সরদার ফজলুল করিমের জন্মদিনে একটি সাক্ষাৎকার

আজ ১ মে সরদার ফজলুল করিমের জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার এই মহান দার্শনিক কে জানায় জন্মতিথিতে বিনম্র শ্রদ্ধা।


সরদার ফজলুল করিম এক বর্ণাঢ্য জীবনের নাম। নানা অর্থেই তিনি এক অসামান্য চরিত্র। রাজনীতি করেছেন আদর্শের। আজীবন মগ্ন ছিলেন জ্ঞানের সাধনায়। প্লেটো, এরিস্টটলের বইসহ রাজনৈতিক দর্শনবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি বইয়ের বাংলা অনুবাদ হয়েছে তার হাতে। সরল জীবন, গভীর মননে বিশ্বাসী সরদার ফজলুল করিমের চিন্তা এবং জীবনযাপন ছিল একই সুতোয় গাঁথা। মহৎ আদর্শবান এই মানুষটির সঙ্গে দর্শন-রাজনীতি এবং ব্যক্তিজীবন নিয়ে কথা হয় গবেষক ও প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে। সেই আলাপচারিতার কিছু অংশ এখানে। সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়েছিল দৈনিক সংবাদে।


আলী : আচ্ছা, যখন বাংলা একাডেমি থেকে আপনাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা গ্রেফতার করে নিয়ে যায়, তখন চোখ বেঁধে নিয়ে গিয়েছিল?

সরদার : না, চোখ বেঁধে নিয়ে যায় নাই। আমার তো সব সময় প্রশংসা ছিল, এই লোকটা ভালো।

আলী : আপনি জেল খাটা কমিউনিস্ট, আপনি এভাবে যুদ্ধের সময় চাকরি করতে লাগলেন। এটা ঠিক হয়েছিল?

সরদার : আমি তো অন্য জায়গায় চলে যেতে পারি না। আমি তো ইন্ডিয়া যেতে পারি না, গ্রামে যেতে পারি না। যখন সৈন্যরা আমাকে আমার বাসায় পাবে না, তখন আমার ছেলে-মেয়ের ওপর আক্রমণটা পড়বে- এই আতঙ্কে সময় কাটত।

আলী : আপনাকে ধরে নেবার পর কী করল? কোথায় রাখল?

সরদার : তখন যেখানে প্রাইম মিনিস্টারের অফিস তার পেছনে এমএলএ-দের হোস্টেল ছিল, সেখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী টর্চার ক্যাম্প করেছিল। ওখানে আমাকে বসাইয়া নানান জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। একজন মেজর আমাকে বললেন, ‘ইউ, দি বাস্টার্ড সান্ অব তাজউদ্দিন। উই স্যাল টিচ্ ইউ এ গুড লেসন্।’ বলেই তিনি গটগট করে সামনে দিয়ে হেঁটে চলে গেলেন।

আলী : মুক্তিযুদ্ধে না যেতে পেরে আপনার কোনো অনুশোচনা হয় না?

সরদার : আমি কোথাও বলি নাই, মুক্তিযুদ্ধে না যাওয়ার জন্য আমার অনুশোচনা হয়। আরে, আমি তো মুক্তিযুদ্ধেই ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ মানেটা কী? তুমি একভাবে দেখ, আমি আরেকভাবে দেখি মুক্তিযুদ্ধকে। অনেকে আমার কাছে জিজ্ঞেস করে মুক্তিযুদ্ধে গেলেন, জেলে গেলেন, ‘পাইলেনটা কী?’ আমি বলি, মুক্তিযুদ্ধ থেকে আমি মুক্তিযুদ্ধ পাইছি। তোমরা তো বুঝবা না, ও কথা। এটা তোমার রেকর্ডেও আমি রাখলাম। অনেকে গাড়ি পাইছে, বাড়ি পাইছে সেটা আলাদা কথা। আমি তো বলি না, গাড়ি পাইছি, বাড়ি পাইছি। তোমাকে যা বলছি, অন্যদেরও তাই বলি, মুক্তিযুদ্ধ থেকে মুক্তিযুদ্ধ পাইছি। একজন মুক্তিযোদ্ধা যদি মুক্তিযুদ্ধকে ভালোবাসে, তাহলে সে কী পায়? মুক্তিযুদ্ধ পায়। মুক্তিযুদ্ধ না হলে তো সে এইটা পায় না। এমনকি এই গোলাম আজমকেও তো পাইতাম না। কোনো মিটিংয়ে গোলাম আজম থাকলে আমি সেখানে যাই না। কারণ গোলাম আজম আমাকে দেখলে পরে বুকে জড়াইয়া ধরবে। আর তখন তোমরা পটাপট আমার ছবি তুলবা। তারপর কাগজে ছাপাই দিবা! গোলাম আজম এবং সরদার ফজলুর করিমের আলিঙ্গন এভাবে।

মুক্তিযুদ্ধ না হলে তো গোলাম আজমকে এভাবে পেতাম না। সেও ফজলুল হক হলের ছাত্র। আমিও ফজলুল হক হলের ছাত্র। আমি তাকে চিনি। এখন তারা জঙ্গি, জামায়াত-টামাত করে। তাদের বই খুব একটা পড়ি নাই। কিন্তু হি ইজ এ ফ্যাক্টর।

আলী : তাহলে কীভাবে দৃষ্টান্ত গড়ে উঠবে?

সরদার : There is no altarnative to example. দৃষ্টান্তের কোনো বিকল্প নেই। তুমি দৃষ্টান্ত দেখাইবা না, কেন মানুষ সেক্রিফাইজ করে না। তুমি ঝধপৎরভরপব করবা না, প্রশ্ন করবা- অন্য মানুষ সেক্রিফাইজ করে না কেন? তা হয় না।

[অনেকদিন পর ২০ সেপ্টেম্বর ২০০৯-এ টেলিফোনে জানতে চাইলাম এ ব্যাপারে তাঁর নতুন কোনো উপলব্ধি হলো কিনা। তিনি সোজা-সাপটা উত্তর না দিয়ে বললেন, আবার যেদিন দেখা হবে, সেইদিন আলাপ করা যাবে।]

আলী : ৭ মার্চকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন?

সরদার : আমি অত গভীরভাবে ভাববার লোক না। আমি একটা ডায়লগ কল্পনা করেছি এভাবে যে, শেখ মুজিব তো ৭ মার্চ ওইটা বলেছেন। বলার পর তো বাড়িতে গেছেন। তখন একটা লোক জিজ্ঞেস করছে, ‘তুমি কী সমস্ত বলে আসছ?’ তখন শেখ মুজিব বলছেন, ‘আমি কী বলে আসছি, আমি জানি না।’

অনেক কৃষকের সন্তান আছে। বাপেরে স্বীকারই করে না। লোকটা গোঁয়াড় প্রকৃতির ছিলেন। তিনি মনে করতেন, কেউ আমারে মারতে পারবে না। যখন মারছে তখনো তিনি বলছেন, ‘তোরা কী করছিস!’ নিজেরে রক্ষা করার জন্য পেছনের দরজা দিয়ে বের হলেন না!

৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে আমিও আছিলাম। ওপর থেকে জঙ্গি প্লেন উড়ছে। সেদিন শেখ মুজিব আর শেখ মুজিব ছিলেন না। একটা লোক কীভাবে নিজের অজান্তে রূপান্তরিত হয়ে যান, সেই লোক তো আর লোক থাকেন না। রাগের সময় তোমার নিজের ওপর কন্ট্রোল থাকে? তিনি যখন মানুষের মধ্যে বক্তৃতা দেন, তখন বুকের মধ্যে প্রেরণা আসে, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’। এই লাইনটা তিনি একটা মিনিট আগেও চিন্তা করেননি। ‘মুক্তি’ শব্দটা আগে ব্যবহার করেছেন, তারপর ‘স্বাধীনতা’ কথাটা ব্যবহার করেছেন। তিনি নিজেকে অতিক্রম করে গেছেন। আমার তো ভাগ্য যে, এই রকম লোককে দেখতে পেয়েছি। আমি দেখতে চাইছি, বলেই না দেখতে পাইছি।

আমি তো মহাত্মা গান্ধী, শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধী- এই তিনজনকে এক লাইনে দাঁড় করিয়েছি। জীবন ওদের দাঁড় করিয়েছে, ওরা দাঁড়িয়েছে।

আলী : সেই ৭ মার্চে শেখ মুজিবুর রহমান রূপান্তরিত হয়ে গেলেন। শেখ মুজিব আর শেখ মুজিব রইলেন না। কিন্তু স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে একা চল নীতি গ্রহণ করলেন। নিজের দলকেও ধরে রাখতে পারলেন না! প্রধানমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি হলেন, রক্ষীবাহিনী করলেন, বাকশাল করলেন কেন?

সরদার : স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল। স্বাধীনতার পর তিনি কী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেটা তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। এসব বিষয়ে আমার মত দেবার কিছু নেই।

আলী : শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে আপনি এক কথায় কী বলবেন?

সরদার : তিনি এমন একজন লোক ছিলেন, তাঁকে গ্রহণও করা যেত না, বর্জনও করা যেত না।

আলী : কেন?

সরদার : কারণ আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ গ্রহণ করেছেন। তাঁকে তুমি বর্জন করবে কীভাবে? তিনি গোঁয়াড় ছিলেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলতেন, অসাম্প্রাদায়িকতার কথা বলতেন। ফলে তাঁকে বিরোধিতা করা যেত না। আমি তাঁকে ‘মুজিব ভাই’ বলে ডাকতাম।

আলী : শেখ মুজিব গণতান্ত্রিক ছিলেন?

সরদার : তাহলে একটা ঘটনা বলি শোন। একবার ন্যাপের সম্মেলন হচ্ছিল। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, সরদার শোন, তোমার মোজাফফ্রকে [অধ্যাপক মোজাফফ্র আহমদ] বল, ‘আমি গণতন্ত্রীর কাছে গণতন্ত্রী, স্বৈরতন্ত্রীর কাছে স্বৈরাতন্ত্রী।’ সুতরাং তোমাকে বুঝে নিতে হবে, এই হলো শেখ মুজিব।

[ঘটনাটা হলো- ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপের) সম্মেলন হচ্ছে, ঐ সম্মেলনে মুজিবপন্থীরা ছিল সংখ্যালঘিষ্ঠ। এটা জানতে পেরে শেখ মুজিবুর রহমান এ মন্তব্য করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই সম্মেলনে মুজিবপন্থীরা আক্রমণ করে।]

আলী : আপনি তো বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে আপনি শেখ মুজিবের অনেক সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন। কেন?

সরদার : বল, এ কথা আমি কোথায় বলেছি? তোমার বলতে হবে। এখন তো মাথার মধ্যে নেই। আমি কী ডিফার করেছি?

আলী : জাতির পিতা সম্বোধন কেমন? অনেক বুদ্ধিজীবী এই তত্ত্ব বিশ্বাস করেন না। আপনি এটা বিশ্বাস করেন?

সরদার : জাতির পিতা এই যে টার্ম, এটা লিটারারি প্রশংসিত হয়। যাকে বলা হয়, তাঁর প্রশংসা করা হয়। তিনি বড় নেতা, বাংলাদেশের জন্য তাঁর অবদান আছে। অবদানকে খাটো করে দেখা যাবে না। তাঁর গুণ ও কার্যকারণকে প্রশংসা করতে পারি। জাতির পিতা, বড় নেতা প্রশংসাসূচক কথা, এটা ডিবেটের কথা।

আলী : সোহরাওয়ার্দী কেমন ধরনের নেতা ছিলেন? আপনারা তো একই অধিবেশনে বক্তৃতা করেছেন?

সরদার : উনি আধো আধো বাংলায় ও ঊর্দুতে কথা বলতেন। ন্যাশনাল কনস্টুয়েন্ট এসেম্বিলিতে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তাঁর বক্তৃতা শুনেছি। তিনি ভালো বক্তৃতা করতে পারতেন। শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দী সাহেবের চ্যালা ছিলেন। দুজনের খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল।

আলী : সিপিবি বাকশাল সমর্থন করেছে। আপনার কী সমর্থন ছিল?

সরদার : আমি বাকশাল সমর্থন করি নাই। আমার যোগ দেবার প্রশ্নও ওঠে নাই। কারণ তাঁরা আমাকে অত বড় বিবেচনা করেননি। অধ্যাপক আহমদ শরীফও বাকশালে যোগ দেন নাই। তিনি বলেছেন, ‘না, আমি যাব না।’

আলী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি সহকারী ওসমানের গল্প বলতে চেয়েছিলেন, আজ গল্পটা শোনাবেন?

সরদার : আমার ঘোরাঘুরি দেইখ্যা সে বলল, ‘আপনি কি চাকরি করতে পারবেন?’ আমি বললাম, ‘কেন?’ তখন সে বলছে, ‘আপনি যে কমিউনিস্ট রাজনীতি করেন না, এটা আমি বিশ্বাস করি না।’ -‘কেন?’ সে বলল, ‘আপনার মধ্যে যে বীজ একবার ঢুকছে, ওইটা আর বেরুবে বলে আমি মনে করি নে।’ আমি তাকে বললাম, ‘আমি তো ইউনিভার্সিটিতে রাজনীতি করি নাই। আমারে ইউনিভার্সিটিতে আনতে অসুবিধা কী?’ একজন এন্টি-কমিউনিস্ট সে আমাকে রিকগনাইজ করছে এইভাবে। মনে করছে, লোকটা যা বিশ্বাস করে তাই করেছে। সে আমাকে ইউনিভার্সিটিতে ঢোকার জন্য যদি সুপারিশ করত, তার চাইতেও আমি তার এই কথায় বেশি খুশি হয়েছি।

আলী : আপনি চাকরি থেকে রিজাইন দিলেন, আবার সেই ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ে এলেন, এগারো বছর জেল খাটার পর। এটা ভাবতে অবাক লাগে না?

সরদার : (হাসতে হাসতে) তবু আরও পরে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলাম। আমার আসার বিষয়টি ফিলোসফি ডিপার্টমেন্টের টিচাররা জেনে বললেন, ‘আপনার তো সর্বনাশ করলেন প্রফেসর রাজ্জাক।’ আমি বললাম, ‘কেন?’ তখন তারা বললেন, ‘আপনি ফিলোসফির ডিপার্টমেন্টের লোক। ফিলোসফিতে অনার্স ও মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। আপনি ফিলোসফি ডিপার্টমেন্টে টিচার হলে দ্রুত প্রমোশন পাইতেন।’ আমিও দেখলাম কথাটা তো ঠিকই বলেছে, চিন্তা করতে লাগলাম কী করা যায়?

একদিন প্রফেসর রাজ্জাকের কাছে গিয়া বললাম, ‘আমি তো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের লোক। আমি ফিলোসফি পড়াব কী করে?’ তিনি তখন বললেন, ‘মাথা ক্লিয়ার না থাকলে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ান যায় না।’

(সংক্ষেপিত)

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত