আজকের পাঠক অথবা পাঠক সমীপে

.
‘এক বইয়ের পাঠক’ বা ‘এক লেখকের পাঠক’ এই দুই শ্রেণি আগে-পড়ে ছিল এদেশে, তবে খুবই ভয়ের কথা এবং চিন্তার কথা এই দুই শ্রেণির বিস্তার হু হু করে বেড়ে চলেছে! এই পাঠকদ্বয় নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বপ্ন দেখি না।
পাঠক তাকে মনে করি- যে তার মনের ক্ষুধা মেটাতে নিয়মিত বই কেনে, বই পড়ে; এই কর্মে যে কোনো অজুহাত দেয় না, কোনো অভাব তাকে আটকাতে পারে না। সে ছুটে যায় বইয়ের দোকানে, গিয়ে চোখের পলক না-ফেলে প্রতিটি বইযের নাম পড়ার চেষ্টা করে, তারপর দোকানদারকে বলে, ওইটা, হ্যাঁ, ওইটা একটু দিন না! তারপর নতুন কিছুর খোঁজে ডুব দেয়। মুক্তো-মানিক খুঁজে পেলে বই বগলে নিয়ে বাড়ি ফেরে। সব ভুলে নতুন কেনা বইটি পড়ে ফেলে।
বিখ্যাতদের পালা শেষ করে সে হতাশ হয়ে পড়ে, সবাইকে তো মোটামুটি পড়ে ফেললাম, আর কি পড়বো? এবার তবে অজানা, অচেনা, নতুন লেখকদের খোঁজে নামি। সার্চ দিলেই সব সামনে চলে আসে, লেখকের অভাব নেই। এদেশে অনেক কিছুর অভাব থাকলেও লেখকের অভাব নেই। অভাব নেই নতুন নতুন বইয়ের। যে সত্যিকারের পাঠক সে ভালো লেখক, ভালো লেখা ঠিক-ই খুঁজে বার করতে পারে। আসল পাঠক কখনো অন্যের মুখে ঝাল খায় না। সে অটোগ্রাফ, ফটোগ্রাফ আর সেলফির জন্য বছরে একটা বই কেনে না। শুধুমাত্র তারকা, বর্তমানে বাজারে কার কাটতি বেশি তার বই খোঁজে না।

আজ সেসব পাঠকের জন্যে আবারও আমার অন্যতম প্রিয় লেখক মঈনুল আহসান সাবের – এর কয়েকটি বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। আমার পড়া বইগুলোর সংক্ষিপ্ত রিভিউ অর্থাৎ পাঠ-প্রতিক্রিয়া ফেসবুকে দিয়েছিলাম, তার কয়েকটি এখানে তুলে দিচ্ছি:
.
“মঈনুল আহসান সাবেরের প্রথম গল্প ‘মোহিনী তমসা’, গল্পটিকে লেখকের সেরা একটি গল্প বলে মনে করি”
.
মঈনুল আহসান সাবের এর প্রথম গল্প (প্রথম ছাপা হওয়া গল্প) ‘মোহিনী তমসা’। ছাপা হয় সে সময়ের প্রভাবশালী পত্রিকা সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। ২৮ জুন, ১৯৭৪। তখন লেখকের কলেজ জীবনের মাত্র শুরু। এখানে লেখক আমাদের জানান, এ গল্পটি বিষয়গত দিক দিয়ে একদমই নতুন, তবে ভাষা বর্ণনা খুবই দুর্বল। এ গল্পটি আমার কোনো বইয়ে নেই। ভাষা ও উপস্থাপনার দিক দিয়ে খুব দুর্বল বলে নেই, তা নয়। কেন নেই, আমি নিজেও জানি না। তবে গল্পগ্রন্থ-১ খন্ডে গল্পটি পাঠক এখন পাচ্ছে। আমার গল্প যারা পড়েন বা পড়বেন, আমার প্রথম গল্পটি কতটা সাদামাটা, অবিন্যস্ত পোশাক পড়েছিল, তা তাদের জানাতে আমি ইচ্ছুক।
হুম, লেখক, আমরাও সে কথা এখন আপনাকে জানাতে তৈরি। ‘মোহিনী তমসা’য় লেখক অস্থিরতার কথা লিখেছেন, বদলে যাওয়ার কথা, এর সঙ্গে অনিশ্চয়তাও দ্রুত গ্রাস করেছে চারপাশ, এই পটভূমিতে লেখা গল্প।
‘মোহিনী তমসা’র শুরু অর্থাৎ প্রথম লাইনটা এমন : পশ্চিম আকাশের মেঘ লাল।
কলেজ পড়ুয়া একজন লেখক তার প্রথম গল্পের লাইনটা এমন পাকা হাতের মতো করে লিখল- পশ্চিম আকাশের মেঘ লাল।
আমি বলবো, এই লাইনটাই জানান দেয়, সে লেখক হয়েই জন্মেছিল, বলেই এ লাইনটি লিখতে পেরেছিল। আমি এ যাবত যত নতুন লিখিয়েদের লেখা হাতে পেয়েছি (কিছূ পেয়েছি পত্রিকা, ম্যাগাজিনের ছেপে দেওয়ার জন্য, কিছু পেয়েছি ছাপা হওয়া লেখা পড়ে দেখার জন্য), তাদের অনেকের লেখার শুরুর লাইনটা এমন সুন্দর, স্বয়ংসম্পূর্ন নয়। মনে লাগার বা ধরার মতো নয়। কিন্তু লেখক মঈনুল আহসান সাবের যখন লেখালেখির ৩৮ বছর পেরিয়ে এসেও তার প্রথম গল্পটা নিয়ে অকপটে বলেন, যে, ভাষা, বর্ণনা খুব দুর্বল। তখন আমার মত সাধারণ পাঠককেও একটু নড়েচড়ে বসতে হয়। এটা লেখকের বিনয়, নিশ্চয়ই।
‘মোহিনী তমসা’র শুরু লাইনটির পরের কয়েকটা লাইন নতুন পাঠকদের জন্যে এখানে তুলে দিচ্ছি :
… সেই লাল আভা উত্তর আর দক্ষিণের আকাশও রাঙিয়ে দিয়েছে। বাড়িতে কেউ নেই। আশফাক বাদে। আশফাক ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক কী করছে সে, তা বোঝা যাচ্ছে না।
গল্পে আশফাক ছাদের উপর থেকে লোকদের মাথায় ইট ছুড়ে মারে। মানুষের মাথা ফেটে চৌচির হয়, তার দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু এ কাজটাও তার কাছে পুরনো ঠেকে। আশফাক ও তার তিন বন্ধুও এই মুহূর্তে যা করে একটু পরই তাদের কাছে পুরনো হয়ে যায়। নারীর নগ্ন দেহও তাদের কাছে পুরনো হয়ে গেছে। বন্ধুদের একজন নোমান। তার কাছে বন্ধুদের বিষণ্নতা ভালো লাগছিল না। সে সবাইকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ে, নতুন কিছু করার জন্য। ওরা চারজন নোমানের গাড়িতে চেপে বসে। নতুনত্ব খুঁজতে গিয়ে ওরা চারজনই এই পৃথিবীতে পুরনো হয়ে গেছে মনে করে। পুরনো ছাড়া তারা আর কিছুই পাচ্ছে না। তবে উপায়? তারা একসঙ্গে বলে, শেষ একটা উপায় হলো- মৃত্যু। কারণ মৃত্যুটাই তাদের কাছে নতুন। এটার অভিজ্ঞতা এখনো তাদের হয়নি। ওরা চারজন (আশফাক, নোমান, লুনা, বর্না) চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
মঈনুল আহসান সাবের এর অনেক গল্পই আমার পড়া হয়েছে। মোহিনী তমসা গল্পটি যেমন লেখকের প্রথম লেখা গল্প। তেমনি পাঠক হিসেবে আমার কাছে মোহিনী তমসাকে লেখকের সেরা দশ গল্পের প্রথম গল্প বলে মনে করি। কারণ গল্পটা অন্যরকম। আগে কখনো এমন আঙ্গিকের গল্প আমি পড়িনি। ছোট একটা গল্প, অথচ এর ব্যাপ্তি বিশাল। গল্পটা একটা অস্থির সময়কালের ওপর লেখা হলেও আজ এত বছর পেরিয়ে এসেও মোহিনী তমসাকে আজকের দিনের গল্পই মনে হয়। বড় অদ্ভুত ভালো লাগে আমার।
গল্পটির ভাষা ও বর্ণনা কোথায় দুর্বল। আমার চোখে পড়েনি। প্রথমবার গল্পটি একবারে পড়েছি। এরপর খুঁত ধরতে (মাতব্বরি করার নিমিত্তে) কলম হাতে নিয়েছি, গল্পে কাটাকুটি করতে (যেহেতু লেখক বলেছেন, ভাষা, বর্ণনা দুর্বল); কোনো শব্দ বা বাক্য কেটে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেও পারিনি। কোথাও মনে হয়নি এখানটায় বাহুল্য, আরোপিত, বা না-লিখলেও পারত!
এখন একবাক্যে বলি, লেখক তার সেরা গল্পটা লিখে ফেলেছেন প্রথম দিনেই। এখন লেখকের চেষ্টা করতে হবে নিজেকে ছাপিয়ে গিয়ে আরো অনেক অনেক সেরা গল্প লিখে চলা। আমি ঠিকঠাক সাহিত্যমান নিয়ে সমালোচনা-অালোচনা করতে পারলাম না, কারণ, আমার মতো পাঠকের দৌড় হলো-মুগ্ধতাটুকু প্রকাশ করা, এর বাইরে সাধ্য নেই। এটা নিশ্চয় সাহিত্যবোদ্ধাগণ বুঝবেন।
আর পাঠকদের সমীপে আমার বলা, পাঠক মঈনুল আহসান সাবের এর প্রথম গল্প ‘মোহিনী তমসা’ পড়ুন। যদি এখনো না-পড়ে থাকেন। বাংলা সাহিত্যের শক্তিশালী একজন লেখককে নতুন করে চিনুন। জানুন। শেষে আপনিও এ লেখকের লেখার প্রেমে নতুন করে পড়বেন। #
.
গল্পসমগ্র-১
মঈনুল আহসান সাবের
অনিন্দ্য প্রকাশ
ফোন : ০১৭১৮-০৮২৫৪৫
.

[ বাবর আজমের উপন্যাস | মঈনুল আহসান সাবের ]

বাবর আজমের উপন্যাসের কেন্দ্রিক চরিত্র বাবর আজম নিজে একজন লেখক। একটি পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক তাকে ঈদ সংখ্যার জন্য উপন্যাস লিখতে বললে সে এই সুযোগটা গ্রহণ করে। এরপর তার জীবনে ঘটতে থাকে একের পর এক বিস্ময়কর ঘটনা। এরই এক পর্যায়ে গুলিবিদ্ধ বাবর আজম রহস্য উন্মোচনে যুক্ত হয়ে পড়েন। তার চোখের সামনে উন্মোচিত হতে থাকে ভিন্ন এক জগৎ।
.
গল্পের সব কিছু ফাঁস করে দিব? সেটা কি ঠিক হবে? বাবর আজম কি শেষপর্যন্ত তার উপন্যাসটা লিখতে পেরেছিল? উপন্যাসের প্লট কী ছিল? কী ঘটেছিল লেখক বাবর আজমের ভাগ্যে?
পাঠকের কথা কিছু বলতে চাই না, যারা নিজেদের লেখক হিসেবে প্রচার করেন, লেখক মনে করেন, কেবলমাত্র তারা বইটি (উপন্যাস) কিনতে পারেন, পড়তে পারেন। কেননা গল্প বলায় নিত্য-নতুন আঙ্গিক মঈনুল আহসান সাবের লেখায় পাই। নতুন এ উপন্যাসটি পাঞ্জেরী প্রকাশনের স্টলে পাবেন। বইয়ের ছাপা, কাগজ, বাঁধাই চমৎকার।
.
মানুষের চেয়ে ভূতও কম শক্তিশালী নয়, তাই না, দন?
.
প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৮
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
পৃষ্ঠা : ১৪৪
মূল্য : ২৭০ টাকা
ফোন : ৯৩৩৫৮২৬


.
[“সব গল্প তার মতো শেষ হয় না” | মঈনুল আহসান সাবের ]

লেখক সুমন ও তার স্ত্রী সোমার ঝগড়ায় মজে ছিলাম, চাইছিলাম-ওদের ঝগড়া যেন না থামে, চলতে থাকুক।
ঝগড়া থামল। সোমা তার খালাতো বোন মিতুর বিয়েতে যাবে। সুমন যাবে না, বাড়িতে থাকবে, নতুন একটা লেখা শুরু করবে সে। সোমার টেনশন হচ্ছে সুমনকে বাসায় একা রেখে যেতে, এমনিতে লেখক মানুষ, কত মেয়ে ভক্ত আছে, ফাঁকা বাসায় কখন কোন মেয়ে হুট করে চলে আসে তার বিশ্বাস কী!
বাসায় সুমন একা। কেমন একটা ভয় ভয় লাগছে তার। সুমনের কথা কী বলবো আমার নিজেরও শরীরে কেমন একটা ভয় ভয় লাগছিলো পড়ার সময়। সুমন ভয়কে পাশ কাটিয়ে তার নতুন উপন্যাসটা লেখা শুরু করল। তিন্নি আর জুবায়েরকে নিয়ে গল্প। কিছুদূর লেখার পড়ে সুমন রান্নাঘরে কারোর উপস্থিতি টের পায়, এ অবস্থায় যে কেউ ভয় পাবে। ভয়কে সত্যি করে দিয়ে একটা মেয়ে সুমনের সামনে এসে দাঁড়াল, বলল, কফি নিন।
সুমন জানতে চায়, কে আপনি?
মেয়েটি বলল, আমি তিন্নি। আপনি এখন যাকে নিয়ে লিখছেন, সেই তিন্নি।
লেখক সুমন বিশ্বাস করে না, বিশ্বাস করি না পাঠক আমিও।
তবে বিশ্বাস না করলেও কিছু করার নেই, সত্যি সত্যি তিন্নি মেয়েটা লেখক সুমনের কাছে এভাবে আসতে লাগল, লেখককে কে বলেকয়ে দেয়, আমাকে নিয়ে এভাবে নয়, ওভাবে লিখুন…
পাঠক হিসেবে আমিও তিন্নির মতো চেয়েছি-তিন্নি যেন জুবায়েরের সঙ্গে রিকশায় না ওঠে, আবার উঠলেও যেন জুবায়ের তার ইচ্ছাটা পূরণ করতে না পারে…
চাইলেই কী মানুষের সব চাওয়া পূরণ হয়?
তবে বইটির শেষ পাতার শেষ অংশে গিয়ে পাঠককে চমকে যেতে হয়।
পড়া শেষ করে আমার মনে হলো, ইশ্ যদি আমি শেষ পাতাটা কোন কারণে ফেলে রেখে উঠে যেতাম। তাহলেও মন্দ হতো না…!
………..
সাফাইঃ আমি সমালোচকদের ফর্মূলায় সমালোচনার যোগ্যতা রাখি না, অবশ্য সে ইচ্ছাও নেই।
বই পড়ে আমার ভালো লাগছে না খারাপ লাগছে তাই শুধু বলতে পারি।

উপন্যাস : “সব গল্প তার মতো শেষ হয় না”
বইটির গায়ের দাম ১০০ টাকা। যদি আপনি কিনতে আগ্রহী হন তাহলে ৭৫ টাকায় কিনতে পারবেন, আবার যদি বলেন, আরেকটু কম রাখা যায় না?
আপনাকে হতাশ হতে হবে না, আরেকটু কম রাখবে বলে জানি।
বইটি পেতে ফোন করুনঃ 7121578.

.

[ “বৃত্ত” | মঈনুল আহসান সাবের ]
.
আমার দেশের গল্প, আমাদের বাংলা সাহিত্যের একটা ছোট গল্পের নাম-‌’বৃত্ত’। গল্পটি অ-নে-ক বার আমার পড়া, তবুও কয়েকদিন পর পরই পড়ি। প্রতিবারই প্রথম পড়ার অনুভূতি হয়। অদ্ভুত! গল্পটি কেন পড়ি, তা গুছিয়ে বলার মতো শক্তি প্রকৃতি আমাকে দেয়নি। তবে যতবার পড়ি ততোবারই মুগ্ধ হই। বেশকিছু সময় মুগ্ধতা আমাকে ঘিরে রাখে। মুগ্ধতা নিয়ে আমি বাসা থেকে বের হয়ে সোজা গন্তব্যহীন হাটতে থাকি। আশংকা পাছে মু্গ্ধতা আমার কন্যার মায়ের চোখে পড়ে। কারণ সব মুগ্ধতার ছবি সবসময় দেখাতে নেই। তবে গল্পটির লেখকের সাথে নয়, গল্পের নায়ক আলমের সাথে এই মুগ্ধতা নিয়ে আলাপ করতে চাই।
বাংলা ভাষার অন্যতস সেরা গল্প “বৃত্ত”।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত