| 15 এপ্রিল 2024
Categories
প্রবন্ধ সাহিত্য

বাঙালির মনন ও মূল্যবোধ জুড়ে ধর্মসমন্বয় ভাবনা

আনুমানিক পঠনকাল: 18 মিনিট

আব্দুল্লাহ-আল-আমিন

 

বাঙালির মনন ও মূল্যবোধ জুড়ে সম্ভবত যুক্তি আর তার্কিকতা মিশে আছে গভীরভাবে। ভাবপ্রবণ বাঙালি মাঝে মাঝে যুক্তি-তর্ক ভুলে আবেগের আতিশয্যে বিভ্রান্তির জটিল জালে আটকা পড়েছে ঠিকই, তবে সেই বিভ্রান্তির পর্বটা দশকের পর দশক ধরে স্থায়ী হয়নি। ভ্রান্তি শুধরে যুক্তি সত্যের কাছাকাছি ফিরে আসতে তার খুব বেশি সময় লাগেনি। বাঙালি সর্বকালে, সর্বযুগে নানা বিষয় নিয়েই তর্ক করেছে; তর্ক করেছে বস্তুবাদ ও ভাববাদী মতাদর্শ নিয়ে, তর্ক করেছে কমিউনিস্টসহ অন্যান্য চরমপন্থী মতবাদের সঙ্গে। হিন্দু ও মুসলমান মৌলবাদের সঙ্গে যেমন তর্ক করেছে, আবার ধর্মনিরপেক্ষ ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের সঙ্গে তর্ক করতে কসুর করেনি। বস্তুত তর্কের মাধ্যমেই বাঙালি ধর্ম-সাহিত্য, দর্শন-বিজ্ঞানের সত্য আবিষ্কার করেছে। তর্ক দিয়ে বাঙালি জানার মাঝে অজানার সন্ধান করেছে; বিশ্বপ্রকৃতির রহস্য উন্মোচন করেছে; জগৎ, জীবন ও ধর্মের ভাবসত্য বিশ্লেষণ করেছে। তর্ক করার প্রবণতা আসলে খাঁটি বাঙালি দৃষ্টিভঙ্গি এবং এর মধ্যে দোষ-গুণ দুটোই দেখতে পাওয়া যেতে পারে। তবে তর্ক করার মধ্যে ভালোর দিকটাই সম্ভবত বেশি, এর দ্বারা বাঙালি উপকৃত হয়েছে বেশি। আসলে তার্কিক প্রবণতা বাঙালিকে পরিণত করেছে যুক্তিবাদী, সহনশীল, পরমতসহিষ্ণু ও সংশ্লেষণবাদীতে। আর তাই বাঙালি পৃথিবীর সকল সুকৃতি ও মহৎ ভাবনাকে আপন বলে গ্রহণ করে নিতে পেরেছে পরম মমতা দিয়ে। খুব সম্ভবত এসব কারণে বাংলার রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রভাব খুব কম। গর্ব করেই বলা যায়, ১৯৪৭ সালের পর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় কিংবা বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে কোনো সাম্প্রদায়িক দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়া তো দূরের কথা, উল্লেখ করার মতো আসন পর্যন্ত পায়নি। আমাদের বেশ মনে আছে, সত্তর দশকের মাঝামাঝিতে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তির ব্যর্থতা ও কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের পটভূমিতে বাংলাদেশসহ উপমহাদেশজুড়ে ধর্মীয় মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও ডানপন্থী শক্তির উত্থান ঘটেছিল। বঙ্গবন্ধুর শাসনের বিরুদ্ধে ঘটেছিল ডান ও বাম চরমপন্থী শক্তির আবির্ভাব এবং সাময়িকভাবে তারা জয়লাভও করে। তবে সেটা দিয়ে বাঙালির ভাবগত পরিচয় নির্ণয় করা যাবে না, কারণ সেই শক্তির আস্ফালন খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। আর একটি বিষয় স্বীকার করতে হয় যে, একটি বা দুটি ভোটের ফলাফল বিবেচনা করে কোনো জাতির মনন-চিন্তন বা ভাবগত মেরুকরণের গভীরতা পরিমাপ করা যায় না বা যাবে না। সামরিক স্বৈরশাসক ও তাদের আশীর্বাদপুষ্ট ধর্মব্যবসায়ী ফেরেব্বাজরা যত শক্তিধর হোন না কেন, বাঙালির অসাম্প্রদায়িক ভাবনার চেয়ে শক্তিশালী তারা ছিলেন না কোনো যুগেই। সুফি, দরবেশ, কবি, শিল্পী, সাধক, ভাবুকরা শত শত বছর ধরে বাঙালির চেতনার গভীরে মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িকতার যে গাঢ় ছাপ মেরে দিয়ে গেছেন, তা মিথ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে কিংবা বল প্রয়োগ করে মুছে দেয়া যাবে না। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আত্মঅহমিকায় দীর্ণ বাম প্রগতিশীল শক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছে বটে, কিন্তু মৌলবাদী সংঘ পরিবারকে মেনে নেয়নি। আবার সামরিক শাসকদের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ কিংবা ১৫তম সংশোধনীর নামে জোড়াতালিও বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেয়নি। সম্প্রতি পশ্চিমা বিশ্বে ধর্মের পুনরুজ্জীবন ঘটেছে, এই উপমহাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি, সাম্প্রদায়িকতা যেমন পছন্দ করে না, তেমনই ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রগতিশীলতার নামে ভাঁড়ামিও সহ্য করে না। সম্প্রতি ভারত হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলোর লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। তারা ভারতের বহুত্ববাদী ও অসাম্প্রদায়িক চরিত্র পালটে দিয়ে একে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। ভারতের উদার গণতান্ত্রিক শক্তি ও সেক্যুলার সংবিধানও আজ ক্ষেত্রবিশেষে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তারপরও ‘অভয় বাজে হৃদয় মাঝে’ পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক শক্তি সেইভাবে শেকড় গাড়তে পারেনি। বাংলাদেশের মানুষও অশুভ সাম্প্রদায়িক শক্তি ও তাদের অসুস্থ রাজনীতি প্রশ্রয় না দিয়ে তাদের সব ধরনের অপ-রাজনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকহানাদার বাহিনীর নৃশংসতা ও বর্বরতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অসাম্প্রদায়িক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ত্রিশ লক্ষ বাঙালি যে-প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে তা কেবল দক্ষিণ এশিয়া নয়, বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে এক বিরল ও অতুলনীয় ঘটনা। বিদ্যাসাগর বাঙালিকে ‘ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন, দাম্ভিক, তার্কিক জাতি’ বলে যত ধিক্কার জানান, বাঙালি যে অসাম্প্রদায়িক সেটা স্বীকার করতেই হবে। শত শত বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের পাশাপাশি অবস্থান ও ভাবের আদান-প্রদান, নানাসব পালা-পার্বণ, উৎসব-কৃত্যাচার অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক ভাবনাকে বাংলার মাটির গভীরে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করে দিয়েছে। ধর্মীয় সংঘাত, দলাদলি, পারস্পরিক ভুলবোঝাবুঝি, লাঠালাঠি, রক্তারক্তির ইতিহাস যে আমাদের একেবারেই নেই, তা বলা যাবে না। তবে ইতিহাসের সেই ধূসর বিবর্ণ, কালিমালিপ্ত অংশ ছাপিয়ে এ ভূখ-ে বারবার ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সমন্বয়বাদী চিন্তার জয় হয়েছে; জয় হয়েছে মানবিক আধ্যাত্মিকতা ও অখ- মানবতার।


বিশ্বের সব মহৎ ধর্মের শ্বাশত বাণীর মধ্যে নিহিত আছে সত্য, সুন্দর, আনন্দমঙ্গল ও মানবিক কল্যাণের কথা। উপনিষদে আছে:
‘ অসতো মা সদ্গময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়,/ মৃত্যোর্মামৃতং গময়।/ আবিরাবর্ম এধি, রুদ্র যত্তে দক্ষিণং মুখং/ তেন মাং পাহি নিত্যম।’
অর্থ: আমাকে অসত্য থেকে সত্যে নিয়ে যাও, অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাও। হে স্বপ্রকাশ জ্যোতিঃস্বরূপ রুদ্র, তুমি আমার নিকট আবির্ভূত হও, তোমার যেটি কারুণ্যপূর্ণ দক্ষিণমুখ তৎদ্বারা আমাকে নিত্য রক্ষা করো।
কোরআন শরিফে আছে: ‘আমাদের সরল পথে চালাও- তাদের পথে যাদের তুমি অনুগ্রহ করেছ; তাদের পথে নয় যারা তোমার রোষের পাত্র, তাদের পথেও নয় যারা পথহারা।’(সুরা ফাতিহা: ৫-৭) অর্থাৎ সব ধর্মের মধ্যে এমন সব মহৎ ভাব নিহিত আছে যা মানুষকে কেবল অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ধাবিত করে। বিশ্বের সব ধর্মের মহৎ ভাবনাগুলি মূলত এক ও অভিন্ন। তবে বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে যেমন মিল রয়েছে, তেমনি অমিলও কম নেই। যেখানে অমিল সেখানে অসামঞ্জস্যও রয়েছে দারুণভাবে। তারপরও প্রায় সব ধর্মই একই ধরনের নৈতিকতা ও পরার্থপরতার কথা বলেছে, যদিও সেমেটিক ধর্ম ও পৌত্তলিকতাবাদী ধর্মগুলির মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যেমন- হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মে জন্মান্তরবাদ স্বীকার করেছে কিন্তু ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মে সেখানে মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের কথা বলেছে। ইসলাম যেখানে একেশ্বরবাদের বাণী দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছে, সেখানে হিন্দুধর্ম বহুদেবতাবাদে, খ্রিস্টানধর্ম ত্রিত্ববাদে আস্থা স্থাপন করেছে আর গৌতম বুদ্ধ তো ঈশ্বর আছে কি নেই এই প্রশ্নে ছিলেন একেবারে নীরব। এসব অমিল স্বীকার করে নিয়েও বিভিন্ন ধর্মের শাশ্বত বাণী বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, সব ধর্মের মর্মার্থ ও উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। আর এর বাইরে যেসব বিধান, পালা-পার্বণ, আচার-আচরণ রয়েছে যেগুলির কোনো সার্বজনীন মূল্য নেই। বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে যে বিরোধ বা অমিল তাও মূলত আনুষ্ঠানিকতা ও আচার বিচারকে কেন্দ্র করেই সংঘটিত হয়। ধর্মের প্রাত্যহিক আচার পালন করেও আমরা সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে বিভিন্ন ধর্মের গভীরতর উপলব্ধির উপর ভিত্তি করে এক ধর্মের সঙ্গে অন্য ধর্মের সমন্বয় সাধন করতে পারি। আমাদের দেশে চৈতন্য থেকে লালন; রামমোহন, বিদ্যাসাগর থেকে রবীন্দ্রনাথ প্রচলিত ধর্মের বিধান, লোকাচারকে অতিক্রম করে সব ধর্মের ভিতর যে স্থায়ী তত্ত্ব রয়েছে সেখানে মিল খোঁজার চেষ্টা করেছেন। আসলে সব ধর্মের মধ্যেই লুকায়িত রয়েছে গভীর সত্য উপলব্ধি বা সার্বজনীন সত্য যা দিয়ে মানুষে মানুষে মেলবন্ধন রচনা করা যায়। মোঘল স¤্রাট আকবর তার দ্বীন ই-ইলাহি দিয়ে ভারতবষের্র সকল ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে সমভাব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তিনি কোনো ধর্মীয় কাল্ট প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। আকবরের ধর্মমত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করতে না পারলেও বাংলাদেশ ও ভারতের সংবিধানে দ্বীন ই-ইলাহির যে ছাপ রয়ে গেছে তা অস্বীকার করা যাবে না। দু’দেশই স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করেছে। আর ভারতবর্ষে সেক্যুলার ভাবনার উৎপত্তি মোঘল স¤্রাট আকবরের দ্বীন ই-ইলাহি থেকে, একথা অমর্ত্য সেন তাঁর ‘দি আরগিউমেঠেটিভ ইন্ডিয়ান’ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন যুক্তি দিয়েই। অবশ্য মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, আকবরের স্বপ্ন সার্থক হয়নি; কারণ সব ধর্মের নিজস¦ সত্তা আছে। তবে নেহেরু তার ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’তে আকবরের দ্বীন ই-ইলাহি সম্পর্কে কিছু ইতিবাচক কথা বলেছেন। বাঙালির নবজাগৃতির পথিকৃৎ রাজা রামমোহনও স¤্রাট আকবরের মতো নানা ধর্মমতের মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করে গেছেন। তাঁর বলিষ্ঠ জীবনভাবনা ও ধর্মসমন্বয়ী প্রত্যয় আজও বাঙালিকে পথ দেখায়- প্রভাবিত করে। সেই প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, কলকাতার সেন্ট পলস কলেজের অধ্যাপক বহুভাষাবিদ ড. মকবুল ইসলামের লেখা ‘ভাগবতগীতা অ্যান্ড আল কোরআন’ (ইযধমনধঃ এরঃধ ধহফ অষ-ছঁৎধহ) গ্রন্থে। আরবি ও সংস্কৃত ভাষায় প-িত উদারপন্থী এই লেখক সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে ভাগবদগীতা ও কোরআন শরিফের অনুপুক্সক্ষ পাঠ গ্রহণ করেন এবং দুই পবিত্র ধর্মগ্রন্থের উপদেশ ও বিষয়বস্তুর মধ্যে উল্লেখ করার মতো যেসব মিল-অমিল রয়েছে সেগুলি উদ্ধৃতিসহ তুলে ধরেন। যারা আলোচ্য ধর্মগ্রন্থ দুটি তেমন গভীরভাবে পড়েননি তারাও বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।
কোরআন শরিফে বিবাহ, বিবাহ-বিচ্ছেদ, সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কিত কিছু বিধান রয়েছে, অন্যদিকে ভাগবদগীতায় এ ধরনের প্রসঙ্গের কোনো উল্লেখ নেই। আবার গীতায় চতুর্বর্ণ প্রথার সপক্ষে কিছু শ্লোক রয়েছে যা কোরআন শরিফে নেই। এই হচ্ছে দু’ ধর্মগ্রন্থের মধ্যে অমিলের উদাহরণ। এ রকম অমিলের উদাহরণ আরও দেখানো যেতে পারে, তবে মূল আলোচনার জন্য সেটা তেমন প্রয়োজন হবে না। ড. মকবুল ইসলাম তাঁর গ্রন্থে ধর্মগ্রন্থদ্বয়ের অমিলগুলি যেমন উদ্ধৃতিসহ তুলে ধরেছেন, তেমনি কোথায় কোথায় মিল রয়েছে তাও দেখিয়ে দিয়েছেন। দু’চারটি উদাহরণ দিয়ে আলোচনা করা হলে বিষয়টি পাঠকের কাছে খোলসা হবে বলে আমার ধারণা।
ইসলাম ধর্মের মূল কথা হলো, আল্লার ইচ্ছার কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ। যেমন সুরা আল ইমরানে বলা হয়েছে, ‘লো! রিলিজিয়ন উইথ আল্লাহ ইজ দ্য সারেন্ডার টু হিজ উইল অ্যান্ড গাইডেন্স’ (৩/১৯) এবং এটাই হচ্ছে ইসলামের সারসত্য। আবার এ রকম পূর্ণ আত্মসমর্পণের কথা ভাগবদগীতাতেও অসংখ্যবার বলা হয়েছে গভীরভাবে। যেমন, গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যিনি সকল প্রাণীর প্রতি দ্বেষহীন, মিত্রভাবাপন্ন, দয়ালু, মমত্ববুদ্ধিসম্পন্ন, নিরহংকার, সুখে-দুঃখে সমভাবাপন্ন, ক্ষমাশীল সদাসংযত স্বভাব, সদা তত্ত্ববিষয়ে দৃঢ়নিশ্চয় এবং যার মন ও বুদ্ধি আমাতে সমর্পিত সেই ভক্তই আমার প্রিয়। (১২/১৪) মর্মার্থের দিক থেকে এখানে কোরআন ও গীতা নিবিড়ভাবে ঘনিষ্ঠ। বিষয়মোহ ত্যাগ করার কথা গীতাতে বারবার বলা হয়েছে, তেমনি কোরআন শরিফেও আছে, ‘লোভ থেকে যিনি নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছেন তিনিই সফল।’ (৬৪/১৬) যিনি নিজেকে বিষয়মোহ থেকে মুক্ত করতে পারেননি তিনি কীভাবে আল্লাহ বা ঈশ্বরে আত্মসমর্পিত হবেন!
কোরআন শরিফ ও গীতার মধ্যে আরও অনেক জায়গায় মিল খুঁজে পাওয়া যাবে, যেসব বিষয় ধর্মনিষ্ঠ কিংবা ধর্মচিন্তক ব্যক্তিকে ভাবিত করতে পারে। ধর্মযুদ্ধের প্রতি দু’ ধর্মগ্রন্থই সমর্থন জানিয়েছে। ভাগবদগীতায় বলা হয়েছে, ‘ধর্মযুদ্ধ ক্ষত্রিয়ের শ্রেষ্ঠ কর্তব্য’। (২/৩১) কোরআন শরিফেও ধর্মযুদ্ধের নির্দেশনা রয়েছে। ‘ইসলাম আক্রান্ত হলে সমস্ত বিশ্বাসী মুসলমানেরই কর্তব্য সর্বশক্তি দিয়ে সেই আক্রমণ প্রতিহত করা। যেমন গীতায় তেমনই কোরআনে কোনো নিষেধ নেই ধর্মযুদ্ধে হত্যার বিরুদ্ধে। কিন্তু একই সঙ্গে আরও একটা কথা বুঝে নেওয়া দরকার। ধর্মযুদ্ধে যেমন ভয়ের স্থান নেই, তেমনি ব্যক্তিগত বিদ্বেষেরও স্থান নেই। ধর্মযোদ্ধা আল্লাহ অথবা ঈশ্বরের ইচ্ছার সাধক মাত্র। গীতা ও কোরআনে তাই, অবিশ্বাসীদের স্তম্ভিত করে দিয়ে, যুদ্ধের পাশাপাশি অহিংসা ও ক্ষমার কথা বলা হয়েছে।’ (অম্লান দত্ত, ধর্মসমন্বয় চিন্তা। দেশ। ২ সেপ্টেম্বর ২০০৪। পৃ: ৩৭) ইসলামের সার্বজনীন সত্যের মর্মার্থ যারা বোঝে না বা বুঝেও ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করায় তারাই জেহাদের সঙ্গে বিদ্বেষ যুক্ত করে। কিন্তু আল্লাহতায়ালার স্পষ্ট নির্দেশ ‘যে তার লোভ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে, সে সফলকাম হবে’ (৭/১৯৯) ভাগবদগীতাতেও অহিংসা, সত্য ও অক্রোধের কথা বলা হয়েছে ষোড়শ অধ্যায়ে। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়কে বিষয়গুলো ভাবতে হবে আমাদের বৃহত্তর স্বার্থে, বিশেষ করে উপমহাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক বিকাশ ও অস্তিত্বের স্বার্থে। আমার বিশ্বাস, আর কেউ চিন্তা করুক না করুক মুক্তবুদ্ধির বাঙালি বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবে। বিশ্বের আর কেউ পারুক না পারুক, অসাম্প্রদায়িক ভাবনায় প্রবুদ্ধ বাঙালি পারবে সকল ধর্মের সারাৎসার আত্মায় ধারণ করে মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে।


বিশ্বের সব মহৎ ধর্মের মিলগুলো দিয়ে আকবর কিংবা রামমোহন মানুষে মানুষে সেতু বন্ধন রচনা করতে চেয়েছিলেন। ধর্মসমন্বয়ের ভাবনা শিখগুরু গোবিন্দের মধ্যেও ছিল, আর তাই তিনি বলতে পেরেছিলেন, ‘গির্জা আর মসজিদ দুই-ই সমান; হিন্দুদের পূজা-অর্চনা আর মুসলমানদের নামাজ রোজা উভয়ই অভিন্ন; সকল মানুষই এক, বিচারের ভ্রান্তির জন্য এদেরকে ভিন্ন বলে মনে হয়। সকল মানুষের একই রকম চোখ, একই রকম কান, একই রকম দেহ, একই রকম আকার- ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ এর সংযোগ। কোনো মানুষকে যেন ভাবতে দেয়া না হয় যে, মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে।’

ইসলামও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সমন্বয় সাধনে ও তাদের পরস্পরের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপনে প্রবলভাবে বিশ্বাসী। এ ধর্ম বিভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রতি বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে দিয়েছে। পবিত্র কোরআন শরিফে বলা হয়েছে:
‘নিশ্চয় যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং যারা ইহুদি ও সাবেইন ও খ্রিস্টান যে আল্লাহ ও পরকালের উপর বিশ্বাস স্থাপন ও সৎকর্ম করে বস্তুতপক্ষে তাদের কোনো ভয় নাই এবং তারা দুঃখিত হবে না (৫/৬৯)।’
একথা সত্য যে, বিশ্বে অসংখ্য ধর্ম আছে এবং এসব ধর্মের মধ্যে বিভেদও আছে আর থাকাটাই স্বাভাবিক। তারপরও প্রত্যেক ধর্মই মানুষকে ভালোবাসতে ও শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছে। বস্তুত ধর্মের মহৎ ভাবনার মধ্যে নিহিত আছে সাম্য, মৈত্রী, মানবিকতা ও উদারতার মর্মবাণী। ধর্ম কখনো নিচুতা শেখায়নি বরং ধর্মান্ধতাই মানুষকে বর্বর, নিষ্ঠুর, গোঁড়া, হৃদয়হীন পশু করে তোলে। বিভিন্ন ধর্মে ঈশ্বরকে নানা নামে, নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করে ডাকা হয়। সৃষ্টিকর্তাকে যে নামে, যে ভাব-ভাবুকতা দিয়ে ডাকা হোক না কেন, ঈশ্বর সম্পর্কিত অনুভূতি সব ধর্মসম্প্রদায়ের কাছে প্রায় একই রকমের। কেউ ঈশ্বর ভাবনাকে যুক্তিবাদের ওপর স্থাপন করেছেন, আবার কেউ স্থাপন করেছেন ভক্তি ও বিশ্বাসের ওপর। আল্লাহ বা ঈশ্বরকে যে শব্দপ্রতিমা ব্যবহার করে ডাকা হোক, তার নাম উচ্চারিত হলে মনের ভেতরে এক ধরনের পবিত্রতা, শুদ্ধতা, অপার্থিব ভাবনার অনুভূতি জেগে ওঠে। আর এটাই অধ্যাত্মবোধ যা সব ধর্মের নির্যাস। সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলে শিখধর্মগুরু নানক কোরআন শরিফ আত্মস্থ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হিন্দুধর্ম ও ইসলামের মৌল ভাবনা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি শিখধর্ম প্রবর্তন করেন। শিখদের স্বর্ণমন্দিরের জন্য জায়গা দান করেন স¤্রাট আকবর। পবিত্র কোরআন বাংলা ভাষায় প্রথম অনুবাদ করেন গিরিশচন্দ্র সেন। আবার হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ ভাগবদগীতা প্রথম বিদেশি ভাষায় অনুবাদ করেন স¤্রাট শাজাহান পুত্র দারাশিকো। বাঙালি মনীষার অন্যতম প্রধান পুরুষ রামমোহন তাঁর যুক্তিশীলতা, আত্মোপলব্ধি, আত্মজ্ঞান দিয়ে বিভিন্ন্ ধর্মের মধ্যে মেলবন্ধন রচনা করতে চেয়েছেন। ‘হিন্দু চিত্তের গভীরতা, ইসলামের আধ্যাত্মিকতা ও জীবনমুখিতা এবং খ্রিস্টধর্মের সহৃদয়তা’র যে অপূর্ব সম্মিলন তার চিন্তাধারায় ও ব্যক্তিচরিত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে তা দিয়েই তিনি ধর্মসমন্বয়ের মতো অসাধ্য কাজটি সম্পন্ন করতে চেয়েছিলেন। তিনি মেজাজে মননে যুক্তিশীল, জিজ্ঞাসু মানুষ ছিলেন, কিন্তু কোনোভাবেই নিরীশ্বরবাদী কিংবা শাস্ত্রবিমুখ ছিলেন না। যুক্তির আলো দিয়ে তিনি ঈশ্বরের পথে হেঁটেছেন, যুক্তি ও প্রজ্ঞা দিয়ে বিভিন্ন ধর্মের মর্মভাবনা ও শাস্ত্রের নিগূঢ় তত্ত্ব বিশ্লেষণ করেছেন। ত্রিশ বছর বয়সে রচিত তুহফাৎ উল মুওয়াহিদীন (১৮০৪) গ্রন্থে রামমোহন ধর্মবিষয়ক চিন্তা তুলে ধরেন। গ্রন্থটির নামের অর্থ: যারা ঈশ্বরের একত্বে বিশ্বাস করেন তাদের উপহার। এ গ্রন্থে তিনি শাস্ত্রনিরপেক্ষ যুক্তি দিয়ে একেশ্বরবাদ প্রমাণ করেন। যুক্তিবাদিতার প্রতি বরাবরই তাঁর প্রবল ঝোঁক ছিল, কিন্তু কোনোভাবেই সেটা তাঁর অধ্যাত্মভাবনার বিরোধী হয়ে ওঠেনি। তিনি যুক্তিও নিয়েছেন এবং অতীন্দ্রিয় অনুভূতি ও ঈশ্বরভাবনাও জীবনের অবিভাজ্য অংশ বলে মেনেছেন আমৃত্যু। স্বাভাবিক ধর্মানুভূতির প্রতি প্রবল আস্থা থাকলেও ধর্মোন্মত্ততাকে তিনি সারা জীবন সন্দেহের চোখেই দেখেছেন। তিনি বলেছেন, সর্বধর্মের মধ্যে যে সারবস্তু বিদ্যমান তার একটা স্বাধীন সত্তা আছে। আরও বলেছেন, ‘পবিত্রতাই ভগবানের গ্রহণযোগ্য’। তারপর বলেছেন, ‘এই বৃত্তিটাই সৃষ্টিকর্তা মানুষের অন্তরে গভীরভাবে প্রোথিত করেছেন।’ রামমোহন ফন্দিবাজ ধর্মধ্বজিদের ফেরেব্বাজি ও প্রতারণা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন প্রথম যৌবন থেকে, তাই ধর্মের শুদ্ধতা রক্ষার জন্য তৎপর ছিলেন সব সময়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, অন্তর্নিহিত এক বৃত্তির অস্তিত্ব যা ধর্মের সার্বজনীন সত্যের সঙ্গে যুক্ত এবং যেখান থেকে পবিত্রতাবোধ উৎসারিত হয়, যেটা ঈশ্বরের কাছেও গ্রহণযোগ্য। এই পবিত্রতাবোধে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা গেলে ধর্মের শুদ্ধতা যেমন রক্ষা সম্ভব হবে, তেমনি ধর্মসমন্বয়ের পথে কোনো বাধা থাকবে না।
এই গভীরতম বৃত্তি মানুষের চিত্তকে কামনা-বাসনার অস্থিরতা থেকে আনন্দ-কল্যাণ-মানবিকতা-সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির পথে নিয়ে যায়, মূল্যবোধ ও চেতনার স্তরকে উন্নততর করে। একে মেনে, আত্মস্থ করে অহংকে অতিক্রম করতে হয়। রামমোহন গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, যুক্তির সঙ্গে ধর্ম, বিশ্বাস কিংবা অন্তরের গভীরে যে আবেগ নিহিত তার কোনো বিরোধ বা সংঘর্ষ নেই; আর তা থাকাও উচিত নয়। তবে সব আবেগ বা বিশ্বাসের যে স্বাধীন সত্তা রয়েছে, তা তিনি অস্বীকার করেননি। এ জন্যই তিনি নবজাগৃতির পথিকৃৎ-রেনেসাঁসের আলোকধারায় ¯œাত মুক্তচিন্তার মুক্তমানব।
চিন্তার স্তরটা স্বচ্ছ করে আরও সরল করে বলা যায়, যুক্তি পথ হারিয়ে বিপথগামী হতে পারে; প্রেম, ভালোবাসা, আবেগ অন্ধ হতে পারে। তারপরও সুস্থ, সুন্দর, আনন্দময় জীবনের জন্য যুক্তি ও আবেগ দুয়ের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। এদের সুসমন্বয় ছাড়া কোনো সিস্টেম চলবে না, কোনো ধর্মই পূর্ণতা পাবে না। বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সমন্বয় সহজসাধ্য বিষয় নয়, অন্য পথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভবপর নয়। তাই সব কাজের মাঝে আমাদের অবশ্যই সমন্বয়ের চিন্তাটা উচ্চে তুলে ধরে রাখতে হবে, যেমন রেখেছিলেন রামমোহন এবং তারও আগে মধ্যযুগের বাঙালি মুসলমান কবি ও পদকর্তারা। একুশ শতকের বাঙালিকেও ধর্মসমন্বয়ের আল ধরেই সামনে এগোতে হবে, নতুবা তার সব কিছুই বিপন্ন হবে।


বিশ্ববিশ্রুত ঔপন্যাসিক লিও টলস্টয়ের বিখ্যাত মন্তব্য: বিশ্বের প্রতিটি ধর্মের রয়েছে তিনটি অপরিহার্য অংশ। প্রথমটি, ফিলসফি অব রিলিজিয়ন, দ্বিতীয়টি, রিচুয়ালস অব রিলিজিয়ন, শেষটি, এসেন্স অব রিলিজিয়ন। শেষটির অর্থ ধর্মের সারসত্য যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে ধর্ম সমন্বয়ের সৌধ।
ধর্ম আলোচনায় যুক্তির প্রসঙ্গ অনস্বীকার্য। অনেকেই মনে করেন, ধর্ম ও যুক্তি পরস্পরবিরোধী; আরও মনে করা হয়, একই সঙ্গে ধর্ম ও যুক্তিবাদের চর্চা সম্ভব নয়। এমন ধারণা সঠিক তো নয়ই, বরং অসম্পূর্ণ ও অযৌক্তিক। যারা ধর্ম মানেন, পালন করেন তারা সবাই যুক্তিবিরোধী নন, তারা অনেকেই যুক্তির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করেন না। এ প্রসঙ্গে রামমোহনের নাম স্মরণ করতেই হয়। পরবর্তীকালে আমরা আরো ক’জন মুক্তচিন্তার বাঙালি মুসলমান তরুণের সাক্ষাৎ পাই যাদের অন্তর্লোক ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা ও যুক্তিবাদের আলোয় উদ্ভাসিত ছিল। ১৯২৬ সাল থেকে ঢাকায় যে ‘বুদ্ধি মুক্তি আন্দোলনে’র সূচনা হয়, সেই আন্দোলনের প্রবক্তা, কর্মী, সংগঠকরা কেউ কেউ ধর্ম মানতেন, পালন করতেন; কিন্তু অস্বীকার করতেন না সেই আন্দোলনের মুখপত্র ‘শিখা’র মর্ম শ্লোগান ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। ওই সময়ে যুক্তি ও ধর্মের সমন্বয়ে যারা জীবনাদর্শ গড়েছিলেন তাদের মধ্যে কাজী আনোয়ারুল কাদীর, কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল, মোতাহার হোসেন চৌধুরী, আবদুল কাদির অন্যতম।
এদের উদ্যোগে ১৯ জানুয়ারি, ১৯২৬ ঢাকায় ‘মুসলিম সাহিত্য- সমাজ’ এর প্রতিষ্ঠা বাঙালি মুসলমানের সমাজ বিবর্তনের ইতিহাসে এক অনন্যসাধারণ ঘটনা। এই প্রতিষ্ঠানটি সে সময় যে ভাব আন্দোলনের সূচনা করে, তা বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন নামে পরিচিত। এই আন্দোলনের অভিষ্ঠ লক্ষ্য ছিল বাঙালি মুসলমান সমাজের চিন্তার পরিধি বিস্তৃত করে তাদের জীবনবোধ উন্নততর করা এবং ধর্ম-অধ্যাত্ম চেতনা গভীরতর করা। ‘বুদ্ধির মুক্তি’ মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত লেখকবৃন্দ সেদিন বাঙালি মুসলমান সমাজকে অন্ধ সংস্কার, শাস্ত্রাচার, সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা, গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করার জন্য এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তাদের কর্মপ্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। নজরুল ইসলাম এ আন্দোলনের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন করেছিলেন, যদিও তিনি নিজেই তখনো পর্যন্ত মুসলমান সমাজে সেইভাবে গৃহীত হননি। এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত অনেকের ওপর সেদিন মুসলিম রক্ষণশীলতার খড়গ নেমে আসে। মুসলিম সাহিত্য সমাজের দুই প্রাণপুরুষ আবুল হুসেন ও আব্দুল ওদুদ সাহিত্য সমাজের কাজ বন্ধ রেখে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য হন। তাদের মুখপাত্র শিখা’র দ্যুতিও ক্রমশ ম্লান হয়ে আসে। তারপরও এ কথা স্বীকার করতে হবে, তৎকালীন বাঙালি মুসলমান সমাজকে এ আন্দোলন নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছিল।
শিখা গোষ্ঠীর লেখকরা কেউই নাস্তিক বা ধর্মবিরোধী ছিলেন না, তাদের মনন চর্চা হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনাদর্শ দ্বারা যেমন অনুপ্রাণিত হয়েছে, তেমনি রামমোহন, ডিরোজিও, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, তুরস্কের কামাল আতার্তুক, পারস্যের শেখ সাদি, ফরাসি লেখক ও দার্শনিক রোমা রোঁলাও তাদের ভাবনার দিগন্ত প্রসারিত করেছে। প্রাচ্য-প্রতীচ্যের সুকৃতি ও শুভচেতনাসমূহ সঙ্গে নিয়েই স্ব সমাজ ও ধর্মের মানুষকে আলোকিত করতে চেয়েছেন তারা। তারা ইসলামের বিধি বিধানসমূহ যুক্তিতর্কের কষ্টিপাথরে যাচাই করে গ্রহণ করতে চেয়েছেন। সাহিত্যিক ডা. লুৎফর রহমানের নাম শিখাগোষ্ঠীর পূর্বসূরি হিসেবে উল্লেখ করা যায়। তাঁর সাহিত্যচর্চার মূল উদ্দেশ্য ছিল মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ। তিনি মানুষের মধ্যে অসীম সম্ভাবনার বিভিন্ন লক্ষণ শনাক্ত করেছিলেন। তাই সব মানুষের অন্তর্নিহিত মহৎ সত্তার বিকাশ সাধনের মধ্য দিয়ে তিনি উন্নতর ও মহত্ত্বর সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আমাদের সমাজে যখন ধর্ম নিয়ে প্রবল তর্ক-বিতর্ক চলছে, হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিভেদের রেখাটা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে, তখনো তিনি উদার ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলাম ও তার সারাৎসার ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি মনে করতেন, ‘জ্ঞানের দ্বারা মনকে চাষ না করতে পারলে ধর্ম পালন হয় না।’ (রায়হান। লুৎফর রহমান রচনাবলী, পৃ: ১৮২।) তিনি আরও বলেছেন, ‘জীবনকে নির্মল, সত্যময়, সুন্দর, ঈশ্বরের যোগ্য, প্রেমময় নিষ্পাপ নির্দোষ করে তোলাই সমগ্র মানবজাতির একমাত্র ধর্ম।… এই সাধারণ ধর্মের নাম আমি ইসলাম দিতে চাই। ইসলাম অর্থ শান্তি, মহাশান্তি।’
১৯২৬ সালের সূচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিম-লে জন্ম নেয়া মুসলিম সাহিত্য সমাজ তথা শিখা গোষ্ঠীর লেখক, সাহিত্যিক, সংগঠকরাও ছিলেন সে সময়ের সবচেয়ে প্রাগ্রসর চিন্তার মানুষ। তারা ইসলাম ও তার মর্মবাণীকে যথার্থ ধর্মবোধ ও যুক্তিবাদের রসায়ন দিয়ে যাচাই করে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। এজন্য তাদের মুখপাত্রের নাম শিখা, তাদের মূলমন্ত্র ছিল বুদ্ধির মুক্তি। আর এই মন্ত্র তারা পেয়েছিলেন বহু জায়গা থেকে- কামাল আতাতুর্কের কাছ থেকে, রামমোহন-রবীন্দ্রনাথ-রোমা রোঁলার কাছ থেকে আর হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর কাছ থেকে। এ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ আবুল হুসেন ‘ইসলামের দাবী’ নামক প্রবন্ধে নিঃশঙ্কচিত্তে বলেছিলেন, ‘হযরত মোহাম্মদের নামের পূজা ও তাঁর মাহাত্ম্যের অন্ধ মোহ থেকে নিজেকে মুক্ত করে আমাদের জ্ঞানের রাজপথে এসে সাধনারত হতে হবে এবং সমাজ জীবনে ‘তাখাল্লাকু বি-আখাবিল্লাহ’ (হযরতের বাণী) সার্থক ও সফল করে তুলতে হবে।’ আর আব্দুল ওদুদ তো আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ‘আল্লার গুণাবলীতে বিভূষিত হও, আল্লার গুণাবলীতে বিভূষিত হওয়ার অর্থ অনন্ত সদগুণে ভূষিত হওয়া, কাজেই মানুষের উন্নতির অন্ত নেই- সে হযরতে মোহাম্মদের চাইতেও বড়ো হতে পারে।’ মুসলিম সাহিত্য সমাজের চিন্তাশীল লেখকগণ মহানবী ও ইসলাম ধর্মকে অন্তর দিয়েই মেনেছেন, তবে মানার সময় মুক্তবুদ্ধি দিয়ে বিচার করে মেনেছেন। রামমোহনের প্রিয় কবি ছিলেন পারস্যের শেখ সাদি, তিনি শিখা গোষ্ঠীর লেখকগণেরও প্রিয় কবি। সাদির রচিত দুটি অমর পঙ্ক্তি রামমোহন খুবই পছন্দ করতেন:
‘তরিকত বজুজ খেদমতে খলক নিসত/ বতসবিহ ও সাজ্জাদাও দলকনিসত।’ অর্থাৎ সৃষ্টির সেবা ভিন্ন আর কিছু নেই। তসবিহ জায়নামাজ ও আলখাল্লায় ধর্ম নাই।
শিখা’র অন্যতম প্রাণপুরুষ কাজী আব্দুল ওদুদেরও প্রিয় কবি ছিলেন শেখ সাদি। সাদির কবিতার মর্মকথা ওদুদকেও অনুপ্রাণিত করেছে। মহানবীর প্রশস্তিসূচক নিম্নবর্ণিত পঙ্ক্তিমালা তিনি বারবার আওড়াতেন:
‘বালাগাল উলা বে কামালিহি। কাশাফাদদুজা বে জামালিহি।’ অর্থাৎ উৎকর্ষে তিনি মহৎ ও মহীয়ান। তাঁর সৌন্দর্যে সব অন্ধকার দূর হয়েছে। মুসলমান সমাজকে কুসংস্কারের অন্ধগলি থেকে জ্ঞান ও বুদ্ধি বিভাসিত রাজপথে নিয়ে আসার প্রত্যয়েই শিখা গোষ্ঠীর সকল সাধনা ও কর্মপ্রয়াস পরিচালিত হয়েছে। ইতোপূর্বে বাঙালি মুসলমান সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে অনেকেই কাজ করেছেন, কিন্তু সে সব ছিল কেবলই ব্যক্তি পর্যায়ের, আর শিখা গোষ্ঠীর তৎপরতার মধ্যে ছিল সামষ্টিক ও সমন্বিত উদ্যোগ। সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে স্ব সমাজ ও ধর্মের দায় শোধ করতে চেয়েছিলেন তারা, কিন্তু বাঙালি মুসলমান সমাজকে নব যুগের নবীন আলোয় উদ্ভাসিত করতে গিয়ে তারা ধর্ম সম্পর্কিত তর্কে জড়িয়ে পড়েন।
ইসলাম ধর্ম, আল্লাহ, নামাজ, মহানবী প্রভৃতি সম্পর্কে যে ভ্রান্ত ধারণা সমাজে প্রচলিত ছিল তা থেকে তারা বাঙালি মুসলমানকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তারা মনে করতেন, ইসলাম সার্বজনীন ধর্ম, মুক্তবুদ্ধির ধর্ম, তাই এ ধর্মে কোনো অন্ধত্ব, গোঁড়ামি, সংকীর্ণতা, যুক্তিহীনতা থাকতে পারে না। আর তাই আব্দুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন মহানবী (সা.) কে পথ-প্রদর্শক, মনুষ্যত্বের আধার, ‘একজন উঁচুদরের যুগ প্রবর্তক মহাপুরুষ’, দিব্যকান্তি সুদর্শন পুরুষ হিসেবে মান্য করতে চেয়েছেন। ইসলামের আচার আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলেছেন। আবুল ফজল তো আরবি ভাষায় খোতবা পাঠের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘…আরবে আরবিতে খোতবা পড়া হয়। সেই ধুয়া ধরিয়া আমরাও চলিয়াছি তাহাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া। মনে করি, সুন্নত পালন করিতেছি। আর ভুলিয়া যাই আরবি আরবদের মাতৃভাষা, আরবি তাহারা বুঝে, আমরা তাহা বুঝি না অথচ পুণ্যলাভের দুরাশায় বুঝিবার ভান করিয়া হাহুতাশ করিয়া বুক ভাসাই।’( তরুণ আন্দোলনের গতি, শিখা, তৃতীয় বর্ষ, ১৯২৯। পৃ:১৩৭।)
কাজী মোতাহার হোসেন আরবি ভাষায় নামাজ পড়া ও সংস্কৃতে মন্ত্রপাঠ সম্পর্কে তার নিজ উপলব্ধি ব্যক্ত করেন ‘ধর্ম ও শিক্ষা’ শীর্ষক প্রবন্ধে:
‘সংস্কৃতে স্তোত্র পাঠ করা আর আরবিতে নামাজ পড়াই নিয়ম। যার অর্থবোধ হয় না, যে কথার সহিত প্রাণের যোগ নাই, সেইসব কথায় ভগবানের প্রার্থনা করায় কতটা হৃদয় মনের তৃপ্তি হয়, তা বুঝে ওঠা কঠিন।’ (শিখা, চতুর্থ বর্ষ, ১৩৩৭। পৃ:৪৮।)
সাধারণ মানুষ যাতে কোরআন হৃদয়ঙ্গম করতে পারে, সেজন্য কাজী আবদুল ওদুদ পবিত্র কোরআন বাংলায় অনুবাদ করেন, অনুবাদের ক্ষেত্রেও তিনি স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখেছেন। তারপরও তিনি সারাজীবন আবেগের চেয়ে যুগ ও যুক্তিধর্মের প্রতি ছিলেন প্রবলভাবে আস্থাশীল। ধর্মচর্চাকে তিনি ‘আদর্শের বা শ্রেষ্ঠ চিন্তার আনুগত্য’ বলে মানতেন। তিনি তার ‘হযরত মোহাম্মদ ও ইসলাম’ গ্রন্থে ধর্ম সম্পর্কে বলেন: ‘একালের ধর্ম বলতে জ্ঞান ও মনুষ্যত্ব সাধনাই মুখ্যভাবে বুঝতে হবে-ধর্মের আচার অনুষ্ঠানের দিক তার তুলনায় গৌণ,-জীবনে কোনটি মুখ্য কোনটি গৌণ এই বিচার আমাদের মধ্যে যেন কখনো শিথিল না হয়, বিশেষ করে একালের জটিল জীবনায়োজনের দিনে।’ (হযরত মোহাম্মদ ও ইসলাম, কলিকাতা, ১৩৭৩। পৃ: ৩০৫।) আর কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল, মোতাহার হোসেন চৌধুরীরা ধর্মকে যুগের প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করে গ্রহণ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তারা মনে করতেন, বাঙালি মুসলমান বহুদিন থেকেই যুগধর্ম উপেক্ষা করে সৃষ্টিশীলতার পথ থেকে দূরে সরে গেছে। বাঙালি মুসলমানের ধর্মবোধ ও উপলব্ধি, অধ্যাত্মচেতনা মোতাহার হোসেন চৌধুরীকে বেদনার্ত ও হতাশ করেছে। তার মনে হয়েছে, বাঙালি মুসলমান ধর্মকে যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে গ্রহণ করতে পারে না বলেই সৎ, সুস্থ, সুন্দর ও আনন্দময় জীবনযাপন করতে পারে না। আচারিক ধর্মের ডোবাতে হাবুডুবু খাচ্ছে বলে আমাদের সমাজ ধর্মান্ধ হয়ে উঠেছে, গভীর ধর্মবোধসম্পন্ন হতে পারেনি। অথচ ধর্মবোধ ছাড়া প্রকৃত ধর্মের মর্মমূলে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করেছেন:
‘অনুষ্ঠানের মধ্যে ধর্ম নেই, আছে মর্মের উপলব্ধিতে।… শাস্ত্র পঠনের আবশ্যকতা তার থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করবার জন্যই, তাকে হুবহু নকল করবার জন্য নয়। … শাস্ত্রকে উপেক্ষা করতে বলছিনে, মানুষকে শাস্ত্রের কাজে না লাগিয়ে, শাস্ত্রকে মানুষের কাজে লাগানোর কথা বলছি। অন্তরের অন্তস্থল হতে উৎসারিত প্রেম আর সমস্ত বিশ্ব-ব্যাপী অখ- অদ্বৈতের অনুভূতিই ধর্ম।’

পশ্চাদপদ, দুর্দশাগ্রস্ত মুসলমান সমাজকে সেবা করার প্রত্যয় নিয়েই গত শতকের তৃতীয় দশকের মাঝামাঝিতে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র অভ্যুদয় তথা ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের সূচনা। রবীন্দ্রনাথের ধর্মবোধ তাদের অনেককেই অনুপ্রাণিত করেছে। রবীন্দ্রনাথের মতো তারাও মনে করতেন, ‘যাহা বিশ্বাস্য তাহাই শাস্ত্র, যাহা শাস্ত্র তাহাই বিশ্বাস্য নহে।’ এতে যুক্তির সুরই প্রবলভাবে ধ্বনিত হয়েছে। রামমোহনেরও ধর্মে আস্থা ছিল, কিন্তু কোনোভাবেই যুক্তিবিরোধী ছিলেন না। ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের লেখক ও সংগঠকরা ধর্মকে যুক্তির সাথে মিশিয়ে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কালের বৈরী প্রতিক্রিয়া পদে পদে বাধা সৃষ্টি করে তাদের সব স্বপ্ন সফল হতে দেয়নি। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, গত শতকের ত্রিশ দশক পর্যন্ত বাঙালি মুসলমান তাদের অর্থাৎ শিখা গোষ্ঠীর মুক্ত, স্বচ্ছ, প্রাগ্রসর চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করার মতো উপযোগী,পরিপক্ব হয়ে উঠতে পারেনি। প্রসঙ্গত একটি বিষয় আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে মানবতাবিরোধী তৎপরতা চালানোর জন্য ধর্মব্যবসায়ী ফেরেব্বাজরা যেমন দায়ী, তেমনই তথাকথিত প্রগতিশীল ও কট্টরপন্থী যুক্তিবাদীরাও উগ্রভাবে ধর্মের বিরোধিতা করে ধর্মান্ধতাকে উসকে দিতে কম ভূমিকা রাখেননি। তারাই সাধারণের মাঝে ধর্মকে অধিকতর আকর্ষণীয় ও প্রয়োজনীয় করে তুলেছেন। কিন্তু শিখা গোষ্ঠীর লেখকরা ধর্ম ও যুক্তির মধ্যে সমন্বয় সাধন করে ইসলাম ধর্মের একটি যুক্তিসিদ্ধ ও শাশ্বত রূপ সাধারণের মধ্যে তুলে ধরার চেষ্টা করে গেছেন। ধর্ম ও যুক্তিকে দুই বিপরীত মেরুতে দাঁড় করিয়ে ধর্মযুদ্ধ করতে চাননি তারা। আধুনিক বাঙালি মুসলমানকেও ধর্ম ও যুক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব না বাধিয়ে, বরং উভয়ের মধ্যে সার্থক সংলাপের আয়োজন করেই এগোতে হবে। আর বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও সংলাপের আবশ্যকতা উপেক্ষা করা যাবে না।


ইতিহাস ঘেঁটে, পুঁথি-পাঁচালি-শাস্ত্র- কেতাব পড়ে জানা যায় যে, বাঙালি চিরকাল ধর্ম মেনেছে, ধর্মের প্রাত্যহিক আচার-আচরণও নিষ্ঠার সাথে পালন করেছে, তারপরও জীবনকে তুচ্ছ ভাবেনি কখনো। তর্কপ্রিয়-যুক্তিবাদী বাঙালি জীবন ও অস্তিত্বের জন্য যা করা দরকার বলে মনে করেছে, তাই করতে উদ্যোগী হয়েছে। জীবন ও জীবিকার জন্য সে বিদেশের ধর্ম নিয়েছে, ভাষা নিয়েছে, কিন্তু অন্তরের ধর্ম বাঙালি কোনোকালেই ত্যাগ করেনি। আর তাই ওহাবি-ফরায়েজি আন্দোলনের আগে শরিয়তি ইসলাম সেইভাবে স্বীকৃতি পায়নি বাংলার জল হাওয়ায়। এখানে ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করেছে সত্যপীর, পাঁচপীর, পাঁচগাজী, মানিকপীররা। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মানত শিরনি দিয়েছে সত্যপীরের দরগায়; একেশ্বরবাদী মুসলমানের সত্যপীর হিন্দুর কাছে হয়ে ওঠে সত্য নারায়ণ। তাই নিরন্ন, নিরক্ষর, বিপর্যস্ত, শোষিত হিন্দু-মুসলমান বাঁচার তাগিদে বলছে:
‘হিন্দুর দেবতা তিনি মুসলমানের পীর।/ দুইকুলে সেবা লয় হইয়া জাহির।’
ধর্মের ভেদবুদ্ধি দূর করে সহবত-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠাকল্পে সেই কল্পিত পীর বলছেন:
‘মক্কায় রহিম আমি অযোধ্যায় রাম-/ কলিতে সম্প্রতি আমি সত্য নারায়ণ’।
তার চেহারাতে-অবয়বেও দু’ ধর্মের মিলিত রূপ ফুটে উঠেছে:
‘অর্ধেক মাথায় কালা, একভাগে চূড়াটানা / বনমালা ছিলিমিলি তাতে,/ধবল অর্ধেক কায় অর্ধনীল মেঘপ্রায়,/ কোরান পুরাণ দুই হাতে।’ (রায়মঙ্গল: কৃষ্ণরাম দাস)
সত্যপীর বা নারায়ণ পারত্রিক মুক্তিদানের বা পাপ-পুণ্যের দেবতা নন, তিনি জাগতিক মঙ্গল বিধানের লৌকিক দেবতা। লোকমানসপ্রসূত এই পীরের সাধারণ ভোগ শিরনি। এর অনুসারী-অনুগামী-ভক্তরা সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক হলেও যুক্তিবাদী, জিজ্ঞাসু, দ্রোহী। মধ্যযুগের প্রেক্ষাপটে এর চেয়ে আর কত বেশি জীবনমুখী- প্রগতি চিন্তাই বা মোঘল শাসনের প্রবল-প্রতাপে পিষ্ট বাঙালির কাছে প্রত্যাশা করা যায়?
প-িতরা বলেছেন, বাঙালি ধর্মপ্রবণ, আধ্যাত্মিক ভাবসম্পন্ন; কিন্তু তারা যে চিরবিদ্রোহী, নতুন চিন্তার অভিসারী, তাও অস্বীকার করা যায় না। নতুন ভাবাদর্শ সৃজনের মাধ্যমে বাঙালি নতুন চিন্তার দিগন্ত প্রসারিত করে চলেছে যুগ যুগ ধরে। মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের উচ্চ মিনারে দাঁড়িয়ে আমাদের সুফি, সাধক, কবি, মরমিরা প্রেম-প্রীতি, মানবিক মর্যাদা ও মানবিক সম্ভাবনার বাণী উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করে গেছেন কালে কালে। এর পেছনেও রয়েছে যুক্তি আর সত্যানুরাগ। বাঙালি কবির কণ্ঠে আমরা মধ্যযুগেই শুনেছি সার্বজনীন সত্যের পরম কাম্য বাণী: ‘শুন’হ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ আধুনিক হিউম্যানিজমের ব্যাখ্যা মধ্যযুগের চ-ীদাসের এই ঘোষণার মধ্যে কী নেই? অবশ্যই আছে, কিন্তু যিনি প্রচলিত ধর্ম এবং ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন তিনি হয়তো এই ঘোষণার সাথে একমত হতে পারবেন না। আর ‘উপনিষদকাররা উলটো কথাই ঘোষণা করেছিলেন সকল মর্ত্যলোকবাসী ও দিব্যধামবাসীগণকে সম্বোধন করে-সবার উপরে ব্রহ্ম সত্য, সা কাষ্ঠা,সা পরাগতি। ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিমাত্রর মন এতে সায় দেবে।’( আবু সয়ীদ আইয়ুব: ‘মনের মানুষের সন্ধানে’। পান্থজনের সখা। কলকাতা, এপ্রিল ২০০৬। পৃ:১৩৪) ইউরোপে রেনেসাঁসের যুগে হিউম্যানিস্টরা যে ভাবধারায় আন্দোলিত হন, ওই একই ভাবুকতার চর্চা করেছেন আমাদের মধ্যযুগের কবি ও সাধকরা। ইউরোপের রেনেসাঁস যুগের হিউম্যানিস্ট পেত্রার্কা ও এরাসমুসদের কাছে ঈশ্বরও সত্য, মানুষও সত্য, কিন্তু কে বেশি সত্য তা চিন্তা করবার প্রয়োজন তারা কখনো বোধ করেননি। তারা আসলে মধ্যযুগের চার্চ নিয়ন্ত্রিত আচার অনুষ্ঠানভিত্তিক প্রথাগত ধর্মের বিপরীতে মানব মহিমা ও মর্যাদা তুলে ধরতে চেয়েছিলেন সবার কাছে। ইউরোপের তখনকার হিউম্যানিস্টরা যে অর্থে হিউম্যানিস্ট সেই অর্থে রামমোহন-দেবেন্দ্রনাথ-বিদ্যাসাগর থেকে রবীন্দ্রনাথ এবং চৈতন্যদেব, চ-ীদাস থেকে লালন, হাছন, কুবির গোঁসাই ও অন্যান্য মরমিরাও হিউম্যানিস্ট। তবে রামমোহন- দেবেন্দ্রনাথ- ডিরোজিও- বিদ্যাসাগরদের মানবিক ভাবনা, উন্নত ধর্মচেতনা, ধর্মসমন্বয় চিন্তা কেবল বাংলার উচ্চগর্বী এলিট ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণির মধ্যেই সীমিত ছিল, গ্রামীণ লৌকিক জীবনে তাদের তেমন প্রভাব ছিল না বললেই চলে। তৎকালে বাংলার গ্রামীণ জীবনভাবনা, ধর্মচেতনাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে লালন, কুবির গোঁসাই, মদন বাউল, পাঞ্জু, দুদ্দু শাহদের মতো মরমি সাধক ও বাউলদের ভাবসমৃদ্ধ ও তত্ত্বাশ্রয়ী গানে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই গানের ¯্রষ্টারা অধিকাংশই নিরক্ষর, অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক এবং সামাজিকভাবে দীর্ণ। এদের গানে যেমন তান্ত্রিক সহজিয়া ও বৈষ্ণব সহজিয়া তত্ত্বের ছাপ রয়েছে, তেমনই ইসলামি সুফিতত্ত্বের প্রভাবও কম নেই। এরা কেবল কবি নন; এরা তার্কিক, যুক্তিবাদী ও দার্শনিক। আর মরমি ভাবুকদের কাছে তো এরা কবি বেশে নবি। ধর্মের নানা দিক নিয়ে ব্রাহ্মণ প-িতরা তর্ক করতেন; মুসলমান মৌলভীরা যেমন তর্কযুদ্ধে অবতীর্ণ হতেন, তেমনই এই ভাবুক, রসিকরাও তর্কযুদ্ধে মেতে উঠতেন আখড়া-আশ্রমে, গানের মাহফিলে কিংবা সাধুসঙ্গে। আর তর্ক করতে গিয়ে এক আসরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বাউল সম্রাট লালন বলেছেন:
‘সুন্নত দিলে হয় মুসলমান / নারীর তবে কী হয় বিধান-/ বামুন চিনি পৈতায় প্রমাণ/ বামনী চিনি কীসে রে।’
এই ক্ষুরধার যুক্তি, দর্শনসমৃদ্ধ ভাবনা লালনের মতো এক নিরক্ষর, গেঁয়ো বাউল পেলেন কোথায়? কোন গুরু-গোঁসাই তাকে এসব শেখাল? সম্ভবত এসব কারণে লালনকে একজন উঁচুস্তরের ভাবুক, সাধক ও দার্শনিক বলে গণ্য করেছেন অনেকে। তিনি তার ভাবনাগুলোকে অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সাবলীলভাবে নিজের গানের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। গানের মধ্য দিয়ে লালন কেবল বর্ণপ্রথার সম্পর্কে প্রশ্ন করেননি, তিনি প্রশ্ন করেছেন, হিন্দু-মুসলমানের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কেও। সেই সাথে শাস্ত্র, মূর্তি পূজা, নামাজ, আহ্নিক, মন্দির-মসজিদ, তীর্থ-ব্রত-উপবাস, বৈরাগ্যসাধন বিষয়েও ছিল তার প্রচ- রকমের সন্দেহ ও অবিশ্বাস। লালনের জন্ম মধ্যযুগ ছুঁয়ে যাওয়া ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দ ধরা হলে তাকে রামমোহন- বিদ্যাসাগরদের সমসাময়িক বলা চলে। অথচ এই নিরক্ষর সাধকের সাথে সে সময়ের কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নবজাগৃতির পুরোধাদের কতই না ফারাক! কেননা লালন যে সময়ে হিন্দু-মুসলমানের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতা, সম্প্রীতি ও ধর্মসমন্বয়ের সাধনা করেছেন, সে সময়ে রামমোহন তার সংস্কার আন্দোলন স্বধর্ম তথা হিন্দু একেশ্বরবাদীদের স্বার্থে চালিত করেছেন। আর ওহাবি-ফরায়েজি ও সৈয়দ আহমেদের ‘তরিকা ই মহম্মদীয়’ আন্দোলনের প্রয়াস ছিল কেবল মুসলমান সমাজকে বিশুদ্ধ ইসলামের পথে ফিরিয়ে আনার মধ্যে সীমিত। অর্থাৎ কোনো পক্ষই সেইভাবে হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়কে এক ময়দানে মিলিত করতে চাননি। আর লালন ও লালন-উত্তর লোকায়তবাদী মরমি সাধক, ভাবুকরা নিম্নবর্গের কৃষিজীবী সমাজকে কেবল কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, শাস্ত্রাচারের পথ থেকে নিবৃত্তই করেননি, তাদের মধ্যে মানবপ্রেম, অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিভাবনাও জাগিয়ে তুলেছেন। আসলে আঠারো-উনিশ শতকে বাংলার লোকায়ত সাধক, কবি ও পদকর্তাদের মধ্যে ধর্মসমন্বয়ের বিস্ময়কর উদ্যোগ লক্ষ করা গেছে। ধর্মান্তকরণের প্রবল ঝড়ো হাওয়া আর সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প মাখানো প্রতিবেশে দাঁড়িয়ে কুবির গোঁসাই গেয়েছেন:
‘অগণনায় বর্ণ লেখা / রাধাকৃষ্ণ, যিশুখ্রিস্ট খোদাআল্লা এক।’
আর কুবির শিষ্য যাদুবিন্দু বলেছেন:
‘এ কুল আলম তোমারি ও হে কুদরত বিহারি/তুমি কৃষ্ণ তুমি কালী তুমি দিলওয়ারি/ তুমি এই মুসলমান তুমি এই হিন্দু।’
(সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত বাংলা দেহতত্ত্বের গান।)
গীতিকার জালালুদ্দিন বলেছেন:
‘করিম কিষণ হরি হযরত লীলার ছলে ঘোরে/ ভাবে ডুবে খুঁজে দেখ/ ভেদাভেদ কিছু নাই রে।’
লালনও ধর্মসমন্বয় চেতনায় শাণিত হয়ে উচ্চকণ্ঠে বলেছেন:
‘সে তো ও নিষ্ঠুর কালা/ নাইকো তার বিচ্ছেদজ্বালা।/ আমার চক্ষু বুঁজে জপমালা/ লা-শারিকাল্লা সে কালা।’
এদের গানের ভাবৈশ্বর্য, ধ্বনিমাধুর্য ও যুক্তির বুনোট অনবদ্য। উত্তর ভারতের সন্ত কবিরের মুক্ত উচ্চারণ: ‘জাতিপাতি কুল কাপড়া/ যেহু শোভা দিন চারি’। এর সাথে বাংলার চিরায়ত লোকগানের বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কবিরের মতো লালন, কুবির, যাদুবিন্দু, জালালুদ্দিনের গানে উদার, অসাম্প্রদায়িক সমন্বয়ীভাবনা ফুটে উঠেছে। কিন্তু বাংলার লোকায়ত সাধকদের এই উদার ভেদবুদ্ধিহীন, মানবিক ভাবনা উচ্চবর্গীয় হিন্দু মুসলমান সমাজ মেনে নেয়নি বরং যেখানে হিন্দু মুসলমান সম্প্রীতি ও সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে, সেখানেই তারা রুষ্ট, ক্ষুব্ধ বাক্যবাণ নিক্ষেপ করেছে। তারপরও ধর্ম ও সংস্কৃতি সমন্বয়ের স্রােতটি প্রবল বেগেই বাংলার গ্রাম জনপদে বয়ে চলেছে। গ্রামের সহজ সরল সাধারণ মানুষ আজও ধর্মমানার ক্ষেত্রে শাস্ত্রীয় আচার-আচরণ বড় করে না দেখে, ভাব-ভাবুকতা ও আবেগকে বড় করে দেখে। হয়তো সে আবেগের মধ্যে যুক্তি কিংবা ঐতিহাসিকতা খুঁজে পাওয়া যাবে না। তারপরও তাদের গান-ধ্যান, ভাব-কল্পনা আমাদের অমূল্য জাতিসম্পদ। এদের কাছে কেতাবের ধর্মের চেয়ে স্ব নির্মিত মানবধর্মই বড় ধর্ম। বাংলার লোকসমাজের কাছে নাস্তিকতা বা ধর্মবিরোধিতা প্রাধান্য পায়নি, প্রাধান্য পেয়েছে মানবিক অধ্যাত্মবাদ। মওলানা-মৌলভী-পুরোহিতদের চেয়ে এরা মান্য করেছে পীর-মুরশিদ, গুরু-গোঁসাইদের- যাঁরা শাস্ত্রের ধর্মের চেয়ে আত্মা ও অন্তরের ধর্মকে বড় করে দেখেছেন; তাদের কণ্ঠ থেকে উৎসারিত হয়েছে মানুষ ও মানবতার গান। এরাই একদিন সত্যনারায়ণের সাথে সত্যপীরকে একাসনে বসিয়ে অর্ঘ্য দিয়েছে, শিরনি মানত করেছে, যেখানে হিন্দু-মুসলমান ভক্তের ভেদাভেদ মধ্যে ছিল না। রাজনৈতিক ভাঙাগড়া, ধর্মের নামে বাড়াবাড়ির মধ্যেও আজও নিরক্ষর, গ্রাম্য গায়কের হৃদয় ছোঁয়া গানে অখ- মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা, সমন্বয়বাদী দর্শনের মর্মকথা শুনতে পাওয়া যায়:
‘মরুতে এলেন মোহাম্মদ/মথুরাতে গেলেন শ্যাম-/ ইমাম খেলেন রসুল/ লীলা খেলেন ঘনশ্যাম,/ মা আয়েশা পাগল হলেন/ নবির প্রেমে মদিনায়/ বাঁশির সুরে পাগল হয়ে/ রাধা চলে যমুনায়/ একই মায়ের দুটি সন্তান/ হিন্দু আর মুসলমান/ একই কুলে জন্ম মোদের/ একই বুকে দুগ্ধপান।/ দেখে আয় ভাই হিন্দু মুসলিম/ মদিনা আর মথুরায়/ দুই রাখালে যুক্তি ক’রে/ গরু আর বকরি চরায়।’ (সুধীর চক্রবর্তী: ‘ব্রাত্য লোকায়ত লালন’। রচনা সমগ্র। কলকাতা বইমেলা ২০১০, পৃ: ৩৩০।)
এমন স্বচ্ছ, সহজ গান আমাদের আত্মাকে তৃপ্ত তো করেই, সেই সাথে এই গানে আমরা খুঁজি বাঙালিত্বকে মহিমান্বিত করার বরাভয় মন্ত্র। মনের গহিনে প্রশ্ন জাগে: এই কনসেপ্ট তারা কোথা থেকে পেলেন? বাংলার প্রকৃতির বিপুল ঐশ্বর্যই কি তাদের এই উদার মানবিক ভাবনার রস ও রসদ জুগিয়েছে? না কি তাদের জিজ্ঞাসু মন? হয়তো তাই। আর এ কারণে বোধ হয় পহেলা বৈশাখ, বর্ষাবরণ, নবান্ন উৎসব, পৌষপার্বণ, বসন্ত উৎসব ইত্যাদি ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলি বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমান জোরেশোরেই উদযাপন করছে। মৌলভী-মওলানারা এগুলোকে হিন্দুয়ানি কৃত্য বলে যতই ফতোয়া দিক না কেন, তাতে জনজীবনে তেমন প্রভাব পড়ছে না। আসলে মানুষকে প্রকৃতিলগ্ন হয়ে বেঁচে থাকতে হয় এবং প্রকৃতিময়তার মধ্যে তাকে পালন করতে হয় ধর্মের নানাসব কৃত্যাচার। বাঙালিকেও প্রকৃতির রূপ-অরূপের লীলার মধ্যে বাঁচতে হয়েছে, ধর্ম পালন করতে হয়েছে। নবান্ন বাঙালি মুসলমানের কাছে কেবলই একটি লোকজ উৎসব, কোনো ধর্মীয় কৃত্য নয়। ঘট-লক্ষ্মী মুসলমানকে ছোঁয় না, কিন্তু ধান-লক্ষ্মী তাকে ছোঁয়। হেমন্তের একগুচ্ছ পাকা ধানের শীষ তার কাছে অর্ঘ্য দাবি করে, কারণ ভাত খেয়ে সে বেঁচে থাকে। জীবন ও অস্তিত্বের জন্যই বাঙালিকে হতে হয়েছে ধর্মসহিষ্ণু, মানবিক ও সমন্বয়বাদী। জীবন যেখানে মেলাতে চায় কিংবা মিলিয়ে রেখেছে, সেখানে ধর্মকে তো সহিষ্ণু হতেই হবে। তার্কিক, যুক্তিবাদী-ধর্মনিষ্ঠ বাঙালি মৃত্যু নয়, জীবনকেই সত্য বলে জানে এবং মানে। সে মনে করে, এ ভূলোক মধুময়; মধুময় পৃথিবীর ধূলি। জীবনকে আনন্দময়, মধুময় ও তাৎপর্যম-িত করতেই তার সকল সাধনা, সকল প্রয়াস। জীবনকে পত্র-পুষ্পে পুষ্পিত করতেই বাঙালির উদার, অসাম্প্রদায়িক, সমন্বয়বাদী ও তার্কিক হয়ে ওঠা।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত