একটি ভাঙনের গল্প

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comএকটি তার, কয়েকটি ক্লিপ দুলছে হাওয়ায়। ছাদের একধারে নিচ থেকে উঠে এসেছে মাধবীলতার গাছ। ফুলে ভরে গেছে। কাপড় মেলতে এসে আলেয়া একটা থোকা ছিঁড়ে খোঁপায় পরে নিয়ে একটু বসে, তারপর একটু পায়চারি করে।

ছাদ থেকে নেমে আসে সে। তারপর থেকেই দেয়ালে ঝোলানো আয়নায় দেখে চলেছে নিজেকে। একমাত্র এ আয়নাটাই ওকে কখনও ধোঁকা দেয় না। যেন জাদুবলে চামড়া টানটান হয়ে ওঠে আয়নার ভেতর। পুরোনো স্যাঁতসেঁতে এ বাড়িটার ঝাপসা এ আয়নায় নিজেকে ভীষণই লাস্যময়ী দেখতে দেখতে হঠাৎই আওয়াজ ওঠে সিঁড়িতে। বুকের ভেতরটায় রক্ত ছলকে ওঠে মুহূর্তেই। কেউ কি এল? তড়িঘড়ি গিয়ে দেখে, কেউ নেই! হয়তো হাওয়া, নয়তো পাড়ার ঘেয়ো কুকুরটা বসে বসে হাঁপাচ্ছে। কি মনে করে বসে পড়ে সে সিঁড়িতেই।

বড় ভয়ঙ্কর এই সিঁড়িটা। একটা থেকে আরেকটা ধাপের দূরত্ব যেন ভয় ধরিয়ে দেয় বুকের ভেতর। সিঁড়ির ঠিক মধ্যিখানে যে বাঁক, সেটাও ভয়াবহ। বাড়িটাও। প্রথম যেদিন এ বাড়িতে আসে আলেয়া, সেদিন থমকে গেছিল সিঁড়িতে এসেই। সঙ্গের লোকটি বলেছিল, “কি রে, থামলি কেন, আয়?”

আঁচলে শরীর আঁকড়ে খুব সন্তর্পনে লোকটার পিছু পিছু একটার পর একটা ধাপ ডিঙিয়ে উঠে গিয়েছিল ওপরে। ভীষণ অন্ধকার দোতলায় যেন কোনও অশরীরী চুপি চুপি নিঃশ্বাস ছেড়ে ফিসফিসিয়ে বলছিল, এ কোথায় এলি তুই?

গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে আলেয়ার। ঠিক সেদিনের মতোই শিউরে ওঠে সে। অনেকবছর আগের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো একে একে যেন হাজির হয় ওর সামনে। রাত যত ঘনায় তত বেশি কাহিল করে ফেলে সেসব দিনের স্মৃতি।

লোকটা বিয়ে করে এনেছিল যৌবনবতী আলেয়াকে, যে কিনা ছিল সুইপার কলোনির হারানের বউ! ওই কলোনিতে লোকটা যে কেন যেত, তা হারানের বউ আলেয়া জানতো না। খোঁপায় মাধবীলতা গুঁজে একদিন ভরসন্ধ্যেবেলা কলোনির পাশের চিকন নদীটার ধারে যখন সে গেল, দেখল এক রাজপত্তুর। পরনে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, পায়ে চটি। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। লোকটা কেমন করে যে দেখছিল, যেন জীবনে সে মেয়েমানুষ সেই প্রথম দেখল। শাড়ির আঁচলে লেপ্টে থাকা আলেয়ার সুগঠিত বুকের ঘন ঘন ওঠানামায় যেন আটকে গেছিল লোকটার চোখ। লোভ টসটসে সেই চোখের দৃষ্টিকে ইচ্ছে করলেই উপেক্ষা করতে পারতো আলেয়া, কিন্তু কেন যেন তার ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি খেলে গেল। নিজের সোয়ামিটা কোনদিন এমন করে তাকায়নি বলেই কী? নাকি ওই হাড় জিরজিরে সোয়ামির হঠাৎ জ্বলে উঠে দপ করে নিভে যাওয়ার ব্যথাটা চিনচিন করে উঠেছিল?

একদিন… সন্ধে গড়িয়ে গেল, ঝিঁঝিদের ডাকে কানে তালা লেগে গেল সবার। চাঁদ নেই, আকাশভরা শুধু তারা। লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি তারা। অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার। সেই অন্ধকারে হারিয়ে গেল হারানের বউ।

সিঁড়িতে বসেই হঠাৎ গুনগুন করে ওঠে আলেয়া। “আমি বনফুল গো……… “

লোকটা গাইতো। শুনে শুনে আলেয়াও গাইতো। পাঁচটা দিন কী সুখেই না কেটেছিল! সেই যে তারাভরা রাতে এই ভুতুড়ে বাড়িটির দোতলায় উঠেছিল, দোতলার শেষমাথায় স্নানের ঘরে সুগন্ধি সাবানে স্নান করে কড়কড়ে নতুন একটা শাড়ি পরেছিল সে। দেয়ালে ঝোলানো আয়নায় নিজেকে দেখে যেন নিজেই লজ্জা পেয়ে গেছিল। এমন করে এতবড় আয়নায় কখনও দেখেনি যে! ওই পাটকাঠির একটুকরো ছাউনিতে পাবে কোথায় অমন আয়না? ছোট্ট এক আয়নায় চোখ দেখা গেলে ঠোঁট নয়, ঠোঁট দেখা গেলে থুতনি নয়। শুধু সিঁথিটুকুই দেখতো সে, সিঁদুরে রাঙানোর সময়। সিঁথির নিচে কপাল আর মুখ দেখার কসরত করার মতো ধৈর্য হয়নি কখনও। তবে লোকমুখে তার রূপের বয়ান নানাভাবেই কানে আসতো। ওর শ্যামলাবরণ, ঢেউ খেলানো কোমর, ডাগর চোখ আর নিটোল বুকের প্রশংসা করেনি এমন কেউ নেই। সেই আলেয়াকে যখন সামান্য ক’টা টাকার জন্য মাতাল বাপটা আরেক মাতাল হারানের হাতে তুলে দিল, তখন আফসোস করেনি এমনও কেউ নেই। তবে কিনা ভিখিরি মাতালের মেয়ে, তার রূপই থাক আর নাই থাক, সে যে আরেক ভিখিরির হাতেই পড়বে, এ কথা জানতো না এমন কেউও নেই। আফসোস যারা করেছিল, তারা তো কেউ বিয়ে করতে চায়নি! আড়ে-ঠাঁড়ে তাকানো আর শিষ দিয়ে ডেকে গতরখানা ছুঁয়ে দেখা কিংবা পারলে শুয়ে পড়া, এই ছিল তাদের মনে।

তাই হারানের সাথে আলেয়ার বিয়ে হওয়ার আফসোসটা টেকেনি বেশিদিন। তবে বিয়ের পর আফসোস আলেয়ারই হয়েছিল। একে মাতাল, তারওপর খেঁকশিয়ালের মতো চেহারা, আবার শরীরেও বল-শক্তির ছিটেফোঁটাও নেই। সব খামতি ওই একটা জিনিসেই পুষিয়ে নেয়া যেতো। কিন্তু যখন ভরা যৌবনের আলেয়াকে সে বুঝটাও দিতে পারেনি ওই মিনসে, তখন আফসোস না হয়ে যায় কোথায়!

স্নানশেষে ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই হঠাৎ পেছন থেকে কোমল কোমরে অনুভব করেছিল পুরুষের বেষ্টনী। পুরুষ থেমে থাকেনি ওখানেই। থামবে কেন? এতদিন যে পেলব বুকের ওঠানামা সে দেখেছে, সেখানে হানা না দিয়ে ছাড়বে কেন? হানা দেবে বলেই না মন্দিরে গিয়ে সিঁদুর পরিয়েছে আবার নতুন করে। আলেয়াও চায়, ভীষণভাবে চায়, হানা দিক এ পুরুষ। হারানের ঘর তো সে এমনিই ছাড়েনি!

দিন রাতের শরীরী খেলায় মেতে থাকতে থাকতে কেটে গিয়েছিল পাঁচটি দিন। ঠিক তার পরের দিনই লোকটা যেন কোথা থেকে আরেক হৃষ্টপুষ্ট লোককে সাথে নিয়ে দুপদাপ উঠে এসেছিল ওপরে।

বলেছিল, “এ আমার বন্ধু মানুষ। আমাকে যেমন খুশি করিস তুই, একেও করতে হবে। যা, সুন্দর করে সেজে আয় তো!”

অবাক হয়ে আলেয়া বলেছিল, “আমি না তোমার বউ? এই সেদিনই তো বিয়ে কইরে আইনলে আমারে!”

খুব একটা তাচ্ছিল্য করে হেসে উঠে লোকটা বলেছিল, “বউ না ঘোড়ার ডিম! সবই তোকে ভোলানোর জন্যে। তোকে তো আমি নিয়ে এসেছি ব্যবসা করবো বলে। যা খারাপ যাচ্ছিল দিনকাল! বাপ জমি-জমা যা রেখে গেছিল, বেচে নেশার টাকা জোগাড় করতে তো সব শেষ। একা তো খাই না, বন্ধু-বান্ধব নিয়েই খাই। খরচ হবে না? বাড়িটা বেচার দশা হয়েছিল। বাড়ি বেচলে থাকবো কোথায়, গাছতলায়?

প্রথম যেদিন তোকে দেখি, ভালো লেগে যায়, মাথায় বুদ্ধিও খেলে যায়। কী সুন্দর গতরখানা পেয়েছিস, একটু খাটাবি না?”

মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছিল আলেয়া। হারানের শরীর জাগতো না, মাতালও ছিল, কিন্তু বউকে দিয়ে তো ব্যবসা করার কথা বলেনি কোনদিন! এ কোন বিপদে পড়লো সে? সেই যে সেদিন অন্ধকারের মধ্যে পেরিয়ে এসেছিল এ-বাড়ির সদর দরজা, আবছাই হোক, তবু বড়সড় বাড়িখানা দেখে মনটা তো ভরে উঠেছিল তার! যে প্রক্রিয়াতেই হোক, ভগবান এ-বাড়ির মালিকের সাথে ভাগ্য বেঁধে দিয়েছিল বলে মনে মনে তো কম ধন্যবাদ দেয়নি তাঁকে। তবে কিনা ওই বুক হিম করা সিঁড়িতে এসে শিউরে উঠেছিল বটে! ওই শিউরে ওঠাই কি তবে ভগবানের পক্ষ থেকে ইশারা ছিল ওর ভবিষ্যৎ দুর্ভাগ্যের?

মুরুকখু মেয়েমানুষ, বুঝবারই পারে নাই!

যেতে চায়নি লোকটার বন্ধুর কাছে, তবু যেতে হল। কোমল কোমরে ছুঁয়ে থাকা কোঁকড়া চুলগুলো মুঠিতে ধরে এমনভাবে ঝাঁকিয়েছিল লোকটা, হুড়মুড় করে লুটিয়ে পড়েছিল মেঝেতে। ঘাড়েও জোর চোট পেয়ে কঁকিয়ে উঠতেই শুনতে পেয়েছিল, যদি রাজি না হোস, কপালে আরও দুঃখ আছে। পকেট থেকে ধারালো একটা চাকুও বের করেছিল। প্রাণের দায় বড় দায়। সেজেগুজে খুশি করেছিল সেদিন হৃষ্টপুষ্ট লোকটাকে। পরেরদিন ভোরে আলো ফোটার আগেই ভেবেছিল পালিয়ে যাবে। কিন্তু সিঁড়ির শেষপ্রান্তে যে দরজা, তাতে যে একটা বড় তালা ঝোলানো! এ দরজায় যে তালা লাগানো থাকে, তা তো আলেয়া জানতোই না! পাঁচদিন আগে ওপরে ওঠার পর আর তো সে নিচে নামার কথা ভাবেইনি! কিন্তু চাবি কোথায়? তন্ন তন্ন করে খুঁজেও চাবি পাওয়া গেল না। সিঁড়ির শুরু আর শেষে দুই তালায় বন্দি হল আলেয়া।

তারপর প্রতিদিন নতুন নতুন লোক, নতুন নতুন কায়দায় শরীরটা ছিঁড়ে খেতে লাগলো। একসময় সয়ে গেল। আলেয়া বুঝে গেল, এই শরীরই তার সম্বল। যত্নে রাখতে হবে সেটাকে আর নতুন নতুন কায়দায় তা মেলে ধরতে হবে। পালাবে না, পালিয়ে যাবে কোথায়?

ভালো আছে। শরীরের জেল্লাও বেড়েছে বেশ। আয়নায় নিজেকে দেখে যেন আঁশ মেটে না। বড় বড় সাহেব বাবুরাও খোঁজ পেয়ে যায়। তারা আসে, আসে কড়কড়ে নোট। সবাই জানে আলেয়ার স্বামী বড় ব্যবসাদার। ব্যবসার আলোচনা করতে লোকজন আসতেই পারে!

ভুতুড়ে বাড়িটিতে না চাকর না বাকর, আলেয়া আর আলেয়ার লোকটা আর রাতে লোকটার লোকজন। কত বছর এভাবে কেটেছে, জানে না আলেয়া। কিংবা হয়তো জানে, হিসেব এলোমেলো হয়ে যায়! লোকটা হঠাৎ করেই রোগে পড়ে একসময়। লিভার না কি যেন, সেটার নাকি সময় ফুরিয়ে এসেছে।

একসময় সময় ফুরিয়ে আসে আলেয়ারও। নিটোল বুকে টোল পড়ে, ডাগর চোখের নিচে কালি, কোমরের ঢেউয়ে বালির আস্তরণ, যেন অযথাই ঝুরঝুর করে ঝরে ঝরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। তেমন কেউ আর আসে না ও শরীরের টানে। যে দুই একজন আসে, তাদের দেয়া সামান্য টাকায় খাবে না ওষুধ কিনবে? লোকটা বিছানায় কাতরায়। করুণ চোখে আলেয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, “আমাকে ছেড়ে তুই চলে যাবি না তো?”

কে জানে কেন, আলেয়ার চোখ ভিজে গিয়েছিল। যে তার এতবড় সর্বনাশ করেছে, তাকে কি সে ভালোবেসে ফেলেছিল? নাকি এতবছর একসাথে থাকতে থাকতে অভ্যাসে পরিণত লোকটার প্রতি করুণা হয়েছিল তার? কিন্তু, করুণায় কি চোখ ভিজে যায়!

শূন্য সিঁড়িতে উঠে দাঁড়ায় আলেয়া। ঘরে যায়। বিছানায় লোকটা সটান শুয়ে। ভীষণ শীর্ণ দেহটায় প্রাণ আছে কি এখনও? বিনা ওষুধে, বিনা পথ্যে একটা মানুষ বেঁচে থাকে কতদিন? আলেয়াও তো বেঁচে আছে। যৌবন হারিয়ে বেঁচে থাকা যায়, কিন্তু খাদ্য ছাড়া কয়দিন বাঁচবে? খাদ্যের যোগানই বা হবে কোথা থেকে? লোকটা না থাকলে এ বাড়িতেও তো আর জায়গা হবে না! নাকি হবে? সবাই তো ওকে লোকটার বউ বলেই জানে! সিঁথি তো এখনও রাঙায় আলেয়া!

আবার আয়নাটার সামনে দাঁড়ায় সে। দুই কানের পাশে আর কপালে সিঁথির ঠিক দুই পাশের চুলগুলো এত সাদা! মুখটা হঠাৎ বিবর্ণ হয়ে যায়। এতদিন তাহলে আয়নাটা তাকে মিছে কথা বলেছে!

আর কোনও আশাই নেই। বিছানার দিকে চোখ যায়। দেখে, উঠে বসার চেষ্টা করছে লোকটা। আলেয়ার চোখে চোখ পড়তেই হাতের ইশারায় কাছে ডাকে। কাছে যেতেই বলে, আমাকে তুই মাফ করে দিস। আর ওই আলমারিতে এবাড়ির দলিলটা আছে। বাড়িটা বিক্রির ব্যবস্থা কর। আমার চিকিৎসার জন্য যা লাগে খরচ করে, বাকিটা তুই নিস। আমি তো আর বেশিদিন নেই, তুই ভালো থাকিস।

বাঁচেনি লোকটা তারপর। পরেরদিন বাড়ি বিক্রির বন্দোবস্ত করে যেন খুব খুশি হয়ে উঠলো। বাড়ি বিক্রির পর আরও খানিকটা। পরের দিন ভোরে উঠেই আলেয়া দেখলো নিথর দেহ।

চলে যেতে হবে। আলেয়া তৈরি। গন্তব্য জানে না, কিন্তু তৈরি সে।

সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে এল আলেয়া। কেন যেন আজ আর ওটাকে ততটা ভয়ঙ্কর মনে হল না। বরং এতদিন মিথ্যে বলার জন্য আয়নাটার ওপরেই রাগ হল মনে মনে। তবে রাগ হয়নি বাড়িটার দেয়াল ধরে ছাদে উঠে যাওয়া মাধবীলতার ওপর। ফুলের ওপর রাগ করা যায় না। চলে যেতে গিয়েও ফিরে এসে একথোকা মাধবীলতা ছিঁড়ে খোঁপায় পরে নিলো আলেয়া।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত