পাঠ পরিক্রমায়- “নক্ষত্রে ঠাঁই নিবো”

 

যেকোন বইয়ের ক্ষেত্রেই পড়া শুরু করার আগেই এর সুন্দর প্রচ্ছদ, ফ্ল্যাপের কথা, কবি পরিচিতি, ভেতরে লেখা উৎসর্গের কথা, ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়গুলো আমার মনযোগ কেড়ে নেয়। বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়েই দেখি আমি সব। এ বইটিতেও চমৎকার প্রচ্ছদ করেছে, এই সময়ের প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে পরিচিত মুখ নবী হোসাইন, উনার করা চমৎকার সব প্রচ্ছদের এটিও আরো একটি অনন্য সংযোজন।বইটির কবি পরিচিতি অংশের মাঝের অংশে হৃদয় বিমোহিত হলো। কি চমৎকার কথাগুলো! তিনি লিখেছেন-

“মলাটবদ্ধ একটি বইয়ে থাকুক আমার কথাগুলো। কারো বুকশেলফে, কারো টেবিলে, কারো মাথার বালিশের পাশে, কারো বৃষ্টি দিনে, কারো বা প্রেমে, কারো বিরহে, কারো আড্ডাতে অথবা বাদামের খোসাতে, সেই দিনগুলোতে যখন আমি থাকবো না। আমি আমাকে লিখি। দু একটা লাইন যদি কারো ছুঁয়ে যায় আমি বসত গড়ি সেই হৃদয়ে।‍”

কথাগুলো মনে দোলা দিয়ে যায় সত্যি। তখন প্রবল ইচ্ছে করে বইটায় কী কী কবিতা লিখেছেন কবি, সেদিক পানে চাইতে। সূচী ঘেঁটে নামগুলো পড়তে পড়তে মুগ্ধতায় মন জড়ায়। আসলে কবিতা আমার কাছে এমনই, এমনই নেশায় জড়িয়ে নেয়ার মতন এক সুন্দর সন্ধ্যা, কবিতা পাঠে যেন মনের সেতারে বাজে নিজেরই কোন সুখ, সাচ্ছন্দ, চেনা, অচেনা অনেক অনুভূতিগুলো। এভাবেই কবি লিখে যান-

‘আঙুল শুধু ছোঁয় না আঙ্গুল

ছোঁয় যে হৃদয় বুঝবে কবে?

তোমার হাতের আঙ্গুল গুলো খুব যে প্রিয়

খুব যে আপন, বুঝবে কবে?’

এখানে প্রেমিক মনে তার প্রিয়তমার স্পর্শের গভীরতা ও তার রূপ ফুঁটে উঠেছে।

এর পরের কবিতার শিরোনাম ‘বাবা’। নিজের স্বপ্নকে ছোঁয়ার আগেই যারা বাবাকে হারিয়ে ফেলেছি, তাদের জন্যেই এ কবিতাখানি। পাঠের পরে এর অনুভূতিতে দ্রবীভূত হয় মন।

এরপর তিনি লিখেছেন, ‘সংঙ্গী যদি বিশ্বস্ত না হয়’ নামক কবিতা। কবিতায় খুবই রুঢ় বাস্তব ও কষ্টের প্রতিফলন।

“সংগী যদি বিশ্বস্ত না হয়,

তবে তাকে নিয়ে যেও না যুদ্ধ কিংবা শিকারে, পাহাড়ে

কিংবা সমুদ্র, কুয়াশার রাতে খোলা ছাদে…”

বিশ্বস্ত না হলে সংগী যে বিপদে ফেলে দেবে এই উপদেশ যেন লাইনগুলোতে। পরের লাইনগুলোতেই চলে এসেছে মূল কথা-

“শরতের কাশফুল, বিকেল তার জন্য নয়, যে বিশ্বস্ত নয়।

সন্ধ্যার চায়ের কাপে চুমুক দিও না

এমন কাউকে নিয়ে যে বিশ্বস্ত নয়’।

সংগী যদি বিশ্বস্ত না হয়, নিজেকে অভিসম্পাত করো না

বিশ্বাস করাটা বোকামি কিংবা পাপ নয়।

সংগী যদি বিশ্বস্ত না হয়, চুপ থাকো আর ক্ষমা করে দাও তাকে

কেননা, ক্ষমা অনেক বড় শাস্তি।‍”

 

কবিতার মাধ্যমে কবির আহ্বান তাদের প্রতি, যারা দুঃখ পায়, তারা যেন ভেঙে না পড়ে। ক্ষমার মাধ্যমে মনের কষ্টের নিরাময় করতে পারে যেকোন প্রেমিক মন, যে বিশ্বস্ত প্রেমিক মনের দেখা পেলো না, অথবা ঠকে গিয়েছে। কারণ যাকে ক্ষমা করা হয়েছে তার ও কি কখনো অনুশোচনা আসবে না? তবে ক্ষমা যে করতে পারে সে কি সত্যিই চায় অন্যের মনে সমান কষ্টের তীরের খোঁচা দিতে?

এভাবেই উঠে এসেছে আরেকটি কবিতা-‘তোর জন্যে কাব্য’ কবিতার লাইনগুলি এররকম-

‘বৃষ্টি দিনে মিষ্টি মধুর তোর কথাতে

ভাসবে হৃদয়, হাসবো আমি

কান্নাগুলো তোর কথাতে

বৃষ্টি হয়ে মিশবে গিয়ে কালের স্রোতে।

অনাদরের শেষ হবে দিন তোর কথাতে।

তোর সাথে মোর কথা ছিলো

কথা ছিলো হৃদয় চাপা, কান্না ভেজা।‘

 

মনে হলো এ যেন আমারই প্রিয় ‘তোর জন্য’ লেখা হয়েছে। কবি যে বলেছেন, তার লেখা কবিতা কারো হৃদয়ে নেবে জায়গা, কারো অস্ফুট অভিব্যক্তিকে পূরণ করে দেয়, সে ঠিকই। পাঠকের কেউ না হয়েও সে বলে দেয় পাঠকেরই মনের কথাগুলো কবিতার ভাষায়।

এরপরে একে-একে পড়া হয়, নির্বাসিত মন, নক্ষত্রে ঠাঁই নিবো, ব্যর্থতা, অতিথি, ধুসর জীবন, জল ছুঁই, বিভ্রম, প্রকৃতি বন্দনা, গার্হস্থ্য জীবন, পাগলামি, অপেক্ষা, আজন্ম একা… নামের অনেক অনেক গুলো কবিতা। সবগুলোই কম বেশি মুগ্ধতা ছড়ায়, আবেগে দোলা দিয়ে যায়, অনুভূতির গভীরে পৌঁছে যায়।

 

এর পরের কবিতাটি, যেটি শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে দেয় আপাদমস্তক। পড়তে গিয়ে খানিকটা কান ও গালে লালের অনুভূতি ছড়ায়ও না কি? হ্যাঁ সত্যিই! বলছি, ‘চুমু’ শিরোনামের কবিতাটিকে নিয়ে!

“আসো চুমু খাই গাল ছুঁয়ে কানের দুলে,

আসো চুমু খাই আঙ্গুল ছুঁয়ে তোমার রংগিন চুড়িতে,

দক্ষিণা বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে চুমু খাই তোমার খোলা চুলে,

আসো ততবার চুমু খাই যতবার তুমি কেঁপে ওঠো!”

সত্যিই ‘চুমু’ এক অন্যরকম শিহরণের নাম! হোক তা কল্পনায় অথবা হোক সে বাস্তব অনুভূতিতেই এ বিষয়টা কবি বেশ ভালোভাবেই এখানে তুলে ধরতে পেরেছেন।

এরপরেও রয়েছে অনেক অনেক গুলো কবিতা। কখনোই একা হই না, সমুদ্র স্নান, আমি ভালো থাকি, দায়, কোথাও ভাগ বসাতে আসিনি, ছাঁচ , বন্ধ, উৎসব, সুখ, অলীক স্বপ্ন, কবিতার অপেক্ষা, অসমাপ্ত গল্প, মাগফেরাত, ত্রিশের পর, বোধ, অভিশপ্ত বুলেট, না হোক কবিতা আমি আমাকে লিখি ইত্যাদি কবিতাগুলো।

বইটিতে শুধু নেই প্রেমের কথা। শুধু নেই প্রেমিক প্রেমিকার ভালোবাসায় দ্রবণের ছন্দ। কবি লিখেছেন, মন নিয়ে; লিখেছেন প্রিয় ব্যক্তিত্ব বাবা কে নিয়ে; বিশ্বাস, অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব নিয়ে; প্রকৃতির রূপ রস নিয়ে; দেশ-মানুষ-আশা-আকাংখা-শ্রদ্ধা-দর্শন নিয়ে লিখেছেন বেশ অনেক গুলো কবিতা। খুব সহজ ভাবেই যেন বলে ওঠে আমাদেরই ব্যক্ত্বি মনের কথা। ২০১৭ বইমেলার পরে এবারের বইটা তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। আশা করছি তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের মতন দ্বিতীয়টিও পাঠক হৃদয়ে জায়গা করে নিয়ে প্রসার হবে খুব। কবির সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে শেষ করতে গিয়ে একইভাবে বলে উঠি এইবার,

“আমি চললাম আগামির দিকে

একদিন পায়ের নিচে নক্ষত্র রেখে হেঁটে বেড়াবো,

সেদিন না হয় হিসাব করো।‍”

 

 

 

 

নক্ষত্রে ঠাঁই নিবো

সৈয়দ মাজারুল ইসলাম রুবেল

প্রকাশনীঃ এক রঙ্গা এক ঘুড়ি

প্রচ্ছদঃ নবী হোসাইন

প্রকাশকালঃ অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯,

মূল্যঃ ২০০ টাকা

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত