Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

সবজে রুমাল রহস্য (পর্ব-৪)

Reading Time: 4 minutes 

অপ্রত্যাশিত প্ল্যান থেকে জন্ম নেয়া একটি নভেলা। তৃষ্ণা বসাকের ভাবনা। সেদিন কয়েকজন সৃষ্টিশীল মানুষ আড্ডা দিচ্ছিলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে, আড্ডার শেষে একটি সবুজ রুমালের দেখা মিললো। একটি রুমাল কে বিড়াল করে দেবার জাদু তো প্রবাদের মত। এখানেও হলো তাই হঠাৎ পাওয়া সবুজ রুমাল টি পেয়েই সব ওলটপালট হয়ে গেল একদল সৃষ্টিশীল মানুষের ভাবনায়।জাদুর মতোই কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই ফেলে যাওয়া এক টুকরো রুমাল হয়ে গেলো ১২-ইয়ারি নভেলা ‘সবজে রুমাল রহস্য’।

পরপর লিখবেন ১২ জন। প্রথম পর্ব লিখলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং শেষ করবেন তৃষ্ণা বসাক। মধ্যে থাকবেন ১০ জন যথাক্রমেঃ 

সোনালি, তপশ্রী পাল, ব্রততী সেন দাস, নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত, নন্দিনী সেনগুপ্ত, শ্যামলী আচার্য, কৃষ্ণা রায়, ইন্দ্রনীল বক্সী, সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, অমিতাভ দাস। আজ থাকছে ব্রততী সেন দাসের লেখা রহস্য নভেলার চতুর্থ পর্ব।


পর্ব-৪

উত্তরে মিস্টার মিত্র কী বললেন সুচন্দ্রা শুনতে পেল না। বরং বেশ চিন্তিত মুখে বাড়িতে ফিরে সংসারের বাকি কাজগুলো কোন রকমে সারতে শুরু করে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিউ আলিপুরে ঘটে যাওয়া হত্যাকান্ডটা সুচন্দ্রার মনের কোণে খোঁচা দিয়ে যেতে লাগল।দূর ছাই! কী যে বিরক্ত লাগছে ।আজকাল টিভিতে নিউজ চ্যানেল খুললেই প্রতিদিন খুন-জখম-অ্যাক্সিডেন্টের খবরে ছড়াছড়ি,সেসব শুনতে শুনতে যেন মানুষের কান অভ্যস্ত হয়ে গেছে।মন দিয়ে কেউ শোনে বলে মনেও হয় না কিন্তু সুচন্দ্রাদের চোখের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে কালকের রাহুল ভাবনানীর কেসটা।বিশেষ করে শয্যার পাশে সবুজ রুমাল আর তাতে খানসামার বয়ান অনুযায়ী ঝিমধরা গন্ধ সুচন্দ্রাকে দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।স্নান সেরে ঠাকুরকে ধুপ জ্বালিয়ে টিভিটা চালালো সুচন্দ্রা।মিউট করে রাখল,শাশুড়ি এ সময় পাশের ঘরে বিশ্রাম নেনরান্নার মেয়েটা রান্না করে টেবলে খাবার সাজিয়ে দিয়ে যায়।আজ সুচন্দ্রা টেবলে নয়,প্লেটে করে সামান্য ভাত আর এক পিস চিকেন নিয়ে সোফায় বসে খেতে খেতে টিভির দিকে চেয়ে কী ভাবতে লাগল।হঠাৎ দেখল নিউ আলিপুরের খবরটা দেখাচ্ছে।এদিক ওদিক খুঁজে সুচন্দ্রা রিমোটটা পেয়ে সাউন্ডটা বাড়িয়ে উদগ্রীব হয়ে শুনতে লাগলভাবনানী হাউস মস্ত বড় তিনতলা বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি,আধুনিকতা আর প্রাচুর্যের মিশেল আগাগোড়া।মস্ত লনউঁচু পাঁচিল ঘেরা বাড়িতে পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ।রাহুল যথেষ্ট ইনফ্লুয়েনশালরাজ্য এবং কেন্দ্রের শাসক গোষ্ঠী,উভয়ের ওপরতলায় বেশ ভাল রকম ওর দহরম মহরম।আসলে একে ওপরের পিঠ না চুলকালে তো চলবে না।ব্যবসা করতে গেলে মি ভাবনানীর যেমন সেন্ট্রাল আর স্টেটের পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গে সাঁট রেখে চলতে হবে তেমনি এদের মত ব্যবসায়ীদের স্পন্সরশীপ না পেলে পার্টিগুলোই বা তাদের ফান্ড যোগাড় করবে কোথা থেকেতাই তাঁর এমন দুর্ঘটনা শুধু রাজ্যের টিভি চ্যানেলে নয়,সর্ব ভারতীয় চ্যানেলেও বেশ হেড লাইন হয়েছে। ঘুরে ফিরে দেখাচ্ছে একই খবর।শোবার ঘরে কীভাবে পড়ে ছিল দেহটি এবং মৃতদেহের পাশে ছিল হাল্কা সবুজ রঙা সুগন্ধী রুমাল সেকথা বারে বারে বলছেন অ্যাঙ্কর পার্সনরাহুল ভাবনানী বছর পঞ্চান্নের ,তাঁর স্ত্রী আর একমাত্র ছেলে ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল হয়ে পড়েছেন।তাঁদের বক্তব্য রাহুল মোটামুটি শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন করতেন।মদ,সিগারেট বা পার্টির কারণে নিশিযাপন কোনদিনই করেননা তাহলে ঘটনার দিন অত রাত্রে তিনি কেন ফিরলেন?এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলির রিসার্চ মেম্বাররা তত্ত্বতল্লাশ করে,সিক্যুউরিটি গার্ডদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জেনেছে সেদিন রাহুল বাড়ি ফিরেছেন নিজের গাড়িতে নাঅন্য কারুর গাড়িতে।গাড়িটি একটি কালো রঙের বি এম ডাব্লুগাড়িতে রাহুল ছাড়াও আরো একজন ভদ্রমহিলা ছিলেন,একজন বছর ত্রিশের আধুনিকা।এবং রাত দেড়টায় গাড়ি গেট দিয়ে ঢুকতে তাঁকে সিক্যুউরিটি গার্ড সাহায্য করে ধরে এলিভেটর অবধি যেতে কারণ তিনি তিনি টলছিলেন।এখন বক্তব্য হল রাহুলের মত টিটেটলার কি মদ্যপান করেছিলেনগভীর রাতে কালো গাড়ির অন্ধকারে রাহুলের সঙ্গে রহস্যময়ী কে ছিলেনতিনি কি কোন অভিনেত্রী,কোন রাজনীতিক নাকি তাঁর বান্ধবী বা পরিচিতা?কে তিনিদেখা গেল ফোকাসটা রাহুলের দিক থেকে সরে ঐ রহস্যময়ীর ওপর গিয়ে পড়েছে।রাহুলের মৃত্যুর সঙ্গে কি তাঁর কোন যোগসূত্র আছেহঠাৎ  ফোনটা বেজে উঠতে সুচন্দ্রার চিন্তার ঘোর ঝটকা লেগে ভেঙে গেল,একটা আতঙ্কভরা দৃষ্টিতে মোবাইলে তাকিয়ে দেখল তাপসের নাম স্ক্রীনে জ্বলজ্বল করছে।

হ্যালো…!

কী হল,এত গম্ভীর কেনঘুমোচ্ছিলে?”

না না,রিঙের শব্দে ভয় পেয়ে গেছিলাম,ভাবলাম আবার সেই স্প্যাম কলার কিনা।টিভি দেখছিলাম…বল কী হয়েছে?”

হ্যাঁ,আমি সে কারণেই ফোন করেছি তোমাকে।আমাদের জিএম মিস্টার কে পি ঘোষের ভায়রাভাই অভিরূপ সরকার নিউ আলিপুর থানার অফিসার ইন চার্জ।ও এই কেসটা লুক আফটার করছে।শুনলাম রাহুল ভাবনানীর সঙ্গে রাতে যিনি গাড়িতে ছিলেন তিনি একজন সাউথ দিল্লীর মস্ত আর্ট এন্ড ক্রাফট অকশন হাউসের চেয়ারপার্সন,নাম নীতা আহমেদউনি অ্যানথ্রোপলজি নিয়ে মিশর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে ওখানকার  এক ছাত্র ফিরোজ আহমেদকে বিয়ে করে দিল্লীতে ফিরে আসেন এবং দিল্লীর পশ এরিয়াতে অকশন হাউস খুলে বসেন।শোনা গেল ব্যবসায়িক সূত্রে আলাপ এবং তারপর থেকে রাহুল ভাবনানীর সঙ্গে নীতার গভীর ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছে।সেও হয়ে গেল অনেকদিন।

আচ্ছা…তাহলে বলতে হবে মি ভাবনানী বেশ রঙিন চরিত্রের মানুষ ছিলেন ,কী বল?”সুচন্দ্রা মুচকি হেসে বরের সঙ্গে একটু মশকরা করল।সারাদিন গুম হয়ে থাকার পর এই প্রথম একটু হাল্কাসুরে কথা বলল ও। ভেতরটা কেমন যেন থম ধরে ছিল।কিন্তু তাপস সে পথে হাঁটল না,বরং একটু গম্ভীর হয়ে বলল,”এ দিয়ে রং-বেরং কিছু বিচার করা চলে না।এ ধরনের কাজ করতে গেলে নানা রকম মানুষের সঙ্গে তালসঙ্গত করতে হয়।প্রচুর অভিনয়-কলার প্রয়োজন হয়।দেখা দৃষ্টিতে যা মনে হয় তা নাও হতে পারে…বুঝলে ম্যাডাম!যাক গে,বাকি কথা বাড়ি এলে হবে।এখন রাখছি।

হ্যাঁ,আমাকে এবার রেডি হতে হবে।

কোথায় যাবে?”

আরেঃ বললাম না ওপরের ফ্ল্যাটের মি মিত্রকে নিয়ে টুবুর বন্ধুর ঠাকুর্দার কাছে যাব।উনি নাকি যে কোন প্রাচীন পুঁথি বা লিপি পড়তে পারেন…ভুলে গেলে?”

ওহ্‌… হ্যাঁ।আচ্ছা রাখছি।

সেভেন এ বিশপ লেফ্রয় রোডে যখন সুচন্দ্রা পৌঁছল তখন ঘড়ির কাঁটা সবে পাঁচটার ঘর স্পর্শ করেছে।টুবু অফিস থেকে সরাসরি চলে এসেছে বন্ধুর বাড়িএ পাড়ায় আর এক মহামতী বাস করতেন আর কয়েকটি বাড়ি পেরিয়েই,ওয়ান বাই ওয়ান বিশপ লেফ্রয় রোডে,ভাবতেই সুচন্দ্রার রোমাঞ্চ খেলে গেল সারা মনে। টুবুর বন্ধু অরিত্র সিনহার ঠাকুর্দা জ্যোতিপ্রকাশ সিনহার আশির ওপর বয়স কিন্তু এখনও কী ঋজু আর ব্যারিন্টোন ভয়েস! সমীহ উদ্রেককারী। সুচন্দ্রা সংক্ষেপে রুমাল বৃত্তান্ত বলে মোবাইল ক্যামেরায় যে পিকচারটা নিয়েছিল সেটা দেখাল আর সঙ্গে যে রুমালটা এনেছিল টেবলের ওপর সুন্দর করে বিছিয়ে রাখল।

জ্যোতিপ্রকাশ অনেকক্ষণ মন দিয়ে রুমালটা পর্যবেক্ষণ করলেন।হাতে নিয়ে কাপড়টা স্পর্শ করলেন,নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুকলেন।তারপর বললেন,”কাপড়টা তো এখানকার মনে হচ্ছে না।এ এক ধরনের ফাইন সুতির কাপড় যাকে সাটিন কটন শীট বলে।এ জিনিস এদেশে  উৎপন্ন হয় না কারণ এর জন্য যে তুলোর প্রয়োজন হয় তা নীলনদের ধারে মিশর ইত্যাদি দেশে ব্যাপকহারে চাষ হতে দেখা যায়।এই তুলো থেকে যে কাপড় বোনা হয় তা যেমন টেঁকসই তেমনি নরম।তাই ইউরোপীয় ধনী দেশগুলোয় এর রপ্তানি হয়ে থাকে।” 

হ্যাঁ,আমাদেরও তাই মনে হয়েছিল।কিন্তু সেদিন আমার বাড়িতে যারা এসেছিল তাদের মধ্যে কে এমন রুমাল ব্যবহার করবে?”  

“…আর রুমালের মনোগ্রামটা লক্ষ্য করেছেন দাদু?”টুবু জিজ্ঞেস করল।

তাই তো দেখছি দাদুভাই…” জ্যোতিপ্রকাশ বললেন।

মি মিত্র এতক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন ,এবার তিনি বললেন,” মনোগ্রামে যে লিপি এম্বস করা রয়েছে আমার মতে  ব্রাহ্মী লিপিতে কিছু লেখা রয়েছে।

হু…আমিও তাই ভাবছি…একটু সময় লাগবে বুঝতে কী লেখা আছে।

ইতিমধ্যে কফি,স্ন্যাক্স ইত্যাদি এসে যাওয়াতে কথাপ্রসঙ্গ একটু অন্যদিকে বয়ে গেল।মি মিত্রই আলিপুরের মিস্ট্রি ডেথের প্রসঙ্গটা তুললেন।

কফি পান হলে জ্যোতিপ্রকাশ বললেন,”খৃষ্ট পূর্ব প্রথম সহস্রের গোড়ার দিকে ভারতবর্ষে দু ধরনের লিপি প্রচলিত ছিল।এক ব্রাহ্মী লিপি বা সারদা লিপি আর অন্যটা খরোষ্ঠী লিপি।ব্রাহ্মী  বাঁ দিক থেকে ডান দিকে লেখা হত আর খরোষ্ঠী লিপি ঠিক তার উল্টোটা,অর্থাৎ লেখা হত ডান দিক থেকে বাম দিকে।সম্রাট অশোকের সময় এই দুই লিপিতে অজস্র শিলালিপি উৎকীর্ণ ছিল।আর রুমালের এই লেখাটা দেখ ,ঠিক প্রাগৈতিহাসিক চিত্রলিপি বা pictograph এর মত।এ হল আদি ব্রাহ্মী লিপির রূপ।পরে এর বহু বিবর্তন হয়েছে। তার মানে যার রুমাল আর যে এই মনোগ্রামটা করেছে তার এ ব্যাপারে ভাল পড়াশোনা আছে।

কিন্তু কী লেখা আছে কিছু বোঝা যাচ্ছে মেসোমশাই?”সুচন্দ্রা উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল।

আমাকে একটু সময় দাও।আমি ভাল করে পর্যবেক্ষণ করে জানাচ্ছি।কারণ কয়েকটি বর্ণ চেনা যাচ্ছে না। মনে হয় একটা মিশ্রিত ভাষায় কিছু লেখার চেষ্টা করা হয়েছে।সেটা কী আমায় জানতে হবে।আমি এর ছবি তুলে নিচ্ছি।লাইব্রেরিতে গিয়ে বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে জানতে হবে।আমি দু একদিনের মধ্যে জানিয়ে দিচ্ছি।” 

বেশ,আজ তাহলে আমরা চলি?”

             

               

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>