Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

শুভ জন্মদিন রবি ঘোষ

Reading Time: 13 minutes

 রানা চক্রবর্তী

পর্দায় যে ধরনের অভিনেতা, বাস্তবে ব্যক্তি হিসেবে সম্পূর্ণ বিপরীত। সিরিয়াস মানুষ, যিনি সময় পেলেই রামকৃষ্ণ কথামৃত পড়তেন। পরচর্চা পরনিন্দা একবারে নাপসন্দ। বাইরের কেউ না থাকলে বাড়ির কাজের লোকেদের, এমনকি তাঁর ড্রাইভার গণেশকে বসিয়ে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ শোনাতেন।

তিনি চকোলেটের লোভ দেখিয়ে রাজি করিয়েছিলেন জয়া ভাদুড়িকে সত্যজিৎ রায়ের ‘মহানগর’-এ অভিনয়ের জন্য। তাঁর জিমন্যাস্টিক দেখে ভাড়া করতে চেয়েছিল সার্কাস পার্টি।

‘উম্মা’-র বদলে একবার শুধু ভুলে ‘উমা’ বলে ফেলেছিলেন। তাতেই তেড়ে ফুড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল বাঘটা। দশ ফুটি তাগড়াই চেহারা। এক থাবায় সাবাড় করে দিতে পারে। করেনি, তবু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রবি ঘোষ বলতেন, মাদ্রাজি ওই বাঘের সঙ্গে অভিনয় করাটাই ছিল জীবনের সেরা চ্যালেঞ্জ!

‘হীরক রাজার দেশে’র আউটডোর। ‘পায়ে পড়ি বাঘ মামা’র গানের সঙ্গে সেই বিখ্যাত শট। গুপী আর বাঘা বাঘের ডেরায় ঢুকবে চাবির খোঁজে। তারই ‘টেক’ নেওয়া চলছিল তখনকার মাদ্রাজে। ট্রেন্‌ড বাঘ। পা ছড়িয়ে ঘরের দেওয়াল ঘেঁষে শুয়ে। পাশে বসে ভিজে তোয়ালে বুলোতে হবে তার পিঠে। আর মুখে আদর করার ঢঙে বলে যেতে হবে, ‘উম্মা, উম্মা’। সঙ্গের মহিলা ট্রেনারটি বুঝিয়ে দিয়েছেন, এ বাঘকে বশে আনার এটাই নাকি দস্তুর। সময়মতো ক্যামেরা চলবে। প্রায় মিনিট দশেক ‘আদর’ চলার মাঝেই ওই বিপত্তি। উম্মা-র বদলে উমা! গর গর করে উঠে দাঁড়াল বাঘ। মুহূর্তে যেন দুলে উঠল গোটা ব্রহ্মাণ্ড। দূর থেকে ট্রেনার লাঠির ঠক ঠক আওয়াজ করে আবার ‘উম্মা উম্মা’ বলতে তবে সে শান্ত হল। শ্যুটও হল। শেষমেশ এত কনফিডেন্স পেয়ে গিয়েছিলেন যে স্থিরচিত্রীর আবদারে বাঘকে চুমু খাওয়ার ‘পোজ’-ও দিয়েছিলেন রবি ঘোষ।

চ্যালেঞ্জ ‘গুপী গাইন…’ -এও কম ছিল না। উখরি-তে শ্যুট। শিমলার থেকেও উঁচুতে। বেজায় ঠান্ডা। পাঁচতলা একটা স্লোপিং দেখিয়ে সত্যজিত্‌ রায় তাঁর বাঘা-গুপীকে বললেন, “ওখান থেকে ঝাঁপ দিতে পারবে না তোমরা?” চোখের সামনে স্থানীয় লোকজন তর তর করে উঠে যাচ্ছে। ঝপাঝপ ঝাঁপও দিচ্ছে। দেখেশুনে ওঁরা এক কথায় রাজি। কিন্তু চুড়োয় উঠে হাত-পা পেটের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার জোগাড়! কনকনে হাওয়া। তার ওপর ক্যামেরা গণ্ডগোল পাকালো। ফলে অপেক্ষা দীর্ঘ হল। বেশ খানিক পরে ঝাঁপ দেওয়ার তলব। এর পর শোনা যাক রবি ঘোষের মুখে, “দিলাম ঝাঁপ। সে এক এক্সাইটিং ফিলিং। মনে হল পেঁজা তুলোর ওপর দিয়ে গড়িয়ে এলাম। কিন্তু হাত-পা স্টিফ। মানিকদা বললেন, ‘শিগগির ওদের ভ্যানে তোলো। আর গরম দুধ খাওয়াও।’ সব রেডিই ছিল। গাইড বলল, ‘খবরদার আগুনের কাছে যাবেন না। পা ফেটে যাবে। শুধু পা ঠুকুন। হাত পায়ের সাড় ফিরতে লাগল পাক্কা চব্বিশ ঘণ্টা।”

‘মহানগর’-এ সত্যজিৎ রায়ের বাণী চরিত্রের জন্য জয়া ভাদুড়িকে খুঁজে দেওয়ার গল্পটি ভারী অদ্ভুত।

রবি ঘোষ লিখছেন, “মানিকদা তখন বছর চোদ্দোর এক ছটফটে বাঙালি মেয়ে খুঁজছেন। জয়াকে দেখে ভাবলাম, ও পারবে।” জয়ার সঙ্গে ওঁর আলাপ তপন সিনহার ‘নির্জন সৈকত’-এর শ্যুটিং-এ। পুরীতে। রোজ সন্ধ্যায় শ্যুটিং পর্ব শেষ হলে আড্ডা বসত। “সেই আড্ডায় জয়াও যোগ দিত। চোখে-মুখে কথা বলে। তরুণদা, মানে সাহিত্যিক তরুণ ভাদুড়ির মেয়ে। ওঁর সঙ্গেই আসত। সন্ধের আড্ডা মাতিয়ে দিত। তরুণদাকে বললাম, মানিকদার ছবির কথা। বললেন, আমি জানি না। ওকেই বরং জিজ্ঞেস করো। জয়া কিন্তু তখন ফিল্মকে অপছন্দ করত। বলে কয়ে চকোলেটের লোভ দেখিয়ে রাজি করালাম।” এর পরও চমক কম নয়। সত্যজিৎ রায়ের সামনে গিয়ে বলতে গেলে বোমা ফাটিয়েছিলেন জয়া। “মানিকদা বললেন, ছবি-টবি দেখো? জয়া বলল, হ্যাঁ। উনি বললেন, কীরকম? তাতে জয়া দেখি, হিন্দি ছবির যত স্টার— মধুবালা, নার্গিস, সুরাইয়া সব্বাইকে নকল করে করে দেখাতে লাগল।” বলা বাহুল্য, এর পর আর সত্যজিৎ রায়কে অপেক্ষা করতে হয়নি। বছর ঘুরতে না ঘুরতে জয়ার সঙ্গে এতটাই বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয় যে, এক সময় কলকাতায় বলতে গেলে তাঁর ‘লোকাল গার্জেন’ হয়ে গিয়েছিলেন রবি ঘোষ।

পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ‘ধন্যি মেয়ে’-তে জয়াকে নেন রবি ঘোষেরই কথায়। এমনকী হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘গুড্ডি’র জন্য জয়া বচ্চনকে হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে শেষে রবি ঘোষেরই কালীঘাটের বাড়িতে ফোন করে তাঁকে উদ্ধার করেন।

সে আর এক কাণ্ড! ’৬৯-’৭০ সালের কথা। একগুঁয়ে, অভিমানী জয়া কিছুতেই যাবে না মুম্বই। বাংলা ছবি করবে। সে বারও তাকে বুঝিয়েটুঝিয়ে বম্বে পাঠান রবি ঘোষই।

যে মানুষ জোরজার করে অন্যকে মুম্বই পাঠান, তিনি কিন্তু এক বছরের বেশি থাকতে পারেননি টিনসেল টাউনে।

’৭২ সাল। রবি ঘোষের জীবনে তখন যেন শোকের ঝড়। জানুয়ারিতে স্ত্রী অনুভা (গুপ্ত) মারা গেলেন। এপ্রিলে মা। সেপ্টেম্বরে দিদি।

সেই সময় মুম্বই থেকে হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়ের ডাক। ‘সব সে বড়া সুখ’ ছবির জন্য। গেলেন। ছবি যদিও ফ্লপ করল, হৃষীকেশ ফোনে বললেন, “তুই কিন্তু হিট। চলে আয়। এখানে সবাই তোকে খুঁজছে।” আর যেতে পারেননি। লিখছেন, “প্রথমত আমি হচ্ছি টিপিক্যাল বাঙালি। বম্বেতে আমার পোষাবে না। তাছাড়া যাদের জন্য রোজগার করা তারাই তো সব চলে গেছে, একার জন্য আর কত কী লাগবে।”

জয়া বচ্চনের সঙ্গে রবি ঘোষের সম্পর্ক যে কতটা নিবিড় হয়ে উঠেছিল, সে সম্পর্কে একটি ঘটনা বলাই যথেষ্ট।

’৮৩ সাল। তত দিনে দ্বিতীয় বার বিয়ে করেছেন রবি ঘোষ। স্ত্রী বৈশাখী। বাদুড় বাগানের মেয়ে। বিয়ের পর বউকে নিয়ে বম্বে গিয়েছেন। কোন হোটেলে উঠেছেন জানতে পেরে জয়া গাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। সেই গাড়ি করেই সন্ধেবেলা তাঁরা হাজির বচ্চন-প্রাসাদ ‘প্রতীক্ষা’য়। আড্ডা-পান-আহার যখন শেষ হল, তখন রাত প্রায় পৌনে একটা। ততক্ষণে ড্রাইভার চলে গেছে। রবি ঘোষ লিখছেন, “জয়া চিন্তিত। বললাম, কী আছে? ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাব। অমিতাভ হাঁ হাঁ করে উঠল। তা হয় নাকি? ভাবিজি আছেন না! আমি পৌঁছে দিয়ে আসছি।” এর ঠিক আগেই ‘কুলি’র শ্যুট করতে গিয়ে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরেছেন বচ্চন। ফলে শরীর যে খুব সুস্থ, এমন নয়। তা সত্ত্বেও সে-রাতে তিনি নিজে ড্রাইভ করে হোটেলে পৌঁছে দিয়ে এসেছিলেন ওঁদের।

জয়া বচ্চনের মতো তখনকার বম্বের আর এক বঙ্গতনয়া শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গেও সম্পর্কটা ছিল অসম্ভব বন্ধুত্বের। রবি ঘোষ স্মৃতিচারণে শর্মিলা বলছেন, “কলকাতায় যখন আমি অভিনয় শুরু করি, তখন আমার খুবই কম বয়স। রবিদা ছিলেন আমার শিক্ষক, মেন্টর। … অভিনয়ের কত কিছু যে শিখেছি ওঁর কাছে! যেমন ‘ছায়াসূর্য’-র সময়। একটা দৃশ্য ছিল যেখানে আমায় হাসতে হবে। যাকে বলে বাঁধনহারা হাসি। এ দিকে আমি হাসতে পারছি না। রবিদা শিখিয়েছিলেন কী ভাবে হাসতে হয়। কী ভাবে একটু একটু করে নিজের মধ্যে আবহাওয়াটা তৈরি করতে হয়।… শুধু আমার নয়, টাইগারেরও খুব ভাল লাগত ওকে। বাইরের লোকের মধ্যে রবিদাই ওঁকে টাইগার বলতেন।”

রবি ঘোষ প্রায়ই বলতেন, “হতে পারতাম সার্কাসের জিমন্যাস্ট, ওয়েট লিফটিং-এ বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন, পুলিশ কোর্টের কেরানিবাবু। পারলাম না। সেই ছোট্টবেলা থেকেই থিয়েটার আর অ্যাক্টিং শব্দ দুটো মাথায় এমন গুবরে পোকার মতো বাসা বেঁধেছিল!”

বরিশালের বাঙাল। বড় হয়েছিলেন কলকাতার কালীঘাটে। তিন ভাই, দুই বোন। বাবা ছিলেন আলিপুর জজকোটের সুপারিনটেন্ডেন্ট। অসম্ভব সৎ। তবে ছেলে রবির অভিনয় নিয়ে পাগলামিটা উনি কোনও দিনই ভাল চোখে দেখেননি। বাবার দিকে সবাই খেলা-পাগল। প্রায় সবাই ইস্টবেঙ্গলের লাইফ মেম্বার। বাবা খেলতেনও। ছেলেও প্রথমে ওই পথেই চলেছিল। সাত-আট বছর বয়স যখন, তখন নিয়ম করে গুরুসদয় দত্তর ব্রতচারীর মাঠে প্র্যাকটিস চলছে।

ওর জিমন্যাস্ট দেখে এতটাই হই হই পড়ে যায় যে, সার্কাসের দল থেকে লোক চলে আসে ভাড়া করতে! স্বভাবতই বাবা মত দেননি। আশুতোষ কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়তে পড়তে আবার শরীরচর্চার নেশা চাপে। এ বার ওয়েটলিফটিং। ওখানকার দাদারা বলেছিল, বেঙ্গল চ্যাম্পিয়নশিপে নামাবে। তা’ও হল না। আঠেরো বছর বয়েস থেকে শুরু করেন পুলিশ কোর্টে চাকরি। অভিনয়ের ঝোঁকে তাকেও বিদায় দেন।

শিল্পকর্মের এই নেশাটা ধরে মামাবাড়ির দিক থেকে। গানবাজনার পরিবার। দাদু অধ্যাপক। কিন্তু ভাল সেতার বাজাতেন। বড় মামা গান গাইতেন। শচীনদেবের ছাত্র। মায়েরও গানের গলা ছিল অপূর্ব।

হঠাৎ কলকাতা থেকে তাঁকে চলে যেতে হয় কোচবিহারের মামাবাড়ি। টানা তিন বছর থাকতে হয় সেখানে। ’৪১ কি ’৪২ সাল, এ শহর তখন জাপানি বোমার ভয়ে কাঁপছে। কলকাতার চেয়ে কোচবিহারের স্মৃতি তাঁকে বরাবরই তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

রবি ঘোষ লিখছেন, “তোর্সা নদী, গাছপালা সব মিলিয়ে কোচবিহার আমার কাছে এক স্বপ্ন। খালি পায়ে হেঁটে বেড়াতাম। গাছে উঠতাম। জাম পেড়ে খেতাম। বাবার শাসন ছিল না।”

থিয়েটার নিয়ে তাঁর মাতামাতি শুরু স্কুলে পড়ার সময় থেকেই। পুজোর সময় দলবল নিয়ে এ পাড়ায় ও পাড়ায় নাটক করে বেড়াতেন, ‘কেদার রায়’, ‘চন্দ্রগুপ্ত’। কলেজে পড়তে পড়তে পাগলামিটা চূড়ান্ত রূপ নেয়। ছুটির পর দারোয়ানকে পয়সা দিয়ে ছাতে রিহার্সাল করতেন। ফোর্থ ইয়ারে উঠে বি কম আর দেওয়া হল না। তখন থিয়েটারের ভূত পুরোপুরি ঘাড়ে চেপেছে।

রবি ঘোষ লিখছেন, “প্রেমাশিস বলে আমার এক বন্ধু ছিল। সে আমাকে আর সত্যকে, মানে অভিনেতা সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়কে একদিন বলল, ‘চলো তোমাদের এক জায়গায় যেতে হবে।’ সব শুনে তো হাত-পা ঠান্ডা। ওয়াইএমসিএ বাড়িতে ইংরেজি নাটকের রিহার্সাল চলছে। উৎপল দত্ত পরিচালক। আমাদের অভিনয় করতে হবে। সে এক বিদিকিচ্ছিরি ব্যাপার। সত্য তো ধুতি পরে, আমি পাজামা। সে সব না হয় গেল, কিন্তু ইংরেজি? আমরা বাংলা মিডিয়ামে পড়া ছেলে, গড়গড় করে ইংরেজি বলতে পারি না। প্রেমাশিস ভরসা দিল, ‘আরে না না। সবাই বাংলায় কথা বলবে।’ গিয়ে দেখি সবাই তুখোড় ইংরেজি বলছে। প্রেমাশিসের ইংরেজি ভোকাবুলারি সাঙ্ঘাতিক। সেন্ট জেভিয়ার্সের ছেলে। ওর আর কী। আমাদের সঙ্গে উৎপলদা বাংলায় কথা বললেন। আর বললেন, করুণাদি, মানে পথের পাঁচালী-র করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর তো রিহার্সাল শুরু হল। উরিব্বাস, সে কী অভিজ্ঞতা। সবাই তোড়ে ইংরেজি বলছে। এক বর্ণও বুঝতে পারছি না। ভাগ্যিস ক্রাউড সিনে ছিলাম। তাই উতরে গেলাম।”

উৎপল দত্তর ‘এলটিজি’-তে কাজের সেই শুরু। শুধু ইংরেজি নয়, এর পর বাংলাতেও যখন এলটিজি থিয়েটার শুরু করল, রবি ঘোষ তখন চুটিয়ে কাজ করে গেলেন একের পর এক নাটকে, ‘নীচের মহল’, ‘তপতী’, ‘সিরাজউদ্দৌলা’ থেকে ‘অঙ্গার’। ’৫২ থেকে ’৫৯। টানা সাত বছর। এলটিজি-তে থাকতে থাকতেই উৎপল দত্ত হয়ে উঠলেন তাঁর গুরু। শিশির ভাদুড়ী, যোগেশ চৌধুরী, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যর পর ওঁকেই তিনি থিয়েটারের এক স্তম্ভ বলে মেনেছেন। এক জায়গায় বলছেন, “আমি যতটুকু শিখেছি, তাঁর প্রশিক্ষণে। পরে নিজের মতো করে গড়ে তুলেছি।”

৩১শে ডিসেম্বর, ১৯৫৯ — উৎপল দত্তের পরিচালনায় মিনার্ভা থিয়েটারে লিটল থিয়েটার গ্রুপ নিবেদিত ‘অঙ্গার’ নাটকের প্রথম শো। সে দিন থেকে শেষ শো পর্যন্ত অভিনয় করেছিলেন তিনি। এই নাটকের জন্য ‘উল্টোরথ’ পুরস্কার পান। নাছোড় অভিনেতা-পুত্রের অভিনয় দেখার দিন ঠিক করেছিলেন শেষ পর্যন্ত বাবা জীতেন্দ্রনাথ। কিন্তু বিখ্যাত ‘অঙ্গার’ নাটকে ছেলের অভিনয় আর দেখা হয়নি। ২৫শে ডিসেম্বর মারা যান তিনি। ‘অঙ্গার’ নাটকে সনাতনের ভূমিকায় একজন ছোটোখাটো চেহারার মানুষ খনি থেকে উঠে উচ্চ স্বরে বলে উঠেছিলেন ‘আমি একজন ভূতপূর্ব লোক’ ‑ যাঁরা সেই কন্ঠস্বর শুনেছিলেন তাঁরা আজীবন ভুলতে পারেননি।

থিয়েটার চলেছে। রাজনীতি। পোস্টারিং, মিটিং তাও চলছে। পাশাপাশি সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ কফিহাউসে আড্ডা। ঘোরতর বামপন্থী নেতাদের সঙ্গে ওঠাবসা। তখনকার নামী সাহিত্যিকদের সঙ্গে আলাপ। সমরেশ বসু, কমলকুমার মজুমদার…। দূর থেকে সত্যজিৎ রায়ের দেখা পাওয়া। বলতে গেলে গোগ্রাসে সময়টাকে গিলতে গিলতে এগোনো। এগোনো তো হল, কিন্তু আর সহ্য হল না কট্টর কংগ্রেসি বাবার। ছেলেকে ‘ত্যাগ’ দিলেন তিনি।

এরই কাছাকাছি সময়ে আলাপ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। শক্তি নিয়ে রবি ঘোষ এক জায়গায় বলছেন, “দেখা হলেই প্রচণ্ড গালিগালাজ করত। তারপর যাবার সময় থুতু মাখানো একটা চুমু খেত। মদ্যপান একসঙ্গে বহুদিন করেছি, কিন্তু ওর সঙ্গে তাল মেলানোর ক্ষমতা আমার থাকত না। বোধহয় শক্তি শাক্ত, আমরা বৈষ্ণব বলে। … কোনও মদ্যপায়ী লেখক বা গুণী ব্যক্তি হলফ করে বলতে পারবে যে তাকে একদিন রাত্রে গভর্নমেন্ট স্টেট বাস ড্রাইভার বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে? পারবে না। শক্তি পারত। ওর যে এমনটা ঘটেছিল। সেই স্টেট বাসের ড্রাইভার ছিল শক্তির কবিতার ভক্ত।”

বেশ চলছিল এলটিজি-তে। হঠাৎ মতপার্থক্যর জেরে দল ছাড়লেন। তখন আর্থিক অবস্থা কহতব্য নয়। ভেবেছিলেন, অনেক হল, এ বার সব ছেড়েছুড়ে চাকরি করবেন। বন্ধু প্রেমাশিস বললেন, ‘তুমি যেরকম কথাবার্তা বলো, ভাল সেল্‌সম্যান হতে পারবে।’ মনে ধরেনি। ‘বিশ্বরূপা’র রাসবিহারী সরকার চাকরির অফার দিলেন। মাস গেলে আটশো টাকা। গেলেন না। নীতিবোধ! কমার্শিয়াল থিয়েটার করবেন না। এ দিকে সব দিক থেকে একটা হতচ্ছাড়া অবস্থা তখন। এই সময়ই তপন সিংহ-র ডাক ওঁকে বাঁচিয়ে দিল। এলটিজি-র ‘অঙ্গার’-এ সনাতনের চরিত্রে অভিনয় দেখে ওঁর খুব ভাল লাগে রবি ঘোষকে। তারই জেরে ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’য় ডেকে নিলেন তিনি। বইয়ের প্রাক্কথনে তপন সিংহ বলছেন, “আমার ‘গল্প হলেও সত্যি’ রবিকে ভেবেই লেখা। ও বলেছিল, সবাই তো নামকরা হিরোকে নিয়ে ছবি করে। আপনি আমাকে হিরো বানালেন। দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। …আমি জানতুম, ও জাস্টিস করবেই।”

‘হাঁসুলী বাঁকের …’ করার সময়ই আরও একটা ঘটনা ঘটল। রাস্তায় ভানু ঘোষের সঙ্গে দেখা। সত্যজিৎ রায়ের অ্যাসিসট্যান্ট। “কোথায় থাকিস? মানিকদা তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এক্ষুনি চ।” সোজা লেক টেম্পলে সত্যজিৎ রায়ের বাড়ি।

এরপরের সত্যজিৎ রায়-রবি ঘোষ সংলাপটা এ রকম—

কোথায় থাকো, তোমাকে একটা রোল করতে হবে। কী! করবে তো?

(না করার প্রশ্নই নেই। তবু উত্তরও জোগাচ্ছে না মুখে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে। সত্যজিৎ আবার বললেন)

আগামী সপ্তাহে তোমার আর সৌমিত্রর স্ক্রিন টেস্ট নেব। সৌমিত্র ড্রাইভার। তুমি ক্লিনার। ক্লিনার দেখেছ?

দেখেছি মানে? আমি কালীঘাটের ছেলে। ক্লিনারদের মতো দারুণ সিটিও দিতে পারি। সিটি মেরে কত পায়রা উড়িয়েছি।

রবি ঘোষ লিখছেন, “মানিকদার বাড়ি থেকে বেরিয়েই সৌমিত্র জিজ্ঞেস করল, ‘বিয়ার খান?’ আমি বললাম ‘হ্যাঁ।’ তারপর ট্যাক্সি করে সোজা মধ্য কলকাতার এক বার-এ।”

এ ভাবেই শুরু হয়ে গিয়েছিল তাঁর অভিনয়-জীবনের আর এক অধ্যায়।

অন্য এক অভিযান!

অভিনয় ছিল তাঁর মজ্জায় মজ্জায়। তাই কোনও বাধাই তাঁর সেই ‘প্যাশন’কে দমিয়ে রাখতে পারেনি। আর পেশাদারিত্ব? ঠিক সময়ে কাজের জায়গায় পৌঁছনো ছিল তাঁর স্বভাব। ‘ঠগিনী’ ছবি তৈরির সময় এক দিন বেশ দেরি হল ফ্লোরে পৌঁছতে। দুপুরের ব্রেকের আগে পর্যন্ত নির্বিঘ্নে কাজ শেষ হলে জানা গেল তিনি সেই সকালেই মা-কে দাহ করে এসেছেন। তাই দেরি। অনেক সময় গাড়ির চালক না এসে পৌঁছলে, ট্যাক্সি ধরে বেরিয়ে পড়তেন, সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী বৈশাখি ঘোষ। পরিচালক সন্দীপ রায় জানিয়েছিলেন, “কমেডিয়ান হিসেবে তাঁর খ্যাতি হলেও আদতে তিনি ছিলেন চরিত্রাভিনেতা।” আসলে রবি ঘোষ এমনই একটা নাম, বাঙালি যাঁকে এক জন কমপ্লিট অভিনেতা হিসেবেই চেনে।

রবির অভিনয় সম্পর্কে একটা খাঁটি কথা বলেছিলেন উত্তমকুমার। বলেছিলেন, “আমরা হয়তো জাঁকিয়ে কিছু করার চেষ্টা করছি, আর রবি হয়তো কয়েক সেকেন্ড থেকে এমন একটা কিছু করবে যে ও গোটা দৃশ্যটা টেনে নিয়ে বেরিয়ে যাবে, লোকে হেসে গড়িয়ে পড়বে”। আর বলিউডের প্রখ্যাত পরিচালক হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, “সব অভিনেতা, সব শিল্পী সব সময় আমার কাছে একশোয় একশো পায় না। রবি পেয়েছিল।”

পর্দায় অভিনেতা রবি ঘোষের যে রূপ দেখা যায়, ব্যক্তি হিসেবে একেবারেই তিনি তার বিপরীতের। একটি গুরুগম্ভীর মানুষ, যিনি সময় পেলেই রামকৃষ্ণ কথামৃত পড়ে সময় কাটাতেন। আর পড়তেন প্রবন্ধ-নাটকের নানা বই। প্রথম জীবনে কমিউনিজিমে দীক্ষিত হয়েও পরবর্তী কালে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ পড়তেন। সে অর্থে নিজে পূজার্চনা না করলেও, অন্যের বিশ্বাস-ভক্তিকে কখনও ছোট করেননি। মাঝে মধ্যে অবশ্য কৌতুকের ভঙ্গিমায় বলতেন— আমাকে রসেবশে রাখিস মা! পরচর্চা-পরনিন্দা করে সময় নষ্ট করতেন না, এমনকী খারাপ শব্দও ব্যবহার করতেন না কখনও। “তবে, ‘মাইরি’ শব্দটা প্রায় প্রতি ক্ষণেই বলে ফেলতেন রবিদা।”, তাঁর স্মৃতিচারণে সংবাদমাধ্যমে একদা জানিয়েছিলেন তাঁরই এক সময়ের প্রতিবেশী ও পরম বন্ধু-চিত্রগ্রাহক নিমাই ঘোষ।

আড্ডাবাজ, পরোপকারী মানুষটি খেতে ভালবাসলেও খুবই পরিমিত আহারে অভ্যস্ত ছিলেন। প্রিয় খাবার ছিল লুচি ও পাঁঠার মাংস। ভালবাসতেন লোককে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে। তবে, গোল বাঁধত যখন তা বাড়িতে জানাতে ভুলে যেতেন। সন্ধে বা রাতে বাড়িতে অতিথি এসে উপস্থিত হলে খুবই গম্ভীর হয়ে তাঁদের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে বলতেন। সময়ে-অসময়ে এ ভাবেই অবস্থার সামাল দিতেন এই ‘মজার’ মানুষটি। বৈশাখিদেবীর সঙ্গে একমত সন্দীপ রায়। তিনি তাঁর স্মৃতিচারণে শুনিয়েছিলেন আরও একটি ছোট্ট ঘটনা –

“বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ দেখানো হবে। সেই সূত্রে রবিকাকার বিদেশ যাওয়া, প্রথম বার। এক দিন রবিকাকা ও তপেনকাকাকে নিয়ে শপিং-এ বেরিয়েছি। জার্মানদের চেহারা লম্বা-চওড়া হয়। সেখানে কোনও জামাকাপড় রবিকাকার ফিট করছে না। শেষে এক জার্মান মহিলা ছোটদের বিভাগে নিয়ে গিয়ে জামাকাপড় কিনিয়ে দেন। অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে রবিকাকা কেনাকাটা করে ফিরে আসেন।”

২৪শে নভেম্বর, ১৯৩১ সালে, কোচবিহারে মামাবাড়িতে জন্ম হয় রবি ঘোষের। বাবা জীতেন্দ্রনাথ ঘোষদস্তিদার আদতে ছিলেন পূর্ব বাংলার বরিশালের গাভার বাসিন্দা। চাকরিসূত্রে তিনি থাকতেন কলকাতার মহিম হালদার স্ট্রিটে। মা জ্যোৎস্নারানি ছিলেন কোচবিহারের সুনীতি অ্যাকাডেমির বৃত্তি পাওয়া ছাত্রী ও বড়মামা ছিলেন শচীনকর্তার প্রিয় ছাত্র। পাঁচ ভাইবোনের দ্বিতীয় ছিলেন রবি। বড় দিদি সবিতা এবং ছোট দীনেন্দ্রনাথ, সুধীন্দ্রনাথ ও তপতী।

পড়াশোনার শুরু কোচবিহার জেনকিন্স স্কুলে। পরে ১৯৪৭ সালে কলকাতার সাউথ সাবার্বান মেন স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। স্কুলে তাঁর সহপাঠী ছিলেন উত্তমকুমারের ভাই অভিনেতা তরুণ চট্টোপাধ্যায়। ভবানীপুর আশুতোষ কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১৯৪৯ সালে এবং এই কলেজেরই নৈশ বিভাগে বি কম-এ ভর্তি হন। নিয়মিত শরীরচর্চার শুরু কলেজের ব্যায়ামাগারেই। পরবর্তী কালে ‘জিম’ না গেলেও, মর্নিং ওয়াক এবং বাড়িতেই নিয়মিত ব্যায়াম করতেন তিনি, জানা যায় তাঁর স্ত্রী বৈশাখি ঘোষের কাছ থেকে।

বিশ্বখ্যাত পরিচালক-অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন বলেছিলেন, “To truly laugh, you must be able to take your pain, and play with it.” তারপর আরও বলেছিলেন, “Life is a tragedy when seen in close-up, but a comedy in long-shot.” এই অমোঘ সমস্ত কথাগুলির সঙ্গে দৃশ্যত রবি ঘোষের সঙ্গে। ‘গল্প হলেও সত্যি’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘অভিযান’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’ ছবিগুলিতে একের পর চুটিয়ে অভিনয় করে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা রবি ঘোষ। নায়কোচিত চেহারা না হলেও সে যুগের বাংলা ছবির সমস্ত পরিচালকের প্রিয় পাত্র ছিলেন রবি। তাঁর হাত ধরেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছিলেন কত কত সফল অভিনেতা-অভিনেত্রী। বাংলা চলচ্চিত্রের ‘বা-বা’ তো তিনিই।

আজীবন বাংলা ছবির ‘কমেডিয়ান’ তকমা পাওয়া এই মানুষটি কিন্তু একেবারেই অভিনেতা হতে চাননি। রবি ঘোষের ছাত্র জীবন কাটে কলকাতার আশুতোষ কলেজে। ছাত্রাবস্থাতেই পড়াশোনার পাশাপাশি চলত নিয়মিত শরীরচর্চা। সেই সময় মাস্‌ল ফুলিয়ে, ছাতি চওড়া করে সিনেমায় ‘হিরো’ হওয়ার চল ছিল না। সুন্দর মুখ আর শক্তিশালী অভিনয়েই প্রত্যেকে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে নিজের জাত চেনাতেন।

কিন্তু রবি ঘোষের বডি থাকলেও না ছিল সুন্দর চাঁদপানা মুখ, না ছিল উচ্চতা। তপন সিংহ-এর ‘গল্প হলেও সত্যি’ ছবিতে রবি ঘোষের অভিনয় দেখলে বোঝা যাবে আসল হিরো তো তিনিই। ওরকম দাপুটে অভিনয় আর মানানসই চেহারায় গোটা ছবি জুড়ে একাই দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। উত্তমকুমার-সৌমিত্রদের যুগেও ভেঙে ফেলেছিলেন স্টিরিওটাইপ তকমা। সিনেমার ভাষ্যে নিয়ে এসেছিলেন একটা অন্য হাওয়া। যে হাওয়ায় সহজেই গা ভাসানো যায়, যে হাওয়ার রেশ থাকে বহু বহু বছর, কিন্তু তাকে ধরা বড্ড শক্ত। কালো, বেঁটে ওই লোকটাই সেই যুগে মিনার্ভা থিয়েটার হাউসফুল করতেন একাই। লোকে বলাবলি করত, রবি ঘোষ মানেই একাই একশো।

রবি ঘোষের অভিনয়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্যই ছিল হাস্যরসের মাধ্যমে সামাজিক রূঢ় বাস্তবিক ঘটনাগুলিকে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা। অভিনয়ের আন্তরিকতা ও সংবেদনশীলতা তাঁর প্রতিটি চরিত্রকে নতুন আঙ্গিকে হাজির করেছিল। কে বলবে, ইনি অভিনেতা নয়, বডিবিল্ডারই হতে চেয়েছিলেন!

এই রবি ঘোষ তাঁর অভিনয়ের গুরু বলে মানতেন চার্লি চ্যাপলিনকে। যে চ্যাপলিন বলেছিলেন, “Actors search for rejection. If they don’t get it they reject themselves.” এখন আর কমেডিয়ানদের যুগ নেই। সারা বছরে হয়তো গুটিকয়েক কমেডি ছবি মুক্তি পায়। একটিও বক্স-অফিস সাফল্য নয়। অনেকবছর আগে অনীক দত্তের ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ রমরমিয়ে চলেছিল বটে। তাও হাতেগুনে ওই একটিই। এখনকার কমেডি বাংলা ছবি জোর করে কাতুকুতু দিয়ে লোক হাসায়। কিন্তু রবি ঘোষকে কেউ ভোলেনি। ‘দ্য রিয়্যাল হিরো’কে ভুলে যাওয়া সহজ নয়। শুধু বডি বডি করে না কাটিয়ে পড়াশোনাও করেছেন নিজের মতো। তাঁর পড়াশোনা, বিশ্বের বিভিন্ন ছবি দেখা কত সমৃদ্ধ, সবকিছুই বোঝা যাবে রবি ঘোষের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার শুনলে। ভাগ্যিস তিনি অভিনয়ে এলেন! নাহলে এই ক্ষুদ্র জীবন নতুন দর্শনের ভ্রমণে ঘুরতে পারত না।

প্রথম স্ত্রী অনুভা গুপ্তর সঙ্গে সম্পর্কের শুরু ‘হাঁসুলিবাঁকের উপকথা’ ছবি করার সময়। সেই সময় হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন রবি ঘোষ। অনুভাদেবীর শুশ্রুষায় সুস্থ হয়ে ওঠেন। তাঁর জীবনের অন্যতম প্রেরণা ছিলেন স্ত্রী অনুভাদেবী। অনুভা যখন একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী, তখন রবি ঘোষ একজন স্ট্রাগলিং অভিনেতা। অথচ কী সুন্দর ভাবে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নানা টানাপোড়েনের পর তাঁরা বিয়ে করলেও, ১৯৭২ সালে অনুভাদেবীর অকাল মৃত্যুতে সেই সম্পর্ক দীর্ঘ হয়নি। এই ঘটনার এক দশক পর ১৯৮২ সালে রবি ঘোষ বিয়ে করেন বৈশাখিদেবীকে। তখন তিনি মহিম হালদার স্ট্রিটের বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছেন গল্ফগ্রিনের ফ্ল্যাটে।

অভিনয়কে সঙ্গে নিয়েই জন্মেছিলেন রবি ঘোষ। এবং তার বিকাশ ঘটে স্কুলে পড়াকালীনই। ছাত্রজীবনে ‘বন্ধুমন’ নামে একটি নাটকের দল গড়ে মহড়া দিতেন আশুতোষ কলেজের ছাদে। নাটকের জন্য বহু বার বাড়ি থেকে বিতাড়িত হতে হয়। অভিনয় করা তাঁর বাবা জীতেন্দ্রনাথ একেবারেই পছন্দ করতেন না। প্রায়ই স্ত্রী জ্যোৎস্নারানিকে বলতেন, “রবি অভিনয় কইরা সময় নষ্ট করে ক্যান? তোমার পোলারে কয়া দিও ওই চেহারায় অভিনয় হয় না। সে ছিল দুর্গাদাস বাঁড়ুজ্যে, হিরোর মতো চেহারা।” বাবা না হলেও, মা ও বড়মামার সমর্থন ছিল পুরোপুরি।

১৯৫৩ সালে কলকাতা পুলিশকোর্টে (ব্যাঙ্কশাল) চাকরি শুরু করলেও ১৯৬১ সালে সে সব পাট চুকিয়ে পাকাপাকি ভাবে অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। অভিনয় জীবন শুরু পাঁচের দশকে ‘সাংবাদিক’ নাটক দিয়ে। পরিচালক উৎপল দত্ত। নাটকে রবি ঘোষের চরিত্র ছিল এক জন সংবাদপত্র বিক্রেতার, মঞ্চের এক দিক দিয়ে ঢুকে অন্য প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া ছিল তাঁর ভূমিকা। মাত্র তিরিশ সেকেন্ডের অভিনয় দেখে পরিচালক মৃনাল সেন সে দিনই বুঝেছিলেন তাঁর অভিনয় দক্ষতা। সোভিয়েত নাট্যকার সিমোনোভের লেখা ‘দ্য রাশিয়ান কোয়েশ্চেন’ অবলম্বনে নাটকটি অনুবাদ করেছিলেন সরোজ দত্ত। কলেজের বন্ধু, অভিনেতা সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরামর্শেই উৎপল দত্তের নাটকের দল লিট্ল থিয়েটার গ্রুপ-এর সংস্পর্শে আসা।

৩১শে ডিসেম্বর, ১৯৫৯ সাল। উৎপল দত্তের পরিচালনায় মিনার্ভা থিয়েটারে এলটিজি-র নিবেদিত ‘অঙ্গার’নাটকের প্রথম শো। এবং সে দিন থেকে নাটকের শেষ রজনী পর্যন্ত তাতে অভিনয় করেন রবি ঘোষ। ১৯৫৯ সালের উল্টোরথ (শ্রেষ্ঠ মঞ্চাভিনেতা) পুরস্কারও লাভ করেন অঙ্গারের জন্য। উল্লেখ্য, প্রথম শো-এর পাঁচ দিন আগে, ২৫ ডিসেম্বর পিতৃহারা হন রবি। কিন্তু ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ সরিয়ে রেখে অভিনয়ের ডাকেই সাড়া দিয়েছিলেন তিনি। এমনই ছিল তাঁর পেশাদারিত্ব।

উৎপল দত্ত পরিচালিত নাটক বাদ দিলে কেবলমাত্র অভিনেতা-বন্ধু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘ঘটক বিদায়’ নাটকে অভিনয় করেন রবি ঘোষ। স্টার থিয়েটারে প্রায় ‘পাঁচশো নাইট’ নাটকটি চলে রমরমিয়ে। চলচ্চিত্রে অবশ্য সত্যজিৎ রায়, উৎপল দত্ত, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, তপন সিংহ, হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়, মৃণাল সেন, গুরু বাগচি, অজয় কর, তরুণ মজুমদার, দীনেন গুপ্ত, শেখর চট্টোপাধ্যায়, অসিত সেন, দিলীপ রায়, গৌতম ঘোষ, শিবু মিত্র, বিমল কর, সলিল সেন, সন্দীপ রায়, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়, সুখেন দাস, রাজা মিত্র, অঞ্জন চৌধুরী-সহ বহু পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন।

‘অঙ্গার’ নাটকে রবিবাবুর অভিনয় দেখেই পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ‘কিছুক্ষণ’ ও তপন সিংহ ‘হাঁসুলিবাঁকের উপকথা’র জন্য তাঁকে ডাকেন। এর পরেই প্রস্তাব আসে সত্যজিৎ রায়ের ‘অভিযান’-এর জন্য। থিয়েটার থেকে চলচ্চিত্রে এলেও দু’টি মাধ্যমের তফাত মাথায় রেখে একটার পর একটা বাংলা ছবির চরিত্রাভিনেতা হয়ে ওঠেন রবি ঘোষ।

মঞ্চাভিনেতা থাকাকালীন নিজের একটি নাটকের দল ‘চলাচল’ গড়ে তোলেন। ঠগ, অলীকবাবু, ছায়ানট-সহ ৮টি নাটক প্রযোজনা করে সেই দল। লিট্ল থিয়েটার গ্রুপ-এ থাকাকালীন ‘নবসংস্করণ’ ও ‘শোধবোধ’ নামে দু’টি নাটকের পরিচালকের কাজ করেন রবিবাবু। ‘সাধু যুধিষ্ঠিরের কড়চা’ ও ‘নিধিরাম সর্দার’ নামে দু’টি সিনেমা পরিচালনার কাজও করেছেন এই রবি ঘোষ।

কর্তব্যপরায়ণ, দিলখোলা, আড্ডাবাজ, খাদ্যরসিক, বহুমুখী প্রতিভাধর অভিনেতা ছিলেন রবি ঘোষ। শুধু তা-ই নয়, রবি ঘোষ ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ। এখানে তাঁর সম্পর্কে তাপস সেনের মূল্যায়নটি মনে রাখার মতো। তাঁর কথায়, “বহু মানুষের নানা সমস্যায় রবি যে সাহায্য করেছিল তা তাদের সূত্রেই জানতে পারি। শুধু বড় শিল্পী নয়, তিনি ছিলেন একজন খাঁটি মানুষ।”

অভিনেতা রবি ঘোষ ছিলেন একনিষ্ঠ পাঠক। তাঁর সেই পাঠকসত্তাই তাঁকে করেছিল লেখক। কলম ধরেছিলেন রবি। লিখেছিলেন দশটি কৌতুক নকশা। ১৯৯৭-এর বইমেলায় প্রকাশিত হল তাঁর ‘হাসতে যাদের মানা’। বইমেলার ইতিহাসে স্মরণীয় ১৯৯৭। সে বছরই বিধ্বংসী আগুনে মেলা পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। তিনদিনের মাথায় ফের শুরু হয়েছিল মেলা। কিন্তু সেই বইমেলা বাঙালির জীবনে আরও একটি বিষাদময় ঘটনার জন্য স্মরণীয়। তাঁর বই প্রকাশিত হল, আর তিনিও চলে গেলেন। মেলা চলাকালীনই ৪ঠা ফেব্রুয়ারি হঠাৎই প্রয়াত হলেন রবি ঘোষ। তাঁকে হারিয়ে তাঁর সঙ্গী ‘গুপী গাইন’ তপেন চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, “শনিবার জুটি ছিলাম, রবিবার একা গেলাম।”

রবি ঘোষের চলচ্চিত্র কর্মসূচির তালিকাটা নিম্নরূপ – • ১৯৫৯-১৯৯৪ পর্যন্ত প্রায় ২০৬টি চলচ্চিত্র। • ১৯৫২-১৯৯৫ পর্যন্ত প্রায় ৩৯টি নাটক করেছিলেন। উল্লেখ্য শ্রীমতী ভয়ঙ্করী ১০০০ রজনী, (বিজন থিয়েটারে ৯০০ ও সুজাতা সদনে ১০০)। কনে বিভ্রাট ৬৩৫ রজনী, (সারকারিনায় ৫৩৫ ও সুজাতা সদনে ১০০), নব সংস্করণ, শোধবোধ, ঠগ, ধনপতি গ্রেফতার, অলীকবাবু, ছায়ানট ইত্যাদি। • হিন্দিতে অভিনয় করেন সত্যকাম, সব সে বড়া সুখ, আজ কি রবিনহুড, পতঙ্গ। • ১৯৮৭-১৯৯৬ পর্যন্ত যাত্রা ৪টি। পাল্কি চলে রে (নট্ট কোম্পানি), বিয়ে পাগলা বুড়ো, লাট সাহেবের নাতজামাই, গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল (মুক্তলোক) • ১৯৮৬-১৯৯৮ পর্যন্ত দূরদর্শনে ধারাবাহিক গোয়েন্দা ভগবান দাস (রবি ওঝা), হুতোমের নকশা (তপন সিংহ), ফেলুদা ৩০ (সন্দীপ রায়), গোপাল ভাঁড় (দেব সিংহ), মনোরমা কেবিন (জগন্নাথ গুহ), মৃত্যুসাক্ষী (হিন্দি, আশিস মিত্র), নেপোলিয়নের বিয়ে (সুভাষ চট্টোপাধ্যায়), রিপোর্টার এক্স (সোমনাথ বিশ্বাস), দে রে ও মনোরমা কেবিন (যীশু দাশগুপ্ত) সহ প্রায় ১৪টিতে। (যেগুলির মধ্যে কিছু কিছু এখনও অসমাপ্ত রয়েছে)।

অভিনয় জীবনের স্বীকৃতি স্বরূপ যে সম্মান পেয়েছিলেন রবি ঘোষ, তার তালিকা নিম্নরূপ – • ‘অঙ্গার’ নাটকের জন্য উল্টোরথ (শ্রেষ্ঠ মঞ্চাভিনেতা) পুরস্কার লাভ ১৯৬০-এ। • মরিশাস সরকারের আমন্ত্রণে ‘সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র উৎসবে’ যোগদান। বাংলা চলচ্চিত্র প্রচার সংসদ কর্তৃক ‘সাবাস পেটো পাঁচু’ নাটকের জন্য শ্রেষ্ঠ মঞ্চাভিনেতার পুরস্কার। • ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর জন্য রাষ্ট্রপতি পুরস্কার। • ‘গুপীবাঘা ফিরে এল’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতার বিএফজে পুরস্কার। • ‘নয়নতারা’র জন্য আনন্দলোক পুরস্কার। • লায়ন্স ক্লাব থেকে শ্রেষ্ঠ নাট্যপরিচালকের পুরস্কার ‘হীরালাল পান্নালাল’ নাটকের জন্য।

তাঁর অভিনয় জীবনের স্মরণীয় কিছু ঘটনা হল – • ১৯৭০: গুপী গাইন বাঘা বাইন ছবির মুখ্য চরিত্র হিসেবে সালে বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ। • ১৯৭২ নেতাজি ইনস্টিটিউটে সমরেশ বসুর উপন্যাস ‘বিবর’ এর নাট্যরূপ মঞ্চস্থ করা ও পেশাদারি নাট্য-পরিচালকরূপে আত্মপ্রকাশ। • ১৯৮৭ তে যাত্রায় যোগদান ও নট্ট কোম্পানির পালা ‘পাল্কি চলে রে’ • ১৯৯৫ স্বজন নাট্যগোষ্ঠীর অতিথি শিল্পী হিসেবে আমেরিকা ও ইউরোপ ভ্রমণ। • ১৯৯৬ শেষ বারের মতো যাত্রায় যোগদান। মুক্তলোকের ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’।

বিভিন্ন সম্মানে নিজের অভিনয়ের মাঠ আলো করে গিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রত্যেকের জন্য ময়দান খালি আছে। যে নিজের রুচি অনুযায়ী সৃষ্টি করতে পারবে, সে-ই দৌঁড়াতে পারবে।

 

(তথ্যসূত্র: ১- আপন মনে, রবি ঘোষ, সম্পাদনা অভীক চট্টোপাধ্যায়, প্রকাশক সপ্তর্ষি প্রকাশন (২০১৫)। ২- ২১শে নভেম্বর ২০১৩ সালে, আনন্দবাজার পত্রিকার কলeকাতা বিভাগে শ্রী রবি ঘোষ কে নিয়ে প্রকাশিত প্রবন্ধ। ৩- ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০১৯ সালে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় শ্রী অরিত্র দাশ লিখিত প্রবন্ধ।)

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>