ভেঙে পড়ার শব্দ

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comএকটু উদভ্রান্ত লাগছিল। এত দিনের চেনা রাস্তা! পাথরের কুচিটুকুও চেনা বললে অত্যুক্তি হয় না। যদিও রাস্তায় পাথরের কুচি সেই অর্থে নেই। ঝকঝকে মসৃণ রাস্তা লম্বা শরীর নিয়ে অনেকটা দূরে চলে গেছে। এদিকে সবই নতুন বাড়ি। যা একটু পুরনো, তাদের গায়ে রঙ ধরিয়ে পালিশ মেরে অন্য চেহারা করে নিয়েছে ছেলে বা মেয়ে। সব বাড়িই এখানে সৌখিন বাড়ি। রিটায়ার্ড লাইফ নিশ্চিন্তে নিরাপদে কাটাতে চেয়ে এখানে জমি কেনা হয়েছিল অনন্ত ঘোষের পরামর্শে। অনন্ত ঘোষ! নামটা বিলুপ্তির পথে যাচ্ছিল। হঠা করেই এই মানুষগুলো বিস্মৃতি থেকে ভেসে ওঠে জলে ডোবা লাশের মত। এমনই হয়ে থাকে। সকলেই থাকে। কিন্তু স্মৃতি বিস্মৃতির আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে থাকে। কে কখন কোন সুতো ধরে ভুউস করে ভেসে উঠবে কেউ জানে না। যেমন আজ অনন্ত ঘোষ উঠে এল। সঙ্গে সঙ্গে ঘোষের হোমিওপ্যাথির বাক্সটা ভেসে উঠল। ওটাই অনন্তর সিগনেচার বক্স।

তনিমা উদভ্রান্তের মতই এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল। সি ব্লকের এগারো নম্বর বাড়িটা কোথায়ও যেন ভুলভাল হয়ে যায়। অথচ বাড়িটা স্পষ্ট মনে আছে। কিছুদূর যেতেই এম বারোর পাশের বাড়ির দিকে তাকাল তনিমা। এখনও বাড়িটা একই ভাবে ঝুঁকে রয়েছে। যেন নীচু হয়ে রাস্তায় পয়সা খুঁজছে ভিখিরিদের মত। কবেই তো ঝুঁকতে ঝুঁকতে চাকনাচুর হয়ে যাওয়ার কথা ছিল এটার। রবি বলতো, একদিন হঠাৎ করে ভেঙে পড়বে দেখ। ভয় একটাই। ঘাড়ে না পড়ে। আজ একই চেহারা নিয়ে একই ভাবে দাঁড়িয়ে! বড়বাজারের কাছেই কোন এক বাড়ির কথা বলতো রবি। বাইরে নাকি পুরসভার ‘বিপজ্জনক বাড়ির নোটিশ ঝুলছে। মাস খানেক আগে বাড়ির একাংশ ভেঙেও ফেলা হয়েছে। অথচ সেই বাড়ির ভেতরে বহাল তবিয়তে বাস করছে বেশ কিছু মানুষ। তনিমা শুনে অবাক হয়েছিল যথার্থ। কী করে বাস করছে মানুষ ওই বিপজ্জনক বাড়িতে! ভয় করে না? লঝঝড়ে একটা বাড়ি, তার ছাদ টলমল, তার দেওয়াল ক্রমেই ঢিলে হয়ে আসছে, প্রতিটি ইঁট পরস্পরের থেকে আলগা হয়ে সম্পর্কচ্যুত হয়ে পড়ছে, কড়ি বরগা হাওয়ায় দুলছে, সেই বাড়িতে দড়ির খাটিয়ায় বসে পকোড়া খাচ্ছিল মা,বাপ,দুই ছেলে, তাদের যার যার বউ! দৃশ্যটা কাঁপিয়ে দিয়েছিল তনিমাকে! এভাবেও বাঁচে মানুষ? পারে?

বাঁক ঘুরতেই সোনাঝুরি গাছটা সামনে এসে দাঁড়াল। কতদিন ধরে চেনাশোনা এই গাছটার সঙ্গে। তুতাইকে নিয়ে বিকেলে বেড়ু বেড়ু করার সময় হলুদ ফুলে ছেয়ে থাকা রাস্তায় তুতাই টলমল করে হাঁটতো। বিকেলের সোনা রোদের আভা সোনাঝুরি গাছে আটকে থাকতো। এই গাছটা এতদিন পরেও কি সেকথা মনে রেখেছে! ওর মনে আছে সেই নিষ্পাপ শিশুকে! তার মা-কে! গাছটা কি চিনতে পারছে তনিমাকে? বিকেলের আলো কমে আসছে। তাড়াতাড়ি করে যেতে হবে তনিমাকে। কিন্তু বাড়িটা যে কোনদিকে! এই চিনতে না পারাটা একটা ধাঁধার মত ঠেকছে তনিমার কাছে। এতগুলো বছর তো ওই বাড়িতে ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল তনিমা। তাহলে আজ কেন বাড়ি ফেরার রাস্তাটা অচেনা লাগছে?

একটু দাঁড়িয়ে হাঁপ ছাড়ল তনিমা। বুক ধড়ফড় করছিল। এমন দ্রুত হেঁটে এসেছে! কাউকে জিজ্ঞাসা করে নেবে তেমন কাউকে দেখতেও পাচ্ছে না। এদিকে লোক চলাচল এমনিতেই কম।এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে হাঁটার গতি কমায় তনিমা। এখন একটা লম্বা রাস্তার মোড়ে এসে পৌঁছেছে ও। এদিকেই কোথায় যেন! স্পষ্ট মনে আছে এই সেদিন ভিত খোঁড়া হল। বাস্তু পুজো করা হল। বাড়ি হচ্ছে। ইঁট বালি পাথর আসছে। বাথরুমে নীল টাইলস বসল। রবি আবার টাইলসের মধ্যে ডলফিনের খুদে খুদে চেহারাওলা টাইলস পছন্দ করে নিয়ে এল। নীলচে টাইলসের মধ্যে ডলফিন। সামুদ্রিক গন্ধ উড়ে আসতো বাথরুমে। শুধুমাত্র কল্পনায় সমুদ্রকন্যা হয়ে উঠতে জানতো তনিমা। চুল খুলে দিলে কোমর ছাপিয়ে নামতো। শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে সাঁতার দেওয়ার ভঙ্গিতে হাত নাড়তো। শরীরে ঢেউ তুলে তুলে! সত্যি যেন জলপরী। মৎসকন্যা। বাথরুমের ভেজা আয়নায় ভেজা চুল, ভেজা শরীরের অচেনা,অথচ দারুণ প্রিয় তনিমাকে আবিষ্কার করে রোজ রোজ খুশি হয়ে ওঠা কম ব্যাপার নয়। রবি একদিন সেই তনিমাকে খুঁজে পেয়ে উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারেনি। সে ছিল একটা সময়! তুতাই এল একদিন। আনন্দের ফুলকি উড়তে থাকে বাড়ির আনাচে কানাচে! ওকে নিয়ে বড় হয়ে উঠতে শিখল তনিমা। আসলে তুতাই টলমল পা ফেলার আগেই কত কিছু শেখাতে শুরু করেছিল তনিমাকে। আড়াই ঘন্টা পর পর মাপ মেনে দুধ খাওয়ানো, একটু একটু করে জল খাওয়ানো, ভ্যাকসিন দিতে নিয়ে যেতে যেতে কত নতুন নতুন মায়ের সঙ্গে আলাপ হওয়া, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া…!

কতকিছু না শিখতে হয়েছি। মনে আছে সন্তুর বোন পম্পি দেখতে এসেছিল তুতাইকে। নীল ফ্লোরাল মোটিভের কিড-মশারির নীচে লাল লাল গাল নিয়ে ঘুমিয়ে থাকা তুতাইকে দেখে ভারি খুশি পম্পি-ওর বয়স কত গো? মাত্র বারোদিন-শুনে সে কী হাসি পম্পির মাত্র বারোদিন! বছর নেই এখনও? পম্পির মা একগাদা জামা বানিয়ে দিয়েছিল তুতাইকে। লাল নীল হলুদ সবুজ! বেনীয়াসহকলা জামা। প্রথম জামাটা মা দিয়েছিল। সেটা নার্সিং হোমেই তখন ঠান্ডাটা সবে পড়তে শুরু করেছে। বাচ্চার ঠান্ডা লাগবে চিন্তা করে গরম কাপড়ের জামাও ছিল গোটা ছয়েক। একটু একটু করে শিখে ওঠছিল তনিমা। তুতাই যা শিখছে, বাধ্য ছাত্রীর মত এক এক করে সে গুলো শিখে ফেলেছিল তুতাইএর মা। শুধু মা-ই কেন? বাবাও কম ছিল নাকি? খুব বৃষ্টির দিনে লোয়ার কেজির পরীক্ষার ডেট পড়েছে। মোড়ের মাথায় স্কুল বাস আসবে। হাঁটুজল ভেঙে তুতাইকে কোলে করে বাসে তুলে দিয়ে এসেছিল রবি। তনিমাও সঙ্গে ছিল। ফিরে আসার সময় ভিজে ঝুপ্পুস দুজনে হেসে সারা। কী কান্ড বলতো? এই পরীক্ষাটা না দিলে কী এমন হতো? আমরা কি অন্যান্য পাগলাটে বাবা মায়ের মত হয়ে যাচ্ছি ?

রবি মন খারাপ করেছিল। বেচারা ছেলেটা! আজ নাহয় ঘুমোতো একটু বেশিক্ষণ! কালে কালে আমরাও বিশু ঘোষের মত না হই? হি হি করেছিল তনিমা তখন বিশু ঘোষের কথা মনে করে। বিশু ঘোষের চার মেয়ের পর ছেলে হতে যেন সাক্ষাৎ ভগবান এসেছেন এমন ভাব। প্রশ্রয় পেতে পেতে ছেলে আকাশ থেকে আরও কত ওপরে ওঠা যায় ভাবছে। বাবা খেতে বসেছে,ছেলের আবদার- বাবা, তোমার থালায় পা দেব।

বিশু ঘোষ আহ্লাদে শিহরিত! দাও বাবা দাও। এই যে, এই খানে দাও, বলে ভাত গুলো সামনের দিকে টেনে খানিকটা জায়গা করে দিয়েছে। -নাও, দাও! ছেলে একটি পা রেখে বামন অবতারের মত আরেকটি পা রাখার জায়গা খুঁজছে। মা এসে- অন্য পা আমার থালায় দিও বাবা?

তনিমা হেসেছিল। তখনও বাড়িটা সম্পূর্ণ হয়নি। বাড়ি ফেরার সময় বাড়িটা দেখে আসার বায়না ধরেছিল তনিমা। সেই বৃষ্টি-ভেজা রাস্তায় দুজনে অটোতে উঠে বসেছিল নিজের বাড়ি দেখবে বলে। তখন অন্যরকম ছিল সব। ভিজে শরীরে কাঁপুনি টাপুনি গ্রাহ্য করেনি কেউ। মেন রোড থেকে অনেকটাই ভেতরে। বাড়ি দেখতে এসে ছাদে উঠেছিল রবি। সিঁড়িতে রেলিং নেই বলে ভয় পাচ্ছিল তনিমা। রবি ওকে ধরে উঠিয়েছিল ছাদে। চোখ জুড়িয়ে গিয়েছিল তনিমার। বাড়ির পেছনদিকে সবুজ মাঠটা অসীম উল্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে। তনিমা রবির হাত নিজের হাতে জড়িয়ে নিয়েছিল, তুতাই খেলতে পারবে! খুব ভাল হল না গো? আমি মনে মনে এরকমই চাইছিলাম জানো। আর আমি গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে ছাদে ওঠার সিঁড়িটা অন্যরকম করব। রাহুলদের বাড়ির মত সিঁড়ি চাই বুঝলে! ফ্রস্টেড গ্লাস স্টেয়ার। এখন এই সিঁড়ি ফ্যাশনে খুব ইন জানো তো? সুন্দর, স্বচ্ছ ন্যাচারাল লাইট ধরে রাখে। যখন দোতলা করব, তখন বুঝবে কেমন ভাল লাগছে সিঁড়িটা।

সত্যি তাই! বাড়িটা মনের মত করে বানিয়েছিল রবি। কোথাও ফাঁকি রাখেনি। একতলা করে বলেছিল, দোতলা তুতাই করবে বুঝলে? আমি পোক্ত ভিত করে দিয়ে যাচ্ছি। তবে তোমার কথা ভেবে যতটুকু পেরেছি, সবটুকু করেছি। তোমার সাউথ ফেসিং বেডরুম,আর বেডরুমের লাগোয়া ব্যালকনি, ব্যালকনিতে ফুলের বাগান, দোলনা এটসেট্রা…! করে দিয়েওছিল রবি। সংসারটাকে খুব ভালবেসে ফেলেছিল রবি। ফেলেছিল কেন বলছে তনিমা? রবি এখনও ভালোবাসে সংসার। খুব, খুব ভালবাসে। কসবার দিদি মঞ্জুষা দাদাকে টিপ্পনী কাটতে ছাড়েনি এই জন্য। লিপ্সটিক রাঙা ঠোঁট ফুলিয়ে বলেছিল, বউদি তো ম্যাজিক জানো। এই দাদা, বাড়িতে একটা ফ্যান লাগাতে দেয়নি। বলতো, ওসব হল বিলাসিতা। এত গাছ আছে বাড়িতে, যথেষ্ট হাওয়া খেলে। কিসের জন্য একগাদা অর্থের অপচয়? আর এখন দেখ! বলে মঞ্জুষা কেমন একরকম করে ঠোঁট বেঁকিয়েছিল। কিন্তু সেই মুখ বেঁকানোটাই খুব খুশি এনে দিয়েছিল তনিমার মধ্যে। ম্যাজিক জানে তনিমা। সত্যি ম্যাজিক জানে! এক ঘোর ঘোর দুপুরে তুমুল বৃষ্টি নেমেছিল তনিমার মধ্যে। রবি সেই বৃষ্টির মেঘ নিয়ে এসেছিল ঘরে। তনিমা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল রবি আসছে একগাদা মেঘ দু’হাতে জড়ো করে। তনিমা ওর বাড়ির দরজা খুলে মেঘ আনতে সাহায্য করেছিল রবিকে। মনে আছে সব। তুতাইকে নিয়ে একটা অপরূপ কল্পনার রাজ্য ছিল ওদের। সেই মেঘ থেকে জন্ম হল তুতাইয়ের!

উফ! এখানে বাম্প হল কবে? তনিমা আচমকা হোঁচট খেয়ে আরেকটু হলেই উলটে পড়তে যাচ্ছিল। নিজেকে সামাল দিতে দিতে তুতাইকে ডেকে উঠেছে ও। ভয় পেলে বা আচমকা হোঁচট খেয়ে “ওহ, মাগো” বলার কথা। শব্দ দুটো আসারই কথা ছিল। কিন্তু তনিমার কাছে তুতাই ছাড়া কার নাম আছে ! রবি? রবিকে কি ওভাবে ডেকেছে তনিমা কখনও? অথচ রবিই ছিল ওর সবটুকু নিয়ে ! রবি? নাকি তুতাই? কে ওর কাছের বেশি? হোঁচট খেয়ে রবিকে ডেকে ওঠেনি কেন তনিমা? তুতাইকে কেন ডাকল ও?

হাঁপ ধরে যাচ্ছে। হাঁটার অভ্যেস নেই অনেকদিন। তাড়াতাড়ি করতে হবে। ভাসুরের ছেলে কৌশিক আর ওর বউ যদি জানতে পারে তনিমা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে, তাহলে এখনই চলে আসবে ওকে নিয়ে যেতে ওদের বাড়িতে। এখন তনিমা তো ওদের বাড়িতেই থাকে। কৌশিক কাকিমাকে নিয়ে গেছে ওর কাছে। না নিয়ে বা করতো কী? কোথায় রেখে যেত তনিমাকে! একা একা থাকতো কী করে তনিমা! এত চেনা,প্রিয় বাড়িতে একা কেমন করে থাকবে তনিমা! তনিমা নিজেই যে সেকথা বুঝে উঠতে পারছে না! কৌশিক হাত ধরে তনিমাকে নিয়ে গাড়িতে তুলেছিল। তনিমা আসলে ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারছিল না পরিস্থিতিটা। বা, বলা যায় অনুধাবন করতেই পারেনি পরিস্থিতি। কৌশিক ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল যখন, তনিমা চিৎকার করে তুতাইকে ডেকেছে। বুঝতে পারছিল না মায়ের ডাক শুনেও তুতাই কেন এগিয়ে আসছে না! রবিকে ডেকেছে বারবার। রবিকে ডেকেছে! আশ্চর্য! দুজনের কেউ আসেনি ওর কাছে! কেউ এসে পাশে দাঁড়ায়নি। বলেনি কৌশিক, কাকিমাকে ছেড়ে দাও। তুতাই বলেনি কুশুদা, মাকে ধরে রেখেছ কেন? ছেড়ে দাও। কেন টেনে নিয়ে যাচ্ছ? না বাবা, না ছেলে, কেউ আসেনি তনিমার কাছে। কৌশিক জোর করে তনিমাকে নিয়ে গাড়িতে তুলেছে। উফফ! তনিমা ফের হোঁচট খেয়েছে। শাড়ির কুচি পায়ে আটকে গিয়েছিল। তনিমা কুচিটা তুলে ধরতে ভুলে গেল। ওভাবেই হাঁটতে শুরু করেছে ফের। লম্বা লম্বা ইউক্যালিপটাস গাছ সন সন করে পাতা নাড়িয়ে চলেছে। তনিমা দাঁড়িয়ে পড়ে গাছের পাতাগুলোর নড়াচড়া দেখল। গাছের গায়ের উঠে যাওয়া ছাল দেখল। গা থেকে ছাল টেনে তুলেছে কেউ! তখন গাছের খুব ব্যথা করেছে ঠিক। খুব ব্যথা করেছে। আহা! বলার মত কেউ ছিল না কাছে। কেউ ওর ডাক শুনতে পায়নি। কেউ এসে বলেনি, কেন ওর গা থেকে ছাল তুলে ফেলছ তোমরা? ওর ব্যথা হয় না? ওর কষ্ট হয় বোঝ না? আচ্ছা, রবি বা তুতাই কেউ এসে বলেনি। গাছের এত ব্যথা ওরা কেউ বুঝল না? শরীর থেকে চামড়া খুলে নিলে উফ, কী কষ্ট তুতাই…কী কষ্ট রবি!

-বউদি, আপনি এখানে…সঙ্গে কেউ নেই? একটা লোক…এসে দাঁড়িয়েছে তনিমার সামনে। বউদি বলছে ওকে! কে লোকটা? তনিমা ভারি আনমনা চোখে লোকটিকে দেখল। দেরি হয়ে যাচ্ছে। কৌশিক ওকে খুঁজতে চলে আসবে! ফের ধরে নিয়ে যাবে। তুতাই আর রবি এই বাড়িতে আছে। তাহলে কেনই বা তনিমা ওদের ছেড়ে কৌশিকের কাছে থাকবে? ওর কি ভাল লাগে এভাবে তুতাই আর রবিকে ছেড়ে থাকতে!

তনিমা দ্রুত পা চালায়। এদিকেই তো বাড়িটা মনে হচ্ছে! তনিমার এই এক দোষ। রাস্তা মনে রাখতে পারে না! রবি শিখিয়েছিল, যে কোনও ল্যান্ডমার্ক মনে রাখতে। যাতায়াতের পথে কিছু চিহ চিনে রাখতে। বলে একটু বদমায়েশি হাসি হেসে রবি ভালমানিষের মত মুখ করেছিল, রাস্তায় কোনও ষাঁড় বসে আছে,বা একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে দেখে ল্যান্ডমার্ক ভেব না। ওরা কিন্তু চিরস্থায়ী নয়। মনে থাকবে?

তনিমা রেগে গিয়ে মুখ থমথমে করেছে, এত বোকা নাকি আমি? লোডশেডিং বলে বাড়ি চিনতে পারিনি। তাছাড়া সবে তো এলাম। এখনও ল্যান্ডমার্ক-ফার্ক মাথায় ঢোকে নি।অথচ তনিমা সত্যি খুব বোকা সেটা প্রমাণ করে দিচ্ছে নিজেই। নিজের বাড়ি চিনতে পারছে না! কোনও ল্যান্ডমার্ক নেই ওর কাছে! কিচ্ছু জমা রাখেনি ল্যান্ডমার্ক হিসেবে এতগুলো দিন ধরে! রবি শুনলে কী যে ভাববে! আচ্ছা বাড়ির সামনে দুটো কলকে ফুলের গাছ ছিল তো! একটাতে হলদে ফুল অন্যটায় সাদা কলকে! এই তো মনে পড়েছে! কত ফুল তুলতো তনিমা! ওর ঠাকুরঘর ফুলে ঢেকে দিত। অনেকদিন পুজো করেনি ও! ভুলে গিয়েছিল পুজো করতে? ইস, দেখেছ কান্ড! পুজো করতে ভুলে গেছে! কিন্তু কলকে ফুলের গাছ দুটো বা কোথায়? ওরা কি ভুলে গেছে তনিমাকে! একটু তো ডাকতে পারে! তনিমা ক্লান্ত চোখে সামনের দিকে তাকায়।

এই যে দুটো কলকে ফুলের গাছ! একটা একতলা বাড়ির সামনে দুটো দুই রঙের ফুল। এটাই বাড়ি তনিমার! হ্যাঁ, হ্যাঁ! মনে পড়েছে! মনে পড়েছে! এই লেমন গ্রীন বাড়িটাই তো…! বাস্তু মেনে বাড়ির রঙ করিয়েছিল রবি। এমন সুন্দর প্রাণ-মন উজ্জীবিত করা রঙ মেখেও বাড়িটা বড্ড বিষণ্ণ! যেন গায়ে মেঘ মেখে রেখেছে। তনিমা বিষন্ন বাড়িটার দিকে ছুটে গেল। বাড়িটা কি ওকে চিনতে পারছে না? হেসে উঠল নাতো! কেমন মনমরা চোখ মেলে তাকিয়ে আছে দেখ! তুতাই মাঝে মাঝে এই রকম চোখে তাকায়! তখন কথা বলে না। গুম মেরে থাকে! যখন বছর বারো বয়স, তখন থেকেই একটু একটু করে বদলে যাচ্ছিল তুতাই। মা হয়ে সেই বদলটা বুঝতে পারেনি তুতাইয়ের মা। ভেবেছে বড় হচ্ছে, শরীরের সঙ্গে মনেরও বদল হয়।পার্সোনালিটি গ্রো করে। হয়তো এটাও সেই বদল। কিন্তু কেমন একরোখা হয়ে পড়েছিল। জিনিসপত্র ভাঙাভাঙি, খাবার ছুঁড়ে ফেলা, জানালার কাচ ভেঙে নিজের হাত কেটে কী যে করেছিল। ব্যাপারটা এতটাই বেড়ে গেল… কৌশিক পরামর্শ দিল কাউন্সেলিং করাতে। ডাক্তার বলেছিলেন, প্রবলেম রয়েছে সামান্য। ওকে উত্তেজিত করা না হয় যেন। নিজেরা ধৈর্য্য ধরে সামলাবেন। রবি ভেঙে পড়েছিল। রাতে ঘুমোতে পারতো না। অথচ তুতাইয়ের বায়না সামলাতে সামলাতে রবি কেমন হয়ে যাচ্ছিল। তনিমা বাপ-ছেলের সম্পর্কের মধ্যেকার দৃশ্যমান অশান্তি সহ্য করতে পারছিল না। অস্থির লাগতো যখন তুতাই ফের মোবাইল ফোন বা কিন্ডল বা হাজার গ্যাজেটের জন্য অনলাইনে অর্ডার দেবে বলে রবির এটিএম কার্ড চাইতো! প্রথম প্রথম রবি শান্তই ছিল। দিয়েছে ছেলেকে। কিন্তু তুতাই ক্রমশ চাহিদার হাত বাড়িয়ে যাচ্ছে। পড়াশোনা নিয়েও তুতাই কম ঝামেলা করেনি! অমুক জায়গায় পড়ব, অমুক সাবজেক্ট নিয়ে পড়ব! রবি সবেতেই সায় দিয়ে গেছে বিশু ঘোষের মত। আস্তে আস্তে কবে যে রবি বিশু ঘোষ হয়ে গেছিল! জয়পুরে কী পড়বে বলে ঠিকঠাক হল। যেদিন যাওয়ার কথা, সেদিন মাত্র আধ ঘন্টা আগে তুতাই বলল, না। আমি যাব না।
-কেন? রবি আশ্চর্য হয়নি। হতাশ চোখে তাকিয়েছিল কেবল।
-ইচ্ছে করছে না! দিল্লিতে ইংলিশ নিয়ে পড়ব। বলে জয়পুরে যাওয়ার ফ্লাইটের টিকিট বের করে ছিঁড়ে ফেলল তুতাই। রবি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল আরও চারবারের মত এবারেও তুতাই একটানে টিকিটটা ছিঁড়ে ফেলল নিপুণভাবে। রবি গলাটা ঝুলিয়ে ঘর থেকে যখন বেরিয়ে আসছিল, ফাঁসিতে ঝুলে যাওয়া বডি মনে হচ্ছিল রবিকে। তনিমা মুখ লুকিয়ে পেছনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। রবির সঙ্গে মুখোমুখি হতে লজ্জা হচ্ছিল তনিমার।

তনিমা গেটে হাত দিয়ে ঝাঁকুনি দিল। গেটটা হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে বিরক্তিসূচক শব্দ করে উঠল। তনিমা গেটের ভেতরে উঁকি দিল। ইসস, সিঁড়িতে শুকনো পাতা পড়ে আছে। ইস, এত বিরক্ত লাগে যে বলার না। রবি কি তুতাই কেউ কি একটু সংসারের কাজ করতে পারবে না কখনও? বাড়ির বারান্দার তারে এখনও শুকোতে দেওয়া আছে রবির ঘরে পড়ার শার্ট, তুতাইয়ের গোল গলা টি! তোয়ালেটা কি কাজে লাগেনি? ঝুলছে অসহায়ের মত। বাড়ির গেট বন্ধ। তালা ঝুলছে। তনিমা তালা ধরে নাড়াল বার কয়েক। তালাটা খুলছে না। কী যে মুশকিল করে রবি! তালা দিয়ে গেছে কোথায়? আর তুতাইটাও হয়েছে! বাবাকে না বলে চলে গেছে কোথায়! হয়তো রবি তুতাইকে খুঁজতে গেছে। ছেলেটা নাকি মানসিক রোগী! আচ্ছা! এসব কেন বলল কৌশিক!
-আপনি? এখানে আসা বারণ!
চমকে পেছন ফিরে তাকাল তনিমা। খাকি পোশাক পরা লোকটা কড়া চোখে তাকিয়ে আছে। তনিমা ভয় পেল। লোকটা কে? এমন করে বলছে কেন?
-আমার…মানে আমাদের বাড়ি। একটু ভেতরে যাব। কিন্তু তালা দিয়ে কোথায় গেছে সব।
-আপনার বাড়ি?
-হ্যাঁ, আমাদের বাড়ি তো! দেখুন না,চাবি দিয়ে রেখে কোথায় গেল।
-আচ্ছা, কী করবেন বাড়িতে ঢুকে?
-বাড়িতে ঢুকে কী করবো! দেখব একটু! বারান্দায় জামাকাপড় তোলেনি কেউ! আমি কৌশিকের কাছে ছিলাম। এরা কিচ্ছু কাজ করেনি। ঝাঁটপাট দেয়নি! বাড়িতে ঝাঁট না দিলে হয়? ইস, ওই দেখ কান্ড, বালতির মধ্যে ভেজা জামাকাপড় নিংড়ে রেখেছে, শুকোতে দেয়নি জয়া। ওহো, জয়া কোথায়? কাজে আসেনা? জয়া কাজে আসেনা কেন? নতুন বাড়ি! কী অবস্থা করে রেখেছে বাড়ির! আমি ঢুকে একটু সাফসুতরো করবো।
-স্যরি ম্যাডাম। অনুমতি নেই। আপনি ঢুকতে পারবেন না। থানা থেকে বাড়ি সিল করে দিয়েছে।

থানা থেকে বাড়ি সিল করে দিয়েছে? তনিমা অবাক হয়ে গেল। এই বাড়ি কি বিপজ্জনক বাড়ি হিসেবে চিহ্নিত নাকি? পুরসভা থেকে কি নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছে বাড়ির গায়ে? কেন? বাড়ি তো নতুন! যান ম্যাডাম। এই বাড়িতে পুলিশের অনুমতি ছাড়া কেউ ঢুকতে পারবে না। এই বাড়ির মালিক রবি নস্করকে তাঁরই ছেলে হকি স্টিক দিয়ে মাথায় আঘাত করে মেরে ফেলেছে। টাকা চেয়েছিল ছেলে। বাবা আপত্তি করায় রেগে গিয়ে… ছেলেটা নাকি মানসিক ভাবে অসুস্থ! এখন পুলিশের হাতে। জামিন পাবে কিনা…!

রবিকে মেরেছে ওঁর ছেলে! তনিমা কিছু বলতে যাচ্ছিল।কৌশিক হাত ধরে টেনে নিয়েছে। আঃ কাকিমা, তুমি কখন…? আমরা খুঁজে মরছি তোমাকে। অজন্তা আন্দাজ করেছিল তুমি এখানে আসতে পারো। চল চল!

একটা কথাও মাথায় আসছিল না। তনিমা কৌশিকের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করছিল। একটা ভয়ঙ্কর শব্দে পেছন ফিরে তাকাল তনিমা। বিপজ্জনক বাড়িটা কি ভেঙে পড়েছে? তাকিয়েই হতবাক তনিমা। বাড়িটাই নেই!

তারপরে একটানা সুরে বাঁধা এস্রাজ থেকে আলগা করে সুরটা টেনে ছিঁড়ে ফেলে দিলে সব কেমন হয়ে যায়। বাড়িটা ঠিক সেই রকম ভাবে ভেঙে গেল। তনিমা এখন ভাঙা বাড়িটাই খুঁজে বেড়াচ্ছিল। একটা গরম হা হা বাতাস একটা জমির চারপাশে হু হু শব্দে ঘুরে মরছে! তনিমা বুঝতে পারে ওখানেই ছিল সে! অনেকদিন আগে।

কৌশিক টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। তনিমা বলল-বাবু,একটু দাঁড়াও, দেখি যদি বাড়িটা ফিরে আসে। একটা শূণ্য জমির ওপরে একটা বাড়ি ফিরে আসবে,এমন জাদু দেখার জন্য কৌশিকের সময় ছিল না। ও হাঁটতে শুরু করেছিল। কিন্তু তনিমা জানে, ও আবার খোঁজ নিতে আসবে। একদিন বাড়িটা ফিরে আসবে, তখন চেনা কাউকে না দেখলে ফিরে যাবে ফের। তনিমা সেটা হতে দেবে না। একবার অন্তত…!

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত