রুদ্র, এখনো কি আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখেন?

রেহেমান মুস্তাফিজ

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে বলা হয় দ্রোহ এবং প্রেমের কবি। কবিমহলে যার পরিচিতি ছিল “প্রতিবাদী রোমান্টিক” হিসেবে। কবিতাপ্রেমী আর দ্রোহ অনুরাগীদের নিঃসঙ্গ রাত্রিতে স্বস্তির পরশ ছিল রুদ্র। ৭৫ পরবর্তী দেশের প্রতিটি আন্দোলনে ছিলেন রুদ্র। কখনো সামনে থেকে বা কখনো কলমের প্রতিবাদে। স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে তার কলমে ছিল সবসময়ই সোচ্চারের কণ্ঠস্বর।

“আর কী অবাক! ইতিহাসে দেখি সব
লুটেরা দস্যুর জয়গানে ঠাঁসা,
প্রশস্তি, বহিরাগত তস্করের নামে নানা রঙ পতাকা ওড়ায়।
কথা ছিলো, ‘আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন,
আমাদের তীর্থ হবে শস্যপূর্ণ ফসলের মাঠ।
অথচ পান্ডুর নগরের অপচ্ছায়া ক্রমশ বাড়ায় বাহু
অমলিন সবুজের দিকে, তরুদের সংসারের দিকে।
জলোচ্ছাসে ভেসে যায় আমাদের ধর্ম আর তীর্থভূমি,
আমাদের বেঁচে থাকা, ক্লান্তিকর আমাদের দৈনন্দিন দিন”

শুরুতেই বলা ছিল রুদ্র ছিল প্রেমেরও কবি। আর সেই প্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বারবারই। প্রিয়তমা তসলিমা নাসরিনের জন্য লিখেছিল “আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে”। যা পরবর্তীতে কালজয়ী এক গানে পরিণত হয়।

“আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে ,
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে।

ঢেকে রাখে যেমন কুসুম, পাপড়ির আবডালে ফসলের ঘুম।
তেমনি তোমার নিবিড়  চলা, মরমের মূল পথ ধরে।

পুষে রাখে যেমন কুসুম, খোলসের আবরণে মুক্তোর ঘুম।
তেমনি তোমার গভীর ছোঁয়া, ভিতরের নীল বন্দরে।

ভাল আছি ভাল থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।
দিয়ো তোমার মালাখানি, বাউলের এই মনটারে।
আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে।”

মানবতার গান গাইতেন রুদ্র আর ভালবাসার কথা বলতেন। তাই তো বহু বছর পরেও থেকে গিয়েছিল প্রিয়তমা তসলিমা নাসরিনের হৃদয়ে। বহু বছর পর তাই আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখেছিল প্রিয়তমা সকাল।

“প্রিয় রুদ্র,

প্রযত্নে, আকাশ

তুমি আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখতে বলেছিলে। তুমি কি এখন আকাশ জুড়ে থাকো? তুমি আকাশে উড়ে বেড়াও? তুলোর মতো, পাখির মতো? তুমি এই জগৎসংসার ছেড়ে আকাশে চলে গেছো। তুমি আসলে বেঁচেই গেছো রুদ্র। আচ্ছা, তোমার কি পাখি হয়ে উড়ে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে না? তোমার সেই ইন্দিরা রোডের বাড়িতে, আবার সেই নীলক্ষেত, শাহবাগ, পরীবাগ, লালবাগ চষে বেড়াতে? ইচ্ছে তোমার হয় না এ আমি বিশ্বাস করি না, ইচ্ছে ঠিকই হয়, পারো না। অথচ এক সময় যা ইচ্ছে হতো তোমার তাই করতে। ইচ্ছে যদি হতো সারারাত না ঘুমিয়ে গল্প করতে। ইচ্ছে যদি হতো সারাদিন পথে পথে হাটতে । কে তোমাকে বাধা দিতো? জীবন তোমার হাতের মুঠোয় ছিলো। এই জীবন নিয়ে যেমন ইচ্ছে খেলেছো। আমার ভেবে অবাক লাগে, জীবন এখন তোমার হাতের মুঠোয় নেই। ওরা তোমাকে ট্রাকে উঠিয়ে মিঠেখালি রেখে এলো, তুমি প্রতিবাদ করতে পারোনি।

আচ্ছা, তোমার লালবাগের সেই প্রেমিকাটির খবর কি, দীর্ঘ বছর প্রেম করেছিলে তোমার যে নেলী খালার সাথে? তার উদ্দেশ্যে তোমার দিস্তা দিস্তা প্রেমের কবিতা দেখে আমি কি ভীষণ কেঁদেছিলাম একদিন ! তুমি আর কারো সঙ্গে প্রেম করছো, এ আমার সইতো না। কি অবুঝ বালিকা ছিলাম ! তাই কি? যেন আমাকেই তোমার ভালোবাসতে হবে। যেন আমরা দু’জন জন্মেছি দু’জনের জন্য। যেদিন ট্রাকে করে তোমাকে নিয়ে গেলো বাড়ি থেকে, আমার খুব দম বন্ধ লাগছিলো। ঢাকা শহরটিকে এতো ফাঁকা আর কখনো লাগেনি। বুকের মধ্যে আমার এতো হাহাকারও আর কখনো জমেনি। আমি ঢাকা ছেড়ে সেদিন চলে গিয়েছিলাম ময়মনসিংহে। আমার ঘরে তোমার বাক্সভর্তি চিঠিগুলো হাতে নিয়ে জন্মের কান্না কেঁদেছিলাম। আমাদের বিচ্ছেদ ছিলো চার বছরের। এতো বছর পরও তুমি কী গভীর করে বুকের মধ্যে রয়ে গিয়েছিলে ! সেদিন আমি টের পেয়েছি।

আমার বড়ো হাসি পায় দেখে, এখন তোমার শ’য়ে শ’য়ে বন্ধু বেরোচ্ছে। তারা তখন কোথায় ছিলো? যখন পয়সার অভাবে তুমি একটি সিঙ্গারা খেয়ে দুপুর কাটিয়েছো। আমি না হয় তোমার বন্ধু নই, তোমাকে ছেড়ে চলে এসেছিলাম বলে। এই যে এখন তোমার নামে মেলা হয়, তোমার চেনা এক আমিই বোধ হয় অনুপস্থিত থাকি মেলায়। যারা এখন রুদ্র রুদ্র বলে মাতম করে বুঝিনা তারা তখন কোথায় ছিলো?

শেষদিকে তুমি শিমুল নামের এক মেয়েকে ভালোবাসতে। বিয়ের কথাও হচ্ছিলো। আমাকে শিমুলের সব গল্প একদিন করলে। শুনে … তুমি বোঝোনি আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো। এই ভেবে যে, তুমি কি অনায়াসে প্রেম করছো ! তার গল্প শোনাচ্ছো ! ঠিক এইরকম অনুভব একসময় আমার জন্য ছিলো তোমার ! আজ আরেকজনের জন্য তোমার অস্থিরতা। নির্ঘুম রাত কাটাবার গল্প শুনে আমার কান্না পায় না বলো? তুমি শিমুলকে নিয়ে কি কি কবিতা লিখলে তা দিব্যি বলে গেলে ! আমাকে আবার জিজ্ঞেসও করলে, কেমন হয়েছে। আমি বললাম, খুব ভালো। শিমুল মেয়েটিকে আমি কোনোদিন দেখিনি, তুমি তাকে ভালোবাসো, যখন নিজেই বললে, তখন আমার কষ্টটাকে বুঝতে দেইনি। তোমাকে ছেড়ে চলে গেছি ঠিকই কিন্তু আর কাউকে ভালোবাসতে পারিনি। ভালোবাসা যে যাকে তাকে বিলোবার জিনিস নয়।

আকাশের সঙ্গে কতো কথা হয় রোজ! কষ্টের কথা, সুখের কথা। একদিন আকাশভরা জোত্স্নায় গা ভেসে যাচ্ছিলো আমাদের। তুমি দু চারটি কষ্টের কথা বলে নিজের লেখা একটি গান শুনিয়েছিলে। “ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিও”। মংলায় বসে গানটি লিখেছিলে। মনে মনে তুমি কার চিঠি চেয়েছিলে? আমার? নেলী খালার? শিমুলের? অনেক দিন ইচ্ছে তোমাকে একটা চিঠি লিখি। একটা সময় ছিলো তোমাকে প্রতিদিন চিঠি লিখতাম। তুমিও লিখতে প্রতিদিন। সেবার আরমানিটোলার বাড়িতে বসে দিলে আকাশের ঠিকানা। তুমি পাবে তো এই চিঠি? জীবন এবং জগতের তৃষ্ণা তো মানুষের কখনো মেটে না, তবু মানুষ আর বাঁচে ক’দিন বলো? দিন তো ফুরোয়। আমার কি দিন ফুরোচ্ছে না? তুমি ভালো থেকো। আমি ভালো নেই।

ইতি,
সকাল
পুনশ্চঃ আমাকে সকাল বলে ডাকতে তুমি। কতোকাল ঐ ডাক শুনি না। তুমি কি আকাশ থেকে সকাল, আমার সকাল বলে মাঝে মধ্যে ডাকো? নাকি আমি ভুল শুনি?”

*

মাত্র চার বছরের সংসার ছিল রুদ্র তসলিমার। বাউণ্ডুলে রুদ্র ভালবেসেই ঘর বেধেছিল সমমনা তসলিমার সাথে। কিন্তু জীবনের হিসেব সমান্তরাল রেখায় চলে না বলেই হয়তো মাঝপথেই থেমে যায় তাদের পথচলা। প্রচণ্ড ভালবাসাগুলো থেকেই সৃষ্টি হয় প্রচন্ড রাগ আর ক্ষোভের। রুদ্র তসলিমারও তাই হয়েছিল। বিচ্ছেদের শুরুতে কিছুদিন নিয়েছিল কবিতার প্রতিশোধ। রুদ্রকে নিয়ে তসলিমা কবিতায় বলেছিল-

“তার চেয়ে কুকুর পোষা ভাল
ধূর্ত যে শেয়াল, সেও পোষ মানে
দুধ কলা দিয়ে আদরে আহলাদে এক কবিকে পুষেছি এতকাল
আমাকে ছোবল মেরে
দেখ সেই কবি আজ কিভাবে পালায়”

জবাবে রুদ্রও বলেছিল-

“তুমি বরং কুকুর পোষো,
প্রভুভক্ত খুনসুটিতে কাটবে তোমার নিবিড় সময়,
তোর জন্য বিড়ালই ঠিক,
বরং তুমি বিড়ালই পোষো
খাঁটি জিনিস চিনতে তোমার ভুল হয়ে যায়
খুঁজে এবার পেয়েছ ঠিক দিক ঠিকানা

লক্ষী সোনা, এখন তুমি বিড়াল এবং কুকুর পোষো
শুকরগুলো তোমার সাথে খাপ খেয়ে যায়,
কাদা ঘাটায় দক্ষতা বেশ সমান সমান।
ঘাটাঘাটির ঘনঘটায় তোমাকে খুব তৃপ্ত দেখি,
তুমি বরং ওই পুকুরেই নাইতে নামো
উংক পাবে, জলও পাবে।
চুল ভেজারও তেমন কোন আশঙ্কা নেই,
ইচ্ছেমত যেমন খুশি নাইতে পারো।

ঘোলা পানির আড়াল পেলে
কে আর পাবে তোমার দেখা।
মাছ শিকারেও নামতে পারো
তুমি বরং ঘোলা পানির মাছ শিকারে
দেখাও তোমার গভীর মেধা।

তুমি তোমার স্বভাব গাছে দাঁড়িয়ে পড়ো
নিরিবিলির স্বপ্ন নিয়ে আর কতকাল?
শুধু শুধুই মগজে এক মোহন ব্যধি
তুমি বরং কুকুর পোষো, বিড়াল পোষো,
কুকুর খুবই প্রভুভক্ত এবং বিড়াল আদরপ্রিয়
তোমার জন্য এমন সামঞ্জস্য তুমি কোথায় পাবে”

তসলিমাকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ জীবনকেই আপন করে নিয়েছিল রুদ্র। আর সেই নিঃসঙ্গতাকে ভিজিয়ে দিয়ে গিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্যামা সুন্দরী শিমুল। বিয়ে করার চিন্তাও করে ফেলেছিলেন। কিন্তু শিমুলের পরিবার রাজি না হওয়াতে আবারও সেই বিচ্ছেদের সঙ্গে ঘরবসতি বানিয়েছিলেন রুদ্র। শিমুলের জন্য সেবার লিখেছিলেন-

“এতোটা নিঃশব্দে জেগে থাকা যায় না, তবু জেগে আছি…
আরো কতো শব্দহীন হাঁটবে তুমি, আরো কতো নিভৃত চরণে
আমি কি কিছুই শুনবো না- আমি কি কিছুই জানবো না!”

রুদ্র পাঞ্জাবী আর জিন্সকে বানিয়েছিল নিজস্ব স্টাইল। ব্যক্তিজীবনে চরম খামখেয়ালি ছিল প্রিয় কবি। শুরুর জীবনে হতে চেয়েছিলেন ডাক্তার। কিন্তু এক ভয়াল একাত্তর বদলে দিয়েছিল তাঁর মনোজগৎ। হয়েছেন দ্রোহ আর প্রেমের কবি। নিজের খামখেয়ালিতা আর জীবন ভাবনা পরিষ্কার ফুটে উঠে বাবাকে লিখা তার চিঠিতে।

“আব্বা,

পথে কোনো অসুবিধা হয়নি। নাসরিনকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে গত পরশু ঢাকায় ফিরেছি। আপনাদের মতামত এবং কোনোরকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আমি বিয়ে করে বৌ বাড়ি নিয়ে যাওয়াতে আপনারা কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু আমি তো আমার জীবন এভাবেই ভেবেছি। আপনার সাথে আমার যে ভুল বোঝাবুঝিগুলো তা কখনই চ্যালেঞ্জ বা পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্ব নয়, স্পষ্টতই তা দুটো বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব। ব্যক্তি আপনাকে আমি কখনোই ভুল বুঝিনি,আমি জানি না আমাকে আপনারা কিভাবে বোঝেন। এ তো চরম সত্য যে, একটি জেনারেশনের সাথে পরবর্তী জেনারেশনের অমিল এবং দ্বন্দ্ব থাকবেই। যেমন আপনার সাথে আপনার আব্বার অমিল ছিলো, আপনার সাথে আমার এবং পরবর্তীতে আমার সাথে আমার সন্তানদের। এই দ্বন্দ্ব ও সংঘাত কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব নয়। আমরা শুধু এই সংঘাতকে যুক্তিসঙ্গত করতে পারি; পারি কিছুটা মসৃণ করতে। সংঘাত রোধ করতে পারি না। পারলে ভালো হতো কিনা জানি না। তবে মানুষের জীবনের বিকাশ থেমে যেতো পৃথিবীতে।

আমার মনে পড়ে না। এই ছাব্বিশ বছরে একদিনও পিতা হিসাবে আপনার সন্তানদের আদর করে কাছে টেনে নেননি। আশেপাশে অন্য বাবাদের তাদের সন্তানদের জন্য আদর দেখে নিজেকে ভাগ্যহীন মনে হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে কখনো কষ্ট প্রকাশ করিনি। ছেলেবেলায় আমার খেলতে ভালো লাগতো। খেললে আমি ভালো খেলোয়াড় হতাম। আপনি খেলতে দিতেন না। ভাবতাম, না খেললেই বোধ হয় ভালো। ভালো মানুষেরা বোধ হয় খেলে না। আবার প্রশ্ন জাগতো, তাহলে আমার খেলতে ভালো লাগে কেনো? আমি কি তবে খারাপ মানুষ? আজ বুঝি, খেলা না খেলার মধ্যে মানুষের ভালো-মন্দ নিহিত নয়। কষ্ট লাগে। আমিও স্বপ্ন দেখতাম, আমি ডাক্তার হবো। আপনার চেয়ে বড় ডাক্তার হয়ে আপনাকে ও নিজেকে গৌরব দেবো। সন্তান বড় হলে পিতারই তো সুখ। আমি সেভাবে তৈরীও হচ্ছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের পর কি যে এক বিরাট পরিবর্তন এলো ! একটি দেশ, একটি নতুন দেশের জন্ম হলো, নতুন চিন্তার সব হতে লাগলো। নতুন স্বপ্ন এলো মানুষের মনে। সবাই অন্যরকম ভাবতে শুরু করলো। আমিও আমার আগের স্বপ্নকে ধরে রাখতে পারিনি। তার চেয়ে বড় এক স্বপ্ন, তার চেয়ে তাজা এক স্বপ্ন, তার চেয়ে বেগবান এক স্বপ্নকে আমি কাছে টেনে নিলাম। আমি সিরিয়াসলি লিখতে শুরু করলাম। আগেও একটু আধটু লিখতাম, এবার পুরোপুরি। আমি আমার আগের সব চিন্তা-ভাবনার প্রভাব ঝেড়ে ফেলতে লাগলাম। চিন্তা থেকে, জীবন থেকে, বিশ্বাস-আদর্শ থেকে, অনেক কিছুর সঙ্গেই সংঘর্ষ হতে লাগলো। অনেক কিছুর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির শুরু হলো। কখনো ক্ষোভে আমি অপ্রত্যাশিত কিছু করে ফেলতে লাগলাম। আপনার সাথে আমার সাথে বিশ্বাসের সাথে মিল এমন মানুষের দেখা পেলাম। তাদের সাথে সংঘাতও হলো। একি! সবার সাথে সংঘর্ষ হয় কেন? মনে মনে আমি ভীষণ অস্থির হয়ে পড়লাম। তাহলে কি এ পথ ভুল পথ? আমি কি ভুল পথে চলেছি? কখনো মনে হয়েছে, আমিই ঠিক, এই প্রকৃত পথ। মানুষ যদি নিজেকে ভালোবাসতে পারে তবে সবচেয়ে সুন্দর হবে। নিজেকে ভালোবাসতে গেলে সে তার পরিবারকে ভালোবাসবে। আর পরিবারকে ভালোবাসা মানেই একটি গ্রামকে ভালোবাসা। একটি গোষ্ঠীর মানুষকে ভালোবাসবে। আর একটি গ্রাম মানেই তো সারা পৃথিবী। পৃথিবীর সব মানুষ – সব মানুষ সুন্দর হয়ে বাঁচবে। পৃথিবীতে কত বড় বড় কাজ করেছে মানুষ। একটা ছো্‌ট্ট পরিবারকে সুন্দর করা যাবে না? অবশ্যই যাবে। একটু যৌক্তিক হলে, একটু খোলামেলা হলে কত সমস্যা এমনিতেই মিটে যাবে। সম্পর্ক সহজ হলে কাজ সহজ হয়। আমরা চাইলেই তা করতে পারি। জানিনা এ চিঠিখানায় আপনি ভুল বুঝবেন কিনা। ঈদের আগে আগে বাড়ি আসবো। আম্মাকে বলবেন, যেন বড় মামার কাছ থেকে হাজার চারেক টাকা নিয়ে আমাকে পাঠায়। বাসায় রান্নার কিছুই কেনা হয়নি। বাইরের খাওয়ায় খরচ বেশী এবং অস্বাস্থ্যকর। আম্মার তদারকিতে দেওয়া সম্পত্তির এটুকুই তো রিটার্ন মাত্র। আপনার সেন্টিমেন্টে লাগতে পারে। লাগাটাই স্বাভাবিক। কারণ আপনার শ্বশুড়বাড়ি। আমাদের কিসের সেন্টিমেন্ট? শিমু মংলায় পড়বে, বাবু স্কুলে। আপনারা না চাইলেও এসব করা হবে। দোয়া করবেন।

– শহীদুল্লাহ”

সারাটা জীবন সৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে যাওয়া রুদ্র নিজের জীবনের প্রতি ছিলেন স্বৈরাচারী। নিজের খেয়ালখুশি মতো চলেছেন আজীবন। করেছেন শত অনিয়ম। আর এই অনিয়মের ফলাফল ছিল শরীরে আলসারের বাসা। সিগারেট আর হুইস্কিতেও ছিল আসক্তি। হুইস্কিকে ভালবেসে নাম দিয়েছিলেন “সোনালি শিশির”। পায়ে রোগ পেয়ে বসেছিল। ডক্টর বলেছিল সিগারেট এবার ছাড়তে হবে না হয় পা দুটো কেটে ফেলে দিতে হবে। খামখেয়ালি রাজা রুদ্র আপন করে নিল সিগারেটকেই। ফলাফল নিজের নতুন ঠিকানা হয়েছিল হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের ২৩১ নাম্বার কেবিন। কিছুটা সুস্থ হয়ে ২০ জুন ১৯৯১ সালে নিজের রাজার বাজারের বাড়িতে ফিরে আসেন। কিন্তু ২১ জুন ভোরে দাঁত ব্রাশ করতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। সেদিনই মৃত্যু নামক আধাঁরপুরের বাসিন্দা হয়ে অবসান করেন স্বৈরাচারী জীবনের।

আচ্ছা আকাশের ঠিকানায় কি আসলেই ভাল থাকা যায়? আকাশের ঠিকানায় কি চিঠি লিখলে তা পৌছে যায় তার মালিকের কাছে। আমিও প্রিয় কবির মতোই একটা ঠিকানা খুজে বেড়াচ্ছি। যেখানে চিঠি দিলে তা পৌঁছে যাবে প্রিয় কবির কাছে। কবিও তার ভালবাসা পৌছে দিবে আমাদের কাছে। কবির মত আমারও হাহাকার জন্মে প্রতিদিন-

“একটা ঠিকানা চাই।
যেই ঠিকানায় সপ্তাহশেষে একটি করে চিঠি দিব…
প্রেম-প্রেম, আবেগে ঠাসা, ভালোবাসায় টইটুম্বুর!
হবে একটা ঠিকানা?
কারণে অকারণে চিঠি দিব”

জানি না প্রিয় মুখগুলোর ভুল আজও ভেঙেছে কিনা। চাই প্রিয় মানুষগুলো তাদের ভুল ভেঙে ফিরে আসুক কবির কাছে। কবি তো বলেই গিয়েছেন-

“ভুল ভেঙ্গে গেলে ডাক দিও,
আমি মৃত্যুর আলিঙ্গন ফেলে আত্মমগ্ন আগুন
ললাটের সৌমতায় তোমার লিখে দেবো একখানা প্রিয়নাম – ভালোবাসা”

মাত্র ৩৫ বছরের স্বল্পায়ু কবি লিখে গিয়েছিলেন ৭টি কাব্যগ্রন্থ। আর “ভাল আছি ভাল থেকো”-এর মতো অর্ধশতাধিক গানের রচনা আর সুরারোপ করেছিলেন। উপরে আকাশের ঠিকানায় ভাল থাকবেন প্রিয় কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। যেতে যেতে শেষবারের মতো আমাদের ভালবাসতে শেখানো আপনার বলে যাওয়া দুই লাইন-

“এখানে এক সময় বিকেল পলাতক হবে
সন্ধার বাড়বে বয়স- আমি তবু একজন
বোসে থাকবো অনন্ত রাত্রির দিকে মুখ ফিরিয়ে
তুমি শুধু একবার বোলো ”ভালবাসা তোমাতে আছে।”

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত