিকে তার নিজের রুমে বসিয়ে বেশ খানিকক্ষণ প্রাথমিক কথাবার্তা শেষ করে বাবর সাহেবই সকলের রুমে রুমে নিয়ে গিয়ে নতুন পরিচালককে পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘ইনিই আমাদের ইফতেখার ভাই, আজ থেকে আমাদের এই পরিবারে যোগ দিলেন।’

তিনি আশা করেছিলেন সবাই তাকে স্যার বলবেন তাই ‘ভাই’ কথাটা চট করে কানে লাগলেও মনোভাব গোপন রেখে পরিচয় পর্ব শেষে সৈয়দা লাইলা বানু’র সাজিয়ে রেখে যাওয়া দেশীয় পরিচালকের রুমটাতে যেয়ে বসলেন ইফতেখার সাহেব, এরপর এখানে বসেই যে তাকে এই অফিস পরিচালনার যাবতীয় কার্যক্রম শুরু করতে হবে।

প্রয়োজনীয় ডিগ্রীগুলো সময় মত যোগাড় করতে না পারলেও বহু বছরের কাজের অভিজ্ঞতায় মানুষ চিনতে ইফতেখার আহমেদ এর ভুল হয় না। অল্প সময়েই তার একটা প্রাথমিক ধারণা তৈরী হয়ে গেল অফিসের সবার সম্পর্কে এবং তাড়াতাড়িই তিনি বুঝে গেলেন অফিসে তার পাশে তিনি কাউকে কাউকে পাবে যদি তাদেরকে কিছু বিশেষ সুবিধা প্রদান করা যায় এবং সে পথে এগোতে প্রথমেই যে কাজটা তিনি করলেন সেটা হলো অফিসের কর্মকর্তাদের নিজেদের মধ্যে এতদিনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কটা ভেঙে দিয়ে দুইটি ভাগে ভাগ করে ফেললেন। একদল তার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে তার সাথে যোগ দিয়ে নানাবিধ সুবিধা আদায়ের পথ খুঁজে নিলো, তাকে স্যার বলা শুরু করলো। যাদের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়, যারা তাকে প্রথমে ভাই বলে সম্বোধন করেছিল, তারা নিরাপদ দূরত্বে থেকে নিজেদের মান সন্মান নিয়ে চাকরি বাঁচিয়ে রাখলো।

অফিসে নিজের অবস্থান সংহত করতে ধীরে ধীরে অনেক পরিবর্তনই করলেন ইফতেখার সাহেব। নিজের বিশ্বস্ত লোকজনকে অফিসের নানা কাজের উছিলায় বিভিন্নভাবে রোপন করলেন যারা অফিসের ভিতরের সব খবর সময়মত তার কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে যাবে। মাস শেষে নানা প্রাপ্তিতে তারা নিজেরাও খুশীতে বাকবাকুম্। ব্যক্তি জীবনের নানান শ্রীবৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন নতুন প্রকল্প আনার চেষ্টায় ব্যস্ততা বাড়লো। যত প্রকল্প তত টাকা। সবকিছুই জোরেশোরে চলতে লাগলো শুধু যাদের দেখিয়ে এত প্রকল্প, এত আয়োজন, সেই হত দরিদ্র মানুষগুলো যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেল। তবে উন্নয়নের উর্ধমুখী গ্রাফ নানান ফরম্যাটের রিপোর্টে যথারীতি বিদেশের হেড অফিসে পৌঁছতেই থাকলো।

বছর দুয়েক বাদেই সবাই একদিন অফিসে বসেই ভরপেট মিষ্টি খেয়ে ফেললো। কি কারণে এই মিষ্টি খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেল ইফতেখার আহমেদ এমবিএ ডিগ্রীটা এইবার সেরে ফেললেন। তার এত বছরের চাকরি জীবনে লেখাপড়ার এমন নিরবিচ্ছিন্ন সুযোগ তিনি এর আগে আর পাননি। অফিসের বেশীর ভাগ কাজতো মূলতঃ অন্য কর্তা ব্যক্তিরাই করেন সুতরাং সময়টাকে চৌকশভাবে তিনি কাজে লাগিয়ে ফেলেছেন। সার্টিফিকেট একটা দুটো কম থাকার অপবাদটা এতদিনে তার ঘুচলো।

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই দেশে এক ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ে তাদের প্রকল্প এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন ওলট পালট হয়ে গেল। ইফতেখার সাহেব ঘন ঘন এ্যাকাউন্টস বিভাগের সাথে বৈঠকে বসছেন। কোথা থেকে কত টাকা বের করে ঝড়ে বাড়িঘর উপড়ে পড়া মানুষদের কাজে লাগানো যায় সেটাই মূল উদ্দেশ্য। বেশকিছু ত্রাণও আসতে লাগলো দুর্গত মানুষদের সাহাযার্থে। অফিসে একটা উৎসব মুখর পরিস্থিতি তৈরী হলো ত্রাণ দেয়াকে কেন্দ্র করে। কত টাকা খরচ করে কোথায় কত ত্রাণ কিভাবে দেয়া হবে সেটা ইফতেখার সাহেবের বিশ্বস্ত লোকজন খুব সফলভাবে শেষ করলো। দুর্গতদের পাশে দাড়িয়ে ত্রাণবিতরণের প্রচুর ছবি তোলা হলো। সেসব ছবি দেশে বিদেশে প্রচার করা হলো সফলভাবে। শুধু একাউন্টসের হেড জাফর সাহেব চোখমুখ অন্ধকার করে ঘনঘন প্রোগ্রামের হেড বাবর সাহেবের সাথে কি যেন বলাবলি করেন।

আরো বছর খানেক ইফতেখার সাহেবের ভালোই কাটলো এভাবে। একদিন সকালে বাবর সাহেবের সাথে এক মিটিং এ আলাপরত অবস্থায় বললেন, ‘আমার যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে এখানে নানাভাবে আমি নতুন নতুন প্রকল্প আনছি, তাহলে সবকিছু কেন হেড অফিসে আমাদের জানাতে হবে বলুন তো? এখন থেকে শুধু প্রয়োজনীয় তথ্যই আমরা তাদের জানাবো, সবকিছু নয়।’ সেইকথা মত তাদের না জানিয়ে সত্যিই তিনি অনেককিছুই ঢেলে সাজাতে লাগলেন তার নিজের পছন্দ মাফিক। একদিকে পুরানো প্রকল্পের অনেক কিছুই কাট ছাঁট হচ্ছিল; আর এক দিকে নতুন নতুন প্রকল্পের আগড়ম-বাগড়ম শুরু হয়ে গেল, যার অনেক কিছুরই আর তল খুঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। এই পুকুর ঘোলার সুযোগ নিয়ে তাকে অপছন্দ করা পুরানো লোকজন তলে তলে নানারকম অসহযোগিতা শুরু করলো যার প্রভাবে মাঠ পর্যায় থেকে নানা অসন্তোষের খবর আসা শুরু হলেও পরিচালক মহোদয়ের বিশ্বস্ত লোকেরা সেগুলো তাকে কিছুই বুঝতে দেয়নি। তাই শহরের অভিজাত এলাকায় একটি নতুন ফ্ল্যাট কিনে খুব নিশ্চিন্ত মনে তিনি অফিসের সবাইকে বাসায় নিয়ে গিয়ে ভরপেট খাওয়ালেন। অকৃতজ্ঞ সহকর্মীরা উদর পূর্তি করে বাহ্যতো খুশি মনে খাওয়া দাওয়া করলেও শহরের প্রাণকেন্দ্রে ফ্ল্যাট কেনার টাকার উৎস নিয়ে কানাকানি করতে কিন্তু ছাড়লোনা।

নানান নতুন ধরণের কাজ শুরু করে ইফতেখার সাহেব সকলের মধ্যে একটা ব্যস্ততা তৈরী করলেন তার অর্থ এই নয় যে দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য তার মায়া বেড়ে গিয়েছিল। বস্তুত পক্ষে তার নজর এবার পড়েছিল কিভাবে নিজের সামাজিক পরিচিতি আরো বৃহত্তর পরিসরে বাড়িয়ে সমাজের কেউকেটাদের সারিতে নিজের নাম লেখানো যায়।

এরমধ্যেই আবার একদিন অফিসের মধ্যে ফিসফিসানি। সাধারণত সকালে রিসেপসানে এসে অনেকেই একটু বসে সেদিনকার পত্রিকা পড়ে তারপর কাজে ঢোকে। তেমনই একদিন সকালে জেন্ডার প্রোগ্রাম অফিসার সুদীপ্তা অফিসে এসে নিজের রুমে ঢুকে কাজ শুরু করার আগে ভাবলেন রিসেপশনে বসে পেপারগুলোতে একটু চোখ বুলিয়ে যাবেন। পছন্দের পত্রিকাটি খুঁজতে গিয়ে দুই তিনটি দৈনিক পত্রিকার নীচেই হঠাৎ একটি ম্যাগাজিন আবিষ্কার করলেন, যেটি দেশের একটি মাঝারি সারির পরিচিত ম্যাগাজিন এবং যার প্রচ্ছদে দেশের উন্নয়ন সেক্টরে তিন চার যুগ কাজ করে জীবন পার করে দেওয়া বরেণ্য কয়েকজনের ছবির মাঝখানে ইফতেখার আহমেদ এর হাসিমুখের একটা ছবি জ্বলজ্বল করছে আর তার ভিতরে এই অফিসের নানাবিধ উন্নয়নমূলক কাজে তার অবদানের লম্বা ফিরিস্তি দেয়া। অফিসের মধ্যে সেই খবর ছড়িয়ে পড়তে দেরী হলো না। তলে তলে খোঁজ চলতে লাগলো কিভাবে কি হলো। খুব বেশী সময় লাগলো না খবরটা বের হতে। একাউন্টস এর হেড জাফর সাহেব চুপিচুপি বাবর সাহেবকে জানালেন এই বাবদ কত টাকা তারা অকাতরে এই পত্রিকার পেছনে ঢেলেছেন।

কিন্ত বাস্তবিক, বিদেশের হেড অফিসের এদেশে কাজ করার উদ্দেশ্যের সাথে পরিচালক মহোদয়ের উদ্দেশ্য সাংঘর্ষিক ছিল। বিদেশীরা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এখানে এসেছে, একটা নির্দিষ্ট ছকের, নির্দিষ্ট মাত্রার উন্নতির বাইরে কখনই তারা কিছু করতে চায়নি, তারা তাদের পরিকল্পনা ‌অনুযায়ী এই দেশীয় অফিস চালাতে চায়। এখানেই হিসাব নিকাশে আমাদের ইফতেখার সাহেবের একটু ভুল হয়ে গেল।

হঠাৎ একদিন সকালে বিদেশের হেড অফিস থেকে দুজন উর্ধ্বতন  অফিসার কোন খবর না দিয়ে এসে হাজির হলো। ঘন্টার পর ঘন্টা দেশীয় পরিচালকের ঘরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক চললো। অফিসের নানান সারির কর্মকর্তাদের সাথে দলে দলে, আলাদা ভাবে, সবরকম ভাবেই তারা তদন্ত চালালো। বোঝা গেল অনেক আঁটঘাট বেঁধেই তারা এসেছেন। ইফতেখার সাহেব তাদেরকে অনেক তথ্য না জানালেও অফিসে অন্য লোকের অভাব ছিল না যারা তার অজান্তে সব তথ্যই হেড অফিসে পৌঁছে দিয়েছে যথা সময়ে।বিকেলের মধ্যেই নোটিশ এলো আপাতত: নতুন কোন দেশীয় পরিচালক মনোনীত না হওয়া পর্যন্ত শ্রীমতী লিন্ডা ম্যাকগেইল অর্ন্তবর্তীকালীন দেশীয় পরিচালক হিসাবে কাজ করবেন।

ইফতেখার সাহেব বিকেলের দিকে কারো সাথে কোন কথা না বলে শুষ্ক মুখে দোতলার তার সেই সুন্দর সাজানো গোছানো আরামদায়ক কক্ষটি থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে গাড়ির কাছে এলেন। প্রথম দিনের মত আজও গাড়িচালক হরিলালেরই দায়িত্ব পড়লো লাল ল্যান্ডক্রুজার এর দরজাটা যথারীতি খুলে দেয়ার। প্রথমদিনের মত গাড়িটা আজকে আর তার অপরিচিত নয় বটে কিন্তু গাড়িটা তার আপনও হলো না এই সাড়ে তিনবছরে।

তবে ‌অসুবিধা নেই, কয়েক দিন বা কয়েক মাস পরেই হয়তো অন্য কোন একটা নীল প্রাডো গাড়ি অপেক্ষা করে থাকবে তার জন্য অন্য কোথাও। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত সেই গাড়িতে করে ইফতেখার আহমেদ দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত চষে বেড়াবেন হতদরিদ্র মানুষের জীবনের মান উন্নত করার জন্য।

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত