একটি ভুলের গল্প

 

রাষ্ট্র বানান ভুল হলে রাষ্ট্রের কী যায় আসে!
ধরা যাক, ‘ষ’-র বদলে লেখা হল ‘শ’ বা ‘স’। তাতে কিঞ্চিৎ উচ্চারণের গণ্ডগোল হবে বটে। কিন্তু খুব সজাগ কান ছাড়া তা ধরা পড়বে না। আর ব্যুৎপত্তিগত্ত গোলযোগ তো কেউ ধর্তব্যের মধ্যেই নেবেন না। কারণ সে ব্যাপারটা নিয়ে কারোরই তেমন মাথাব্যথা নেই। কারোর বলতে আপাতত এখানে, এই কারখানার কথা বোঝানো হচ্ছে। মানে যেখানে কয়েক ঘণ্টায় কয়েক হাজার শব্দ পাশাপাশি বসানোর বরাত দেওয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে এটাকে একটা কাগজের অফিস বলতে হবে।   
কথাটা মনে হতে একটু খারাপই লাগল প্রমোদের। হাজার হলেও তার নিজেরই অফিস। এই একটু আগে সে এই অফিসের-ই সুন্দর ফুল আঁকা মগ থেকে ঘটঘট করে জল খেয়েছে সে। কারণ এখানে আসতে গিয়ে সে ঘেমেনেয়ে একসা হয়ে গিয়েছিল। আর তেষ্টায় তার ব্রহ্মতালু শুকিয়ে যাচ্ছিল প্রায়। অনেকবার ভেবেছে, জলের বোতল ক্যারি করবে। কিন্তু হয়ে আর ওঠে না। ঠিক সেই সময়ে অফিসের ঠান্ডা জলটা তার কাছে জীবনের মতো মনে হয়েছিল। তারপর, প্রতিদিনের মতো তার নির্দিষ্ট জায়গায় দুটো লাল কালির কলম নিয়ে গিয়ে সে বসে পড়েছিল। একপাশে বেশ কয়েকটা প্রিন্ট আউট রাখা আছে। এবার সেগুলো ধরে ধরে তাকে চালতে হবে। অর্থাৎ, ভুল বানান, টাইপো ইত্যাদি বেছে আলাদা করতে হবে। চাল থেকে কাঁকর বাছার মতো। সেটাই তার কাজ। আজ এতগুলো বছর ধরে ক্লান্তিহীনভাবে সে এই চালার কাজ করছে। তাও দু-একটা কাঁকর থেকে যায়। তার জন্য খিস্তিও খায়। আবার চালা শুরু করে। চালতে চালতেই হঠাৎ আজকে তার মনে হল, রাষ্ট্র বানান ভুল হলে কী যায় আসে! রাষ্ট্রেরই বা কী! জনগণেরই বা কী, আর কাগজেরই বা কী! আসলে কথাটা তার মাথায় আসত না। যিনি কপি লিখেছিলেন, সম্ভবত তিনিই এই ভুলটি করেছেন। এরপর যিনি সেটিকে ডিটিপি করেন, তিনিও ভুলটি বহাল রেখেছেন। তাঁর নিশ্চিত মনে হয়েছে, এটা রাষ্ট্রের কোনও বিকল্প বানান। আর নেহাত যদি ভুল-ই হয়, তবে প্রমোদদের হাতে এলেই শুধরে যাবে। ফলে তিনি আর ভাবনা-চিন্তা করেননি। কিন্তু ঠিক এখান থেকেই প্রমোদের ভাবনা শুরু হল। এই যে এতক্ষণ ভুল বানান-ই থেকে গিয়েছে, এতে তো কোথাও কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি। এবং এই ভাবতে ভাবতেই সে নিজের অফিসকে কারখানাও ভেবে বসল। পরক্ষণেই অবশ্য সে ভাবনা মন থেকে তাড়াল। কারখানা হোক আর যাই-ই হোক, যে অন্ন জোগায় সেই-ই লক্ষ্মী। মাথায় থাকুক তা। কিন্তু প্রশ্ন হল, রাষ্ট্র বানানে ‘শ’, বা ‘স’ থাকলে সত্যিই কি কিছু এসে যাবে! লাল কালির কলমখানি বেশ খনিকক্ষণ নাড়াচাড়া করল প্রমোদ। হিসেবমতো ভুল বানানটিকে তার কেটে দেওয়াই উচিত। কিন্তু যে ভুলে কিছু আসে যায় না, তাকে কেটেই বা কী হবে! এই দ্বিধাতেই সে বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকল। এবং একটা সময় বুঝল, এভাবে চুপচাপ বসে থাকা ঠিক হচ্ছে না। অতএব সে একটা সিগারেট খেতে অফিসের বাইরে বেরোল।

২)

সিগারেটটা যখন মাঝামাঝি, তখন প্রমোদ মোটামুটি নিজের মনে বিষয়টিকে গুছিয়ে নিয়েছে। ধরা যাক, সে ভুল বানান কাটল না। তাহলে কী কী হতে পারে? প্রুফ হওয়ার পর এই কপি একবার লেখক নিজে দেখবেন। তাঁর চোখে ভুল পড়লে তিনি সঙ্গে সঙ্গে এ-ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন। তখন, ‘এহহে এক্ককেবারে চোখ এড়িয়ে গেছে’ বললেই হবে’খন। যদি তা না হয়, তবে এরপর কাগজের পাতার বিন্যাস যখন হবে, তখন নিশ্চয়ই কারোর না কারোর চোখে ঠিক পড়ে যাবে। তাও যদি না হয়, নিউজ এডিটর যখন পাতা ছাড়বেন, খুঁটিয়ে একবার দেখে নেবেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই মিস করবেন না। যদি তিনিও মিস করেন, তবে খোদ সম্পাদক সাহেব নিশ্চয়ই বিন্দুমাত্র ভুল করবেন না। অর্থাৎ, প্রমোদ যদি ভুল বানান রাখেও, তবু সেটির ভুল থাকার জো নেই। কিন্তু এই সবকিছুর জন্যই প্রমোদের ভালোমতো ঝাড় খাওয়ার চান্স আছে। কেন, এমন সহজ বানান চোখ এড়িয়ে গেল, তা নিয়ে প্রতি পদে কৈফিয়ৎ তলব হতে পারে। তাহলে সে কী করবে? তারই বিভাগের কারোর সঙ্গে একবার আলোচনা করবে! জিজ্ঞেস করে দেখবে যে, সে এই বানানটা ভুলই রাখতে চাইছে। তাদের সম্মতি আছে কি না? অথবা, সম্মতি না হলেও অন্তত তাদের কী মতামত এ ব্যাপারে?

ঠিক এইখানে এসে সিগারেটটি শেষ হল। এবং, প্রমোদ একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেল। কপিতে এতক্ষণ ধরে রাষ্ট্র বানানটা ভুলই আছে। মানে এই মুহূর্ত পর্যন্ত ভুল বানানের রাষ্ট্রকেই সে স্বীকৃতি দিয়েছে তার হাতের কপিতে। কিন্তু তার মধ্যেও যেটুকু চিন্তাভাবনা সে করল, তাতে তার নিজের কথাই শুধু সে ভাবল। অর্থাৎ, তার সঙ্গে কী হবে বা না হবে? একবারও কাগজের কথা সে ভাবেনি। রাষ্ট্র, একমাত্র রাষ্ট্রই তো এভাবে গোত্র ভেঙে ব্যক্তি মালিকানাকে নির্লজ্জ প্রশ্রয় দিয়েছিল। এবং দিয়ে থাকেও। এখানে মালিকানা বদলে ব্যক্তিচিন্তা শব্দটা বসিয়ে নেয় প্রমোদ। অথবা মালিকানাও বলা যায়। কারণ নিজের সম্পর্কে চিন্তা, নিজেকে সুরক্ষিত রাখার চিন্তাও আসলে সম্পদেই গড়ায়। এ-চিন্তা জোরদার না-হলে লোকে নিজের সম্পদ, ক্ষমতা, মালিকানা নিয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন হত না। এই কথাটা মনে হতেই সে নিশ্চিত হয়, বানান ভুলের জন্য রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য এবং উদ্দেশ্যের একচুল এদিক ওদিক হয়নি। এবার যদি সে কোনও সহকর্মীর সঙ্গে আলোচনা করে, তাতেই বা কী হবে! প্রথমেই সকলে বলবে, এ তো পাগলের প্রলাপ। অথবা, যদি তেমন বুদ্ধিমান কেউ হয়, তবে বলবে, ‘বেশ তো করেই দ্যাখো না’। আসলে, যে এমন পরামর্শ দেবে, সে কিন্তু প্রমোদকে টাইট দিতেই চাইছে। কারণ, সে-ও জানে, এই ধরনের ভুল কাগজে বেরোলেই প্রমোদ বাঁশটি খাবে। অথচ সে খুব সুচতুরভাবে প্রমোদকে এনকারেজ করবে যাতে সে বাঁশটি খায়। এবং প্রমোদ বাঁশ খাওয়ার দরুণ সে খানিকটা কর্তৃপক্ষের নেকনজরে পড়ে। কারণ যে কোনও রাষ্ট্রই চায়, সুবিধাভোগী অবনত শ্রেণি তৈরি করে তাদের একের বিরুদ্ধে অন্যকে লাগিয়ে দেওয়া। যাতে কোনোদিন গোত্র টিকে না থাকে। রাষ্ট্র এমনই এক প্রতিষ্ঠান যা এই ধরনের অশ্লীলতাকে প্রশ্রয় দেয়, পালন করে। প্রমোদ জানে। কীভাবে জানে, আজ আর তা মনে করতে পারল না। তার মনে হল, তরুণ বয়সে এসব কোথাও সে পড়েছিল। এখন প্রয়োজনহীন, তবু মনে থেকে গিয়েছে। স্মৃতি অপ্রয়োজনেই বহুকিছু ধরে রাখে। কিন্তু এবারও, একটা ব্যাপারে সে নিশ্চিত হল। যদি উপরে বর্ণিত সমস্ত কিছু ঘটে, তবে এটাই প্রমাণিত হয় যে, ভুল বানানেও রাষ্ট্রের কিছু এসে যায় না।
সুতরাং সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। কারণ, অন্তত তার কাছে এ-নিয়ে আর কোনও দ্বিধার অবকাশ ছিল না।

৩)

বিকেল গড়াতে মুড়ি আর শিঙাড়া এল। শিঙাড়া যথারীতি ঠান্ডা। এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, গরম শিঙাড়া দিলেই বরং সকলে চমকে উঠবে। চায়ের মাসি ঘুরে ঘুরে এক রাউন্ড চা-ও দিয়ে গেল।

প্রমোদ মুড়ি চিবোতে চিবোতে, চায়ে চুমুক দিতে দিতে, সিগারেট টানতে টানতে অপেক্ষা করে, কখন এ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। কেউ না কেউ তো অন্তত বলবে যে, ‘এ বাবা রাষ্ট্র বানানটা ভুল থেকে গিয়েছে। কে করেছে এ কাজ?’ ঠিক তখনই প্রমোদ তার মোক্ষম যুক্তি চেলে বলবে, বানান ভুল হলে রাষ্ট্রের কী যায় আসে! জনগণেরই বা কী ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু যত সন্ধে বাড়ছে তত মিটিংয়ের সময়সীমা বাড়তে থাকল। কারণ এদিন রাষ্ট্র এমন একটা ঝুঁকিবহুল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা জনগণের কাছে আঘাত হিসেবে নেমে আসতে পারে। এমত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের সমালোচনা করাটা দরকার। সবদিক তলিয়ে দেখতে হবে তো বটেই। কিন্তু সুর কতটা চড়বে সেটাই বিবেচ্য। এতটাও চড়ালে চলবে না, যাতে সরাসরি কাগজকে রাষ্ট্রের কোপে পড়ে যেতে হয়। আবার সাধারণ মানুষকে উপেক্ষা করলেও সার্কুলেশনের দফারফা। তখন রাষ্ট্র ছেড়ে কাগজ একটা রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হয়ে ওঠে। ফলে এরকম ক্রুসিয়াল সময়ে এই ব্যালেন্সটা খুঁজে পাওয়া জরুরি। যাতে সাপও না মরে, লাঠিও না ভাঙে। সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক এবং অন্যান্য পাকা মাথার লোকেরা সেই সুরটিই খুঁজতে ব্যস্ত। মিটিংরুম থেকে ঘনঘন নির্দেশ আসছে। আর সেইমতো একজন একটি করে কপি লিখতে বসে পড়ছে। হু হু করে তার প্রুফ দেখা হছে। পুরো কাজটাই হচ্ছে খুব দ্রুত। আর তার মধ্যে প্রমোদের ভুল বানান রেখে দেওয়া কপিটিও আছে। সেটা বেশ কিছুক্ষণ আগেই লেখা হয়ে গিয়েছিল। ফলে, গোটা অফিস ধরে নিয়েছে, সেখানে ভুলের সম্ভাবনা কম। এবং শেষমেশ সেদিন আর কোনও প্রশ্নই উঠল না। পরদিন, কাগজের প্রথম পাতায় ভুল বানানের কপিটিই চলে এল। আসলে কপিটির প্রথম পাতায় থাকার কথা ছিল না। কিন্তু কোনও কারণে নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে প্রক্সি দিতে তাকে সামনে পাঠানো হয়েছে। তাতে কেলেঙ্কারি বাড়াবাড়িরকম বাড়ল। কাগজ লোকের হাতে পৌঁছানো মাত্র দারুণ প্রতিক্রিয়া হল। পাঠক তুলোধোনা করতে শুরু করলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছিছিক্কার পড়ল। একটি সমাদৃত পত্রিকা কী করে এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ করতে পারে তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হল।
ডাক পড়ল প্রমোদের।

৪)

ভুলটা যে তার হাত দিয়েই হয়েছে, এ কথা স্বীকার করতে প্রমোদের কোনও দ্বিধা ছিল না। শুধু তার প্রতিপাদ্য ছিল যে, সে বুঝিয়ে দেবে সে আসলে কোনও ভুলই করেনি।
পুরো সম্পাদকীয় দপ্তর যখন তার দিকে ‘কেন জেনেবুঝে এরকম ভুল সে করেছে?’ এই প্রশ্ন ছুড়ে দিল, তখন হঠাৎ নিজেকে মারাসোলের মতো মনে হল প্রমোদের। নির্বিকল্পভাবে সৎ এবং নির্বিকার। মায়ের মৃত্যুর পর যে ছেলের চোখে জল নেই। কারণ কেঁদে কী করবে? জীবন তো সেই আগের মতোই থাকবে। ফলত যে কোনও শোকের মধ্যে খানিকটা স্তোক আছে। মারাসোলের নীতি তাই-ই বলে। তাই সে নির্বিকার থাকতে পারে। কিন্তু আসলে তো সে ভয়নাকভাবে সৎ। যা সাজানো, তা সে সর্বোতভাবে প্রত্যাখান করেছে। ফলে মৃত্যু ও শোকের শৃঙ্খলাবদ্ধ যুক্তি সে মানেনি। মানতে পারেনি। এই মুহূর্তে প্রমোদের মনে হল, সে নিজেও সেরকমই একটি নির্বিকল্প সততার উদাহরণ দেবে। কারণ সে প্রমাণ করে দেবে, রাষ্ট্রের বানান ভুল হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রের কিচ্ছু যায় আসে না। এমনকি জনগণেরও না। কারণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ঝুঁকি জনগণকে ঠিক বা ভুল বানান নিরপেক্ষভাবেই ভেড়ার মতো বয়ে বেড়াতে হবে। সুতরাং সব যখন একই থাকবে, তাহলে আর ভুল বানানকে কাঠগড়ায় তোলা কেন! প্রমোদ নিশ্চিত, এই নির্বিকারত্বকে সে বুঝিয়ে দিতে পারবে। কারণ অমন ঝুঁকিতে জনগণের মেরুদণ্ড বেঁকে যাবে জেনেও, তারা কাল শিঙাড়া খেয়েছে, চা খেয়েছে, দামি সিগারেট টেনেছে। তাহলে! ভুল বানান এখানে কি আদৌ কোনও ফ্যাক্টর হচ্ছে?
মোটামুটি এরকমভাবেই সে তার যুক্তিগুলো পেশ করেছিল। খানিকটা গুছিয়ে। খানিকটা অসংলগ্নতায়। এবং খুব প্রত্যাশিতভাবেই একটি কথাও সে প্রতিষ্ঠিত করতে পারল না বরং আলোচনাটা ঘুরল অন্য দিকে। যে ক্ষতি হয়েছে, এখন সেখান থেকে কাগজকে বাঁচানো যায় কী করে! প্রথম পাতায় রাষ্ট্র বানান ভুল! ড্যামেজ কন্ট্রোল করা যথেষ্ট চাপের হবে, এ ব্যাপারে সকলেই নিশ্চিত। এর মধ্যে প্রমোদ আমতা আমতা করে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, তার যুক্তিগুলো নাহয় মানতে হবে না। কিন্তু ধরে নেওয়া যাক, একটা সিলি মিস্টেক হয়ে গেছে। সেই হিসেবে বিষয়টাকে দেখা হোক। তাহলে দেখা যাবে, প্রমোদের হাত থেকে কপি বেরোনোর পর যাদের তা চেক করার দায়িত্ব ছিল, তারা কেউই সে ভূমিকা পালন করেননি।
কিন্তু এ কথাতে হিতে বিপরীত হল। পুরো প্রক্রিয়াটি নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানো হিসেবে দেখা হল। ফলে এখুনি যাতে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় সে ব্যবস্থাও করতে বলা হল। কারণ সকলের স্থির বিশ্বাস, প্রমোদের মাথা একেবারেই খারাপ হয়ে গিয়েছে।

প্রমোদ নিজে শুধু আর একবার নিশ্চিত হল যে, কোনও ভুল সে করেনি। বিত্তহীনদের উপর বিত্তবানদের শাসন প্রতিষ্ঠার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, যে কিনা হাতে তুলে দেয়, সেই-ই তো রাষ্ট্র। বানান ভুল ছাপা হলেও তার কিছু যায় আসে না। নইলে এখানে শুধু প্রুফ রিডার প্রমোদকে নয়, আরও কেষ্টবিষ্টুদের বরখাস্ত করা হত। সেটাই যুক্তিযুক্ত হত।
বেশ পরিতৃপ্তিতেই সে এখন বেরিয়ে আসে। কেউ অবশ্য তার মুখে লেগে থাকা আলগা কৌতুকটুকুকে খেয়াল করে না।

৫)

পরের দিন কাগজের প্রথম পাতাতেই মোটা কালো বর্ডার দেওয়া বক্সে চমৎকার কিছু কথা ছাপা হল। যেখানে লেখা ছিল, ‘পাঠক, গতকাল সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় একটি খবরের পুরোটাতেই রাষ্ট্র বানান যে ভুল তা আপনিও জানেন, আমরাও। হ্যাঁ, এই ভুল আমরা স্বেচ্ছায় রেখেছিলাম। কারণ, আমরা আপনাদের একটি সামাজিক পরীক্ষার মুখোমুখি করতে চেয়েছিলাম। যার প্রতিপাদ্য ছিল এরকমঃ রাষ্ট্র বানান ভুল হলেও রাষ্ট্রের কি কিছু এসে যায়! নাকি জনগণের কিছু এসে যায়!

প্রিয় পাঠক, এবার ২৪ ঘণ্টা পিছিয়ে গেলে আপনি দেখবেন, সত্যিই কোথাও কিছু এসে যায় না। রাষ্ট্র চলছে নিজের মতো, আমরাও সবকিছু মেনে নিতে প্রস্তুত। শুধু এই ভুল বানান যেন আমাদের মর্যাদা সম্পর্কে আমাদেরই সচেতন করে দিয়ে গেল। আমাদের বুঝিয়ে দিল, আমরা কতটা নির্বিকার। রাষ্ট্রও আমাদের সম্পর্কে কীরকম নির্বিকার। অথচ সবই চলছে, কোথাও কোনও হেলদোল নেই। আমরা জোর দিয়ে দাবি করছি না যে, এই সামাজিক পরীক্ষা সঠিক। কিন্তু এটা আমাদের একটা প্রয়াস ছিল মাত্র। রাস্তা চলতে হোঁচট খেলে যেমন রাস্তা খারাপ মালুম হয়, এও অনেকটা সেরকমই ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। তবে, এতদসত্ত্বেও যদি কেউ ওটাকে বানান ভুল হিসেবেই ধরেন, তবে তাঁরা এটিকে রিজয়েন্ডারই মনে করবেন।’
অভ্যেসের বশে হাতে কাগজ তুলে নিয়ে এ-লেখায় চোখ পড়তেই প্রমোদ ভীষণ চমকেছিল প্রথমে। তারপর হেসে উঠেছিল সশব্দে। মোড়ের মাথায়, চায়ের দোকানে বসে। আর সকলে চমকে উঠেছিল।
মুখে কেউ কিছু বলেনি, কিন্তু, অনেকেই সে মুহূর্তে প্রমোদকে পাগল-ই ভেবেছিল।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত