সাগর সঙ্গমের সেই সাঁতার

Reading Time: 3 minutes১৯৫৭ কি ‘৫৮ হবে | উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত অসিত সেনের ছবি ‘জীবন তৃষ্ণা’ সবে মুক্তি পেয়েছে। এই ছবির সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তখন নাম হয়েছে অসমের সঙ্গীতশিল্পী ও সুরকার ভূপেন হাজারিকার।উত্তমকুমারের লিপে গেয়েছিলেন ভূপেন। গানটা ছিল ‘সাগরসঙ্গমে সাঁতার কেটেছি কত ‘।এই গানটা তিনি লিখেছিলেন অসমিয়া ভাষায়। জাহাজে বসে আমেরিকা থেকে ফেরার সময়।প্রশান্ত মহাসাগরের রূপ দেখে। পরে ওই গানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ”গান লেখা আর সুর করার ব্যাপারটা আমার সব সময় স্বতঃ স্ফুর্তভাবে আসে।’ আমেরিকা থেকে ডক্টরেট করে আফ্রিকা হয়ে ফেরার সময় গানটা লিখি, ঠিক এই ভাবেই লিখি শিকাগো যাবার পথে ট্রেনে যাবার সময়, ‘রেল চলে মোর রেল চলে।’ এই গানটা পরে বাংলায় রেকর্ড করি এইচএমভি কোম্পানি থেকে।’ আমেরিকা সফরের সময় ভূপেন হাজারিকার জীবনে ঘটেছিল একটি স্মরণীয় ঘটনা। নিউ ইয়র্কে একটি মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হল। নাম প্রিয়াম্বদা পাটিল। বরোদার মেয়ে। পড়াশোনা শান্তিনিকেতনে। ওর তখন পড়া শেষ। তার তখন ফেরার পালা। জানি না, শিল্পীর মধ্যে কী দেখেছিলেন প্রিয়ম্বদা। প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়লেন | ভূপেনের তখন মাথায় বাজ পরার দশা। তিনি কিছুতেই মেয়েটিকে বুঝিয়ে উঠতে পারছেন না, তিনি চালচুলোহীন শিল্পী। বাউন্ডুলে। আজ এখানে তো কাল সেখানে। কোনো বাধা চাকরি নেই। বাঁধাধরা রোজগার নেই। এমন ছন্নছাড়া জীবনের সঙ্গে কি করে ফুলের মত নরম মেয়েটিকে জড়ান? প্রিয়ম্বদা কানেই তুললেন না ভূপেনের কথা। ছিনে জোকের মত রইলেন ভূপেনের সঙ্গে। শেষে বাধ্য হয়ে ১৯৫০-এ আমেরিকায় ভূপেন বিয়ে করলেন তার প্রিয়া-কে। এবার ঘর টানছে ভূপেনকে। প্রিয়ম-কে নিয়ে ১৯৫৪-তে গুয়াহাটিতে ফিরলেন শিল্পী | শুরু হলো সংগীত জীবন। এই সময় ভূপেন যোগ দেন গণনাট্য সংঘে। পান বাজারে তখন থাকতেন গণনাট্যের প্রাণপুরুষ হেমাঙ্গ বিশ্বাস। ওর সংস্পর্শে আসার পর দুজনে মিলে ঠিক করলেন, সারা উত্তরপূর্বাঞ্চলের মানুষদের নিয়ে গুয়াহাটিতে একটি বড় অনুষ্ঠান করবেন। রোজ ২২ হাজার লোক ১টাকা করে টিকিট কেটে সেই অনুষ্ঠান শুনতে আসত | বিনা পারিশ্রমিকে ওই সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন বলরাজ সাহানি, সলিল চৌধুরী, সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস ও ওমর শেখ | গুয়াহাটিতে আসার পর অসম সরকার দু’বছর গান গাইতে দেয়নি ভূপেন হাজারিকাকে। সব গান ব্যান করেছিল।এমনকী বিহু উত্‍সবেও তার গান নিষিদ্ধ ছিল। মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণুরাম মেধা পর্যন্ত বলেছিলেন, ভূপেন নাকি কমিউনিস্ট। কেন এমন ধারণা জন্মেছিল সবার মনে? কারণ, তিনি কমিউনিস্ট পার্টি-র মেম্বার ছিলেন না বটে। কিন্তু গণনাট্য সংঘের হয়ে গান গাইতেন, তাই। সরকারের বিরুদ্ধে সেই সময় মুখ খুলতে পারেননি ভূপেন। কিন্তু মনের জ্বালা প্রকাশ করেছিলেন কালি-কলম আর কন্ঠ দিয়ে | ওই সময় তার সৃষ্টি ‘প্রতিধ্বনি শুনি’-র মত চিরকালের গান। এরপরেই অসম ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন ভূপেন হাজারিকা। কলকাতায় আসার আগে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মত নিয়েছিলেন শিল্পী। ভূপেনকে হেমাঙ্গবাবু এই পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘পৃথিবীর মানুষ তোমায় চায়। তাই শুধু অসমে থাকলে তোমার চলবে না। পৃথিবীর সঙ্গে লড়াই করতে হলে কলকাতা মহানগরীতে চলে এস।’ মৃত্যুর আগে হেমাঙ্গ বিশ্বাস এক প্রথম শ্রেণীর পত্রিকায় সাক্ষাত্‍কারে বলেছিলেন, ‘ভূপেন-ই একমাত্র শিল্পী, যেকোনো সময় মানুষের মনে ঝড় তুলতে পারে।’ হেমাঙ্গবাবু খুব মিথ্যে বলেননি। কলকাতার ওয়েলিংটন স্কোয়ারে গণনাট্য সংঘের হয়ে গান গেয়ে পরের দিন সব দৈনিক পত্রিকায় হেড লাইন হয়ে গেলেন ভূপেন হাজারিকা। মুম্বই-এ সলিল চৌধুরী গণনাট্য সংঘের হয়ে একটা ইউথ কয়ার করেছিলেন। তাতে মহম্মদ রফি গেয়েছিলেন ‘ধিতাং ধিতাং বলে।’ আর ভূপেন গাইলেন ‘দোলা, এ দোলা’, ‘সাগর সঙ্গমে’ গানগুলো। প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয়েছিল তাঁর এই সব গান। আর সারা ভারতের মানুষের কাছে বিশেষ ভাবে পরিচিতি পেলেন অসমিয়া গায়ক। শেষে গানকেই তিনি জীবিকা করলেন। শুধু জীবিকা নয়, গান-ই তাঁর হাতিয়ার, প্রাণ এবং জীবন। কোনদিন তিনি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। আর তাঁর প্রতিবাদের ভাষা ছিল গান। অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদে ভিতরটা ঝলসে উঠত। আর কলম দিয়ে বেরিয়ে আসত কালজয়ী গান। ১৯৬০-এ গণহত্যালীলার বিরুদ্ধে তিনি গেয়ে উঠেছেন ‘মানুষ মানুষের জন্যে।’ গানে নিজেকে মেলে ধরলেও কখনো এক গাদা গান গাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না ভূপেন। অনেকে ভাবতে পারেন, এতো অল্প গান গেয়ে কীভাবে এত জনপ্রিয় হলেন তিনি! এই প্রশ্ন তাকে হেমাঙ্গবাবুও করেছিলেন। উত্তরে শিল্পী বলেছিলেন, ‘পুরনোকে আকড়ে ধরে বাঁচতে শিখিনি। বরাবর নতুন প্রজন্মের চাহিদাকে মিশিয়ে দিয়েছি আমার সৃষ্টির মধ্যে।’ আজও ভূপেন হাজারিকা সমসাময়িক, প্রাসঙ্গিক।এখানেই তাঁর শিল্পী সত্তার সার্থকতা। তাঁর সৃষ্টির সাফল্য।      

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>