Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

জয়ন্তর শাদা বল

Reading Time: 6 minutes

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com‘এদিকটা খুব বদলে গেছে।’

বিচ্ছিন্ন বাক্যটা দুলতে দুলতে বক্তার কানের ছিদ্রমুখেই আটকে থাকে। বদলে যাওয়া সময়ের এমন খেই হারানো বাক্যের শ্রোতারা সময়ের মতোই চঞ্চল। তাছাড়া বর্ষীয়ান মানুষগুলো ঘরে-বাইরে এই একটা বাক্যই সবচেয়ে বেশিবার আওড়ান বলে এর প্রতি মনোযোগ দেওয়া নিষ্প্রয়োজন ভেবে অন্যরা যে যার কাজে সামনে পা বাড়ায়। চারপাশের বদলে যাওয়াও থেমে থাকে না।

শেষ বিকেলের আকাশে অযুত-নিযুত মেঘ জমেছে। এই মেঘ ভারহীন, বৃষ্টি আনে না। আকাশের মতো শান্ত-সৌম্য ভাব এই এলাকায় নেই। নাগরিক কোলাহলে এখানে কান পাতা দায়। গাড়ি, রিকশা, সাইকেল, হকার যে যার মতো পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। বাতাসে দুর্গন্ধ। ফুটপাতের পাশ দিয়ে যাওয়া ড্রেনের অনেকটা অংশের স্লাব ভাঙা। কদিনের টানা বৃষ্টিতে রাস্তায় পানি জমে ছিল। আজ রোদ পেয়ে পানিতে টান ধরায় রাস্তার ভেজা আবর্জনা আর ড্রেনের ময়লার চাপা দুর্গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

আবারও কেউ বুকচেরা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, ‘এদিকটা খুব বদলে গেছে।’ প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে কোনো না কোনো প্রবীণ নাগরিক অন্তত একবার এই কথাটি বলেন। ‘এই রাস্তা এদিকে ছিল না, উত্তরপাশের ঐ মার্কেট এলাকাও গোরা খালের অংশ ছিল,’ বলতে বলতে কারো কারো বর্ষীয়ান চোখ চারদিকের বদলে যাওয়া দেখতে থাকে। কেউ কেউ চশমার ভারি গ্লাসে হাত বুলিয়ে সময়ের অদৃশ্য কালিঝুলি সরান।

ঠিক এই মুহূর্তে তেমনই একজন মানুষ এলাকার প্রাচীনতম বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি এই এলাকার একজন পুরনো বাসিন্দা। তিনপুরুষ ধরে এখানে তাদের বসতি। মাঝখানে তার ছেলে পুরনো আমলের বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি করায় এদিকেই একটা বাড়িতে বছর খানেক তারা ভাড়াটিয়া হিসেবে ছিলেন। 

এই রাস্তার আশেপাশে নতুন সব বাড়ি। অবস্থা সম্পন্ন মানুষের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যবিত্তের ফাউন্ডেশনহীন বাড়িও রয়েছে। মসজিদের কাছে নির্মিত দুটি পাঁচতলা ভবনের মালিক এই জেলার সবচেয়ে নামী-দামী উকিল বশিরউদ্দিনের। এই বাড়ি দুটোর ঠিক উল্টোদিকেই লাল ইটের জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত ভবনটির অবস্থান। আগে এটি নন্দনপুর ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বছর দুই আগে ছাদের একাংশ থেকে ভারি পলেস্তরা খসে দুজন কর্মচারি আহত হবার পর ভূমি অফিস অফিসপাড়ায় স্থানান্তরিত হয়েছে। শোনা যাচ্ছে এই বাড়ি ভেঙে সরকারি অফিস নির্মিত হবে।

এই বাড়ির সামনে প্রায়ই এই বৃদ্ধকে দেখা যায়। দূর থেকে বৃদ্ধকে একা দেখা গেলেও তিনি একা নন। সারাদিনই বাসায় বন্দী সময় কাটান বলে তারা স্বামী-স্ত্রী দুজন ছেলে-বউমার সম্মতিতে রোজ বৈকালিক হাওয়া খেতে বের হন। সাধারণত বাড়ির মানুষ বৃদ্ধকে একা ছাড়ে না। বৃদ্ধের মস্তিষ্কের রোগ দেখা দিয়েছে। গতমাসে ছেলে তাকে মেডিকেলে নিয়ে গেলে ডাক্তার সাহেব প্রেসক্রিপশনে খসখস করে লিখে দিয়েছেন, ডিমেনশিয়া।

সপ্তাহ খানেক আগে তিনি বাড়ির কাউকে না বলে দৌলতপুরে চলে গিয়েছিলেন। সেই যে সেখানে, যেখানে সভা করে আব্দুস সবুর খান অমুসলিমদের কতলের ডাক দিয়েছিলেন। কৌতূহলী কেউ চাইলে খুলনা শহরের ইতিবৃত্ত খুঁজে ৬৪ সালের এই ঘটনার সঠিক বিবরণ আর সংঘঠিত হবার স্থান কোনটা তা জেনে নিতে পারেন। অবশ্য বৃদ্ধকে কাছে বসিয়ে পুরো গল্পটা শোনাবার জন্য অনুরোধও করতে পারেন। যদিও স্মৃতি-বিস্মৃতিতে ডুবসাঁতার কাটা বৃদ্ধের স্নায়ুকোষ এখন ঘটনার সঠিক বিবরণ দিতে বা ঘটনার সঠিক স্থান না-ও চিহ্নিত করতে পারে। তবে আশার কথা এই যে এখনো বেশিরভাগ সময় স্মৃতির সঙ্গে লুকোচুরি খেলায় তিনিই জয়ী হন।

হারিয়ে যাওয়ার দিনটিতেও দৌলতপুরে একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নিশানাহীন আঙুল তুলে উপস্থিত সবাইকে তিনি কী কী যেন দেখিয়েছেন আর জড়ানো কণ্ঠে পুরনো দিনের কথা বলেছেন। স্মার্টফোনে অভ্যস্ত নগরবাসী তার কথা শোনার জন্য দাঁড়ায়নি। পরে তার ছেলের শ্বশুরবাড়ির দিকের এক আত্মীয় তাকে চিনতে পেরে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেছে। বাড়ি ফিরে কাঁপা কাঁপা গলায় বৃদ্ধ জানিয়ে ছিলেন, ‘দেশে রায়ট লেগেছে।’

‘ওই দিকে কই যান? আজ না যাই ওই দিকে।’ বৃদ্ধের ছায়ার সমান্তরালে দাঁড়ানো ভদ্রমহিলা বোরকার ভেতর থেকে তার মোজা পরিহিত হাত বের করে স্বামীর হাতে টান দেন। স্ত্রীর স্পর্শে বৃদ্ধ সচকিত হন। কিছু একটা মনে পড়েছে তার। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে তিনি হাসেন আর জিভ জড়ানো কণ্ঠে বলেন, ‘টগর ফুল শাদা।’

এখন তারা দুজন যে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এই বাড়ি তাদের না। জীর্ণ-শীর্ণ বাড়িটার প্রবেশদ্বারে ততোধিক জীর্ণ একটা সাইনবোর্ড লাগানো, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, প্রবেশা নিষেধ-আদেশক্রমে কর্তৃপক্ষ।’ বিকালের তেজহীন রোদের ছায়া টুটোফাটা সাইনবোর্ডের লেখা আরও ম্রিয়মাণ করে রেখেছে।

বৃদ্ধা স্বামীর কাছ থেকে শুনেছেন, যেবার ভারতের শ্রীনগরের হজরতবাল দরগাশরিফ থেকে হজরত মুহাম্মদ (সঃ)এর মাথার চুল চুরি হওয়ার সংবাদে এ নগর উত্তাল হয়েছিল, সেবারের দাঙ্গায় এই বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। আর একাত্তরের পর পাকিস্তান সরকারের শত্রু সম্পত্তি স্বাধীন বাংলাদেশের অর্পিত সম্পত্তি হয়ে যায়। এরপর বাড়িটা সরকারি উদ্যোগে সংস্কার করা হয়েছিল।

আগুনে পুড়ে যাওয়া বাড়িটায় এখন কোনো পোড়া চিহ্ন নেই। মানুষেরও চিহ্ন নেই। দেশান্তরের কারণে পূর্ব-পাকিস্তানের অন্যতম হিন্দুগরিষ্ঠ জেলাটি যখন মুসলিমগরিষ্ঠ জেলাতে রূপান্তরিত হয় তখন হয়তো অনেকের মতো এই বাড়ির সদস্যরাও ভারতের জলপাইগুড়িতে চলে গেছে।

বৃদ্ধ চোখ একে একে অনেকের চলে যাওয়া দেখেছে। আগুন দেখেছে। থোকা থোকা সাদা টগর দেখেছে। আজো সেই চোখ সাদা টগর দেখে।

‘টগর গাছ কই?’

স্ত্রীর প্রশ্ন তিনি শুনতে পান না।

‘এই টগরের পাপড়ি থোকা থোকা, তাই এটা থোকা টগর।’

তারা দুজন বাড়ির গেটের একেবারে সামনে দাঁড়ান। ভঙ্গুর বাড়িটার প্রবেশদ্বারের রডগুলো অদক্ষ হাতে কেউ কেটে নিয়েছে। এদিকটায় মাদকসেবীদের আখড়া। সপ্তাহখানেক আগে রাত এগারোটার দিকে এখানে বৃদ্ধের ছেলের মানিব্যাগ ছিনতাই হয়েছে, ছোরাও বের করেছিল ছিনতাইকারীরা। অথচ এদিকটা এমন কোনো নিরিবিলি এলাকাও না।

ভাঙা গেট দিয়ে মানুষ দুজন সহজেই বাড়ির ভেতরে ঢুকে যান। তাদের বৃদ্ধ শরীর অশরীরী এক অনুভবে কেঁপে কেঁপে ওঠে। মনে হয় দরজার পাল্লা খুলে এখনই কেউ মাথা বের করে বলবে, ‘তোদের বল ঢোকেনি বাগানে। যা পালা, তোদের কাকা দেখলে বকবে।’

এই বাড়ির জানালার কাঁচ ভাঙাই থাকতো বরাবর। আজও ভাঙা। জানালার গ্রিল কেটে নিয়েছে কেউ। বৃদ্ধের পায়ের নিচে শুকনো পাতা মড়মড় করে ওঠে। পা হড়কে পড়তে পড়তে তিনি স্ত্রীর হাত ধরেন। বৃদ্ধের হাত নরম, ঘামে ভেজা। কী মনে হয় স্ত্রীর হাত ছেড়ে দিয়ে তিনি কয়েকপা এগিয়ে যান। এরপর পিছু ফিরে বিমর্ষ কণ্ঠে বলেন,

‘সকালে ভাত খাইনি।’

‘খেয়েছেন। দুপুরেও খেয়েছেন।’

‘না, সকালে ভাত দেয়নি কেউ। খোকা কেমন হয়ে গেল।’

‘টগর আবার কী করলো?’

‘ভাত খেতে ডাক দিলো না।’

‘কী যে বলেন! টগর আর আপনি না সকালে একসাথে বসে ভাত খেলেন! চলেন তো, বাড়ি চলেন।’

‘অনেকদিনপর এলাম তো। কুয়োপাড়ে যাই।’

‘গত সপ্তাহেও এসেছেন।’

‘কুয়োর মুখ বন্ধ হয়ে গেছে না?’

এই বাড়ির সীমানায় ঢুকলে তিনি প্রতিবার এই প্রশ্নটি করেন। নেকাবের পর্দা ভেদ করে একই উত্তর আসে, ‘না।’

বৃষ্টিতে প্রশ্রয় পাওয়া জঙ্গল ছাড়া এখন আর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য গাছগাছালি নেই এই বাড়িতে। খড়ি কুড়ানোর উছিলাতে মানুষজন দিনের বেলাতেও সীমানা দেয়াল ঘেঁষা আম আর কাঁঠাল গাছের হাতের নাগালের ডালপালা ভেঙে নিয়ে যায়। তবু লাল ইটের সবুজ শ্যাঁওলার ছোপ লাগা বাড়িটার চারদিকে ঘন সবুজ।

বৃদ্ধা তার নেকাব সরান। ‘বর্ষার দিন। সাপখোপ আছে মনে হয়। সাবধানে হাঁটেন।’

বৃদ্ধ নাক টানেন। বেশ একটা মিষ্টি ঘ্রাণ পাচ্ছেন। বাড়ির পেছনের দিকে কোনো কালে হয়তো একটা টগর গাছ ছিল। সেই গাছ ঝাঁপিয়ে শাদা শাদা ফুল ফুটতো। বৃদ্ধ সবুজের দিকে তাকান। দেখেন, গাছটি দাঁড়িয়ে আছে অবিকল, অবিচল। এবার তার মুখে ফুলের হাসি ফোটে। গুটিগুটি পায়ে তিনি কুয়োপাড়ে এগোন। উঁকি দিয়ে দেখেন কুয়োর ভেতর। কিছু খুঁজছেন তিনি।

স্বামীর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কুয়োর ভেতরে উঁকি দিতে দিতে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে বৃদ্ধা প্রশ্ন করেন, ‘কী দেখেন?’ বৃদ্ধ হাসেন। ফুকফুক হাসির শব্দে বৃদ্ধা চমকে ওঠেন।

‘কুয়োর মধ্যে জয়ন্তর বল পড়ে গেছে। শাদা বল। আমি এমন কিক মেরেছি না…’ বলতে বলতে বৃদ্ধ হাসেন। হাসির ফুকফুক ফুকফুক শব্দে বৃদ্ধা চমকে ওঠেন। এতগুলো বছরেও নিঃশ্বাসের দূরত্বে বাস করা মানুষটার গভীরতার থৈ পাননি তিনি। জীবনের অযুত-নিযুত রহস্যের সমুদ্রে ডুব সাঁতার কাটতে কাটতে তবু তারা একসঙ্গে পাড়ে এসে ভিড়েছেন।

এর ঠিক তিনদিন পর এই বৃদ্ধা মারা যান। এরপর বৃদ্ধের অসুস্থতাও বেড়ে যায়। খেয়ে বলেন খাননি, নিয়ে বলেন নেননি। অকারণে হৈচৈ করেন, জিদ করেন অবুঝ বালকের মতো। কর্মব্যস্ত ছেলে-ছেলেবৌয়ের সময় সংকুলান না হওয়ায় গৃহপরিচারিকার তত্ত্বাবধানে থাকা বৃদ্ধ আজকাল বাড়ির বাইরেও বের হন না। এর মধ্যে তবু আরেক বিপদের ঘটনা ঘটে।

মায়ের মৃত্যুর পর চল্লিশ দিনের দিন অফিস থেকে ফিরে টগর তার বাবাকে কোথাও খুঁজে পায় না। পরিত্যক্ত ‘সাহা ভিলা’, কুয়ো পাড়, আশেপাশের ঝোপঝাড়, সব জায়গায় এলাকার ছেলেছোকরাদের সঙ্গে নিয়ে সে ছুটে বেড়ায়। দৌলতপুর থেকে শুরু করে পাড়ার গলিতে গলিতে একে-তাকে পাঠিয়েও বৃদ্ধের হদিশ পাওয়া যায় না। এরপর রাত হয়ে এলে টগর থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি করে আসে। মাঝরাতে কেউ একজন ফোন দিয়ে জানায় ঢাকাগামী ট্রেনে বৃদ্ধকে উঠতে দেখা গেছে।

সারারাত ছটফট করতে করতে ফুলের মতো নরম ছেলে টগর বাবার জন্য কাঁদে। বাবার এই বিহ্বলতার দিকে আরো আগে কেন সে বাবার প্রতি মনোযোগ দেয়নি ভেবে ভেবে নিজেকে দোষারোপ করে। পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি করার পর থেকে মানুষটা ভেঙে পড়েছে। এতদিন বিষয়টা উপেক্ষা করেছে সেই আক্ষেপে কাঁদতে কাঁদতে টগরের শরীর ভেঙে পড়ে। বাবার বিছানায় নির্ঘুম রাত কাটানোর পর ক্লান্তির তীব্রতায় টগরের চোখের পাতা যখন জুড়ে আসে ঠিক তখন একটা হুইসেল বাজানো ট্রেন ওর মস্তিষ্কের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে যায়। বাবা ফিরে এসেছে!

বাইরে এসে টগর দেখে প্রবল বৃষ্টি নেমেছে মাটিতে, বাবাকে ফিরে না পাওয়ার গ্লানি ভেজা মাটিতে লেপ্টে গিয়ে বেকায়দা হাসি হাসছে। টগর ছুটতে থাকে। বাবার কাছে শুনেছিল ‘সাহা ভিলা’র কিশোরী মেয়েটির নাম ছিল টগর। রায়টের সময় টগর তার দাদা জয়ন্তকে বাঁচাতে গিয়ে ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসেছিল। তারপর থেকে টগরকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বাবার মুখে গল্পের পুনরাবৃত্তি একসময় টগরকে চঞ্চল করতো। অমনোযোগী শ্রোতার মতো গল্পের মাঝখানে বাবার সামনে থেকে হাওয়া হয়ে যেত সে। সেই টগর আজ গল্পের খোঁজে ছুটছে।

ছোটবেলায় টগর অনেকবার বাবার সঙ্গে এই বাড়ির সীমানায় ঢুকেছে। পরে অফিস চালু হলে এদিকটায় সবার আসা-যাওয়া সীমিত হয়ে গিয়েছিল। তবু বাবা আসতো। বারবার আসতো। টগর ফুলের খোঁজে।

টগরের চোখে পানি টলমল করে। কুয়োপাড়ে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা একাকী নিশ্চুপ মানুষটিকে তীব্র শ্লেষে ভর্ৎসনা করে উঠতে গিয়েও সে থেমে যায়। মানুষটা মাথা বাড়িয়ে কিছু একটা দেখছেন বা খুঁজছেন।

‘বাবা, কী খোঁজেন অমন করে?’

টগর এসেছে। কাছাকাছি কোথাও থোকা টগর ফুটেছে। বৃদ্ধ বুক ভরে শ্বাস নেন, মাথা ঝুকিয়ে আবার কুয়োমুখে উঁকি দেন। রোদে শাদা শাদা টগর তারার মতো ঝলমল করে।

‘ও বাবা, পড়ে যাবেন তো? কী খোঁজেন বললেন না?’

‘জয়ন্তর শাদা বলটা। আমি এমন কিক মেরেছি না…। কাকা দেখতে পেলে বকবে। সুনিতা কাকীর গলা পেলেই পালাবো।’

‘কই বল বাবা?’

‘আছে আছে, ঐ যে…দ্যাখ।’

বৃদ্ধ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে গাল ভরে হাসেন। বিস্মৃতিকে নাস্তানাবুদ করতে পারার খুশিতে নাকি ষাট বছর আগের হারিয়ে যাওয়া বল খুঁজে পাবার অলীক আনন্দে তিনি বিশ্বজয়ের হাসি হাসেন সকালের চমকে ওঠা আলোতে তা ঠিক বোঝা যায় না।

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>