| 14 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

শহিদের বান্ধবী

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

বন্ধ কাচের জানালার গা বেয়ে অবিশ্রান্ত জল্ধারা নেমে চলেছে। ঘোর বর্ষা। শ্রীপর্ণা বিছানায় বসে ওই দিকেই তাকিয়ে আছে। শরীর আর মন জুড়ে একরাশ ভালো না লাগা লেগে আছে। সাতই শ্রাবণ! একসময় এই দিনটা মানেই ছিল সারাদিন হুল্লোড় আর মজার। সাতই শ্রাবণ, ওঁর মৃত প্রেমিকের জন্মদিন। এখন মৃত্যু দিনও। ঠিক একবছর আগেই এই সাতই শ্রাবণের এক কালো রাতে হঠাৎ বেজে উঠেছিল মোবাইল। ভারতীয় বায়ুসেনার এক অফিসার বিনম্র স্বরে জানিয়েছিল ওঁর প্রেমিকের শহিদ হওয়ার খবর।

শ্রীপর্ণা বিছানা ছেড়ে এগিয়ে গেল বন্ধ জানালাটার কাছে। দু-হাতে ঠেলে খুলে দিল জানালাটা। পিছনে বাগানের সমস্ত গাছ মাথা নিচু করে ভিজছে। মুখ নিচু করে ঝুলে থাকা পাতার গা ছুঁয়ে নেমে যাচ্ছে জলের ধারা। সেইদিকে তাকিয়ে শ্রীপর্ণার মনে হল, গাছগুলোও যেন নীরবতা পালন করছে। শুধু ফুলে ভরা হলুদ রঙ্গনটা আকাশের দিকে মুখ তুলে রয়েছে। ও আসলে শ্রীপর্ণার শহিদ পেমিককে স্যালুট জানাচ্ছে। গাছটার দিকে তাকাতেই শ্রীপর্ণার চোখের সামনে টুকরো টুকরো অনেক ছবি ভেসে উঠল।

ওদের প্রেমের শুরুটাই তো এই হলুদ রঙ্গন দিয়ে। ওদের কলেজের সামনের বিস্তৃত সবুজ লনের চারিদিকে রঙ্গন ফুলের গাছ দিয়ে সাজানো ছিল। হলুদ, কমলা, সাদা, গোলাপি বিভিন্ন রঙের রঙ্গন। শ্রীপর্ণা কলেজে নতুন তখন,মানে প্রথম বর্ষ আর ওর প্রেমিক তৃতীয়বর্ষ। বর্ষার জল পড়তেই গাছগুলো যখন ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে, এমনই এক দিনে শ্রীপর্ণা গাছ থেকে একগুচ্ছ হলুদ রঙ্গন তুলে ওদের বায়োলজি ক্লাসের দিকে পা বাড়াতেই সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল ওর প্রেমিক। সেই প্রথম সাক্ষাৎ, কিন্তু সে সাক্ষাৎ সুখকর ছিল না। সকলের সামনে টেনে এক চড় কষিয়ে ছিল,ফুল তোলার জন্য। প্রথম প্রথম ঘৃণা, কিন্তু খুব অল্পসময়ের মধ্যেই বন্ধুত্ব। শ্রীপর্ণা তাকে ভালোবেসে রজ্জু বলত। কেমন এক অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে ফেলার ক্ষমতা ছিল রজ্জুর। ওর নামের আদ্যাক্ষরকে ভেঙে সৃষ্টি করেছিল এই নামটা। মাতৃ-পিতৃহীন অনাথ রজ্জু ওঁর ঠাকুমার কাছেই শুনেছিল,ওঁর মা হলুদ রঙ্গন ভালোবাসতেন। রজ্জুর রঙ্গন প্রীতির কারণ জানতেই বন্ধুত্ব করতে আর একটুও সময় নেয়নি শ্রীপর্ণা। মাত্র ছ’মাস সময় নিয়েছিল বন্ধুত্ব প্রেমে পরিণত হতে। কলেজ শেষ করার বছরখানেকের মধ্যেই রজ্জু বায়ুসেনায় চাকরিটা পেয়ে যায়।তারপরই ঠাকুমার মারা যাওয়া।

রজ্জুর ঠাকুমা মারা যাওয়ার পর থেকেই শ্রীপর্ণা এবাড়িতে আছে। গত পাঁচবছর ধরে এবাড়ি আগলে রয়েছে শ্রীপর্ণা। মাস্টারডিগ্রি শেষ করে একটা ছোট্ট চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে। রজ্জুর একমাত্র ওয়ারিশ হিসাবে এখন এবাড়ির মালিক শ্রীপর্ণা।

শ্রীপর্ণা জানালার কাছ থেকে সরে এসে দাঁড়াল দেওয়ালে টাঙানো শহিদ বায়ুসেনা অফিসার ‘রাজলক্ষ্মী সামন্তর’ ফটোর নিচে। শ্রীপর্ণার প্রেমিক রাজলক্ষ্মী সামন্ত। শ্রীপর্ণা তাড়াতাড়ি স্নান সেরে একটা আকাশি পাড়ের সাদা শাড়ি পরে তৈরি হয়ে নিল। অফিসের খাতায় রাজলক্ষ্মী সামন্তর একমাত্র ওয়ারিশ শ্রীপর্ণা অধিকারী।

দেশের কাজে শহিদ হয়েছেন রাজলক্ষ্মী সামন্ত। আজ বায়ুসেনার পক্ষ থেকে বীর শহিদ সম্মাননাপত্র তুলে দেওয়া হবে শহিদ রাজলক্ষ্মী সামন্তের একমাত্র ওয়ারিশ শ্রীপর্ণা অধিকারীর হাতে। শ্রীপর্ণা আমন্ত্রণপত্রের গায়ে একটা চুমু খেয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত