| 2 মার্চ 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প ধারাবাহিক

মহানগরের নয়জন নিবাসী (পর্ব-১৯) । ডঃ দীপক কুমার বরকাকতী

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,russia flagমিজোরামের আইজল শহরের পদার্থ বিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডঃ দীপক কুমার বরকাকতী (১৯৪৮) অসমিয়া সাহিত্যের একজন সুপরিচিত এবং ব্যতিক্রমী ঔপন্যাসিক। আজ পর্যন্ত আটটি উপন্যাস এবং দুটি উপন্যাসিকা, অনেক ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাছাড়া শিশুদের জন্য দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তারই ইংরেজি ভাষার একটি নতুন দিল্লির চিলড্রেন বুক ট্রাস্ট থেকে ১৯৯২ সনে প্রকাশিত হয়। দেশ-বিভাজন, প্রব্রজন, ভেরোণীয়া মাতৃত্ব (ভাড়াটে মাতৃত্ব), ধর্ম এবং সামাজিক বিবর্তন ইত্যাদি তাঁর উপন্যাসের মূল বিষয়। আলোচ্য ‘মহানগরের নয়জন নিবাসী’উপন্যাসে ১৯৩২ সনে স্টালিনের বিরুদ্ধে লেলিনগ্রাডের নয়জন টলস্টয়বাদী গান্ধিজির অহিংসা নীতির দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে করা আন্দোলনের ছবি ফুটে উঠেছে। তাঁর ইংরেজি ভাষায় অনূদিত গ্রন্থ দুটি হল From Valley to Valley (Sahitya Akademi, New Delhi, 2010) এবং The Highlanders (Blue Rose Publishers, New Delhi, 2010)। বাংলা ভাষায় অনূদিত গ্রন্থ ‘স্থানান্তর’ (অর্পিতা প্রকাশন, কলকাতা, ২০০৭)। বাসুদেব দাসের অনুবাদে ইরাবতীর পাঠকদের জন্য আজ থাকছে মহানগরের নয়জন নিবাসীর পর্ব-১৯।


টলস্টয়বাদীরা শেষবারের মতো সাক্ষাৎ করার পরের দিন থেকে মস্কো শহরের ভ্লাডিমিরভেলিক্স পুরোনো ডায়েরি খুঁজে পরবর্তী আলোচনার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। তিনি যতই টলস্টয়েরবাড়িতে করে আনা টীকগুলি পড়ছিলেন ততই দশ বছর আগে দেখে আসা ইয়াস্নায়াপলিয়ানার কথা মনে পড়ছিল। 

ভ্লাডিমিরভেলিস্কই তাঁর নিজের নোটবইয়ের পাতা উল্টাতে লাগলেন। দেখতে দেখতে তিনি একজায়গায় পেলেন টলস্টয় ১৯০৯ সনের ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন–’ ট্রান্স ভিলের একজন হিন্দুর থেকে একটি অতি সুন্দর চিঠি পেলাম।

ডায়েরির এই নোটটা পড়ে লিখে রাখার পরে তিনি টলস্টয়ের চিঠির পুঁটলিগুলি দেখতে শুরু করেছিলেন। তারমধ্যে উদ্ধার করেছিলেন এমকে গান্ধী টলস্টয়কে লেখা তিনটি চিঠি।১৯০৯ সনের ২৪ সেপ্টেম্বর তারিখে পাওয়া চিঠিটা ছিল গান্ধীর প্রথম চিঠি । সেই চিঠিটা গান্ধী লন্ডন থেকে লিখেছিলেন । চিঠিটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সভিলে তেরো হাজার ভারতীয় লোক ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসক ন্যায্য প্রাপ্তিতে বাধা দিয়ে প্রবর্তন করা কালো আইনের বিরোধিতা করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালানোর কথা বিস্তারিতভাবে লিখেছিলেন । গান্ধীজির থেকে পাওয়া এই চিঠিটির পরেই টলস্টয়’ হিন্দুর প্রতি একটি চিঠি ‘ বলে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন এবং তাতে ইংরেজের ঔপনিবেশিক শাসনের অন্যায় অত্যাচার গুলির প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন ।

১৯১০ সনের এপ্রিল মাসে গান্ধী অন্য একটি চিঠি দিয়েছিলেন। সেটি টলস্টয় মে মাসের প্রথম সপ্তাহে পেয়েছিলেন এবং আরও একটি চিঠিতে উল্লেখ করার মতো তিনি গান্ধীরগুজরাটিভাষায় রচিত একটি গ্রন্থ ‘ ইন্ডিয়ানহোমরুল’ নামের নিজে করা ইংরেজি অনুবাদ গ্রন্থটি পাঠিয়ে ছিলেন। সেটি পড়ে উঠে টলস্টয় ডায়েরিতে লিখেছিলেন–’ এই সন্ধ্যেবেলা আমি গান্ধীজির বইটি পড়লাম। বড় ভালো। গান্ধীর বিষয়ে লেখা বইটি পড়লাম। বড় প্রয়োজনীয় বই। আমাকে তাকে লিখতে হবে।’

ভ্লাডিমিরভেলিস্কই টলস্টয়ের ডায়েরি পড়ে উঠে গ্রন্থাগারের মধ্যে গান্ধীর’ইন্ডিয়ানহোমরুল’ গ্রন্থটি খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু গান্ধীর বিষয়ে লেখা বইটি খুঁজে পেতে তার সময় লেগেছিল। বইটি ইংরেজি ভাষায় লিখেছিলেন জোসেফ জে ডক নামে একজন ব্যাপ্টিস্ট ধর্মযাজক। বইটির নাম ছিল’ এম কে গান্ধীঃইন্ডিয়ান প্যাট্রিয়ট ইন সাউথ আফ্রিকা।’ এই গ্রন্থটির কোনো চিঠিতে উল্লেখ না পেয়ে ভ্লাডিমিরভেলিস্কই ধারণা করেছিলেন যে এপ্রিল মাসের চিঠিটির আগে নিশ্চয় অন্য একটি চিঠি গান্ধীজি টলস্টয়কে লিখেছিলেন এবং তার সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন বইটি। যাই হোক না কেন গান্ধীর বিষয়ে লেখা বইটি যে টলস্টয় অত্যন্ত আগ্রহ নিয়েপড়ে ছিলেন তার প্রমাণ তিনি দেখতে পেয়েছিলেন– কারণ তার প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠাগুলিতে তিনি হস্তাক্ষর করে রেখেছিলেন।

ভ্লাডিমিরভেলিস্কই বইটিতে চোখ বুলিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন বইটি গান্ধীজির জীবনে আলোকপাত করা ছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকায় চলতে থাকা ভারতীয়দের আন্দোলনের বিবরণও রয়েছে।

ভ্লাডিমিরভেলিস্কই তাঁর নিজের ডায়েরিতে গান্ধীজির অন্য একটি চিঠির টীকা লিখে রেখেছিলেন।১৯১০ সনের ১৫ আগস্ট লেখা এই চিঠিটি গান্ধীজির শেষ চিঠি বলে উল্লেখ করে তিনি লিখেছিলেন যে সেখানে গান্ধীজি দক্ষিণ আফ্রিকায় সেই সময় উত্তপ্ত হয়ে উঠা রাজনৈতিক বাতাবরণের আভাস দিয়েছিলেন। শত শতভারতীয় পরিবারকে সরকারের সঙ্গে অসহযোগ করার জন্য গৃহহীন করা হয়েছিল। গৃহহীনভারতীয়দের মধ্যে আকাল দেখা দিয়েছিল। গান্ধীজি তাঁর জার্মান আর্কিটেক্ট বন্ধু হেরম্যানকলেনবাসের সঙ্গে গৃহহীনভারতীয় লোকদের থাকার জন্য জোহান্সবার্গের একুশ মাইল দূরে এক হাজার একশো একর মাটিতে একটি বৃহৎ কৃষি পাম গড়ে তুলেছিলেন। ‘টলস্টয় ফার্ম’ নামে নামকরণ করা এই মাটিতে মানুষগুলিকে বিনামূল্যে থাকার সুবিধা দিয়েকৃষিকার্যেমনোনিবেশ করার জন্য সুবিধা দেওয়াহয়েছিল। এই পামটির সবিশেষ জানিয়েকলেনবাসও যে টলস্টয়কে লিখেছিলেন তার আভাস চিঠিটিতে ছিল।

এই চিঠির উত্তরে টলস্টয় কী লিখেছিলেন ভ্লাডিমিরভেলিস্কই জানেন না।

কেননা তার আড়াই মাস পরে টলস্টয়ের মৃত্যু হয়েছিল।

কয়েক দিন পরে যখন টলস্টয়বাদীরানাডিয়াদের ঘরে বিকেলে একত্রিত হল নাডিয়া তখন বাড়িতে ছিল না। সেদিন দুপুরবেলা ভিক্টর একছুর্স্কিএসেছিলেন এবং লাইলাক ফুলের ঝোপের পাশে ছবি আঁকা সরঞ্জামগুলি নিয়ে তাকে নিয়েগিয়েছিলেন।


আরো পড়ুন: মহানগরের নয়জন নিবাসী (পর্ব-১৮) । ডঃ দীপক কুমার বরকাকতী


বিকেল থেকে একজন দুজন করে মানুষ আসতে শুরু করেছিল। ভ্লাডিমিরভেলিস্কের সঙ্গে মস্কো থেকে অন্য একজন মানুষ এসেছিল। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক । নাম ভলক’ভ রিয়াজন’ভ। তাছাড়া জর্জিয়ার কুরা নদীর কাছ থেকে এসেছিল সমাজসেবক নিকলাইচের্নভ।

পিটার যেলেনকভমহাশয় আলোচনা শুরু করেছিলেন । তিনি বলেছিলেন –’ আমরা আগেরবার আলোচনার শেষে গান্ধীর বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম। আমি ইতিমধ্যে দুটো খবর জোগাড় করেছি। সেই সব বিস্তারিতভাবে বলার আগে প্রথমে ভ্লাডিমিরভেলিক্স থেকে গান্ধীর বিষয়ে শুনতে চাইছি ।’

ভাডিমিরভেলিক্স বললেন–’ আমি ইয়াস্নায়াপলিয়ানায় এক সপ্তাহ কাটানোর কথা সেদিনই বলেছিলাম । সেই সময়েটলস্টয়ের গ্রন্থাগার এবং চিঠিপত্র দেখার সুবিধা পেয়ে ছিলাম । সেখানে গান্ধী এবং টলস্টয়ের মধ্যে পারস্পরিক বিনিময়ের মাধ্যমে আন্তরিক যোগাযোগ ছিল সে কথা তিনটি চিঠি এবং দুটি বই থেকে বুঝতে পেরেছিলাম ।’

তিনি সঙ্গে নিয়ে আসা নোট বইটি হাতে নিয়ে কথা গুলি বিবৃত করলেন । তিনি বললেন –’১৯০৭ সনে এশিয়া মূলের মানুষ গুলির জন‍্য দক্ষিণ আফ্রিকায় রেজিস্ট্রেশন আইন বলবৎ করা হয়েছিল। তাদের নাম ভর্তি করে পরিচয় পত্র নিয়ে বেড়াতে হত, হিন্দু নিয়মের বিবাহ অবৈধ বলে মনে করা হত এবং শ্রমিকদের বছরে তিন পাউন্ড কর দিতে হত। গান্ধী আট সনে পরিচয় পত্র গুলি সামগ্রিকভাবেজ্বালিয়ে প্রতিবাদী আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন এবং কারাবাস খেটেছিলেন।’ 

ভ্লাডিমিরফেলিক্স বললেন–’ এই অহিংস আন্দোলনের ধারণাটি গান্ধীজি হয়তোটলস্টয়ের  ‘ভগবানের সাম্রাজ্য তোমার মধ্যে আছে’ পুস্তকটির দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে আহরণ করেছিলেন।১৮১৪ সনে কনস্টাঞ্চগারনেটে করা পুস্তকটির ইংরেজি অনুবাদ গান্ধীর হাতে পড়েছিল । সেই পুস্তকটিতে উল্লেখ করা নন রেসিসটেন্স টু এভিল– যা বাইবেল গ্রন্থমতে’ রেসিস্ট নট এভিল’ থেকে গৃহীত– এই ধারণাটি থেকেই নিশ্চয় গান্ধীজি পাপ কাজের প্রতি নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধে করা অহিংস আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন।

তিনি বললেন–’ প্যাসিভরেসিস্ট্যান্স’ অর্থাৎ ‘নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ’ শব্দ দুটি গান্ধীরকাছে দুর্বলেরঅস্র যেন অনুভূত হয়েছিল। যেন কোনো ঘৃণা থেকে উদ্ভূত শব্দ । তাই তিনি ‘ইন্ডিয়ানওপিনিয়ন’ কাগজের মাধ্যমে পাঠকদের থেকে একটি নতুন শব্দ গ্রহণ করেছিলেন। সেটা ছিল ‘সদাগ্রহ’। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি সেটা পরিবর্তন করে’ সত্যাগ্রহ’ করেছিলেন। সত্যের অন্বেষণে আগ্রহ ।

ভ্লাডিমিরভেলিক্সই জোসেফ ডকের পুস্তকে উল্লেখ করা গান্ধীর নেতৃত্বে আরম্ভ হওয়াসত্যাগ্রহ আন্দোলনের কথা বললেন, সরকার শ্রমিকদের গৃহহীন করায় টলস্টয়ফার্মেকৃষিপাম গড়ে তোলার কথাও বলেন।

তার কথা শেষ হওয়ায় পিটার যেলেনকভ বললেন–’ আমি ইতিমধ্যে গান্ধীরআত্মজীবনীর অনেকটা পড়েছি। এটা প্রথমে গান্ধীরমাতৃভাষায়বেরিয়েছিল যদিও এখন গান্ধীজীর সম্পাদনা করা’ ইয়ংইন্ডিয়া’ নামের পত্রিকাটিতেধারাবাহিকভাবেইংরেজিতে প্রকাশিত হয়ে চলেছে। সেখান থেকেই তিনি যে টলস্টয়ের’ দ‍্য কিংডম অফ গডইজউইদিনইউ’ নামের পুস্তিকাটির ওপরেও যে জন রাসকিন এর ‘আনটু দিস লাস্ট’ বইটির যথেষ্ট প্রভাব ছিল সে কথা পরিষ্কারভাবে স্বীকার করেছেন।’

কাজান থেকে আসা য়ুরিফমিসেভও নোট বই বের করে বার্তালাপে যোগ দিলেন। তিনি বললেন–’ হ্যাঁ, মহাশয়।’ টলস্টয় ফার্ম’ গড়ে তোলার আগেও গান্ধী ১৯০৪ সনে রাস্কিনের সম্মানে ফিনিক্স ফার্ম’ গড়ে তুলেছিলেন। সেখান থেকে’ ইন্ডিয়ানওপিনিয়ন’ নামে প্রকাশিত একটি ইংরেজি কাগজ তিনি সম্পাদনা করেছিলেন । ১৯১০ সনে টলসস্টয়ের মৃত্যুর একমাস পরের সংখ্যাটিতে মহান লেখকের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলিজানিয়ে তিনি লিখেছিলেন– টলস্টয় তাঁর লেখা সমূহের দ্বারা দেখিয়েছিলেন কীভাবে সেনাদলের আধারে গঠিত বর্তমানের আধুনিক সভ্যতা মানুষের ঐশ্বরিক গুণের বিলোপ সাধন করছে এবং দেখিয়েছিলেন মানুষ যৌবন প্রাপ্তির আগে এই হিংস্র ভাব দমন করতে পারলে সমস্ত কথা এবং কাজে কীভাবে অফুরন্ত প্রেম ভালোবাসার নিদর্শন প্রকাশ করতে পারে।’

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নোট বইয়ের পাতা উল্টে য়ুরিফমিসেভ বললেন–১৯২৮ সনের শতবার্ষিকীতে পাঠানো তাঁর বাণীতে টলস্টয়ের জীবনী এবং লেখা সমূহ গান্ধীর কাছে কতটা তারই আভাস দিয়েছিলেন । লিখেছিলেন  যে মহান লেখক যে নীতির কথা বলেছিলেন তাকে নিজের জীবনে পালন করেছিলেন এবং সত্যের সন্ধানে যে কোনো মূল্য দিতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন। তিনিই বর্তমান সময়ে অহিংসার সবচেয়ে মহান প্রচারক বলে গান্ধী অভিহিত করে বাণীটা সমাপ্ত করেছিলেন।’ 

‘ এখানে আমি একটা কথা বলি।’– পিটার যেলেনকভয়ুরিফমিসেভকে বাধা দিয়ে বলে উঠল–’ দিনটা ছিল’– তিনি নোট বই দেখে পুনরায় বললেন–’ দিনটা ছিল ১৯২২ সনের ১০ এপ্রিল। স্থান ছিল নিউইয়র্ক শহরের কমিউনিটি গির্জা ঘর। ধর্মযাজক উপদেশ দেওয়া অনুচ্চ গুরু আসনের পাশে দাঁড়িয়েরেভারেন্ড ডক্টর জন হেইনেসহোমস গির্জায় উপস্থিত থাকা লোকদের দিকে তাকিয়ে একটা প্রশ্ন করলেন – বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে মহান ব্যক্তি কে ?’– নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিয়ে বললেন –’ ভারতের এমকে গান্ধী’। আমেরিকান মানুষের অপরিচিত ব্যক্তিটিকেধর্মযাজকরা তখনই চিনতে পেরেছিলেন এবং সেই জন্যই সেদিনের ধর্মসভায়গান্ধীরপরিচয় উপস্থিত থাকা মানুষগুলোর সামনে তিনি বিবৃত করেছিলেন ।’

পিটার যেলেনকভের কথা শুনে অনেক সময় চুপ করে বসে থাকা লিঅ’নিড এডলার বললেন–’ গান্ধী টলস্টয়কে মহান বলেছিলেন, কিন্তু তিনি নিজেই মহান আখ্যাপেয়েছিলেন। তুমি কাউকে ভালবাসলে তোমাকেও লোকে ভালোবাসবে। তুমি যদি কাউকে মহান বল, তুমিও মহান লোকের সারিতে পড়বে। তুমি প্রেমের মাধ্যমে প্রতিবাদ করবে, প্রেমের মাধ্যমেই তার প্রতিদান পাবে।’

যুবক লিঅ’নিডেরকণ্ঠস্বর শুনে মানুষগুলি তার মুখের দিকে কিছুক্ষণের জন্য তাকিয়েরইল।

তখনই ঘরটিতে থাকা মানুষগুলির মনে হল ইতিমধ্যে ভিক্টর একছুর্স্কি এবং নাডিয়া এসে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করেছে এবং মানুষটাই নয়, নাডিয়াওলিঅ’নিড এডলারের কথা শুনে তার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। দূরে উল বুনতে থাকা মাসারমানভনাও তার দিকে মাথা তুলে তাকিয়েছে। 

ভিক্টর একছুর্স্কির কথা শুনে পিটার যেলেনকভ আগের আলোচনায় উপস্থিত না থাকা চিত্রকরকে কথাটা বুঝিয়ে বললেন ।

সেই সময়েভলক’ভরিয়াজন’ভযুবতিনাডিয়ার সৌন্দর্য দেখে বিভোর হয়ে হয়েছিল। তথাপি তিনি বাস্তব থেকে হারিয়ে যাননি। পিটার যেলেনকভমহাশয়ের কথা শেষ হওয়ায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন – ‘গান্ধী যে দক্ষিণ আফ্রিকায় আন্দোলন করলেন তার ফলাফল কী হল– সেটাই জানতে পারলাম না।’ 

পিটার যেলেনকভ বললেন–’ কিছুটা দেরিতে হলেও লিঅ’নিড বলা অনুসারে অহিংস আন্দোলনের অহিংস প্রত‍্যুত্তর পেল। তারা সফল হল। দক্ষিণ আফ্রিকার শ্রমিকের তিন পাউন্ড করে থাকা কর উঠিয়েনিল। হিন্দু বিবাহ স্বীকৃতি পেল এবং আঙ্গুলের ছাপ থাকা নাম ভর্তির সাধারণ কাগজ একেকটিনিয়েবেড়ালেই হবে বলে সরকার দাবিগুলি মেনে নিল।’ 

শ্বিগানকঝুছুপ’ভ ভাঙ্গা ভাঙ্গারুশভাষায় বললেন–’ গান্ধী ১৯১৫ সনে দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে এলেন। এখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সেদিন বলা  লবণ অমান্য আন্দোলন ও তারই অংশ।’

পিটার যেলেনকভ মহাশয় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বললেন–’ ইয়ংইন্ডিয়ায় প্রকাশিত গান্ধীরআত্মজীবনীর একটি খন্ডে একটা বড় মহত্বপূর্ণ কথা পেলাম। ফিনিক্সফার্মে থাকা দুজন যুবকের চারিত্রিক স্খলনের কথা জানতে পেরে গান্ধীজি জোহান্সবার্গ থেকে ফিনিক্সফার্মে তখনই রেলে যাত্রা করেন। সঙ্গে গেলেন মিস্টারকেলেনবাস। চারিত্রিক স্খলনটা তাঁর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের বিপরীত ধর্মী বলে মনে বড় আঘাত পেলেন এবং নেতৃত্ব দেওয়া লোক হিসেবে তিনি অন্য একটি পন্থার চিন্তা করতে লাগলেন। প্রত্যেকের মনের মধ্যে প্রবেশ করার জন্য তিনি আত্ম কষ্টে প্রায়শ্চিত্ত করবেন বলে স্থির করলেন। তিনি সাত দিনের জন্য’ অনশন’ করলেন এবং তার পরের চার মাস শুধুমাত্র এক বেলা খাবেন বলে ঠিক করলেন। তিনি এই কথা উল্লেখ করে লিখেছেন যে অন্যের পাপের জন্য করা তার প্রায়শ্চিত্তে প্রত্যেকেই দুঃখ পেলেন। তারা চারিত্রিক স্খলনের গুরুত্বটা বুঝতে পারলেন এবং ধীরে ধীরে যুবক যুবতিদের সঙ্গে তার সম্বন্ধের সততা এবং শক্তি বৃদ্ধি পেল। তখন থেকে অনশন করাটা তাঁর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের অংশ হয়ে পড়ল।’

‘ এখন’– কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি পুনরায় বললেন–’ এখন এখানকার পরিস্থিতিতে আমরা টলস্টয়বাদীদের কী করা উচিত? গান্ধীবাদের পন্থা অবলম্বন করব নাকি? আমি গান্ধীবাদের সপক্ষে, কেননা গান্ধী বলেছিলেন– হিংসার পথে আনা একটি পরিস্থিতির উপশম সাময়িক, কিন্তু এটা করা ক্ষতি চিরস্থায়ী।’

পিটার যেলেনকভ মহাশয়ের মতামতের ওপরে কথা বলার মতো কারও যুক্তি ছিল না। মানুষগুলি চুপ করে রইল। তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে।

জর্জিয়া থেকে আসা সমাজকর্মীনিকলাইচের্নভএতক্ষণ চুপ করে ছিল। তিনি ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন-‘ আমি জর্জিয়ার কুরা নদীর তীর থেকে এসেছি । আমাদের এখানেও সমবায় খোলার নামে মানুষের ব্যক্তি স্বত্ব এবং স্বাধীনতায় আঘাত করা হয়েছে। জোর জুলুম এবং অত্যাচারের সঙ্গে দখল আরম্ভ হয়েছে। মানুষগুলি বড় অশান্ত হয়ে উঠেছে। আমাদের শান্তি চাই। আমরা হিংসা চাইনা।’

মানুষটার কথা শেষ হওয়ার পরেও মানুষ গুলি পুনরায় বহু সময় নীরব হয়ে রইল। নীরবতা ভঙ্গ করল পিটার যেলেনকভমহাশয়। তিনি পুনরায় বললেন–’ আমাদের যে গান্ধীপন্থা অবলম্বন করতে হবে সে কথা আমরা আপনাদের মৌনতা থেকে প্রায় নিশ্চিত হয়েছি । কিন্তু কীভাবে করব সে বিষয়ে আমরা দুজন ভারতীয় লোকের সঙ্গে কথা বলে নিতে পারি কি?’

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি পুনরায় বললেন– আমার জানা দুজন ভারতীয়দের একজন হলেন মিস্টার এম এন রায় এবং অন্যজন মিঃচট্টো– বি এন চট্টোপাধ্যায়। দুজনেই রুশদেশে থাকে। এম এন রায় লেনিনের খুব কাছের মানুষ ছিলেন এবং আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট ফোরামে লেনিনের সঙ্গে তিনিও থিসিস জমা দিয়েছিলেন।’

মস্কো থেকে আগত শিক্ষক ভলকভরিয়াজনভ বললেন – মহাশয় মিঃ রায় কুড়ি সনে মস্কো এসেছিলেন । রাশিয়ার বাইরে কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠন করা একমাত্র লোক তিনিই। তিনি ম্যাক্সিকোতে পার্টি গঠন করেছিলেন। তাছাড়া কুড়ি সালের অক্টোবর মাসে তাসখন্দে গিয়েভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিও গঠন করেছিলেন।১৯২৬ সনে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট পার্টির সবচেয়ে উচ্চ এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হতে সমর্থ হয়েছিলেন। পরের বছর তাকে চীন দেশে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ফিরে আসার পরে–’

ভলকভরিয়াজনভ চুপ করলেন এবং চারপাশে একবার দেখে নিয়ে বললেন– কমরেড স্টালিন দেখা করার অনুমতিই দিলেন না ।২৯ সনে আন্তর্জাতিক কমিটি থেকে বহিস্কৃত করার পরের বছর তিনি নাকি ভারতে ফিরে গেলেন। কিন্তু–’

ভলক’ভ রিয়াজন’ভ পুনরায় বললেন – মিঃচট্টোপাধ্যায় বর্তমানে মস্কোতেরয়েছেন । তিনি ফরেন ওয়ার্কসপাবলিশিং হাউসে সম্পাদক হিসেবে কাজ করে চলেছেন।’

কিছুক্ষণ থেমে তিনি বললেন–’ আবশ্যক হলে আমি ভ্লাডিমির ফেলিক্স মহাশয়কে সঙ্গে নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে পারব।তাঁর গান্ধী পন্থার বিষয়ে মতামত কী জানতে পারব।’ 

পিটার যেলেনকভ মহাশয় বললেন–’ তাহলে তাই হোক। আপনারা তার সঙ্গে দেখা করুন এবং তারপরে আমরা কী পন্থায় সরকারকে আমাদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করব তা স্থির করব।’

সেদিনের মত আলোচনায় অন্ত পড়ল। মানুষগুলি বাড়িতে ফিরে যাবার পরেও লিঅ’নিড এডলার নাডিয়ার দাদা মিখাইলের সঙ্গে বসে রইল ।

ওরা দাবা খেলায় বসল না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেলিঅ’নিডের সঙ্গে বেরিয়ে যাবার জন্য কাপড় বদলাতে নিজের ঘরে গেল।

নাডিয়া কফির পেয়ালা গুলি গুছিয়ে রাখতে লাগল। সে বুঝতে পারল লিঅ’নিড তার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

‘ নাডিয়া’

নাডিয়াপেয়ালা গুলি গুছিয়ে রাখতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। সে লিঅ’নিডের দিকে তাকাল।

‘ তোমার ছবির কাজ কতটা এগিয়েছে?’– সে জিজ্ঞেস করল।

সে চট করে উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ পরে সে বলল–’ আর এক দিনের মতো বসলে হয়তো হতে পারে।’

সে পুনরায় পেয়ালা গুলি গোছাতে লাগল। ট্রেতে করে সবকিছুনিয়ে যেতে চাইতেই লিঅ’নিড পুনরায় জিজ্ঞেস করল–’ শিল্পীটির সামনে বসে থাকতে তোমার কেমন লাগে?’

নাডিয়ালিঅ’নিডের দিকে তাকাল।লিঅ’নিড তার আকাশী রঙের চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে ছিল।

নাডিয়াও কিছুক্ষণ তার দিকে তাকাল কিন্তু তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোনো প্রয়োজন অনুভব করল না । সে পেয়ালাগুলিনিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেল।

মিখাইল একটা জ্যাকেট পরে তার ঘর থেকে বেরিয়ে এল এবং লিঅ’নিডের সঙ্গে সন্ধ্যার ধূসর আলোর মধ্যে বেরিয়ে গেল।

ওদেরবেরিয়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়েনাডিয়া ভাবতে শুরু করল–’লিঅ’নিড তাকে কথাগুলি কেন জিজ্ঞেস করল?’

তার স্থির কালো চোখ দুটি তার মনে ভেসে উঠল। 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত