| 16 এপ্রিল 2024
Categories
অন্যান্য খেলা ইতিহাস খেলাধুলা

রজার ব্যানিস্টার: হাজার বছরের দেয়াল ভাঙার আখ্যান

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

প্রাচীন অলিম্পিয়ায় দৌড়কে স্পোর্টস ইভেন্ট হিসেবে যোগ করা হয়। সেটা যিশুখ্রিস্টের জন্মের ৭২০ বছর আগের ঘটনা। এরপর পেরিয়ে যায় দুহাজার বছর। কিন্তু দৌড়কে কেন্দ্র করে একটা বিশেষ অর্জন অধরাই থেকে যায়। চেষ্টা করেছেন অনেকেই। কিন্তু সাফল্য তাদের কাছে ধরা দেয়নি। যুগে যুগে শীর্ষ দৌড়বিদরা আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। হাল ছেড়ে দিয়ে শেষে বলেছেন, ‘কঠিন নয়, বিপজ্জনক নয়, বিলকুল অসম্ভব।’
তাত্ত্বিক, স্বাস্থ্যবিদ কিংবা বিজ্ঞানীরাও সায় দিয়েছেন তাতে। বলেছেন, মানুষের যে শারীরীক কাঠামো, তাতে চার মিনিটের কমে এক মাইল অতিক্রম করা অসম্ভব! মানুষের পায়ের পেশির শক্তি ও ফুসফুসের সামর্থ হবে না এই দুরত্ব অতিক্রম করার। তাহলে?

অ্যাথলেটিকসের দুনিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এক মনস্তাত্ত্বিক ‘দেয়াল’ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হাজার বছর ধরে পাথুরে দাঁত বের করে বলছিল, ‘পারবে না হে। চার মিনিটের কমে এক মাইল পেরোনো মানুষের কম্মো নয় !’ সময়ের হাত ধরে একটা দ্বিধাগ্রস্থ ‘মিথের’ মতো এই ধারণা ঘুরে বেড়িয়েছে। অ্যাথলেটদের অনবরত নিরুৎসাহিত করেছে।
অবশেষে এই ‘দেয়াল’ গুড়িয়ে যায় ১৯৫৪ সালে। তারিখটা ছিল ৬ মে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রেকর্ড ভাঙা একটি দৌড়ের জন্য যে আদর্শ পরিবেশ প্রয়োজন তাতে বাতাসের দাপট থাকবে না, পথ হবে শুকনো, অ্যাথলেটদের উৎসাহ দেবার জন্য অসংখ্য দর্শকের সমাবেশ থাকবে সেখানে। কিন্তু দিনটা ছিল এর বিপরীত। ঠান্ডা স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া, পথ ভিজে আছে পানিতে, কনকনে বাতাস বইছে। দর্শক হবে বড় জোর হাজার তিনেক। রঙ্গম যখন এভাবে সাজছে, আমাদের ঘটনার নায়ক তখন মেডিকেলে ডিউটি করছেন।
যখন তিনি রেসট্রাকে পৌঁছালেন, গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। দমকা হাওয়ায় মেঘগুলো নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে। তিনি একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, ‘‘আমি আজ যা করতে চাই তা মানুষের সাধ্যের বাইরে। আমার পায়ের পেশিতে যদি না কুলায়, তবে আমার হৃদয় আমার শরীরকে সামনে এগিয়ে নিযে যাবে। এই দৌড়ে যদি আমার মৃত্যুও ঘনিয়ে আসে, তবে ইতিহাস রচনা করেই ফিনিশিং লাইনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবো।’’
আমাদের এই ঘটনার নায়কের নাম রজার ব্যানিস্টার। জন্মেছিলেন লন্ডনের এক খেটে খাওয়া সাধারণ পরিবারে। ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখতেন, ডাক্তার হবেন, মানুষের সেবা করে কাটাবেন পেশাদারী জীবন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সঙ্গতির কথা ভেবে খারাপ লাগতো তার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ চিকিৎসক হবার স্বপ্নকে আরো আলোড়িত করে। কিন্তু যুদ্ধের তান্ডব আর ক্ষয়ক্ষতি তাঁর কষ্টের পরিমাণকে বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি ।
হাইস্কুল পড়ুয়া রজার দৌড়ে বিশেষ প্রতিভা দেখান। একজন অপেশাদার দৌড়বিদ হিসেবে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এই ‘দৌড়দক্ষতা’ তাকে স্বপ্ন পূরণে সহযোগিতা করে। পেয়ে যান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ। ১৯৪৮ সালের অলিম্পিকের দৌড়ের ইভেন্ট তাঁকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে। অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা শুরু করেন তিনি। ততদিনে যুদ্ধবিদ্ধস্ত ব্রিটেনের তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে রজার পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
১৯৫২ সালের অলিম্পিক এগিয়ে এলে প্রত্যাশার পারদও চড়তে থাকে। ১৫০০ মিটারে সোনা এনে দেবেন রজার, এমনই প্রত্যাশা দেশবাসীর।
কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। অলিম্পিক কমিটি একদম শেষ মুহূর্তে ইভেন্টের সময়সূচি বদলায়। ফলে রজারের ব্যায়াম ও বিশ্রামের সিডিউল ব্যহত হয়। সোনার পদক জেতার বদলে রজার দৌড় শেষ করেন চতুর্থ অবস্থান নিয়ে। হতাশা ঘিরে ধরে তাঁকে। সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলেন, দৌড় নামক ভালবাসা থেকে অনেক দূরে সরে যাবেন।
দু’মাস হতাশার সাগরে হাবুডুবু খাওয়ার পর নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। ভাবলেন, এমন কিছু করবেন যা আগে কেউ কখনো করেনি। দৌড়কে ঘিরেই আবার নতুন করে ভাবতে থাকলেন তিনি। সামনে এগিয়ে যেতেই পেয়ে গেলেন সেই ‘দেয়ালের’ দেখা। চার মিনিটের কম সময়ে যে দেয়াল কেউ অতিক্রম করতে পারেনি কখনো।
ততদিনে ডাক্তার হবার পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছেন। নিজেই নানারকম পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে বুঝতে পারলেন, চার মিনিটের কম সময়ে এক মাইল পাড়ি দেয়া সম্ভব। কিন্তু তার মতো অখ্যাত মেডিকিল স্টুডেন্টের কথা সবাই হেসে উড়িয়ে দিল। কিন্তু তাতে মোটেও দমে গেলেন না রজার। নিজেই গবেষণা করে উদ্ভাবন করলেন অনুশীলনের নতুন উপায়। সেভাবেই নিজেকে গড়ে তুললেন তিনি।
তারপর এলো সেই বিশেষ দিনটি। ছয়জন প্রতিযোগীকে ফেলে তিনি যখন ফিনিশিং লাইন ছুঁয়েছেন , তখন মাইকে ঘোষক বলছিল, ‘ইট ওয়াজ থ্রি…’। বাকিটা দর্শকদের উল্লাসে চাপা পড়ে গিয়েছিল। হাজার বছরের দেয়াল ভাঙ্গার জন্য মানুষ তাকে আন্তরিক আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিয়েছিল। এক মাইল পার হতে রজার সময় নিয়েছিলেন ৩ মিনিট ৫৯.৪ সেকেন্ড।


এই অসাধ্য সাধনের পর রজার একজন বিশেষজ্ঞ নিউরোলজিস্ট হন। নার্ভাস সিস্টেমের উপর গবেষণায় অসামান্য অবদান রাখেন। তাঁর এসব অসামান্য কীর্তির জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে ‘স্যার’ খেতাব দেয়।
বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) প্রশিক্ষক আবদুল্লাহেল কাফি বলেন, ‘একজন অ্যাথলেটকে অবশ্যই শারীরীক সক্ষমতার পাশাপাশি মানসিক শক্তি বাড়াতে সচেষ্ট হতে হবে। দূরপাল্লার দৌড়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় ৪০ কিলোমিটার পার হবার পর এক ধরণের সমস্যার মুখোমুখি হয় অ্যাথলেট। আমরা এটাকে বলি ‘ম্যারাথন ওয়াল’। শারীরীক এবং মানসিক শক্তির সমন্বয় না থাকলে এই ম্যারাথন ওয়াল পার করা কঠিন হয়ে পড়ে একজন অ্যাথলেটের পক্ষে।’
যে জুতো পরে সেই ‘দেয়াল’ ভেঙেছিলেন রজার সেটা ক্যাঙারুর চামড়ায় তৈরি। জুতোর তলায় বসানো আছে ছয়টি পেরেক। দেখতে সাধারণ হলেও সেটার মালিক আর তাঁর অসামান্য কীর্তির কথা এখন জেনে গেছে সবাই। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে জুতোজোড়া নিলামে ওঠানো হয়েছিল। নিলামকারী প্রতিষ্ঠান ক্রিস্টির ধারণা ছিল, সর্বোচ্চ ৫০ হাজার পাউন্ড দাম পাওয়া যাবে ওগুলো থেকে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে জুতোজোড়ার দাম উঠল ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫শ পাউন্ড! ক্রেতা নিজের নাম প্রকাশ করেননি।


রজার অ্যাথলেটিকস থেকে পাওয়া সবগুলো ট্রফি আগেই প্রদর্শনীর জন্য দিয়েছিলেন অক্সফোর্ডেও পেমব্রোক কলেজকে। সেখানে তিনি স্নায়ুবিদ্যা পড়াতেন। আর নিলাম থেকে পাওয়া অর্থ তিনি দিলেন অটোমেটিক চ্যারিটেবল ট্রাস্টকে। এই দাতব্য সংস্থাটি স্নায়ুবিদ্যা গবেষণাকে উৎসাহিত করে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত