বিষুব

দুপুরের হলুদ রোদটা গায়ে মেখে কফিশপের ভেতরে এসে ঢুকেছে নীতা। এই একটা দৃশ্য ভাবতে ভাবতে আমার সকালটা শুরু হয়। নীতা একটা হলদে দুপুরের নাম। নীতা, নীটা কিংবা নী। আমার যখন যা ইচ্ছে তখন তাই নামে ডাকি ওকে।
ভোর এলে বলি- নীটা, আমায় এক কাপ চা দেবে?
ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে একসা হয়ে বলি – নীতু, ছাতার ভেতর এসো, এভাবে ভিজবে না প্লিজ।
মাঝরাতে জেগে উঠে ডাকি – নী,আরেকটু কাছে এসো।
কোনো নামেই সেদিন বোধ হয় ওকে ডাকতে পারিনি। প্রথমদিন এত দুঃসাহস দেখানো যায় না। কিংবা ডেকেছি কয়েকবার। মনে নেই। অমন নেশাতুর দিনের স্মৃতিরাও টালমাটাল হয়।

নীতা রোদ হয়ে ভেতরে এলো। ওর গায়ে একটা মার্মালেড রঙের শাড়ি। আমি নিশ্চিত হতে পারছি না। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে আমার। চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পাচ্ছি মার্মালেড রঙটা আমার দিকে একটু এগিয়েছে। এবার আমার ফোনটা বেজে উঠলো। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। এই বয়সে এতটা অস্থিরতা ভীষণ বেমানান। নিজেকে বোকা বোকা স্কুলবয় মনে হচ্ছে আমার।

ফোনটা হাতে নিলাম। ওর নম্বরটাই ভেসে উঠেছে স্ক্রিনে। নীতা ডাকছে। এতগুলো বছর পর! তবু ফোন হাতে নিয়ে আমি ইতস্তত করছি। আমার শরীরে মার্মালেডের ছায়া পড়েছে। আমি চোখ তুলে তাকালাম। নীতা হাসলো। কী আশ্চর্য! ওর হাসি এতটুকু বদলায়নি!

: পারিজাত?
: নবনীতা!

ব্যস, এরপর আরো অনেকক্ষণ একটাও শব্দ বিনিময় হয়নি আমাদের মাঝে।

‘আমায় চিনেছো? তুমি কখনো ‘চিত্রাঙ্গদা’ ছিলে?’

আমার প্রশ্নের উত্তর খুব অসময়ে দিয়েছিল নীতা। এর আগে কখনো কেউ উত্তর দেয়নি। আমি জানতাম মেসেজটা দেখার পর নীতা যদি উত্তর দেয় তবে সেটা হ্যাঁ সূচক হবার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। আমাকে মনে রাখার মতো স্মৃতি তো খুব একটা নেই। এ পর্যন্ত কত নীতাকে একই মেসেজ দিয়েছি সে হিসেব রাখিনি। মাঝেমাঝে এমন হয়। ভীষণ অস্থিরতা কাজ করে। ওকে ঘন্টার পর ঘন্টা খুঁজি ফেসবুকে। মেসেঞ্জার খুলে বসে থাকি। নীতারা নিরুত্তর থেকেছে বরাবরই।

বিশ মিনিট পরেই আমার ফ্লাইট ছিল। বোর্ডিং পাস হাতে নিয়ে ডিপার্চার লাউঞ্জে অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় আমার মেসেজ রিকুয়েস্ট এক্সেপ্ট করলো নবনীতা সোম। পাঁচদিন আগে

মেসেজ দিয়েছিলাম ওকে। দু’বছর পর দেশে ফিরছি। বুকের ভেতরটা কেমন করছে। এবার যদি নীতার সঙ্গে দেখা হয়?

নীতার প্রোফাইলের ছবিটা ভীষণ সুন্দর। আকাশের দিকে মুখ তুলে আছে মেয়েটা। আমি ঘোরলাগা চোখে ওর ছবিটা দেখি৷ নীতা এমন সময় মেসেজের উত্তর দিল।

‘হ্যাঁ, আমি সেই নীতা। ‘

আমি অনেকটা সময় নিয়ে লিখলাম- আমি আসছি নীতা।

তারপর আমাদের দেখা হলো একটা কফিশপে। মুখোমুখি বসে ওর চোখে চোখ রাখতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ রেগে গেল মেয়েটা। আমি ভিখিরির মতো মুখ করে চোখ ফিরিয়ে নিলাম।

: এভাবে বসে থাকার জন্য ডেকেছো? কিছু তো বলো, পারিজাত!
: তুমি কেমন আছো?
: আমি ভালো আছি, বেশ ভালো আছি।
: লাঞ্চ ব্রেকে বের হয়ে এলে? কখন ফিরতে হবে?
: এখনো মিনিট দশেক হাতে আছে। কিছু বলো।

: দেরি হলে বোলো কিন্তু।
:এতদিন পর দেখা, একটু দেরি হলে কিছু হবে না।
: নীতা, তোমার বাবা মা কেমন আছে?
: ওরা সবাই ভালো আছে। তুমি তোমার কথা বলো তো। কোথায় আছো, কী করছো?

কোথা থেকে শুরু করতে হয় সেটা ভাবতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেছিলাম সেদিন । বোধ হয় সেখান থেকেই শুরু করা দরকার যেখানে নীতা আমাকে রেখে গিয়েছিল।

কমলপুর স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করার পর আমি, আমার বন্ধুরা বেশিরভাগই কমলপুর কলেজে ভর্তি হলাম। কিন্তু নীতা ওর বাবা-মায়ের সাথে ঢাকায় চলে গেল। আর খুব ভাল একটা কলেজে ভর্তি হলো। আমার সবসময় মনে হতো ওকে আমি একদিনেই হারিয়ে ফেলেছি। মুঠোফোন তখন এতটা সস্তা হয়ে ওঠেনি। ফেসবুকের হদিস পেয়েছি আরো বছর খানেক পরে। নীতাকে ফিরে পাওয়া সে সময় এত সহজ ছিল না৷

তবু ওকে খুঁজতাম। তার ফলাফলস্বরূপ প্রথম বর্ষে আমার রেজাল্ট খুব খারাপ হলো। স্যার একদিন সবার সামনে অপমান করলেন আমাকে। খুব জেদ হলো, অভিমান হলো আমার। বাড়ি ফেরার পথে ভাবছিলাম-নীতা ভালো রেজাল্ট করে ভালো কলেজে পড়ছে, তাহলে আমি কেন

পড়ায় মন দিতে পারি না? ভালো রেজাল্ট ছাড়া ঢাকার কোনো ভার্সিটিতে আমায় নেবে না। নীতার কাছাকাছি যেতে হলে রেজাল্ট তো ভালো করা চাইই চাই।

শেষমেশ দেড় বছর পর আমি ঢাকায় এসে পৌঁছলাম। এই জনসমুদ্র পা রেখে ভেতরটা টালমাটাল হয়ে গিয়েছিল। গণরুমের ফ্লোরে শুয়ে শুয়ে মাঝেমাঝে কান্নাও পেতো। নীতার কথা ভাবলে আমার এত কষ্ট কেন হয়? কখনো অন্য কাউকে ভালো লাগেনি তা নয়। কিন্তু নীতার সঙ্গে ওদের মিল খুঁজতে গিয়ে হতাশ হতাম আর সেই আগের জায়গায় ফিরে আসতাম প্রতিবারই ! তারপর বুঝলাম নীতার ব্যাপারটাই অন্যরকম, ওরকম আর দ্বিতীয় কেউ নেই৷

নীতার ডাকে ডুবসাঁতার থেকে মুখ তুলতে হয়। ওর হাসিটা বদলায়নি। এমনকি এখনো সেই সদ্য কৈশোর পেরুনো চোখমুখ ওর! আমি মুগ্ধ হয়ে কান পেতে শুনি ওর রিনরিনে কণ্ঠ।

: অ্যাই! কোথায় ডুব দিলে!
: পুরনো কথা মনে পড়ছে….তোমাকে সবসময় মনে পড়তো জানো? অনেক খুঁজেছি তোমাকে।
: সে তো মেসেজেই কয়েকবার বলে ফেলেছো। কারণটা বলো এবার! এখন তো আমি সামনেই আছি।
: আমার কথায় তুমি বিরক্ত হচ্ছো না তো?

: কথা! তুমি তো মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছো পারিজাত! যত বকবক সব আমিই করছি! নিশ্চয়ই
ভাবছো নবনীতা সোম কবে এত বাচাল হলো!
: আমার শুনতেই ভালো লাগছে । তুমি বলো।
: আমি তখন অনেক গম্ভীর স্বভাবের ছিলাম তাই না? খুব একটা কথা হতো না তোমার সঙ্গে।
: আমাদের শিফট আলাদা ছিল নীতা।
: হ্যাঁ তুমি ডে তে ছিলে। আমাকে তোমার মনে আছে, কী অবাক কান্ড!
: এরচেয়ে অবাক ব্যাপার কী জানো? তুমি আমাকে চিনতে পেরেছো!
: তুমি কিন্তু খুব ভালো আবৃত্তি করতে । এত ভালো যে এখনো মনে আছে আমার! সব কি ছেড়ে দিয়েছো পারিজাত?
নীতা আমার আবৃত্তির কথা মনে রেখেছে জানলে আমি চর্চা কখনোই ছাড়তাম না। শুধুমাত্র ঢাকায় আসবো বলে কত কী বাদ দিয়েছিলাম জীবন থেকে! নীতা বারবার প্রশ্ন করে। যেন সব কথার আগল খুলে দিতে হবে একদিনেই।
: মনে রাখা আর খুঁজে বের করা সহজ কাজ নয়। পারিজাত বলো তো তুমি আমাকে মনে রাখলে কীভাবে?

নীতা,নীতা,নীতা! এত বোকা তুমি। তুমি বরং জিজ্ঞেস করো তোমাকে ভুলে যেতাম কী করে!
আমি নিজেকে সংযত করলাম। এই কথাগুলো উচ্চারণ করার জন্য উপযুক্ত দিন ছিল না সেদিন। তাই অন্যকিছু বললাম।

: সেদিন মেসেজে বললাম না? চিত্রাঙ্গদাকে ভোলা কঠিন!
: ধুস! ওসব বোগাস কথা।
: তোমার হাতে লেখা দেয়ালিকার ছবি আমার কাছে এখনো আছে। আর স্কুলের ম্যাগাজিন দুটো,মনে আছে? আমি রেখে দিয়েছি।
: ও বাবা! আমি নিজেই ভুলে গেছি কখনো এসব করতাম। কত কথা যে মনে করিয়ে দিচ্ছ!

মুখটাকে নিচু করে কফির মগে চামচ নাড়ছে নীতা। আমার পরবর্তী পোর্ট্রেট এর সাবজেক্ট ঠিক সামনেই বসে আছে! স্কেচ খাতাটাও সঙ্গে আছে। একটা বহু পুরনো ইচ্ছে ধীরে ধীরে মাথা চাড়া দিচ্ছে। কিন্তু সাহস পাচ্ছি না। নীতা যদি রাগ করে? ওকে ভীষণ অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে।

: একটা কথা বলবো,নীতা?

আমার ডাকে নীতা মুখ তুলে তাকালো। ওর চোখ ভরা কাজল। ভ্রুসঙ্গমে ছোট্ট একটা টিপ। শাড়ির মার্মালেড রঙটা ওর চোখেমুখে দীপ্তি ছড়াচ্ছে। আমি বোধ হয় জমে বরফ হয়ে গেলাম।সময়টা ওখানে থেমে গিয়েছিল।
রাতে বাড়ি ফিরে সাথেসাথেই রঙের বাক্স খুলে বসেছি । মার্মালেড শেডটা আমার নেই। খুব যত্ন করে ওটাকে তৈরি করলাম। নিজের ইচ্ছে মতো নীতাকে তৈরি করবো বলে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম আমি।

সারারাত কাজ করে ভোরের দিকে বোধ হয় ঝিমুনি এসেছিল। আধো ঘুমে চোখ মেলে দেখি নীতা তাকিয়ে আছে আমার দিকে, ঠিক যেমন করে কফিশপে তাকিয়েছিল। আমি হাত বাড়ালাম ওর দিকে। পোর্ট্রেটের ভেতর থেকে চোখ দুটো হেসে উঠলো। ফিসফিস করে বললাম- নী, কাছে এসো।

নী কাছে আসার আগেই আমি দূরে সরে যাই। পরিযায়ী পাখির মতো দিক বদল করি এই উড়ুক্কু জীবনের। আমার ফেরার দিন ঘনিয়ে এসেছে। আর এক সপ্তাও সময় নেই। ব্যাগ গুছাতে কী আলসেমি আমার! খুব দরকারি কিছু রসদ সঙ্গে নেবার জন্য বাজারে যাবার প্রয়োজন, কিন্তু ঘর থেকে বাইরে পা ফেলতে ইচ্ছে করেনা৷ নীতাকে কথাচ্ছলে বললাম। সে বললো- আলসি ছেলে! তবু একবারও বললো না- চলো, আমিও সঙ্গে যাচ্ছি।

আজকাল আমি ফোন করলে ও খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অল্প কথায় আলাপ শেষ করে দেয়। নীতা বোধ হয় জানেনা ওর এসব কিপটেমিতে আমার কিছুই যায় আসে না। ওই একদিনের স্মৃতি নিয়ে অনেকটা পথ আমি দিব্যি চলতে পারি।

ও হয়তো জেনে গেছে আমার আদ্যোপান্ত। আমার চোখ দেখলেই ওর বুঝতে পারার কথা। সেদিন আমার লালচে মুখটার দিকে তাকিয়ে খুব হেসেছিল নীতা। ওর প্রশ্নবাণে আমি জেরবার হয়ে যাচ্ছিলাম।

: আচ্ছা, তুমি চিত্রাঙ্গদা কীভাবে দেখেছিলে? ওটা তো আমাদের গানের স্কুল থেকে হয়েছিল!
আমি ধরা পড়ে যাওয়া গলায় বলেছি-দর্শক হতে তো নিষেধ ছিল না! তোমাকে দেখে মনে হতো চরিত্রটায় তুমি ছাড়া অন্য কাউকেই এত মানাতো না!
: তুমি কি স্কুলেও এমন বাক্যবাগীশ ছিলে? কখনো তো বলোনি! কেউ আমার ব্যাপারে এত ভাল ভাল কথা ভাবে এতদিন পরে জানলাম আমি! কী দুর্ভাগ্য!

নীতার ভ্রুজোড়া নেচে উঠলো। মনে হলো যেন ওটা ওর নাচের মুদ্রা! আমি চোখ নামিয়ে নিলাম। তারপর বললাম- এখন কি সব ছেড়ে দিয়েছ?

: দিতে হয়েছে। নাচগান এখন বিলাসিতা। সেই আগের অমল ধবল জীবন তো আর নেই।
: এজন্যই হয়তো আর কখনো সেই চিত্রাঙ্গদাকে দেখতে পাইনি। আমি ঢাকায় মোটামুটি সব দলের শো দেখতাম।

নীতা বড় বড় চোখে তাকালো আমার দিকে। আমি আলগোছে বললাম- তুমি তো চাইলেই আবার শুরু করতে পারো।
: চাওয়াটাই যে আর আসে না। বয়স হচ্ছে তো!
: কী যা তা বলছো! তোমার এমন কিছু বয়স হয়নি।
: হুম! আর তুমিও স্কুলবয় রয়ে গেছো!

কফির মগে চুমুক দিতে দিতে কথা বলছিল নীতা। আমি সতৃষ্ণ চোখে ওর মগটায় চোখ রাখছিলাম। এই সামান্য একটা দৃশ্য আমাকে কী ভীষণভাবে কাঁপিয়ে দিতে পারে কেউ বোধ হয় বুঝবে না। স্কুলের পিকনিকের কথা মনে পড়ছে আমার। ওর রেখে যাওয়া জলের বোতলটা সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সরিয়ে ফেলেছিলাম আমি। নীতার ঠোঁটের ছোঁয়া লেগে ছিল বলে তলানির জলটুকু রেখে দিয়েছিলাম অনেকদিন। কী ভীষণ ছেলেমানুষ ছিলাম তখন! সেরকম কিছু করার সুযোগ আজকেও আছে। আমি তক্কে তক্কে আছি। আরেকবার স্কুলবয় হতে এতটুকু লজ্জা করবে না আমার।

চিত্রাঙ্গদার একটা ছবি ছিল আমার কাছে। আমার চোখে ওটা কখনো মলিন হবে না। আমার বন্ধু রঞ্জুর ক্যামেরায় তুলেছিলাম ছবিটা । তারপর এই এক ছবির জন্য আমাকে বহু ফরমায়েশ খাটতে হয়েছিল! জানাজানি হয়ে যাবার ভয়ে আমি মুখ বুঁজে রঞ্জুর অত্যাচার সয়ে নিয়েছিলাম।
শুধুমাত্র ক্যামেরার কারণেই ওকে সঙ্গে নিয়ে যেতাম শিল্পকলায়। সেই বছর বেশ কয়েকবার চিত্রাঙ্গদার শো হয়েছিল। আমি প্রতিবারই যেতাম৷ কখনো একা, কখনো বন্ধুদের সঙ্গে। রঞ্জুরা ঘুরতো,ফিরতো, ফুচকা খেতো। শুধু আমি অনড় হয়ে বসে থাকতাম পুরোটা সময়।

‘অবগুণ্ঠন ছায়া ঘুচায়ে দিয়ে
হের লজ্জিত স্মিত মুখ শুভ আলোকে’

নীতা যখন গেয়ে উঠতো আমি প্রতিবারই ওকে মনে মনে মালা পরিয়ে দিতাম৷ সব কথার মর্ম বুঝে উঠতে পারতাম না। তবু ধীরে ধীরে গলার কাছে একটা কান্না দলা পাকিয়ে উঠতো। ওকে কখনো এসবের আভাস দিইনি। সত্যি বলতে আমি খুব বিব্রত ছিলাম নিজেকে নিয়ে। তাছাড়া বয়সটাও খুব অল্প ছিল।

আজ এতবছর পর দেখা হবার দিনে সেই নীতা কত কিছু জানতে চায় আমার কাছে! নীতা জানেনা ওদের মর্নিং শিফটের ছুটি হলে প্রায়ই ওর পিছু নিতাম আমি। গলির মোড়ে বখাটেদের আড্ডাটা পেরিয়ে গেলে তারপর ফিরে আসতাম। খুব সাবধানে পিছু নিতে হতো, নীতা আমাকেও বখাটে ভাবতে পারে সারাক্ষণ এই দুশ্চিন্তায় তটস্থ থাকতাম। আর এসব করতে গিয়ে স্কুলে ঢুকতে প্রায়ই দেরি হয়ে যেত আমার।

গল্পের ফাঁকে রঞ্জুর ক্যামেরায় তোলা ছবিটা এগিয়ে দিলাম নীতার দিকে। খুব চমকে গেল সে। অবাক চোখে দেখতে লাগলো নিজেকে। ঠোঁটের কোণে তিরতিরে কাঁপুনি আসন্ন কান্নার পূর্বাভাস দিচ্ছিল। তারপর টুপ করে দু’ফোটা মুক্তোদানা ঝরে পড়েছিল। আমাকে যতই আড়াল করুক ওকে অপাঙ্গে দেখছিলাম আমি। ওর মাথায় হাত রাখতে ইচ্ছে করলেও শুধু অস্ফুটে বলেছি-এভাবে কেঁদো না, প্লিজ।
: পারিজাত, আমার জীবনের সেরা সময়টা আসলে কমলপুরে রেখে এসেছি।
নীতা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর বললো।

একটু পর কফিশপ থেকে বের হয়ে আমরা রাস্তার উল্টোদিকের শপিং মলটায় গেলাম। ওর কিছু কেনাকাটা ছিল। আমি তখনো সঙ্গপিয়াসী। ওর পিছু পিছু ছুটছিলাম। বের হবার আগে নীতা একটা ফটোফ্রেম নিলো। গত সতেরো বছর ধরে যে ছবিটা আমার কাছে যত্ন করে রাখা ছিল সেটাই চেয়ে নিল নীতা। আমি না করতে পারলাম না। এই প্রথম নী আমার কাছে কিছু চাইলো, ফিরিয়ে দেয়া অসম্ভব।

ছবিটা হাতে পেয়ে আমাকে ধন্যবাদ জানালো সে। আর বললো- আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিটা ফিরিয়ে দিয়ে গেলে তুমি!

নীতা জানে আজ আমার ফিরে যাবার দিন। এয়ারপোর্টে বসে একবার ফোন করলাম ওকে। সাড়া পাইনি। দুপুর আড়াইটা। অফিসটাইম,ব্যস্ত সময়। কিংবা যে ঢেউ বহু আগে বয়ে চলে গেছে তার সাথে মিশতে ওর অস্বস্তি লাগছে। সত্যিই তো মসৃন পথে হেঁটে যাবার সময় এমন খড়কুটোকে এড়িয়ে যাওয়াই মঙ্গল।

তবে এইসব ছাইপাঁশ আমি বেশিক্ষণ ভাবতে পারিনা। আসলে নীতার বিরুদ্ধে আমি কখনো এসব ন্যাকাবোকা অভিযোগ বা অভিমানের কথা ভাবতেই পারিনি। ও অজান্তে যা দিয়েছে তাতেই আমার জীবনপাত্র উছলে পড়ে। সুযোগ পেলেও হয়তো এরচেয়ে বেশি আমি ধারণ করতে পারতাম না।

‘নবনীতা সোম চেইঞ্জড হার প্রোফাইল পিকচার।’ ফোনের ভাইব্রেশনের সঙ্গে আমিও কেঁপে উঠলাম। মার্মালেড রঙের শাড়ি পরে চিত্রাঙ্গদার ছবিটা হাতে নিয়ে হাসছে নীতা। সেদিন আমিই ছবিটা তুলে দিয়েছি ওর ফোনে। প্রিয় হাসিমুখটা ছুঁয়ে দিলাম এবার। আলাপ বাক্সের নীল বাতিটা জ্বলজ্বল করে ওর অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। চলে যাবার কথাটা এখন আমার আর জানাতে ইচ্ছে করছে না।

শূন্যে ভাসতে ভাসতে জানালা দিয়ে নিচে তাকালাম আমি। ফ্ল্যাটবাড়িগুলো পুতুলের ঘরের মতো দেখাচ্ছে। কোনো একটা ঘরে বসে নীতা এখন অফিসের কাজে ব্যস্ত। ছোট্ট বিন্দুর মতো মিলিয়ে যাচ্ছে ওর অস্তিত্বটুকু। চলে যাচ্ছি নীতা! পৃথিবী যেমন বিষুবের পর আবার সূর্যের কাছ থেকে দূরে সরে যায় ঠিক সেভাবেই আমিও নীতার কাছ থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছি।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত