শমিতার কবিতারা

আজ ১৫ আগষ্ট কবি ও বাচিক শিল্পী শমিতা চৌধুরী ওঝার জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


অপেক্ষারা
 (১)
বুক পকেটে সন্ধ্যাতারা তোমার
আমার জানলায় পর্দা প্রতীক্ষার!
(২)
পাথর জমেছে বুকে।
জল তার নিচে পড়ে
হয়েছে পিছল।
তুমি আসবে বলে
শ্যাওলার মতো চৌকাঠে
এখনও ফেলছি কিছু বালু, কিছু চুন।
(৩)
অনুপুঙখে জড়িয়েছি তাকে
ব্যর্থ প্রেম স্তব্ধ হোক আজ।
অপেক্ষারা ফিরুক জ্যোৎস্নায়
ভিজুক দুঃখ বাগানে এইবার।
দাঁড়ালাম পথের ওপাড়ে,
নিজস্ব কুসুম নিয়ে হাতে
এসো নতুন দুঃখ
পরাবো তোমায়, বরণমালা
রুগ্ন গলাতে।
(৪)
দরজায় কান পেতে ভোর
ডোরবেল বাজে রাতজুড়ে।
এখনও বলেনি সে, যাই
কিংবা বলেনি আজ আসি!
হয়তোবা তারও রয়েগেছে
কিছু মায়া -বৃষ্টি ভেজা খাম।
রয়েছে শ্রাবণী সাঁঝবেলা
রয়েগেছে স্মৃতি ভরা যাম।
(৫)
তার চুলে চূর্ণ বসে থাকা
ঠায় কাঁপে পথ চাওয়া চোখ
ক্লান্তিদের বয়স হয় না।
অথবা বয়সের শরীরে ভ্রান্তমন!
উড়ে যাওয়া প্রতিশ্রুতি
হেলায় উড়িয়ে দিতে পারি। পারি? ইচ্ছুক বা অনিচ্ছুক স্বপ্নরা আসবে মনে করাতে? প্রমিস! হাসালেন মশাই! সে আবার কি কথা! হয় নাকি! বাঙালী হয়ে পড়েন নি, সে কবিতা “কেউ কথা রাখে নি”……? আদপে কথা রাখা না রাখা অনেক সময় পরিস্থিতি ঠিক করে দেয়। ঠিক করে দেয়, কোন কথাটা রাখব, না কি রাখা হল না, এবারেও! হিসেব কষে জীবন চলে না। আজকের দিনে প্রেমিকের বুকে শুয়ে তিন সত্যি কাটা যুবতী, কাল বলে, ‘তুমিই আমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিলে!’ আঁধি সিনেমার সেই গানটা মনে পড়ে গেল! “তেরে বিনা জিন্দেগী সে কোই সিকবা তো নেহি!”…  প্রতিশ্রুতি গুলি হেলায় উড়ে যায়। উড়ে যায়, কারো বা পুড়ে যায়।
না, বলতে আসি নি, পাশে থাকবো। কথাটা কত ঠুনকো, আপনি আমি হাড়ে হাড়ে জানি। পাশে থাকা সে তো অনেক বড় ব্যাপার। আমার সাধ্য কি পাশে থাকার? সাথে থাকার আজীবন!
তবে সঙ্গোপনে রাখা থাক তবে সত্যিকারের ইচ্ছে গুলি। জলসিঁড়ি বেয়ে মাঝেমধ্যে সেখানে ডুব দিয়ে আসলেই হবে। যাঁরা শিরদাঁড়া টানটান করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শপথ করতে পারেন, তাদের জন্য শুধু একদিন নয়, নিজের সাথে যে মুহূর্তেই দেখা হবে টুক করে সেরে নেন প্রমিস পর্বটি। রাখবো, ভাঙবো, যা ইচ্ছে তাই করবো। তেত্রিশ বছর পরে কোন কবি কাঁদবে কে তার হিসেব রাখছে! অবহেলায় উড়ে যায় অস্তিত্ব, অনায়াসে ভুলে থাকা যায় প্রিয় মুখ। ইচ্ছাকৃত না হলে ভুল হয় না রাস্তা। খুব চেনা গলিকে পাশ কাটিয়ে কাটিয়ে কখন যে অচেনা রাজপথে দাঁড়াই, খেয়াল থাকে না। আকস্মিক অস্বস্তির সাথে কোনো মোড়ে কোন ভুলে থাকা প্রতিজ্ঞা সামনে দাঁড়ালে পিঠটান দিলেই হল!
কবিতাগুচ্ছ
১.
আমার একটি ভুলে
ঝুপ করে চাঁদ পড়ে গেল ওই অলকনন্দা জলে।
আমার শরীর জোড়া বিষে
অমিয় মিশেমিশে
কেমন করে জ্যোৎস্না ভেজে
চিকন মতো কেশে।
আমার ওই একটি ভুলে
স্থলপদ্ম ফুলে
কীটের মত বাসা গড়ে
ক্ষতের  মত হলে।।
২.
সেই তো তুমি এলে
চলেই যদি গেলে
কেমন করে একলা হয়ে
পথক্লান্ত হলে
আবার যদি এলে!
৩.
মিথ্যে পোশাক কিছু
ছিঁড়ি
জলের মধ্যে আস্ত এক সিঁড়ি
ওই পথে তার আসা যাওয়া চলে
লোকে এমন কত কথাই বলে,
নদীর মধ্যে জমছে কথার পাথর
আমার বুকে রুমাল ভেজা আতর,
মিথ্যে সব কথার কথা ছিঁড়ি
গোপন থাকুক জলের মধ্যে সিঁড়ি..
৪.
তুই বুঝি আসবি!
শুধু ভালবাসবি?
কোনোদিন বর্ষায়
হাত দিবি ভরসায়
তাও মাঝেমধ্যে
গদ্যে বা পদ্যে
দেখা হবে দুজনের
সেই ঢের, সেই ঢের।।
৫.
ভাল আছি, ভাল ভাছি
পথ ক্লান্ত পাখি,
তোকে জানিয়ে রাখি
এই বেশ ভাল আছি,
সুখে আছি, প্রেমেও,
তবু পথক্লান্ত পাখি
তোকে বলে রাখি
উড়ে যাস, অল্প না থেমেও।।
৬.
আমার অসুখ হলে
তোমার হেয়ারপিনে খোঁচা লাগত
মনে আছে?
তোমার অসুখ হলে
আমার জুতোর খোলে
আজও তাই গজাল পেরেক!
৭.
কি করে যে সবটুকু ভোলো, অনিকেত!
পায়ে পায়ে ভুল রাস্তায়
দেখা হতো।
কি করে যে সবটুকু ভুলি, বলো
অনিকেত!
৮.
ধানকুটোর মত উড়ে যাওয়া সুখ
একবার বোস এইখানে।
একবার হাত ধরে বল,
একবার ভাত খা,
গন্ধ নে আমন ধানের।
ধানকুটোর মত উড়ে যাওয়া সুখ
একবার আয়, দেখ সুখ কাকে বলে
তারপর যাস,
অসুখবিলাস
স্রোত হোস, অবেলার স্নানের।।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত