রবীন্দ্রসংস্কার ও রবীন্দ্রনাথ

Reading Time: 2 minutes

আজ ৮ আগষ্ট বাংলা ২২ শে শ্রাবণ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস। ইরাবতী পরিবার বিশ্বকবিকে স্মরণ করছে দিলীপ মজুমদারের লেখায়।


 

প্রথমে বলি দুটি অভিজ্ঞতার কথা। ‘ইরাবতী’তে ‘রবীন্দ্রনাথ নীরব কেন?’ নামে একটি প্রবন্ধ বেরিয়েছিল। আমাদের পাড়ার একটি অনুষ্ঠানে আমি প্রবন্ধটি পাঠ করি। আমার পাশে বসে ছিলেন এলাকার এক নামকরা ডাক্তার। আমার প্রবন্ধপাঠের মাঝপথে কানে আঙুল দিয়ে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করলেন। আমার কি দুঃসাহস, আমি রবীন্দ্রনাথের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলি! এই তাঁর বক্তব্য। অত্যন্ত অভদ্র হলে তাঁকে বলা যেত : ‘মশাই আপনি তো স্কুল আর কলেজপাঠ্য বইতে রবীন্দ্রনাথের লেখা ছাড়া আর কিছুই পড়েন নি।’

আমি ততটা অভদ্র নই। তাই নীরব থেকেছি। এবার দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা। আমার পরিচিতা এক বয়স্কা গৃহবধূ কথাপ্রসঙ্গে একদিন বললেন, ‘আমাদের রবীন্দ্রনাথ ছাড়া চলে না, তিনি আমাদের অস্থিমজ্জায়।’ নিতান্ত অভদ্র হলে তাঁকে বলতে পারতাম, ‘সকালবেলা ঝিমোতে ঝিমোতে টিভি-তে রবীন্দ্রনাথের গান শুনেই তো আপনাদের রবীন্দ্রচর্চা।’

যে ডাক্তার ও গৃহবধূর কথা বললাম তাঁরা নিয়মের ব্যতিক্রম নন, বরং নিয়ম। বেশিরভাগ মানুষ মেনে নিয়েছেন যে রবীন্দ্রনাথ বিরাট মানুষ, নোবেল পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়, তিনি সাধু বা ঋষি ইত্যাদি। মেনে নিলে আর কথা থাকে না, কিছু পড়তে হয় না, ভাবতে হয় না, খুঁজতে হয় না, লাইব্রেরি ছুটতে হয় না, একের সঙ্গে অন্যের তুলনামূলক বিচার করতে হয় না। রবীন্দ্রনাথের দুর্ভাগ্য, যে আচার-প্রথা-সংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি এত বলে গেলেন, সেই সংস্কারের ফাঁদে পড়লেন তিনি। দেশময় গড়ে উঠল বিচিত্র রবীন্দ্রসংস্কার।

আপনি বলবেন,তা কেন, রবীন্দ্রনাথের লেখা বই এত বিক্রি হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের উপর লেখা বই বাজারে গাদাগাদা। ঠিক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বই বা রবীন্দ্ররচনাবলি শোকেসে সাজানো থাকে, আর রবীন্দ্রনাথের উপর লেখা বই বিক্রি হয় স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরে তাঁর লেখা পাঠ্য থাকে বলে। ‘আপনি রবীন্দ্রনাথের কোন কোন বই পড়েছেন’— এ বিষয়ে আপনার পাড়ায় বা কর্মস্থলে সমীক্ষা করলেই জলবৎতরলং হয়ে যাবে সত্যটা। রবীন্দ্রনাথের গানের ক্যাসেটের বিক্রিও দারুণ। এ বিযয়েও একটা সমীক্ষা করতে পারেন এই প্রশ্ন করে ‘আপনি যে গানটি শুনলেন তার বিষয় কি এবং গানটি আপনার কেন ভালো লাগছে।’ বুঝতে পারবেন অধিকাংশ শ্রোতার কানের পর্দায় গিয়ে গানটি শেষ হবে যাচ্ছে। কানের ভিতর দিয়া মরমে প্রবেশ করছে না। তা যদি করত তা হলে আমাদের অনেক লাভ-ক্ষতিজনিত উদ্বেগ (stress) কমে যেত।

রবীন্দ্রনাথের গানকে তো চমৎকার থেরাপির কাজে ব্যবহার করা যায়। রবীন্দ্র নৃত্য-নাট্যেরও কদর খুব বলবেন। ঠিক। সুসজ্জিত ভালো মঞ্চে তাঁর নৃত্যনাট্য হলে ভিড় হয়। ‘চিত্রাঙ্গদা’ তো আমরা অনেকে দেখি। যাঁরা বাড়ি গিয়ে বউকে শাসন করেন তাঁরাও দেখেন, যাঁরা অন্তরে নারী স্বাধীনতার বিরোধী তাঁরাও দেখেন। জাতিভেদ মেনে চলেন যাঁরা তাঁরাও সেজেগুজে “চণ্ডালিকা’ দেখতে যান।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি এখন একটা প্রথা। তবে দেখেছি ঘুরে ফিরে ১০০/১৫০টি কবিতাই আবৃত্তি হয়। গলা কাঁপিয়ে আবৃত্তি হল ‘ভগবান তুমি যুগে যুগে দূত’ কিন্তু দেশের চারপাশে যখন বিচারের নামে অবিচার চলে, দূষিত করা হয় প্রাকৃতিক ও মানবিক পরিবেশ, তখন আমরা চুপ।

রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন সেই দেশ যেখানে জ্ঞান মুক্ত, উচ্চ যেথা শির। কোন দেশে বাস করি আমরা? যে দেশে ‘কর্তার ইচ্ছা্য় কর্ম’ হয়। সে কর্তা কখনও গুরু, পুরোহিত, মোল্লা, মৌলবী আবার কখনও রাজনৈতিক নেতা। একথা ঠিক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আবিষ্কারের ফলে আমরা কেতাদুরস্থ ও আধুনিক। কিন্তু মনের ভেতরটায় সেই আদিম অন্ধকার। প্রতিদিন বিচিত্র বিচিত্র কৌশলে খুন-জখম-রাহাজানি-তঞ্চকতার তালিকা দেখুন। আমরা আধুনিক কিন্তু অন্তর হতে বিদ্বেষ বিষ নাশ করতে পারি নি। মহামানবের সাগরতীর ভারতে এখন জাতিপ্রেম নাম ধরি প্রচণ্ড অন্যায়, ধর্মেরে ভাসাতে চাহে বলের বন্যায়।

মুষ্টিমেয় কিছু মানুষকে প্রাণিত করেন রবীন্দ্রনাথ। সন্দেহ নেই এ বিষয়ে। কিন্তু সংখ্যাগুরু মানুষ মজে আছেন রবীন্দ্রসংস্কারে। তাঁদের প্রাণিত হবার দরকার নেই।

 

[ লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক ]

   

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>