রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহের কয়েকটি কবিতা

Reading Time: 5 minutes

আজকের এ দিনে প্রয়াত হন কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। প্রয়াণ দিবসে ইরাবতীর পাঠকদের জন্য তাঁর কয়েকটি কবিতা পুনঃমুদ্রিত হলো।


বাতাসে লাশের গন্ধ

আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই আজো আমি মাটিতে মৃত্যূর নগ্ননৃত্য দেখি, ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে… এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দু:স্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়? বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ। এই রক্তমাখা মটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিলো। জীর্ণ জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আধাঁর, আজ তারা আলোহীন খাঁচা ভালোবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায়। এ যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আরষ্ট কুমারী জননী, স্বাধীনতা – একি হবে নষ্ট জন্ম? একি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল ? জাতির পতাকা খামচে ধরেছে আজ পুরোনো শকুন। বাতাশে লাশের গন্ধ নিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর দেহে দুলে মাংসের তুফান। মাটিতে রক্তের দাগ – চালের গুদামে তবু জমা হয় অনাহারী মানুষের হাড় এ চোখে ঘুম আসেনা। সারারাত আমার ঘুম আসেনা- তন্দ্রার ভেতরে আমি শুনি ধর্ষিতার করুণ চিৎকার, নদীতে পানার মতো ভেসে থাকা মানুষের পচা লাশ মুন্ডুহীন বালিকার কুকুরে খাওয়া বিভৎস্য শরীর ভেসে ওঠে চোখের ভেতরে। আমি ঘুমুতে পারিনা, আমি ঘুমুতে পারিনা… রক্তের কাফনে মোড়া – কুকুরে খেয়েছে যারে, শকুনে খেয়েছে যারে সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা। স্বাধীনতা, সে আমার – স্বজন, হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন – স্বাধীনতা – আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল। ধর্ষিতা বোনের শাড়ী ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা।

    আফিম তবুও ভালো, ধর্ম সে তো হেমলক বিষ যেমন রক্তের মধ্যে জন্ম নেয় সোনালি অসুখ তারপর ফুটে ওঠে ত্বকে মাংসে বীভৎস ক্ষরতা। জাতির শরীরে আজ তেম্নি দ্যাখো দুরারোগ্য ব্যাধি ধর্মান্ধ পিশাচ আর পরকাল ব্যবসায়ি রূপে ক্রমশঃ উঠছে ফুটে ক্ষয়রোগ, রোগের প্রকোপ একদার অন্ধকারে ধর্ম এনে দিয়েছিল আলো, আজ তার কংকালের হাড় আর পঁচা মাংসগুলো ফেরি কোরে ফেরে কিছু স্বার্থাণ্বেষী ফাউল মানুষ- সৃষ্টির অজানা অংশ পূর্ণ করে গালগল্প দিয়ে। আফিম তবুও ভালো, ধর্ম সে তো হেমলক বিষ। ধর্মান্ধের ধর্ম নেই, আছে লোভ, ঘৃণ্য চতুরতা, মানুষের পৃথিবীকে শত খণ্ডে বিভক্ত করেছে তারা টিকিয়ে রেখেছে শ্রেণীভেদ ঈশ্বরের নামে। ঈশ্বরের নামে তারা অনাচার করেছে জায়েজ। হা অন্ধতা! হা মুর্খামি! কতোদূর কোথায় ঈশ্বর! অজানা শক্তির নামে হত্যাযজ্ঞ কতো রক্তপাত, কত যে নির্মম ঝড় বয়ে গেল হাজার বছরে! কোন্ সেই বেহেস্তের হুর আর তহুরা শরাব? অন্তহীন যৌনাচারে নিমজ্জিত অনন্ত সময়? যার লোভে মানুষও হয়ে যায় পশুর অধম। আর কোন দোজখ বা আছে এর চেয়ে ভয়াবহ ক্ষুধার আগুন সে কি হাবিয়ার চেয়ে খুব কম? সে কি রৌরবের চেয়ে নম্র কোন নরোম আগুন? ইহকাল ভুলে যারা পরকালে মত্ত হয়ে আছে চলে যাক সব পরপারে বেহেস্তে তাদের আমরা থাকবো এই পৃথিবীর মাটি জলে নীলে, দ্বন্দ্বময় সভ্যতার গতিশীল স্রোতের ধারায়
 

অভিমানের খেয়া

এতোদিন কিছু একা থেকে শুধু খেলেছি একাই পরাজিত প্রেম তনুর তিমিরে হেনেছে আঘাত পারিজাতহীন কঠিন পাথরে প্রাপ্য পাইনি করাল দুপুরে, নির্মম ক্লেদে মাথা রেখে রাত কেটেছে প্রহর বেলা_ এই খেলা আর কতোকাল আর কতোটা জীবন! কিছুটা তো চাই- হোক ভুল হোক মিথ্যে প্রবোধ, অভিলাষী মন চন্দ্রে না পাক, জ্যোৎস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই কিছুটা তো চাই, কিছুটা তো চাই। আরো কিছুদিন, আরো কিছুদিন– আর কতোদিন? ভাষাহীন তরু বিশ্বাসী ছায়া কতোটা বিলাবে? কতো আর এই রক্ততিলকে তপ্ত প্রণাম! জীবনের কাছে জন্ম কি তবে প্রতারণাময়? এতো ক্ষয়, এতো ভুল জমে ওঠে বুকের বুননে, এই আঁখি জানে, পাখিরাও জানে, কতোটা ক্ষরণ কতোটা দ্বিধায় সন্ত্রাসে ফুল ফোটে না শাখায় তুমি জানো নাই– আমি তো জানি কতোটা গ্লানিতে এতো কথা নিয়ে, এতো গান, এতো হাসি নিয়ে বুকে নিশ্চুপ হয়ে থাকি বেদনার পায়ে চুমু খেয়ে বলি এই তো জীবন, এইতো মাধুরী, এই তো অধর ছুঁয়েছে সুখের সুতনু সুনীল রাত। তুমি জানো নাই– আমি তো জানি মাটি খুঁড়ে কারা শষ্য তুলেছে, মাংসের ঘরে আগুন পুষেছে যারা কোনোদিন আকাশ চায়নি নীলিমা চেয়েছে শুধু, করতলে তারা ধরে আছে আজ বিশ্বাসী হাতিয়ার পরাজয় এসে কণ্ঠ ছুঁয়েছে লেলিহান শিখা, চিতার চাবুক মর্মে হেনেছো মোহন ঘাতক তবুও তো পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে মুখর হৃদয়, পুষ্পের প্রতি প্রসারিত এই তীব্র শোভন বাহু। বৈশাখী মেঘ ঢেকেছে আকাশ পালকের পাখি নীড়ে ফিরে যায়– ভাষাহীন এই নির্বাক চোখ চোখ আর কতোদিন? নীল অভিমানে পুড়ে একা আর কতোটা জীবন? কতোটা জীবন?’ ‘কিছুটা তো চাই– হোক ভুল হোক মিথ্যে প্রবোধ, অভিলাষী মন চন্দ্রে না পাক, জ্যোৎস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই কিছুটা তো চাই, কিছুটা তো চাই… ‘

  অবেলায় শঙ্খধ্বনি  অতোটা হৃদয় প্রয়োজন নেই, কিছুটা শরীর কিছুটা মাংস মাধবীও চাই। এতোটা গ্রহণ এতো প্রশংসা প্রয়োজন নেই কিছুটা আঘাত অবহেলা চাই প্রত্যাখান। সাহস আমাকে প্ররোচনা দেয় জীবন কিছুটা যাতনা শেখায়, ক্ষুধা ও খরার এই অবেলায় অতোটা ফুলের প্রয়োজন নেই। বুকে ঘৃণা নিয়ে নীলিমার কথা অনাহারে ভোগা মানুষের ব্যথা প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই- করুণাকাতর বিনীত বাহুরা ফিরে যাও ঘরে। নষ্ট যুবক ভ্রষ্ট আঁধারে কাঁদো কিছুদিন কিছুদিন বিষে দহনে দ্বিধায় নিজেকে পোড়াও না হলে মাটির মমতা তোমাতে হবে না সুঠাম, না হলে আঁধার আরো কিছুদিন ভাসাবে তোমাকে। অতোটা প্রেমের প্রয়োজন নেই ভাষাহীন মুখ নিরীহ জীবন প্রয়োজন নেই- প্রয়োজন নেই কিছুটা হিংস্র বিদ্রোহ চাই কিছুটা আঘাত রক্তে কিছুটা উত্তাপ চাই, উষ্ণতা চাই চাই কিছু লাল তীব্র আগুন।  
খতিয়ান

হাত বাড়ালেই মুঠো ভরে যায় ঋণে অথচ আমার শস্যের মাঠ ভরা। রোদ্দুর খুঁজে পাই না কখনো দিনে, আলোতে ভাসায় রাতের বসুন্ধরা। টোকা দিলে ঝরে পচা আঙুলের ঘাম, ধস্ত তখন মগজের মাস্তুল নাবিকেরা ভোলে নিজেদের ডাক নাম চোখ জুড়ে ফোটে রক্তজবার ফুল। ডেকে ওঠো যদি স্মৃতিভেজা ম্লান স্বরে, উড়াও নীরবে নিভৃত রুমালখানা পাখিরা ফিরবে পথ চিনে চিনে ঘরে আমারি কেবল থাকবে না পথ জানা– টোকা দিলে ঝরে পড়বে পুরনো ধুলো চোখের কোণায় জমা একফোঁটা জল। কার্পাস ফেটে বাতাসে ভাসবে তুলো থাকবে না শুধু নিবেদিত তরুতল জাগবে না বনভূমির সিথানে চাঁদ বালির শরীরে সফেদ ফেনার ছোঁয়া পড়বে না মনে অমীমাংসিত ফাঁদ অবিকল রবে রয়েছে যেমন শোয়া হাত বাড়ালেই মুঠো ভরে যায় প্রেমে অথচ আমার ব্যাপক বিরহভূমি ছুটে যেতে চাই– পথ যায় পায়ে থেমে ঢেকে দাও চোখ আঙুলের নখে তুমি।

 
  দূরে আছো দূরে তোমাকে পারিনি ছুঁতে, তোমার তোমাকে- উষ্ণ দেহ ছেনে ছেনে কুড়িয়েছি সুখ, পরস্পর খুড়ে খুড়ে নিভৃতি খুঁজেছি। তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই। যেভাবে ঝিনুক খুলে মুক্ত খোঁজে লোকে আমাকে খুলেই তুমি পেয়েছো অসুখ, পেয়েছো কিনারাহীন আগুনের নদী। শরীরের তীব্রতম গভীর উল্লাসে তোমার চোখের ভাষা বিস্ময়ে পড়েছি- তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই। জীবনের ’পরে রাখা বিশ্বাসের হাত কখন শিথিল হয়ে ঝ’রে গেছে পাতা। কখন হৃদয় ফেলে হৃদপিন্ড ছুঁয়ে বোসে আছি উদাসীন আনন্দ মেলায়- তোমাকে পারিনি ছুঁতে-আমার তোমাকে, ক্ষাপাটে গ্রীবাজ যেন, নীল পটভূমি তছ নছ কোরে গেছি শান্ত আকাশের। অঝোর বৃষ্টিতে আমি ভিজিয়েছি হিয়া- তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।   এ কেমন ভ্রান্তি আমার

এ কেমন ভ্রান্তি আমার ! এলে মনে হয় দূরে স’রে আছো, বহুদূরে, দূরত্বের পরিধি ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে আকাশ। এলে মনে হয় অন্যরকম জল হাওয়া, প্রকৃতি, অন্য ভূগোল, বিষুবরেখারা সব অন্য অর্থবহ- তুমি এলে মনে হয় আকাশে জলের ঘ্রান। হাত রাখলেই মনে হয় স্পর্শহীন করতল রেখেছো চুলে, স্নেহ- পলাতক দারুন রুক্ষ আঙুল। তাকালেই মনে হয় বিপরীত চোখে চেয়ে আছো, সমর্পন ফিরে যাচ্ছে নগ্ন পায়ে একাকী বিষাদ- ক্লান্ত করুণ ছায়ার মতো ছায়া থেকে প্রতিচ্ছায়ে। এলে মনে হয় তুমি কোনদিন আসতে পারোনি.. কুশল শুধালে মনে হয় তুমি আসোনি পাশে বসলেও মনে হয় তুমি আসোনি। করাঘাত শুনে মনে হয় তুমি এসেছো, দুয়ার খুল্লেই মনে হয় তুমি আসোনি। আসবে বললে মনে হয় অগ্রিম বিপদবার্তা, আবহাওয়া সংকেত, আট, নয়, নিম্নচাপ, উত্তর, পশ্চিম- এলে মনে হয় তুমি কোনদিন আসতে পারোনি। চ’লে গেলে মনে হয় তুমি এসেছিলে, চ’লে গেলে মনে হয় তুমি সমস্ত ভুবনে আছো।

   

[রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। অসংখ্য জনপ্রিয় কবিতা উপহার দিয়েছেন তিনি। ‘ভালো আছি ভালো থেকো,আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’ গানটিও তাঁরই লেখা। প্রতিবাদী রোমান্টিক কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। ১৯৮১ সালের ২৯ জানুয়ারি বহুল আলোচিত নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে বিয়ে করেন। ১৯৮৮ সালে তাদের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। ১৯৯১ সালের ২১ জুন রুদ্র ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।]      

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>