উপনিবেশিত মন ও মনন : আত্মকথনের খসড়া

প্রস্তর-সদৃশ ভাবনাসমূহ প্রকাশের আগে শিশুতোষ একটি গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। গল্পটি খুব ছোট বেলায় পঠিত এবং যথারীতি রচয়িতার নামও বিস্মৃত। ‘লালসালু’ উপন্যাসে বর্ণিত মজিদের দেশের মতোই বাংলাদেশের নিরাক-পড়া কোন গ্রাম গল্পটির প্রেক্ষাপট। সেই গ্রামের এক বালক দারিদ্র্যে-দুর্দশায় ম্রিয়মান, উদ্দেশ্যহীন জীবন-যাপন করে। বাড়িতে অসুস্থ মা ও বোনের সংসারটি একটি মাত্র মুরগির ডিম বিক্রিতে প্রতিপালিত হয়।
 
 
সে সারাটাদিন নদীর ধারে অজানা কোনো ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বসে থাকে। একদিন সেই নদী বেয়ে ভিনদেশি নৌকায় চড়ে এক বাজিকর আসে। সারাদিন সে চোঙা ফুঁকে মানুষকে আকৃষ্ট করে জিনিসপত্র বিক্রি করে। ভিড় সরে গেলে বাজিকর বালকের উৎসুক দৃষ্টি অনুসরণ করে যাবতীয় খোঁজ খবর নেয়।
 
সবকিছু শুনে জানায়, ঐ মুরগিটা এনে দিতে পারলে বালককে সে খুশি মতো জিনিশ নিতে দেবে। পরিবারটির বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনটি বালক এনে তুলে দেয় ভিনদেশি বাজিকরের হাতে। কিন্তু বাজিকর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। বালকের পছন্দের পাথর-বসানো বাটঅলা এক ভোজালি দিতে সে অস্বীকৃতি জানায়।
 
বলে, যে ছেলে পরিবারের অবলম্বন অন্যের হাতে তুলে দিতে পারে, সে-তো ঐ ভোজালি দিয়ে বাজিকরকেই এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিতে পারে। দু’চারটা প্লাস্টিকের খেলনা তার হাতে তুলে দিয়ে সে নৌকায় উঠে যায়। সঙ্গে করে নিয়ে যায় বালকের বেঁচে থাকার অবলম্বন। অবশ্য অনেক অনেক প্রতিশ্রুতিও সে দেয়।
 
পরবর্তীবারে এসে আরো অনেক কিছু দেয়ার জন্য। সাথে এও মনে করিয়ে দেয় যেন আরো ভালো কিছু জোগাড় সে করে রাখে। বালক নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আস্ফালন করতে থাকে, ভুল বুঝতে পেরে অভিসম্পাত করতে থাকে। কিন্তু নৌকো ততক্ষণে মাঝ নদীতে ভেসে পড়েছে।
 
দুই.
গল্পের বাজিকরের মতোই সমুদ্রের ওপার থেকে বারংবার ভিনদেশি বণিকেরা লুট করে নিয়ে গেছে সম্পদ, সৌন্দর্য, সমৃদ্ধি। দিয়েও গেছে, অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে হীনম্মন্যতা-উচ্চম্মন্যতা মিশ্রিত এক জটিল রসায়ন যাকে আমরা বলছি উপনিবেশিত মন।
 
বাণিজ্যিক প্রয়োজনে ভাষা রপ্ত করতে গিয়ে বৃটিশ আমলাগণ বাংলা ভাষার অবহেলিত-অপরিপক্ক গদ্য-ব্যাকরণের কাঠামোকেই পুনর্নির্মাণ করেছিলো। প্রকারান্তরে এই দানের পরিবর্তে তারা তাদের ভাষার আজীবন গোলামি চুক্তি নীরবে সম্পাদন করে নিয়েছিল। হ্যালহেড শ্রীরামপুর- আসঁসুম্পসাঁও-ফুলমনি ও করুণা।
 
অর্থাৎ গদ্য-ব্যাকরণ-ছাপাখানা-উপন্যাস মিলে সম্পূর্ণ ভাষার শরীরী দখলের ইতিহাস রচনা করে তারা। বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ প্রণীত হয়েছিলো ইংরেজি ভাষায়। বিদেশির হাতে। ইঙ্গিতবহ প্যারাডক্স। আচিরকাল শাসিত থাকবার। প্রসারিতদৃষ্টি বৃটিশ-মস্তিস্ক কবিতার কৌমার্য পরিহার করে কঠোর কঠিন গদ্যে মনোনিবেশ করেছিলো।
 
গদ্য প্রয়োজনের ভাষা-বাণিজ্যের ভাষা। পলাশীর আম্রকাননে আমাদের পক্ষ থেকে র্যা পিং কাগজে মুড়ে স্বাধীনতা নামক উপহার প্রদানের শুরু। ক্রমেই তা রাজনীতি ও রাজনীতির বাণিজ্যকে মূল ভিত হিসেবে রেখে সম্প্রসারিত হলো শিল্প-সাহিত্য-ভাষা-সংস্কৃতির মতো মৌলিক ও সুদূরপ্রসারী উপাদান কুক্ষিগতকরণে।
 
শিল্পের নির্মাণ বা হয়ে ওঠার মান নির্ধারণ এক অমীমাংসিত বিষয়। উপনিবেশ-আবিষ্ট সাহিত্যে বিষয়ের পরিবর্তে ভাবের আধিক্য, সমষ্টির বদলে জায়গা করে নিলো ব্যক্তি; বিচ্ছিন্ন, আত্মকেন্দ্রিক ছায়া যেন দ্রুত গ্রাস করে নিল উপনিবেশকাল অতিবাহিত হবার পর। সহজিয়া গান ও কবিতার দর্শক-শ্রোতামুখিতার চাইতে অহংকারী একাকীত্ব আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিতে চাইলো নব্য বাঙালি সংস্কৃতি।
 
স্বভাবতই মৌখিক ভাষাকে অস্বীকার করে প্রতিষ্ঠান বা বাবুদের অফিস করার পদক্ষেপ হিসেবে স্যুট-বুটের মতো কৃত্রিম, ভিন্ন ঋতুতে মানানসই পোশাকের মত ভাষারও এক জবরদস্তিমূলক শ্রেণীভাষার আঙরাখা তৈরি হলো। আলালী-হুতোমী ভাষাকে পাশ কাটিয়ে উপনিবেশ রাষ্ট্রের গৃহীত পরীক্ষায় পাশ করা বঙ্কিম এবং উপনিবেশ ধর্মে দীক্ষিত মাইকেলের হাতে কৃত্রিমতা আরোপের প্রারম্ভ।
 
কেরীর পাঠশালায় পণ্ডিত বিদ্যাসাগর হেডপণ্ডিতি করতে গিয়ে ‘বিপদ’ আর ‘আপদে’র পার্থক্য টের পান হাড়ে হাড়ে। অবশেষে একদিন কানে ধরে মাস্টার ঈশ্বরচন্দ্র সাঁওতালপল্লীতে নির্বাসনে চলে যান। মাস্টারদের ‘কানে-ধরা’ পর্ব চলমান থেকে যায় অদৃশ্য উপনিবেশ বসতিতে।
 
ঔপনিবেশিক ক্ষমতা (Empowerment) বদলে দেয় ভাষার অর্থগত (Semitics) ভিত্তিভূমিও। ‘আমারও দেশেরও মাটির গন্ধে’ এখন আর মন ভরে ওঠে না। বরং কোন কিছু নষ্ট হলে তাকে আমরা ‘মাটি হওয়া’ বলি। কালো ছেলের গায়ের রঙে আকাশ আর আলো হয়ে ওঠে না। কালো রাতগুলো ক্রমেই ‘কালরাতে’ পরিণত হয়।
 
বাঙালির পাতের ভাত যদিও তেতো দিয়ে শুরু হয়, পান্তায় নুন লাগেই, অথচ ‘কষ্টকর অভিজ্ঞতা’গুলো উপনিবেশ-আবেশে আবিষ্ট হয়ে ‘তিক্ত অভিজ্ঞতা’য় (Bitter experience) রূপ নেয়।
 
এক সময়কার উচ্চস্বরে বাজনা (Loud speaker) শোনা চারপাশকে অতিষ্ঠ বিরক্ত করে তোলা রকবাজ তরুণেরা হেডফোনে তাদের জগৎ গুটিয়ে নিয়েছে। তাই প্রতিবাদের বদলে নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিও করে তারা।
পশ্চিমা কূটনীতি এক সময় তৃতীয় বিশ্বের এই তরুণদের হাতে মাদক তুলে দিয়েছিলো। ভোক্তাকে পুরোপুরি ধ্বংসের পথে ঠেলে দিলে পণ্যের বাজারও সংকোচনের অর্থনীতি মেনে চলে।
 
সেক্ষেত্রে ভালো, ধোলাইয়ের (Brain wash) চাইতে নিষ্ক্রিয়করণ (Brainfaging)। মাদকের পরিবর্তে এলো প্রযুক্তি। ফেসবুক, ইউটিউব, গেমস জোন। এবার আর বয়সেরও সীমারেখা রইলো না। শূন্য থেকে অসীম। ব্যবসা তাদেরই রইলো, বরং উঠলো বেড়ে। প্রযুক্তির চাবিকাঠি তাদেরই হাতে।
 
কিন্তু মনোহারী খেলনাগুলো যুবা-বৃদ্ধ সকলের চিত্তকেই শিশুতোষ করে তুললো। অধুনা নাৎসী পরিকল্পিত এও এক গ্যাস চেম্বার। হিরোশিমার আগুন নেই, চেরনোবিলের প্রত্যক্ষ তেজষ্ক্রিয়া নেই। ইন্দ্রিয়সমূহ চাবিটেপা খেলনার ভেতর জিম্মি। এই শিশুদের বয়স আর পরিপক্ক স্তরে পৌঁছালো না। মনোহারী খেলনায় তারা যুদ্ধ ও প্রতিবাদের গেম খেলে জিঘাংসা মেটায়।
 
ভুল বানানে, ভুল ছন্দে গদ্য-পদ্য লেখে। এমনকি লোককবি কিংবা বাউলেরাও যে যথেষ্ট পরিমাণ ছন্দজ্ঞান, দেহতত্ত্ব-জ্যোতিষশাস্ত্র সংক্রান্ত পাণ্ডিত্য অর্জন করে নিজস্ব শব্দভাণ্ডারের দক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমেই শিল্পের ভুবনে বিচরণ করতেন তা আজ প্রমাণিত। উপনিবেশিত ছাঁচে ফেলা ইতিহাস তো তাদের আধুনিক-পূর্ব তথা অনাধুনিক-মধ্যযুগীয় বিভাজনে অধঃপতিত করে রেখেছে।
 
সামষ্টিক জনতা হয়ে ওঠেছে ‘শ্রেণীরুচির’ কাছে ‘আদার পিপল’। শেকড়বিচ্ছিন্ন মজিদ অথবা হোসেন মিয়া, ডা. শশী অবিরলভাবে আমাদের স্বপ্নের নায়ক হয়ে উঠতে থাকে। কামুর নায়ক মারসল বা রিওর মতো। মজার কথা হলো প্রযুক্তির কাছে সংস্কৃতি বিলীয়মান হয় না। তাই পাশ্চাত্য রীতিতে উচ্চাসন বিশিষ্ট পয়োধার বহুল প্রচলিত হয়ে ওঠে, কিন্তু টিস্যু পেপারের ব্যবহার মোটেই নয়।
 
তিন.
যে-কোন ধর্মের সঙ্গেই মূলত নৈতিকতার প্রশ্নটি জড়িত থাকে। মুশকিল হয় তখন, যখন ধর্মের নৈতিকতার সঙ্গে সংস্কৃতির নৈতিকতার বিরোধ সৃষ্টি হয়। এদেশে অতীতে এবং বর্তমানে অসংখ্যবার এই সাংঘর্ষিক মুহূর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ধর্ম এবং রাষ্ট্র যৌথভাবে কখনো কখনো সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, ষাটের দশকের রবীন্দ্র-বিরোধিতা অথবা সমকালের ‘ভাস্কর্য বিতর্ক’ এর প্রমাণ।
 
অথচ সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠানও অনেক সময় ধর্মীয় কাজের অনুষঙ্গ হয়ে উঠতে পারে। যেমন গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। আবার ধর্মীয় অনুষ্ঠানও হয়ে উঠতে পারে সর্বজনীন সংস্কৃতি। যেমন শবে-বরাত বা দুর্গাপূজা। অথচ পহেলা বৈশাখের মত ধর্মনিরপেক্ষ অনুষ্ঠানও বিতর্কিত করে তোলার চেষ্টা চলছে। এই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কারণ ও ফলাফল পুরোপুরিই অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যনির্ভর। যার শুরুটাও ব্রিটিশদেরই হাতে।
 
‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নামে। এতদঞ্চলীয় রাজনীতির সঙ্গে ধর্ম ও ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা এভাবেই একসূত্রে গ্রথিত হয়ে যায়। ব্যবসাকে বাঁচিয়ে প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে ‘লালসালু’ উপন্যাসের ধর্ম ব্যবসায়ী মজিদ আর পুঁজিপাতি গ্রাম্য মাতবর খালেক ব্যাপারিদের মতো কিছু সংগত সম্পর্কের যোগসাজশ একাট্টা হয়ে চিরকালের গাঁটছড়া বাঁধে।
 
তাই স্বাধীনতা প্রাপ্তিতেও, চির-উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর ভাগ্যরেখা ধর্ম, পুঁজি কিংবা নব্য সামন্তের হাতেই জিম্মি থেকে যায়।
 
সংস্কৃতিকে আঘাত করবার সহজতম পন্থা হলো একীভূত লোকবিশ্বাস বা লোকধর্মের ভিতর সন্দেহ ও বিদ্বেষ প্রবিষ্ট করা। তাই মানুষকে আঘাত করার চাইতে সহজ পান্তা-ইলিশ, হালুয়া-রুটি, গরু-শূকর, শাঁখা-সিঁদুর কিংবা তুলসী গাছের মতো প্রতীকের উপর ক্রমাগত বিতর্ক সৃষ্টি করে রাখা।
 
মেকলে প্রণীত শিক্ষা ব্যবস্থার গোলামিকে জোরদার করতে, শিক্ষার মানকে আরো অধিক অবনমিত করতে থাকা। রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোকে অস্থিরতার মাধ্যমে পুরোপুরি সচল হতে না দেয়া।
 
আমরা কি তবে আত্মপ্রবঞ্চক জাতি? নিজেকে ক্রমাগত ঠকিয়ে যাচ্ছি? আমার আমিকে স্তোকবাক্যে ভুলিয়ে রেখে এক অবিমৃষ্য বিচ্ছিন্নতার ছায়ার ভেতর ক্রমেই বিলীয়মান আমাদের অস্তিত্ব।
 
১৮৩৪ সালে টমাস ব্যাবিংটন মেকলের নেতৃত্বে প্রথম আইন কমিশন ভারতীয় দণ্ডবিধির খসড়া তৈরি করে। মেকলে বলেছিলেন ‘এই শিক্ষাব্যবস্থা এমন এক অনুগত কর্মচারী সৃষ্টি করবে যারা রক্তে-বর্ণে ভারতীয় অথচ রুচি-নীতি-বুদ্ধিতে ইংরেজের মত আচরণ করবে।’
 
মেকলে-ক্লাইভ প্রমুখের বিদায়ের দ্বি-শতবর্ষ সমাগত, এবং আমাদের রাষ্ট্রকাঠামো, আইন, শিক্ষা কমিশনের একাধিক সংস্কার সাধিত হলেও মেকলে প্রদত্ত ভারতবর্ষের সেই সুদূর প্রসারী নীলনকশার কোনো পরিবর্তন কি দৃশ্যমান হয়েছে আজো?
 
সময়ের ও ক্ষমতার পরিক্রমায় ভৌগোলিক পরিবর্তনে ভারতবর্ষের স্থানে বাংলাদেশ, ইংরেজের পরিবর্তে আমেরিকা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু শোষিত-ব্যবহৃত এবং ব্যবহৃত হতে হতে শূকরের মাংস বনে যাওয়া বাঙালির স্বাজাত্যবোধ, দেশপ্রেম, প্রতিবাদ, শত্রু-মিত্র চেনা ও চেনানোর পরিসীমা ইত্যাকার বিষয়গুলোর সঙ্গে বাঙালি জাতি নিজের জীবনের পরিসরে এখনো সমঝোতায় আসতে পারেনি।
 
তাই পৃথকভাবে সমস্যার প্রতিবাদে স্ফূলিঙ্গ জ্বলে ওঠে, নিভেও আসে আচমকা। আর এই জ্বলে ওঠাটা যেন ‘লালসালু’র জমিলার মতো ইনস্ট্যান্ট, অনুভূতিতাড়িত। পরিস্থিতি বিবেচনাপ্রসূত নয়। কাজে কাজেই মজিদের ঘরেই প্রতিবাদ শেষে পূর্বাপর ভাবনা ছাড়াই জমিলা পুনরায় ঘুমিয়ে পড়তে পারে। সমস্যার ঐতিহাসিক সূত্রে বিশ্বায়নের সঙ্গে সমন্বিতভাবে ভাববার বৌদ্ধিক চর্চা ক্রমশ বিলুপ্তির পথে।
 
বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে রয়েছে সুদীর্ঘ শোষণ আর প্রতারিত হবারও ইতিহাস। প্রতারিত জাতির পায়ে থাকে স্পার্টাকাসের মতো শেকলের দাগ, চোখে-মুখে সার্বক্ষণিক ঘৃণা-অভিযোগ আর অসহিষ্ণুতার কুঞ্চন। ঔপনিবেশিককাল থেকেই শান্তিপ্রিয় বাঙালি যতটা যুদ্ধ আর প্রতিবাদ করেছে, ফলাফলে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা অসারতায় পর্যবসিত হয়েছে, সামগ্রিক সমন্বয় আর পরশ্রীকাতর অভিযোগসর্বস্বতায়।
 
কেবল মীরজাফর আর ক্লাইভ নামক অবিসংবাদিত দুই প্রতারকের উদাহরণ টানা যাক। মীরজাফর আলী খান বিক্রি করেছিলো নিজ দেশকে, কিন্তু ক্লাইভ স্মরণকালের প্রতারণাটি করেছিলো নিজ দেশের স্বার্থে, অন্য দেশের সঙ্গে। তথাপি ক্লাইভ নিজ দেশে তার কী পুরস্কারটি পেয়েছিল? দুর্নীতির দায়ে তাকে বিচারের কাঠগড়ায় উঠতে হয়েছিল। সমস্ত সম্পদের বিনিময়ে রেহাই পেতে চেয়েও বিচার কাজ বন্ধ করা যায়নি।
 
বিশ্বাসঘাতক, প্রতারক ক্লাইভ অপমানবোধে ক্ষুর দিয়ে গলা কেটে আত্মহত্যা করে। এদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, কিংবা দোষারোপের রাজনীতি নামক অপচর্চার শুরু আদ্যিকালের বদ্যিখুড়োর যুগ থেকেই। আমরা অবশ্য মীরজাফর আলীকে শাস্তি দিতে না পারলেও তার নামকে শাস্তি দিয়েছি।
 
আগামী কয়েক’শ বছরেও এই নামটি আমাদের কাছে অশেষ ঘৃণার প্রতীক হয়ে থাকবে। আর আমরাও ক্রমেই ব্যক্তিকে ভুলে গিয়ে নামকে ঘৃণা করব, কখনো পূজা-স্তুতি-স্তব অর্পণ করব কেবলি নামের প্রতি।
 
এতসব নেতিবাচকতা সত্ত্বেও জাতিগতভাবে অসাধারণ আবেগপ্রবণ সহজিয়া ধর্মাচরণে বিশ্বাসী, অভাবে-পরিশ্রমে, সুরে-সঙ্গীতে প্রকৃতির সন্তান এতদঞ্চলের প্রাকৃতজন। মধ্যযুগেও কালকেতু-পত্নী ফুল্লরা, আইহন-পত্নী রাধিকা হাটে গিয়ে পশরা নিয়ে বসেছে। পথে-ঘাটে কৃষ্ণ নামক উত্যক্তকারী বালকদের মোকাবেলা করেছে।
 
আজো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বৃহৎ একটি অংশের দায়িত্ব সামাল দিচ্ছে নারী। অথচ উপনিবেশ-সৃষ্ট মধ্যবিত্ত স্পর্শকাতর শ্রেণীটিই আজ নারীর পোশাক, চলা-ফেরা, ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক বিধি-নিষেধ, চারিত্রিক মাপজোক ইত্যাদি বিষয়ে ভাবিত।
 
মেকলে শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের অস্তিত্বকে দ্বিধাবিভক্ত করতে চেয়েছিল। আজ আমরা যে কোনো পরিস্থিতিতেই দ্বিধাবিভক্ত হতে প্রস্তুত। তাই নারী কখনো বন্দি হয়ে শ্বাসরুদ্ধ, কখনো পণ্য হয়ে। এই লেখাতেও দোষারোপের রাজনীতিরই চর্চা হলো। দোষারোপ ক্রিয়াশীল স্ব-অস্তিত্বের প্রতি। গরিমাপ্রবণ, নিজেকে ভোলানো বাঙালির যাপিত-জীবনের প্রতি।
 
হ্যামিলনের বাঁশিতে ভুলতে থাকা নিদ্রামগ্ন গড্ডলপ্রবাহের প্রতি। এবং দোষারোপের প্রতি দোষারোপ। মানলাম ব্রিটিশ-পাকিস্তানি-মার্কিনরাই দায়ী। দায়ী আফিম প্রদায়ক। কিন্তু আফিমগ্রহীতার কি কোনো দায়বদ্ধতা নেই? বাজিকরের সম্মোহন-প্রতারণা অবশ্যই অপরাধ। কিন্তু সম্মোহিত-প্রতারিত হওয়া যে মূর্খতার অধিক অপরাধও, ভালোমানুষীর মোড়কে তা আর কতকাল পরিবেশিত হবে।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত