নারী পুরুষের মিলন কাহিনী(পর্ব-৩১)

বিবাহ  মানব সমাজের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। যুগে যুগে প্রতিষ্ঠানটি এর আদি রূপ থেকে বর্তমান কাঠামোয় উপনীত হয়েছে। বিবাহপ্রথাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে প্রধানত ধর্ম। বিয়েসংক্রান্ত সকল নিয়মকানুন বিধিবদ্ধ হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসনে। প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় ধর্মীয় শাস্ত্রের বিধানই ছিল সামাজিক আইন, ধর্মীয় আইনের দ্বারাই শাসিত হতো সমাজ-সংসার। ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি লোকজ সংস্কৃতিও বৈবাহিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে নানাভাবে। মনুস্মৃতি এবং অর্থশাস্ত্রে আট প্রকারের হিন্দু-বিবাহ পদ্ধতির উল্লেখ আছে। ‘ব্রাহ্ম’, ‘দৈব’, ‘আর্য’, ‘প্রজাপত্য’, ‘অসুর’, ‘রাক্ষস’, ‘পৈশাচ’ ও ‘গান্ধর্ব’ এই আট ধরনের বিবাহের মধ্যে ব্রাহ্ম বিবাহই শুধু গ্রহণযোগ্য ছিল। দায়ভাগ গ্রন্থে জীমূতবাহন উল্লেখ করেছেন যে, ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রজাপত্য এবং গান্ধর্ব বিবাহ অনিন্দনীয়। ধর্মশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী নিজ বর্ণের মধ্যে বিবাহ ছিল সাধারণ নিয়ম। সবর্ণে বিবাহ উৎকৃষ্ট হলেও মনু ব্রাহ্মণ পুরুষকে নিজ বর্ণ ছাড়া নিম্নতর তিন বর্ণে বিবাহের অধিকার দিয়েছিলেন। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে, যেমন চন্ডীমঙ্গলে, মুসলমানদের নিকা বিবাহের কথা বলা হয়েছে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, এমনকি বিশ শতকেও মুসলমানদের মধ্যে বহুবিবাহ ব্যাপক হারে প্রচলিত ছিল। উচ্চশ্রেণীর অবস্থাপন্ন মুসলমানদের একাধিক স্ত্রী থাকত। বিশ শতকের শুরুতে কুলীনদের বাইরে হিন্দু সমাজে বহুবিবাহ তেমন প্রচলিত ছিল না। বিয়ের এমন অনেক জানা অজানা বিষয়ে আলো ফেলেছেন ড. রোহিণী ধর্মপাল তাঁর এই ধারাবাহিক ‘নারী-পুরুষের মিলন কাহিনী’-তে। আজ থাকছে নারী-পুরুষের মিলন কাহিনীর ৩১পর্ব।


ঈর্ষা শব্দটির সঙ্গে সব সময়ই মেয়েরাই যুক্ত থাকে। হিংসুটে ছেলে, শুনেছেন? বরং ডানপিটে বিশেষণটি আবার ছেলেদের একচেটিয়া প্রায়। হিংসুটি মানেই মেয়ে! হ্যাঁ, অবশ্যই কথাটা ভুল নয়। মেয়েরা হিংসুটে বইকী, কিন্তু  তারা একা নয়, মেয়ে ছেলে উভয়েই হিংসুটে, কারণ এটা যে একটা প্রবৃত্তি। তাই খেয়াল করে দেখুন, বিজ্ঞাপন জগতে কখনো কখনো খুব স্থূল ভাবে, কখনো বা সূক্ষ্ম  ভাবে এই ঈর্ষাটিকে উস্কে দেওয়া হয়। সেই Onida টিভির প্রথম বিজ্ঞাপনটি মনে পড়ে? একটা দুই শিং আর লেজযুক্ত শয়তান টিভিটাকে জড়িয়ে এই কথাটা বলছে? “Neighbour’s Envy Owners Pride ” ? সত্যিই বলুন তো, এখানে owner বলতে কেউ বাড়ির গিন্নি বা মহিলার কথা ভেবেছেন? মালিক মানে আমাদের মাথায় সেই কোনকাল থেকে গজাল মেরে ঢোকানো আছে কর্তা, অর্থাৎ বাড়ির প্রধান পুরুষমানুষটি।  Aquaguard কোম্পানি তো স্পষ্ট দুই শিশুর গলায় বলিয়েছে, “আমার বাবা aquaguard লাগিয়েছে বাড়িতে। তোর বাবা?” বিজ্ঞাপন জগতের মনস্তাত্ত্বিকরা এইটুকু সমাজতত্ত্ব জানেন, যে পুরুষের ইগোকে আঘাত করলে অনেক সহজে কাজ হবে। মেয়েদের ক্ষেত্রে আসলে হিংসেটাকেও ছোট করে দেখা হয়। অথচ একেবারে শুরুর দিকে ছাড়া ক’জন পুরুষকে সপতিত্ব সহ্য করতে হয়েছে? পঞ্চ পাণ্ডব এবং হাতে গোনা কিছু উদাহরণ ছাড়া? আর মেয়েদের সপত্নীত্ব? বিয়ে করা অন্য বউ, তাছাড়া আবার উপপত্নী! তার কত রকমফের! সে প্রসঙ্গে তুলছিই না, আপনারা সবাই ভালোই জানেন! অথচ, এমনকী, স্ত্রীর পুরুষ বন্ধুকে সহ্য করতে পারেন না স্বামীরা। এখনও। এই নিয়ে কত সাহিত্যে সিনেমায় গৃহদাহ হয়ে গেছে! এদিকে, স্ত্রীরা স্বামীর অন্য সম্পর্ক তো বটেই, তাদের সন্তানদের পর্যন্ত মেনে নেন শেষ পর্যন্ত।।
এবার দেখব, এক পুরুষের ঈর্ষা কিভাবে পরস্পরের প্রতি অনুরাগে আসক্ত এক দম্পতির জীবনকে কীভাবে বিষময় করে তুলল! মাধুরী আর শাহরুখের একটা সিনেমা মনে আছে? অনজাম? যেখানে নায়িকাকে পেতে তার জীবনটাকে তছনছ করে দেওয়া হয়েছিল? অনেকটা তেমনই গল্প মহাভারতের নল-দময়ন্তীর। অথচ গল্পটা ছিল অনাবিল এক প্রেমকাহিনী।
 নল ছিলেন নিষধদেশের রাজা বীরসেনের পুত্র। রূপবান বীর নানা গুণসম্পন্ন; তার মধ্যে একটি বিশেষ গুণ হল অশ্ব সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান, তাই তাঁর বিশেষণ হল অশ্বকোবিদঃ, যার টীকা করা হয়েছে অশ্বানাং কোবিদঃ হৃদয়জ্ঞ বলে। যুধিষ্ঠিরের তাঁর  সঙ্গে সবচেয়ে বড় মিলটি ছিল অক্ষক্রীড়াপ্রিয়তায়। বস্তুত এই কারণেই বনবাসে এসে যুধিষ্ঠির বৃহদশ্ব মুনির কাছে নলরাজার উপাখ্যানটি শুনতে চেয়েছিলেন।
দময়ন্তী ছিলেন বিদর্ভরাজা ভীমরাজার কন্যা। দমন নামে এক মুনির সেবা করে রাজা-রাণী বর পেয়েছিলেন এক কন্যা, তিন পুত্রের জন্মের। দময়ন্তী, দম, দান্ত আর দমন। এই দময়ন্তীও ছিলেন অনিন্দ্যসুন্দরী।
বাণিজ্যসূত্রে এবং অন্যান্য এই দুই দেশের মধ্যে বেশ যোগাযোগ ছিল। অন্তত পক্ষে দুই দেশের  মানুষেরই দুই দেশে যাতায়াত ছিল। আর বিদর্ভের মানুষ দময়ন্তীর কাছে এসে নলের প্রশংসা করত। আর নিষধদেশের লোক দেশে ফিরে নলের কাছে দময়ন্তীর কথা বলত। পরস্পরের সম্পর্কে শুনতে শুনতে দুজনেরই পরস্পরের প্রতি অনুরাগের জন্ম হল। একদিন নল দময়ন্তীর কথা ভাবতে ভাবতে আনমনেই নিজের অন্তঃপুরের বাগানে কতগুলো সোনা রঙ হাঁস ঘুরছিল, তাদের একটিকে ধরলেন। সে একেবারে তড়িঘড়ি বলে উঠল, “আমাকে মারবেন না রাজা। আমি দময়ন্তীর কাছে গিয়ে আপনার এমন গুণগান করব, যে তিনি আপনাকে ছাড়া আর কাউকে ভাববেনই না”! নল তো তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিলেন তাকে। সেও তার দলবল সহ পাখা মেলল আকাশে! নামল গিয়ে একেবারে বিদর্ভ রাজার অন্তঃপুরে, যেখানে দময়ন্তী সখীদের সঙ্গে ঘুরছিলেন। এত সুন্দর হাঁস হাতের কাছে দেখে মহা আনন্দে সেগুলো ধরতে গেলেন সবাই। এক একটি মেয়ে, এক একটি হাঁসের পেছনে। দময়ন্তী যে হাঁসটির পিছু ধাওয়া করলেন, সে হল সেই বিশেষ হাঁসটি। সে তক্কে তক্কে ছিল, যেই না দময়ন্তী কাছে এসেছেন, অমনি শুনিয়ে শুনিয়ে নলের কথা বলতে আরম্ভ করল, “আপনিও নারীদের মধ্যে রত্ন, তিনিও পুরুষদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এই মিলন হলে তা  হবে যোগ্যতমের সঙ্গে যোগ্যতমার মিলন”! ৩১তম শ্লোক, বনপর্ব, খণ্ড সাত,পৃঃ ৪৮৩। 
হাঁসের কাছে নলের সৌন্দর্য্যের কথা শুনে অবধি তো দময়ন্তীর উচাটন অবস্থা। না পারছেন ঠিক করে খেতে, না পাচ্ছেন ঘুমোতে। রাধার পূর্বরাগের অবস্থা। শরীর পর্যন্ত রোগা হয়ে যেতে লাগল!
 প্রকৃত মিলনের আগে নায়কনায়িকার পারস্পরিক দেখা থেকে মিলনের তীব্র যে আকাঙ্ক্ষা জাগে, তাই পূর্বরাগ। এখানে দেখা হয় নি ঠিকই, কিন্তু শোনা তো হয়েছিল! পূর্বরাগের কতগুলি  symptom আছে। নিজেরাও যে যার প্রেমপর্বের শুরুটা একটু মনে করুন, কেমন ছিল সেই দিনগুলো, যখন মন খালি গাইত “মিলন হবে কত দিনে আমার মনের মানুষের  সনে…..”! মিলিয়ে নিতে পারেন রাধার লক্ষণগুলির সঙ্গে, বুঝতে পারবেন আপনার পূর্বরাগ হয়েছিল কিনা! বৈষ্ণব পদাবলিতে শ্রীরূপ গোস্বামী একেবারে ধরে ধরে এই প্রেমরোগের লক্ষণ বলেছেন। ব্যাধি শঙ্কা অসূয়া শ্রম ক্লান্তি নির্বেদ ঔৎসুক্য দৈন্য চিন্তা নিদ্রা জাগরণ বিষাদ জড়তা উন্মাদ মোহ ও সব শেষে মৃত্যু।
মনস্তত্ত্ব নিয়ে কত কথা বলি না আমরা! মনস্তত্ত্ব শুধু পাশ্চাত্যের অবদান! এমন প্রেমের ভাগ, প্রতি পর্বের লক্ষণ আছে সেখানে? এমনকী শেষ পর্যন্ত  depression এবং inertia, madness, dementia, delution আর মৃত্যু, আর এই মৃত্যু suicide ছাড়া আর কী,এই প্রতিটি মানসিক অবস্থার বিবরণ! আর প্রতিটি অবস্থার সংজ্ঞা পর্যন্ত। আগ্রহীরা উজ্জ্বলনীলমণি বইটি পড়ে নেবেন দয়া করে।
বিদর্ভরাজকুমারী দময়ন্তীর শুরু হল ব্যাধি শঙ্কা জাগরণ ক্লান্তি ঔৎসুক্য চিন্তা দৈন্য। বাবা মেয়েকে দেখে বুঝলেন এইবার তার বিয়ের আয়োজন করতে হবে, মেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।
 রাজারাজড়াদের নেমন্তন্ন করা হল। মহা আড়ম্বরে তাঁরা সব এলেন। এমনকী দেবরাজ ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণ প্রভৃতি লোকপাল দেবতারা পর্যন্ত দময়ন্তীকে পেতে ইচ্ছে করে তাঁর স্বয়ংবর সভার দিকে যাত্রা করলেন। যেতে যেতে পথে, দিনের আলোতে তাঁরা সূর্য্যের মত প্রভাযুক্ত নলকে দেখে বুঝলেন, ইনি যদি প্রতিযোগী হন, তাহলে তো আমরা গেলাম! কী করা যায় তাহলে! এত সহজে হাল ছেড়ে দেবেন! দেবতা হয়ে! তাঁরা নলকেই ডাক দিলেন আর বললেন, “ভাই, আমরা হলাম গিয়ে ইন্দ্র অগ্নি বরুণ আর যম। আপনি দময়ন্তীকে গিয়ে বলুন এঁদের একজনকে বিয়ে করতে, আমরা চারজনেই ওঁকে প্রাপ্তুম্ ইচ্ছন্তি”।
কী বিপদেই না পড়লেন নল!  দূরে থেকেও যার প্রতি তীব্র অনুরক্ত, তাঁর স্বয়ংবর সভায় যাচ্ছেন, মনে মনে জানেন দময়ন্তীও তাঁকে ভালো বেসে ফেলেছেন; অথচ দেবতারা এসব কী অলক্ষুণে কথা বলছেন! বেচারা নল নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। বললেন, “আমিই তো যাচ্ছি তাঁকেই পেতে। সেই আমি কি করে অন্য কোনো পুরুষের কথা বলব! এ হতে পারে নাকি!”
দেবতারাও ছাড়বার পাত্র নয়। আসলে দেখা হতেই নল ভদ্রতা করে বলেছিলেন “আপনাদের জন্য কি করতে পারি”? সেই কথাটি বলে দেবতারা বললেন, “এই তো একটু আগে আমাদের কাজ করবেন বলেছিলেন, এখন পিছু হটছেন কেন? আপনাকে এই কাজটি করতেই হবে। অতএব এক্ষুণি যান। মা চিরম্! দেরী করবেন না একটুও”!
এই জন্য বলে ক্ষমতাবান আর কূটনৈতিক লোকের সঙ্গে আগ বাড়িয়ে ভদ্রতাও করতে নেই!!! তাঁরা নলকে অদৃশ্য হওয়ার শক্তি পর্যন্ত দিলেন, যাতে নল পৌঁছে যেতে পারেন সরাসরি দময়ন্তীর কাছে। নলের উপায়ন্তর রইল না!
এইখানে একটা কথা মনে না এসে পারে না! অম্বা দময়ন্তী শকুন্তলা হিড়িম্বা প্রভৃতি বহু মেয়েকেই দেখি কাউকে ভালোবাসলে তা সবার সামনে বলতে, তাবড় তাবড় অন্য পুরুষকে প্রত্যাখ্যান করতে এতটুকু দেরি করে না! ছেলেরা এত মিনমিনে কেন! শাল্ব কেন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন অম্বাকে? রাম প্রজাদের কথা শুনলেন, নিজে কেন সিংহাসন ছাড়ার হুমকি দিলেন না? প্রজাদের ফিসফিসানি মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যেত! দুষ্মন্ত তো জেনে বুঝেই সব করেছিলেন, শুধু শকুন্তলার তেজটাকে হিসেবে ধরেন নি! হিড়িম্বার সবার সামনেই ভীমকে ভালোবাসার কথা শুনে কুন্তী আর যুধিষ্ঠির ভীমকে ছেড়ে দিয়েছিলেন কিন্তু। দেখুন, সেই অর্থে পাণ্ডবদের প্রথম বিবাহ এক বনেচর রাক্ষসজাতির মেয়ের সঙ্গে। নিম্ন শ্রেণীর মেয়ে বলে নাক কোঁচকান নি তো তাঁরা!
সত্যি বলতে কি মহাভারতে পুরুষের প্রত্যাখ্যানের যে জ্বলজ্বলে একটি কাহিনী আছে, সেটি অর্জুনের। যে অর্জুনকে আমরা lady killer বলে থাকি, সোজাসাপটা এখনকার ভাষায় বললে মেয়েবাজ, সেই অর্জুন কিন্তু পরিপূর্ণ সুযোগ পেয়েও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরীকে না করেছিলেন!

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত