রুমুর ডায়েরি

পৃষ্ঠা নম্বর ১০

আমার নাম রুমু। আমি স্ট্যান্ডার্ড টুতে পড়ি। পড়তে আমার ভাল লাগেনা। প্রতিদিন এত্ত এত্ত বই পড়ি। আমার স্কুল ভাল লাগেনা। স্কুলের কাউকে ভাল লাগেনা। টিচাররা অনেক হোম টাস্ক দেয়। অনেক সময় এমনি বকে। সেদিন টিভিতে খেলার মাঠ দেখেছি একটা স্কুলের। আমাদের স্কুলে কোন খেলার মাঠ নেই। আমি খেলতে পারিনা। তাই আমরা শুধু ক্লাসে বসে থাকি। করিডোরে খেলি।

পৃষ্ঠা নম্বর ১৪

আমার শুধু গল্পের বই পড়তে ভাল লাগে। কিন্তু মামনি গল্পের বই পড়তে দেয় না বেশি। ক্লাসের বই পড়তে বলে সারাক্ষণ। বাবা মাঝে মাঝে আমাকে গল্পের বই কিনে দেয়। বাবাকে সেজন্য আমি খুব ভালবাসি। বাবা মা’র মত বকেনা বেশি। কিন্তু বাবাতো অফিসে থাকে বেশিরভাগ সময়। মোবাইল ফোন নিয়ে অনেক কাজ করে। 

অফিস থেকে এসেও বাবা কাজ করে। আমার মোবাইল ফোন একদম ভাল লাগেনা। বাবা-মা দুজনেই মোবাইল নিয়ে কাজ করে সারাক্ষণ। আমি তাদের কাছে গল্প শুনতে চাইলে গল্প বলেনা। যখন তারা মোবাইল দেখে তখন আমার সাথে কথা বলেনা, আমার দিকে তাকায় না। কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় না। তারা কি দেখে? আমি মোবাইল দেখতে চাইলে গান দেখায়, নাচও দেখি ইউটিউবে আমরা মাঝে মাঝে। কিন্তু তবুও আমার মোবাইল ফোন একদম ভাল লাগেনা। কারণ বাবা-মা আমার চেয়েও মোবাইল ফোনকে বেশি ভালবাসে । 

বড় হয়ে আমিও মোবাইল দেখবো, তখন আমিও তাদের কথার উত্তর দেবোনা। প্রশ্ন করলে বকে দেবো।

পৃষ্ঠা নম্বর ২০

আমাদের বাসা ১৪ তলায়। আমাদের বাসা থেকে ধানমন্ডি লেক দেখা যায়। অনেক সবুজ, অনেক ভাল লাগে যখন বাতাস বয়। এক ছুটির দিনে বাবা আমাকে নিয়ে লেকে বেড়াতে গিয়েছিল। লেকের মধ্যে একটা ছোট্ট মাঠ আছে। ওখানে আমরা ব্যাডমিন্টন খেলেছি। একদিন মাঠের পাশে দেখলাম একটা ছোট্ট ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা মাকে বলেছিল ও নাকি আমার চেয়েও ছোট। ঐদিন খুব শীত ছিল। কিন্তু তার গায়ে কোন সোয়েটার ছিল না। আমি বাবাকে বললাম, ওর গায়ে কোন সোয়েটার নেই কেন? বাবা বলল, ওরা গরীব তাই ওর বাবা-মা ওকে সোয়েটার কিনে দিতে পারেনি। আমার খুব খারাপ লাগল ওর জন্য। আমি আর বাবা পরের দিন একটা পুরানো সোয়েটার নিয়ে আবার গেলাম। কিন্তু ঐ ছেলেটা সেদিন ছিল না। ওকে আমরা আর খুঁজে পাইনি।

পৃষ্ঠা নম্বর ২৬

আমদের একটা সাদা গাড়ি আছে। আমাদের গাড়ির নাম পোকেমন। কারণ ডোরেমনের চাইতে পোকেমন আমার ভাল লাগে। তাই গারিটার নাম রেখেছি পোকেমন। বাবা গাড়ি চালায়। বাবা আমাকে প্রায়ই অফিসে যাবার পথে স্কুলে নিয়ে যায় গাড়িতে। একদিন দেখলাম সেই ছোট্ট  ছেলেটা ফুটপাতে বসে আছে। ওর হাতে ফুলের মালা অনেকগুলো। বাবা বলে ওগুলো নাকি ও লেকের মধ্যে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করবে। 

পৃষ্ঠা নম্বর ২৮

ঐ ছেলেটা আমার চেয়ে ছোট। কিন্তু সে একা একা সব জায়গায় যায়। লেকে বেড়ায়। ছুটোছুটি করে, খেলে। আমি খেলতে পারিনা। ওর মত ইচ্ছে হলেই বেড়াতে যেতে পারিনা। বাবা-মা আমাকে একা কোথাও যেতে দেয়না। নিজেকে বন্দী বন্দী লাগে। কিন্তু আমিও ঘুরতে চাই। লেকের ঐ পারে যাবো। ওখানে কখনও যাইনি। ইস! আমি যদি ওর মত একা একা যেখানে খুশি চলে যেতে পারতাম! লেকের পরে কি আছে দেখতে চাই। আমি বড় হয়ে অনেক ঘুরবো। দেশ –বিদেশে ঘুরতে যাবো। 

পৃষ্ঠা নম্বর ৩০

আজ আমার বই খাতা ব্যাগ হারিয়ে গেছে। আসলে হারায়নি। আমিই দিয়ে দিয়েছি ঐ ছেলেটাকে। ঐ ছেলেটার নাম সিয়াম। আমাদের স্কুলের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। ওর বাবা বাদাম বিক্রি করে। আমি মায়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সিয়ামকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম সে কোথায় পড়ে। সিয়াম পড়েনা। কিন্তু সে পড়তে চায়। কারণ, ওর বই, খাতা কলম ব্যাগ কিছুই নেই। তাই ওকে আমার সবকিছু দিয়ে দিলাম। ওগুলোতো আমার ভাল লাগেনা। থাকলেও বা কি, না থাকলেও বা কি। ও ব্যাগ আর বই খাতা পেয়ে খুব খুশি। সিয়ামকে বললাম, আমি তার সাথে ঘুরতে চাই, লেকের সব গাছপালা, ঘাস, পানি সবকিছু দেখতে চাই। তার মত খেলতে চাই। সে বলল সে আমাকে সব জায়গা ঘুরে দেখাবে। 

আজ মা অনেক বকেছে, মেরেছেও। আমি বলিনি, বইখাতা আর ব্যাগ যে আমিই দিয়ে দিয়েছি। বলেছি হারিয়ে গেছে। 

এই পর্যন্ত পড়ে রেণু রাখলেন ডাইরিটা। তার খুব খারাপ লাগছে। রাগের মাথায় মেয়েটাকে অনেক বকেছেন, মেরেছেনও। এমন ঘটনা ঘটবে তারা ভাবতেও পারেনি।

গতকাল সে মেয়েকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে নিউমার্কেটে গিয়েছিল। শপিং করে গাড়ি নিয়ে ফিরতে স্কুলের সামনে বেশ দেড়ি হয়ে গিয়েছিল ট্রাফিক জ্যামে পড়ে। তিনি অবশ্য দপ্তরিকে ফোন করে বলে দিয়েছিলেন, রুমু যেন কোনভাবেই স্কুলের গেটের বাইরে বেরোতে না পারে। কিন্তু রুমুকে আটকানো গেলনা। সে কখন বের হয়ে গেছে দপ্তরি খেয়াল করেনি। রুমুকে সে পেল স্কুলের গলি পেড়িয়ে ফুটপাতে। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কি ভাবছিল সে ই জানে। তার মেয়েটা অনেক শান্ত শিষ্ট, অন্য শিশুদের মত না, কথা কম বলে। বই পড়তে ভালবাসে। যদিও প্রশ্ন করে প্রচুর। কিন্তু এত মনমরা হয়ে থাকে সে খেয়ালই করেনি এতদিন। নিজের উপরই রাগ হল। এত ধৈর্য আর সাধনার ধন হেলায় হারাতে বসেছে কিনা সে। আজ যদি আরও বড় বিপদ হয়ে যেত! তাঁর উপলব্ধি হল, মোবাইল ফোনে সময় না কাটিয়ে রুমুকে তাঁদের আরও মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। তাঁকে নিয়ে প্রকৃতির মধ্যে ঘুরতে যাওয়া দরকার বারবার। ওকে আরও গল্পের বইসহ নানা রকম বই কিনে দিতে হবে। 

পরের দিন রেণু স্কুলে পৌঁছে দিতেই স্কুল গেটে বাদামওয়ালা মানে সিয়ামের বাবা রুমু’র বই-খাতা-ব্যাগ ফেরত দিয়ে বলল, ”আফা, মাফ কইরা দ্যান, আমার পোলাডা ছোড, বোঝেনইতো। ও কি বোঝে কন!”। রেণু তখন রুমুর বই খাতা ব্যাগ ফেরত নিয়ে নতুন বই খাতা আর ব্যাগ দিয়ে বলল, ”এগুলো আপনার ছেলের জন্য। ওকে স্কুলে ভর্তি করে দেন।“ লোকটা বলল, আফা আমার কি অত টাকা আছে? তয় দেহি পোলাডার এত আগ্রহ, সরকারী লাইন স্কুলে ভর্তি কইরা দিমু। আপনারে যে কি কইয়া ধন্যবাদ দিমু!

রুমু এখন খুব খুশি। সে দাদাবাড়ির গ্রামে যাচ্ছে, সবুজ প্রকৃতি আর নদী দেখতে। এবারের বইমেলায় অনেক বই কেনা হয়েছে। মা এখন আর বকেনা। বাবা-মা এখন আর মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকেনা। প্রতিদিন নতুন নতুন গল্প বলে। সে এখন প্রতিদিন লেকে যায় আর খেলে বাবার সাথে। সে বাবাকে বলেছে সে ট্রাভেলার হবে বড় হয়ে। তার এখন মনে হয়, আহ জীবন কত সুন্দর!

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত