সন্দেশীর স্বপ্ন

একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুম ভেঙে গেল সন্দেশীর। সোনাবরণ হলুদ জল আর তার মধ্যে ডুবছে আর ভাসছে কিছু পাঁশুটে গোলক। একটা পলা শাঁখা পরা নিটোল হাত হাতা ডোবাচ্ছে আর শব্দ হচ্ছে প্লপ প্লপ প্লপ। আর সেইসাথে ডুবছে আর ভাসছে পরম কাঙ্ক্ষিত সয়া বড়ি গুলি। ভেঙে গেল এমন সুন্দর স্বপ্ন।পাশ ফিরে শোয়।পাশে রাখা বর্তনের মধ্যে টপ টপ করে পরছে জং ধরা টিনের ছাদ চুঁইয়ে পড়া জল। বাবা মাঠে গেছে। মা তো ওঠে সেই আলো ফুটতে না ফুটতেই। ছুটতে হয় নদীর পাড়ে মিতাদের সাথে। দেরি হলেই বাঁশঝাড়ের ওপারে জটলা জমায় রসুলপুরের ছেলে-ছোকরারা। এমন সব অশ্লীল টিপ্পনী যে আটকে যায়। কোষ্ঠ পরিষ্কার করা মাথায় ওঠে।বাড়ির পুরুষদের এসব কথা বলা যায় না। ওদের মাথা গরম। বললেই ফের কাজিয়া, লাঠালাঠি , মাথা ফাটাফাটি রক্তারক্তি রাম রহিম পুলুশ ধরপাকড়।স্বচ্ছ ভারত বড় মেহেঙ্গা। তাই স্বচ্ছ ভারতের মাথায় হেগে রোজ ভোরে নদীর পারে ঝোপের আড়াল খোঁজা। দু একবার চোখ কচলে আড়মোড়া ভেঙে চৌকি ছাড়ে। ঘরের বাতার ফাঁকে গোঁজা দাঁত মাজার ব্রাশ- এ পেস্ট  লাগিয়ে টিউকলের দিকে যায়।স্কুলের দিদিমনিরা বলেছে ওসব  জিগার দাঁতন নয়। টুথব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজতে। গত বছর ক্লাস ফাইভে ওদের লাইন করে দেখিয়েছিল কি করে খাওয়ার আগে হাত ধুতে হয় সাবান দিয়ে। কার্তিক ঠাকুরের মত একটা স্যার মোবাইলে ছবি তুলছিল পটাপট। হেডমাস্টার নাকি বলেছে ছবি পাঠাতে হবে বিডিও অফিসে। অনেকক্ষণ ধরে দাঁত মাজে । উপর নিচে ডাইনে-বাঁয়ে আগে পিছে ঠিক যেমন টিভিতে দেখায়। আর সফেদ দাঁত সুস্থ মসুড়ের প্রত্যাশায় দাঁতের কোণে কোণে আর মাড়ির আড়ে ময়লা খোঁজে ওর সন্ধানী ব্রাশ। গুণে গুণে তিনবার কুল্লি করে মুখে জলের ঝাপটা দেয় সন্দেশী।  

রোজকার মতই দাঁত মেজে আয়নায় দাঁত দেখে সে কিন্তু টিভির ছাওয়াল মাইয়া গুলার লাহান ঝলক কই? সেই রকম দাঁত চাই যা দিয়ে  চিবানো যায় ডাঁসা পেয়ারা, আখ আর চর্বিওয়ালা খাসির স্বাদু মজ্জাওয়ালা মোটা হাড়। ওদের ক্লাসের সখিনা অবশ্য বলে খাসির চেয়ে গরুর হাড়ের স্বাদ বেশি।আর ওর বাবা দিনকাটু সিং বলে

”চিবানোর লাহান ঘরত নাই হাড় দেইখবে আসো বিটির দাঁতের বাহার”।

 

শুরু হয়ে যায় তার কর্মমুখর এক বালিকা দিবস। গুণে গেঁথে ব্যাগে বই ভরে। ঘরের লাগোয়া যে দর্মার বেড়া দেওয়া ঘরে ওদের চুলা জ্বলে সেইখানে উঁকি দিয়ে কলাই করা সানকির আমানি  ছেঁচে যেটুকু পন্তা পায় তার প্রতিটি কণা পরম তৃপ্তিতে খুঁটে খায়। অবশ্য তাতে খিদে মেটে সামান্যই। এরপর টিউকলে মুখ দিয়ে ভরপেট জল খেয়ে ঝপাঝপ স্নান সেরে স্কুলের ইউনিফর্ম পরে রওনা দেয় স্কুলে। স্কুল গেটের পাশেই মীডডে মিলের রান্নাঘর।চুলা এখনো জ্বলে নি। ইয়া ব্বড়ো সব ডেকচি ভরে রয়েছে খোসা ছাড়ানো আলুর ঢিবিতে।  মাঝে মাঝে  উঁকি দিচ্ছে কালো বেগুন আর কমলা কুমড়োর টুকরো। আঁশবটিতে চারফালি হয়ে আলু যাচ্ছে পাশের ডেগে। দুই ডেকচিতে ভূমি পরিবর্তন দেখে সন্দেশী নিবিষ্ট চিত্তে। এক ডেকচিতে পাহাড় ক্রমশ ক্ষীয়মাণ ও অপরটিতে টেথিস সাগরের বুক থেকে পাহাড় জাগছে। এভাবেই চলছে ভাঙা গড়ার খেলা। এরপরে চলে চাল ধোবার পালা। ডেকচি ভর্তি চালের ওপর টিউকল পাম্প করে চলেছে কুঁজী মাসি। আর জলের তোড়ে ভেঙে চলেছে চালের চূড়ো। দুই মাসী ডেকচির দুই দিকের আংটা ধরে ক্রমান্বয়ে ওঠায় দুদিক। চালে জল সঞ্চরণ হয়। ধুলোর আস্তর ভাসে জলের ওপর। সেই জল ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ফেলে ডেগের দুই আংটা ধরা হাত।

 

ঠং ঠং করে বেজে ওঠে স্কুলের ফাটা ঘন্টা। প্রার্থনার সময়। ক্লাসরুমে ব্যাগ রাখতে দৌড়ায় সন্দেশী। প্রার্থনায় দেরী হলেই গেমটীচারের গাট্টা। প্রার্থনার লাইনে হুড়োহুড়ি,  ঠেলাঠেলি কমলে সাবধান বিশ্রাম। লাউডস্পীকারে সুন্দরী দিদিমণির সুরেলা কণ্ঠস্বর। দিদিমণির সুরঞ্জিত ঠোঁটের সাথে ঠোঁট মিলিয়ে গুণগুণ গেয়ে ওঠে ও। সেই গুঞ্জিত সুরে রণিত হয় চালতাপুর স্কুলের গোটা ময়দান। প্রার্থনার মাঝে ভ্যারিয়েশান আনে আসুরিক ডিসকর্ড।

 

প্রার্থনা শেষ। এবার ‘লাইন তোড়’। হুড়মুড় করে বাঁধভাঙা জলোচ্ছ্বাসের মত কলকল করে ক্লাসরুমে ছোটে মালা ছিঁড়ে ছড়িয়ে পড়া কালো পুঁতির মত কতশত মাথা। সেই ভিড়ে সন্দেশী হারিয়ে যায়। ক্লাসের কলরোলে এক জোড়া অসীম খিদে নিয়ে জিজ্ঞাসু ফারহানা, শেষ বেঞ্চের রোঁয়া ফোলানো রেনিগিড রাজু বা প্রথম বেঞ্চে দিনের পড়া খুলে বসা আয়েষার সাথে ওর তফাৎ থাকে না। চিলতে ক্লাসঘরের চূড়ান্ত ঠাসাঠাসির মধ্যে শুরু হয় কখনো-না-মেলা জীবনবৃত্তের দু ধার মেলানোর চিরকালীন খেলা।

 

কিন্তু এসবই মাস ছয়েকের আগের কথা। তখনো টিফিনের ঘন্টা মিড ডে মীলের সমার্থক ছিল। চুলার কাঠের ধোঁয়া ছিল। ধোঁয়া মাখা ভাত ছিল। ভাতের পাতে আলুর ঝোল তাতে ভাসত সোনালী সয়া বড়ি। টিফিনের ঘন্টা পড়তেই বড় মায়াময় স্বাদু মনে হত পৃথিবী। কানা উঁচু  স্টিলের থালায় ঢিপি করা ভাত  আর তার ওপর হাতা ভর্তি করে ঢালা আলুর ঝোল। উপরি প্রাপ্তি হিসেবে  তিন-চারটে সয়াবড়ি (বাড়ন্ত শরীরের নাকি প্রোটিনের দরকার)। কেউ কেউ  এক টাকার আচার কিনে নিত  কেউ বা নল পাপড়। তারপর উন্মুক্ত আকাশের নিচে গোল হয়ে বসতো তারা। চারপাশ দিয়ে ভাত কাচিয়ে ঝোলে মেখে  গরাসের পর গরাস চলে যেত সর্বগ্রাসী পেটে।

 

মাথার উপর সূর্যকে সাক্ষী রেখে  চলত জনকল্যাণকর রাষ্ট্রের  ঢাকের বোল।

 

তবে এখন টিফিনের ঘন্টা আর মন টানে না সন্দেশীর। তালা পড়েছে মিড ডে মিলের রান্না ঘরে দরজার দুপাশে যুযুধান দুই রাঁধুনির দল। তাঁদের চোখে শুকনো খড়ির মত খরখরে চাউনি। একটু স্ফুলিঙ্গ পেলে যেন তা দাবানল জ্বালাবে। তবুও মন মানে না সন্দেশীর। টিফিনের ঘন্টা পড়তেই ওর অবাধ্য পা ওকে নিয়ে যায় মিড ডে মিলের রান্নাঘরের দিকে। সেখানে ক্লাস ফাইভের বেশ কিছু পড়ুয়ার আনাগোনা। ঘরের চারপাশে ঘোরাঘুরি করে মহল্লার অভুক্ত সারমেয়কুল। এদিক-ওদিক শোঁকে। দরজায় মুতেও দিয়ে যায় তাদের কেউ কেউ। রাঁধুনীরা দেখেও দেখেনা। শুধু লাগোয়া বারান্দার এক কোণে সনকা বুড়ি উপোসী চোখে একদৃষ্টে চেয়েই থাকে চেয়েই থাকে। মাস ছয়েক আগে যখন নিয়মিত মিড ডে মিল হতো তখন বুড়িকে অভুক্ত ফেরাতো না রাঁধুনীরা। এখনো এক বেলা ভাতের আশায় নিত্য আগমন তার। এসে বারান্দার কোণে বসে একমনে রান্না ঘরের দিকে দেখে আর স্বপ্ন দেখতে থাকে কড়াই কড়াই সয়া বড়ির ঝোল সাথে আলু আর সাদা শিউলির মত মোটা চালের ভাত। তার কলাইয়ের থালায় সেই ভাত আর আলু সোয়াবিনের ঝোল মেখে নিচ্ছে তার পরিতৃপ্ত হাত। সেই মুহূর্তটায় সনকা বুড়ি আর সন্দেশীর স্বপ্নরা জড়াজড়ি করে শোয়। পাশ ফেরে। আড়মোড়া ভাঙতে চেয়েও ভাঙে না। এমন সুন্দর স্বপ্ন ভেঙে যায় যদি! ! !

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত