কবিতাগুচ্ছ

রিমঝিম আহমেদ। জন্ম ৮ জুলাই ১৯৮৫, রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম। আজ তার জন্মতিথিতে ইরাবতী পরিবার কবিকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


মানুষ, মাটিহীন

তোমাকে ডাকি না আমি, তোমার ভেতর থেকে শুধু
আমাকেই ডাকি, আয়! এই পাকচক্রে গলে হার
না দেখার অজুহাতে। সভ্যতার চারপাশে ধস
আমাদের পথ বাকি নেই আর, ফিরে তাকাবার

তোমার ভেতরে কবে আমাকেই গুঁজে দিয়ে আসি!
শূন্যতম বিন্দু থেকে রেখা টেনে কার কাছে যাই!
শিশুদের শব এই পথে পথে ছড়ানো রয়েছে
তাদের মাড়িয়ে যাই, ডিঙোবার সাহস তো নাই

ধর্মের শেকড় বাড়ে চুরি গেল সব এবাদত
দেশ নেই, রাষ্ট্র নেই, জলে-জলে বেহুলা-ভাসান
বারোমাস ভিক্ষা করে একফালি মাটির আস্বাদ
মানুষ বেড়ায় খুঁজে, চাঁদের আলোও আজ ম্লান
আমাকেই খুঁজি আজ তোমার ভেতর থেকে আমি
ভেবে নিয়ে পূত গঙ্গা অতল সমুদ্রে রোজ নামি।

কেউ একজন

ভাবছি এ অন্ধকার নয়, কুয়াশা
মশারি-টাঙানো ঘরে ইন্দ্রজাল মেলে আছে
স্বপ্ন নয়, মেঘের ভেতর শুয়ে আছি
নীলাভ্র বিছানাময় সাপ খেলা করে
রানি আর রাজা সাপ, তাদের মণিতে
চড়ুইপাখির ছায়া, অদূরে স্বর্গের নদী
কুয়াশার অন্তরালে কেউ একজন
দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার একচোখে আমার পিতার লাশ
অন্য চোখে প্রণয়ের হাতছানি!

তপ্তশ্বাস

আমার নিশ্বাসে তুমি উড়ে যাচ্ছ, গাংচিল
আগামী বসন্তে এসো, রক্ত ও পায়েসে অন্নপ্রাশন হবেই

মিঠেপানি নদী ছেড়ে
বরফগলা সমুদ্র ছেড়ে
পাথরের পাহাড়ের দিকে
যেখানে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন মানুষ
খুলি ও হাড়ের বন, আঙুল-খুইয়ে-আসা প্রেমিকের হাত
যার স্পর্শ থেকে বেড়ে ওঠে রক্তজবা ভ্রূণ

আমার নিশ্বাসে তুমি পুড়ে যাচ্ছ…

প্রজাপতি
আমার মেয়ের নাম প্রজাপতি। প্রজাপতির মতোই ওড়ে, হাসে, গায়,
নাচে। সকালবেলা ওর চুলের ফিতেয় এসে জড়ো হয় শত-শত
পাতিহাঁস, দুপুরে রোদ্দুর, বিকেলে শালিক; সন্ধ্যা হলে বুনোফুলের ঘ্রাণ।
রাতভর স্বপ্নেরা ওকে চুমু খেয়ে, ভালো ভূতের গল্প শুনিয়ে উড়ে যায়।

আমি কোনও-কোনও বিষণ্ন প্রহরে ওর ডানাদুটো ধার করি, উড়ি, হাসি,
ভাসি, ভেসে ভেসে দেখে আসি চিলেকোঠার ঘরে সারাগায়ে ভান মেখে
দ-ভঙ্গিমায় একজন শুয়ে থাকে; আমি তাকে সবচেয়ে সুরেলা ফোক
গানটি শুনিয়ে আসি। তারপর সে মৃদু হেসে নিজের বামবুকে হাত রেখে
ঘুমিয়ে পড়ে যেখানে আমি থাকি- যত্নে, অবহেলায়!

বিষণ্নতার মৃত্যুর পর প্রজাপতিকে ডানাদুটো ফেরত দিই আবার। অবশ্য
সেগুলো বড় আঁটোসাঁটো লাগে আমার!

রাষ্ট্র ও ধর্ম
ভূস্বামী আজ ধৃতরাষ্ট্রে ছেলে
রক্ত যাদের হোলির মতোই প্রিয়
অন্ধ পিতার অনন্ত প্রশ্রয়
পট্টি বেঁধেছে মাতাজি গান্ধারীও

খুচরো আদুলি গড়াগড়ি খায় পথে
শিয়রে রেখেছি হস্তরেখার বই
আবছা হয়েছে ভবিতব্যের রেখা
মৃত্যুকে লাগে অবিচ্ছেদ্য সই

রাষ্ট্র এখন সাড়ে তিনরুম ফ্ল্যাট
জাদুবাকশোয় সমূহ নজরদারি
পাঁজর খুলেই ঘুমাই সরীসৃপ
বারুদগন্ধে হয়েছে আকাশ ভারী

উপোসী বাঘের নখরে জমেছে থাবা
রাষ্ট্র, ধর্ম রক্তের তীব্রতা
দখিন হাতের খড়গ উঁচিয়ে ধরে
রক্তবীজের বিনাশ করো হে মাতা

পরানসখা

দাঁড়াও, আলো আনছি
বলে কেউ একজন অন্ধকারে হারিয়ে গেলো
সামনে চৌরাস্তা
কোন পথে যাব ভাবতে ভাবতে বুঝলাম
পায়ের লিগামেন্টে টান পড়েছে
তখন আমার তৃতীয় চিৎকারটি দিলাম

প্রথম দিয়েছি জন্মচমকে, দ্বিতীয় প্রসববেদনায়

আর তৃতীয়টি
তোমাকে ছুঁতে না পারার আর্তনাদ

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত