ইতিহাসের সাক্ষী: রুশ বিপ্লব ও কেরেনস্কি

১৯১৭ সালে রাশিয়ায় যে বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা ক্ষমতায় আসে তা ছিল বিংশ শতাব্দীর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি।

এ বিপ্লব ঘটেছিল কয়েকটি পর্বে। সে বছর ফেব্রুয়ারি মাসে একের পর এক গণবিক্ষোভের পর ক্ষমতা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন রাশিয়ার জার নিকোলাস।

জার সেসময় ছিলেন পুরানো, অচল, এবং স্বৈরতান্ত্রিক এক শাসকচক্রের প্রতিনিধি।

তার পতনের পর রুশ উদারপন্থী এবং সমাজতন্ত্রী দলগুলো মিলে সরকার গঠন করেছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল রাশিয়াকে একটি আধুনিক পশ্চিমা ধাঁচের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পথে নিয়ে যাওয়া। তাদের কথায়, তাদের নীতির মূল আদর্শ ছিল ফরাসী বিপ্লব।

সে সময় পশ্চিমা বিশ্বে রাশিয়ার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতীক ছিলেন একজন তরুণ সমাজতন্ত্রী – যার নাম আলেক্সান্ডার কেরেনস্কি। অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে জনপ্রিয় মন্ত্রী ছিলেন তিনি।

তার উচ্চাভিলাষ ছিল রাশিয়াকে বিশ্বের সবচাইতে বড় প্রগতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা, রাশিয়ায় গণতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করা।

১৯১৭ সালেল বসন্তকালে তিনি ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের একমাত্র সমাজতন্ত্রী এবং সবচাইতে জনপ্রিয় মন্ত্রী।

বহু আইন পাস করেছিলেন কেরেনস্কি। এর মধ্যে ছিল ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, পুরোনো বংশগত পদবী বিলুপ্ত করা, নারীদের সমানাধিকার – এ রকম আরো অনেক আইন। মনে করা হয়, কেরেনস্কি ছাড়া কেউই এত আইন পাস করাতে পারতেন না।

russian_revolution_kerensky

আলেক্সান্দর কেরেনস্কি

কেরেনস্কি ছিলেন একজন দুর্দান্ত বক্তা – যিনি রাজনৈতিক তত্বকে প্রায় আধ্যাত্মিক ভাষায় প্রকাশ করতে পারতেন। হয়তো সে অর্থে একজন রাজনৈতিক নেতার চাইতে একজন ধর্মযাজকের সাথেই তার বেশি মিল ছিল।

কিন্তু জনপ্রিয়তার স্রোতে ভাসতে থাকা কেরেনস্কি হয়তো বিপদ আন্দাজ করতে ভুল করেছিলেন।

১৯১৭ সালের ৩রা এপ্রিল আরেকজন সম্মোহনীক্ষমতা সম্পন্ন নেতা ১০ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষ সেন্ট পিটার্সবার্গ বা পেত্রোগ্রাদে এলেন। তার নাম ভ্লাদিমির লেনিন।

শুরু থেকেই লেনিন অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাত করার ডাক দিতে থাকলেন। কারণ তার ভাষায় ওই সরকার ছিল একটি বুর্জোয়া পুঁজিবাদী সরকার।

বাস্তবিক লেনিন তার পুরো জীবনে কখনোই উদারনৈতিক কোন সরকারকে ভালো চোখে দেখেন নি। লেনিন বলতেন, একটা সরকার বা দেশ যদি পুঁজি দিয়ে শাসিত হয়, এবং ভূমির ব্যক্তিগত মালিকানা থাকে – তা হলে সেই সরকার বা প্রজাতন্ত্র কত ‘গণতান্ত্রিক’ বা কত ‘স্বাধীন’ – তাতে কিছুই আসে যায় না। কারণ তাহলে একটা নিয়ন্ত্রিত হবে অল্প কিছু লোক দিয়ে – যাদের অধিকাংশই হবে হয় ধনী, নয় পুঁজিপতি।

রুশ ইতিহাসের একজন বিশেষজ্ঞ অরল্যান্ডো ফাইজেস বলেন, দু’জন রাজনৈতিক নেতার মধ্যে এর চেয়ে বেশি বৈপরীত্য বোধ হয় কল্পনা করা যায় না, যতটা লেনিন এবং কেরেনস্কির মধ্যে ছিল।

অনেক বছর পর বিবিসিতে ইতিহাসবিদ এলেনা শাপিরোকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে কেরেনস্কি স্বীকার করেছিলেন যে তিনি লেনিন এবং বলশেভিকদের উপযুক্ত গুরুত্ব দিতে ভুল করেছিলেন।

কেরেনস্কি বলেছিলেন, “সেই সময় বলশেভিকদের ভুমিকা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তারা ছিল সংখ্যালঘু। আমাদের সরকারকে ‘বুর্জোয়া এবং পুঁজিবাদী’ বলে লেনিন যে শ্লোগান দিতেন – শুরুর দিতে সেন্ট পিটার্সবুর্গে শ্রমিক সমাবেশগুলোতে এসব কথাবার্তা তেমন কোন সাড়া পায় নি।”

১৯১৭ সালের জুলাই মাসে কেরেনস্কি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হলেন। এবং তার থাকার জায়গা হলো উইন্টার প্যালেস বা শীত প্রাসাদে – যা ছিল জারের সাবেক বাসভবন।

russian_revolution_leninছবির কপিরাইটUNK ভ্লাদিমির লেনিন

অনেকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললেন যে কেরেনস্কি নেপোলিওনের মতোই উচ্চাভিলাষী।

অরল্যান্ডো ফাইজেসের কথায়, ১৯১৭ সালের আগস্ট মাস নাগাদ কেরেনস্কি একটা বিভ্রমের মধ্যে ছিলেন। সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা তখন ভেঙে পড়েছে। কেরেনস্কি যাকে সামরিক বাহিনীর কমান্ডার ইন-চিফ হিসেবে অধিষ্ঠিত করেছিলেন – সেই কর্নিলভ তখন কেরেনস্কিকে রেখে হোক বা বাদ দিয়ে হোক – এক ধরণের সামরিক একনায়কতন্ত্র কায়েম করার চেষ্টা করছিলেন। কেরেনস্কির ওপর তখন আরো কারোরই আস্থা ছিল না।

অক্টোবরের শুরুর দিকে কেরেনস্কির কর্তৃত্ব ভেঙে পড়লো। অন্যদিকে লেনিনের চাপে বিপ্লবী বলশেভিকরা একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য এক গোপন প্রস্তাব পাস করলো ।

লেনিন জোর দিয়ে বললেন, যা করার দ্রুত করতে হবে।

তিনি ঠিক করলেন রাশিয়ার পুরোনো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী অক্টোবরের ২৫ তারিখ অভ্যুত্থান হবে। যা ইউরোপিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৭ই নভেম্বর। পেত্রোগ্রাদে মোতায়েন সামরিক বাহিনীর লোকদের মধ্যে যে বলশেভিক সমর্থকরা ছিল – তাদের দিয়ে রাজধানীতে সশস্ত্র পাহারা বসানো হলো।

এর পর বলশেভিকরা শীত প্রাসাদ আক্রমণ করলো, কেরেনস্কির অবশিষ্ট কয়েকজন মন্ত্রীকে গ্রেফতার করা হলো। লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা সোভিয়েত শাসনকে একদলীয় একনায়কতন্ত্রে পরিণত করলো।

কেরেনস্কি মনে করতেন, বলশেভিক শাসন বেশি দিন টিকবে না। তাই অভ্যুত্থানের পর তিনি গ্রামে চলে গেলেন এবং সৈন্য সংগ্রহ করে লেনিনের অনুগত বিদ্রোহীদের আক্রমণের চেষ্টা করলেন। যখন সে চেষ্টা ব্যর্থ হলো, কেরেনস্কি রাশিয়া ছেড়ে পালালেন।

বাকি জীবন নির্বাসনেই কাটাতে হয় কেরেনস্কিকে। তিনি মারা যান নিউইয়র্কে ১৯৭০ সালে।

সূত্র: বিবিসি

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত