সত্যেন সেন : গদ্য সাহিত্যের উদভ্রান্ত জাদুকর

দীপংকর গৌতম

সত্যেন সেন- একটি নাম, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির একটি প্রোজ্জ্বল অধ্যায়। জীবনের বাঁকে বাঁকে যারা পদচারণা করে নিঃশঙ্ক চিত্তে-জীবনকে মানুষের ও সমাজ প্রগতির সংগ্রামে যারা উৎসর্গ করেন সেই বিরল প্রজাতির মানুষের একজন সত্যেন সেন। সমাজ বদল ছাড়া মেহনতি মানুষের মুক্তি নেই- এ কথা বিশ্বাস করে যারা জীবনকে সমাজ প্রগতির কাজে উৎসর্গ করেন সত্যেন সেন তাদের একজন। তিনি তার লেখা একটা গানে লিখেছেন তার জীবন দর্শনের অন্তঃসার। সেই গানটি হলো- ‘মানুষের কাছে পেয়েছি যে বাণী, তাই দিয়ে রচি গান/মানুষের কাছে ঢেলে দিয়ে যাবো মানুষের দেয়া প্রাণ।’ এই গানের মধ্যকার সত্যবদ্ধ উচ্চারণ আর কিছু থাকতে পারে বলে মনে হয় না। মাটি ও মানুষের প্রতি আজীবনের দায়বদ্ধ এই উচ্চারণ, অন্ধ অবস্থায়ও তার লেখালেখির প্রতি বিন্দুমাত্র অনীহা ছিল না। জেল প্রকোষ্ঠে বসেও তিনি লিখেছেন নিরন্তর। এক সময় জেলখানায় পত্রিকা দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে বাইরের খবর তিনি জানতেই পারতেন না। তখন সময় কাটবে কি করে? এটা ব্রিটিশ যুগের কথা। ও সময় অবশ্য পত্রিকা বন্ধ করে বাইবেল দেয়া শুরু হলো। তাতেই সন্তুষ্ট হলেন সত্যেন সেন। তিনি বইবেলের কাহিনী নিয়ে লিখলেন দুখানা উপন্যাস- অভিশপ্ত নগরী ও পাপের সন্তান। রঁম্যা রোলার সেই যে কথা- ‘এ আগুন নেভে নেভে নেভে না’; এ কথা পুরোপুরি প্রযোজ্য ছিল সত্যেন সেনের জীবনে। তাকে কোনো পথেই তার পথ থেকে সরানো সম্ভব ছিল না। তিনি লিখতেন- একটু সময় পেলেই তিনি লিখতেন। প্রয়াত সাংবাদিক নির্মল সেন, সত্যেন সেনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলে ছিলেন- সত্যেন দা’র মতো মানুষ এ সমাজের জন্য কতটা জরুরি এই এ দেশ, জাতি তা কতটা বুঝেছে জানি না। তবে এই মাপের মানুষ হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে পারা একটা চ্যালেঞ্জের মতো বিষয়। সত্যেন দা’র সঙ্গে আমি জেল খেটেছি। কাছ থেকে সত্যেন দা’কে দেখেছি। জেলে বন্দি পকেটমারও সত্যেন দা’কে সম্মান করতো। সেয়ানা নামের উপন্যাসটির নায়ক জেলখানারই হয়তো কেউ। তিনি লিখতেন একদম ভেতর থেকে। তাই তার লেখা মানুষকে স্পর্শ না করে পারে না। সত্যেন দা জেলে বসেও উবু হয়ে নিরন্তর লিখে চলতেন। জেলখানায় তো চেয়ার টেবিল ছিল না, তাতে সত্যেনদার কিছু যেত আসতো না। সিমেন্টের ফ্লোরে দিনের পর দিন উবু হয়ে বসে লিখতে লিখতে তার কনুইয়ের চমড়া ইস্পাতের মতো হয়ে গিয়েছিল। আমাদের মতাদর্শিক পার্থক্য ছিল, কিন্তু সত্যেন দা ছিলেন সব মতাদর্শের ঊর্ধ্বের একজন মানুষ।

তার লেখা- ‘গ্রাম বাংলার পথে পথে’, আজকের সংবাদপত্রে যা চারণ সাংবাদিকতা নামে পরিচিত, তার মূল দলিল ওই বইখানা। এ বই পড়লে একটা এলাকা ঘুরে এসে সেই এলাকা, এলাকার মানুষ সম্বন্ধে কীভাবে লিখতে হয় তার আদর্শলিপি এই বইখানি। এই বইখানা পড়ার পরে আমি মেনাজাতউদ্দীনের- পথ থেকে পথে, সংবাদ নেপথ্যে, পায়রাবন্দের শেকড় সংবাদ, কানসোনার মুখ পড়েছি; বা ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদক আব্দুল জব্বারের- বাংলার চালচিত্র বা রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলার মুখ পড়েছি- সব বই পড়ার পড়ে মনে হয়েছে এদের সবার শিক্ষক সত্যেন সেন। তার লেখার যে সারল্য ও সাধারণ শব্দের ব্যবহারের কৌশল, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন মার্কসবাদী লেখকের গদ্য শৈলী যে মাপের হয়, সেই মাপেই সত্যেন সেনের প্রতিটি উপন্যাস ও প্রতিবেদনের ভাষা নির্মিত হয়েছে। বোঝা যায় জেল জীবনে কিংবা মুক্ত হাওয়ায় থেকে তিনি কাহিনীর বিন্যাসের সঙ্গে শব্দের পেছনে ছুটেছেন অবিরত। যে কারণে তার গদ্যশৈলী একটি প্রাতিস্বিক ধারায় তৈরি হয়েছে। সত্যেন সেন লিখতেন শুধুমাত্র মনের তাগিদে নয়, সমাজের দায় থেকে। সমাজ বদল যার চেতনায়-মননে-অন্তরের গহীন তল্লাটে ভর করে আছে তার শব্দ নির্মাণের কাঠামো আর দশজনের থেকে আলাদা হবে এটাই স্বাভাবিক। আমরা যদি কেবল সত্যেন সেনের সাহিত্য সাধনার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করি, তাহলেও এর ব্যাপ্তি দেখে আশ্চর্যান্বিত হতে হয়। তিনি লিখেছেন রাজনৈতিক উপন্যাস, ঐতিহাসিক উপন্যাস, সামাজিক উপন্যাস, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাহিনী, বিজ্ঞান বিষয়ক ছোটদের লেখা, রিপোর্টাজ ও কারা-উপন্যাস। তাঁর উপন্যাসের বিশেষ একটি জায়গা দখল করে আছে রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ, প্রকাশকাল ১৯৬৬। যদিও লেখক ১৯৫৯ সালে রাজশাহী কারাগারে অবস্থানকালে এই উপন্যাস রচনা সম্পন্ন করেছিলেন। সত্যেন সেনের কারাজীবনের বিবরণ দিতে গেলে তা হয়ে উঠবে আরেক উপন্যাস। তাঁর সৃষ্টিশীল ও অনন্য রচনার পরিচয়দান দাবি করে যেসব উপন্যাস, তার মধ্যে রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ বিশেষ একটি সৃষ্টিশীল প্রয়াস হিসেবে পরিগণিত হয়। এ ক্ষেত্রে একটা কথা বলা যেতে পারে, মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ রচনা করছিলেন- তার শুরুতে তিনি লিখেছিলেন, ‘লিখিব মা বীর রসে ভাসি, তব পদে এ মম মিনতি।’ কিন্তু মাইকেল মধুসূদন দত্ত বীরবাহু থেকে শুরু করে মেঘনাদের যে বীরত্ব তুলে ধরছিলেন তাতে এটা বীর রসেই লেখা হচ্ছিল। কিন্তু বিপাকটা বাধে অন্য জায়গায়। মেঘনাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এক হাহাকার গোটা ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যকে করুণ রসে নিষিক্ত করে। না, এই নিষিক্ত করা শুধুমাত্র রাজা রাবণের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে না। তার ব্যক্তিগত জীবনে জমিদার রাজ নারায়ণ দত্তের ছেলে জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে আঘাত খেতে খেতে, অর্থাভাবে, অনভ্যস্ত জীবনযাপনে যখন তাকে বলতে হয়- ‘আইরেট আর একটা টাকা হলে আর একদিন বেশি বাঁচতাম।’ জীবনে এই যে করুণ পরিণতি তা এসে ভর করে ‘মেধনাদ বধ’ কাব্যে। যে কারণে মেঘনাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কাব্যরসের সুষমা কারণ রসে এসে ভর করে। বদলে যায় প্রেক্ষাপট। একই কথা ঘটে যায় রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ উপন্যাসে। যে উপন্যাসের মধ্য দিয়ে রুদ্ধদ্বার ভেঙে মুক্তপ্রাণের ধারা বিকশিত হবে, সেখানে নিজের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা উপন্যাসকে যেখানে নিয়ে যায়, সেখানের পরিসর অনেক বড়। কিন্তু সত্যেন সেনের জীবন সংগ্রামের আদ্যোপান্ত অর্থাৎ তার সঙ্গীত থেকে জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম, আন্তর্জাতিকতাবাদী রাজনৈতিকি বীক্ষা, তার সঙ্গে জীবনের ছোটখাটো ঘাটনা একজন বিপ্লবীকে কতটা বাস্তবমুখী করে তোলে, তা এই উপন্যাসের শব্দরীতি কাহিনীর ধ্রুপদী বিন্যাস সব কিছুর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র রুনু তেমনি এক বন্দি। তাকে ঘিরেই এই উপন্যাস। তাহলে সত্যেন সেনের জীবনে এমনকি কোনো ঘটনার আঁচ পাওয়া যায় যেখানে রুনু নামে কেউ এসে দাঁড়ায়? উপন্যাসের প্রয়োজনে অনেক চরিত্র সৃষ্টি করতে হলেও রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ উপন্যাসকে এমন জায়গায় দাঁড় করানো হয়েছে যে এই উপন্যাসটিকে শিল্পী সংগ্রামী সত্যেন সেনের আত্মজৈবনিক উপন্যাস হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ সত্যেন সেনের অজান্তেই তার আত্মজৈবনিক উপন্যাসে পরিণত হয়েছে। মানের দিক থেকে অত্যন্ত উচ্চমানের এই উপন্যাসের রাজবন্দি স্বয়ং লেখকই। পাকিস্তানি আমলের এ এক বড় বাস্তবতা, যখন কারাগার সর্বদা পরিপূর্ণ থাকতো বামপন্থি, জাতীয়তাবাদী ও সংখ্যালঘু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের দ্বারা। কাহিনীর এই রুনু নিজের সম্পর্কে নিজেই বলে, ‘আমি একজন ইনট্রোভার্ট।’ ফলে আত্মপরিচয় এখানে বিশেষ মেলে না। কেবল অন্য চরিত্রের সঙ্গে রুনুর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কিংবা অন্যজীবন সম্পর্কে রুনুর মূল্যায়ন থেকে আমরা জানতে পারি তার সম্পর্কে। উপন্যাসের শুরু সাদামাটা এক সংক্ষিপ্ত বাক্যে, ‘বিভার চিঠি এসেছে।’ তারপর এমনই নিরাভরণ সহজিয়া ধারায় আশ্চর্য এক মিষ্টতা ছড়িয়ে বর্ণনা এগিয়ে চলে, ‘ওর কাছ থেকে নিয়মিতভাবে চিঠি পাই। মেয়েটা সত্যি ভালো। মেয়েটা ভালো অর্থাৎ আমার জন্য ও আপনাকে বিকিয়ে দিয়েছে। সম্ভবত এই জন্যই আমি ওকে ভালো মেয়ে বলি, বিচারের মানদণ্ডটা আমরা এভাবেই তৈরি করে থাকি।’

রচনা কুশলতা থেকে স্পষ্টত বোঝা যায়, প্রথম উপন্যাস হলেও এই লেখকের রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি। ৫০ বছরে উপনীত হয়ে আপন লাজুকতা ও দ্বিধাদ্ব›দ্ব পেরিয়ে উৎসর্গিত প্রাণ এই রাজনীতিবিদ কলম হাতে তুলে নিয়েছিলেন। মার্কসবাদী রাজনীতিতে বিশ্ববীক্ষণ ও বিদ্যাচর্চা ছিল এক জরুরি বিষয়, আর রবীন্দ্রনাথ ও সঙ্গীত দ্বারা আকুল সত্যেন সেনের পঠন-পাঠনের ব্যাপ্তি তাঁকে কখনো রীতিবদ্ধ শাসনের গণ্ডিবদ্ধ পাঠপ্রবণতায় আটকে রাখেনি। প্রায় নিয়মিতভাবে ঘটেছে তাঁর কারাবাস, সেখানে যেমন পড়াশোনায় নিবিষ্ট থেকেছেন, তেমনি লিখেছেন অজস্র চিঠি। বস্তুত একজন রাজবন্দি সপ্তাহে যে কয়েকটি চিঠি লেখার অনুমোদন পান, তিনি তার পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন।

এসব চিঠি লিখেছেন পরিবারের নিকটজনের কাছে, এমনকি নবীন সদস্যদের কাছেও। সেন্সর কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে রাজনীতির কথা চিঠিতে উল্লেখ করা না গেলেও জীবনের কথা বলার সুযোগ ছিল। কেজো চিঠির ছত্রে ছত্রে কিংবা দুই ছত্রের মাঝখানের ফাঁকা স্থানে এমনই উপলব্ধির পরিচয় তিনি মেলে ধরতেন। সেইসঙ্গে আমরা দেখি, নিজেকে সাহিত্যিক পরিচয়ে চিহ্নিত করতে না চাইলেও গান ও কবিতা লিখেছেন চল্লিশের দশক থেকে; বিভিন্ন গল্প প্রকাশিত হয়েছিল পত্রপত্রিকায় এবং ভোরের বিহঙ্গী নামে একটি প্রস্তুতিমূলক উপন্যাসও লিখেছিলেন, যা প্রকাশিত হয়েছিল অনেককাল পর। ফলে প্রস্তুতি ছিল সত্যেন সেনের ভিন্নতরভাবে কিন্তু তাঁর বড় অঙ্গীকার ছিল সমাজ পরিবর্তনের কর্মকাণ্ডের প্রতি। আর তাই সাহিত্য সাধনাকে এর সম্প্রসারিত রূপ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এ কারণে তাঁর লেখায়, বিশেষভাবে আত্মজৈবনিক রচনায় এক দ্বন্দের সৃষ্টি হয়েছিল। ‘রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ’ উপন্যাস হিসেবে রচিত হয়েছে কারাজীবনের বাস্তব কাহিনী, এর মূল অবস্থানে বিভা নামে যে নারীর অবস্থান, উপন্যাসের শুরু ও শেষে তাকে পাই বড়ভাবে। কিন্তু সহবন্দিদের জীবন এবং তাঁদের অভিজ্ঞতার বিচিত্রতার বর্ণনার মধ্য দিয়ে বিভা যেন কোথায় হারিয়ে যায়, যদিও মাঝেমধ্যে জেগে ওঠে বুদ্বুদের মতো, এভাবে কাহিনীও মাঝেমধ্যে হয় গতিহারা। যদিও সত্যেন সেন রচিত ইতিহাস-আশ্রয়ী উপন্যাসের সংখ্যাই বেশি এবং এ ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্যও সর্বাধিক। এ জাতীয় উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য : অভিশপ্ত নগরী (১৯৬৭), পাপের সন্তান (১৯৬৯), পুরুষমেধ (১৯৬৯), কুমারজীব (১৯৬৯), বিদ্রোহী কৈবর্ত (১৯৬৯), আলবেরুনী (১৯৬৯), অপরাজেয় (১৯৭০) প্রভৃতি। ইতিহাসের যেসব উপাদান নিয়ে তিনি উপন্যাস রচনা করেছেন, তার কালসীমা খ্রিস্টপূর্ব কয়েক শতক থেকে খ্রিস্টীয় উনিশ শতক পর্যন্ত বিস্তৃত।

বৈদিক যুগের ভারতকে পটভূমি করে লেখা পুরুষমেধ উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি লিখেছেন অভিশপ্ত নগরী ও পাপের সন্তান, যাতে পরস্ফুটিত হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে জেরুজালেম নগরীর পতন এবং তার পরবর্তী পুনর্গঠনের জীবনচিত্র। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের বৌদ্ধ পণ্ডিত কুমারজীবের অহিংস জীবনবোধ নিয়ে আখ্যান রচনার পাশাপাশি বাংলায় পালযুগের বৌদ্ধ শাসনামলেই সংঘটিত শূদ্রদের বঞ্চনাবিরোধী জীবনসংগ্রামের ভাষ্য রচনা করেন ‘বিদ্রোহী কৈবর্ত’ উপন্যাসে। খ্রিস্টীয় এগারো শতকের মুসলিম জ্ঞানসাধক আলবেরুনীর সংগ্রামশীল জীবনের আখ্যান রচনার পাশাপাশি তিনি উনিশ শতকে সংঘটিত ভারতবর্ষের উপনিবেশবাদবিরোধী প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবদীপ্ত কাহিনী বয়ান করেন অপরাজেয় উপন্যাসে; সা¤প্রদায়িক মনোভঙ্গির কারণে যে ঘটনাকে সমকালীন লেখকরা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেননি কিংবা সচেতনভাবে করেছেন উপেক্ষা।

কিন্তু সত্যেন সেন সম্প্রদায়গত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে তিনি এক বিশ্বনাগরিক। তাঁর ইতিহাস পরিভ্রমণের অর্থ ইতিহাসের অব্যাহত বিনির্মাণ, নতুন নতুন পাঠসৃজন। তাঁর কাছে ইতিহাস শোষক ও রাজন্যবর্গের কীর্তিগাথা নয় বরং শোষিত-নিপীড়িতজনের সংগ্রামী জীবনভাষ্য। ইতিহাস ব্যাখ্যায় বা জ্ঞানকাণ্ড সৃষ্টিতে তিনি লক্ষ করেন, সর্বদাই শোষককুল আপন স্বার্থতাড়িত ও আধিপত্য বিস্তারে দ্বিধাহীন। ফলে প্রচলিত ইতিহাসের ধারা থেকে তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন এবং চেষ্টা করেন প্রকৃত ইতিহাস নির্মাতাদের খুঁজে বের করার। এ কারণেই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ কুমারজীব, আলবেরুণীর শোষক-স্বার্থবিরোধী জ্ঞানসাধনা, মধ্যযুগে কৈবর্ত্যদের কিংবা আধুনিক যুগে সিপাহিদের ক্ষমতাকেন্দ্র দখলের সংগ্রামী অভিযান। তিনি মনে করেন, পরিশ্রমজীবীরাই সভ্যতার নির্মাতা, প্রথাগত ইতিহাস যে সত্যকে অস্বীকার করছে। তিনি ইতিহাস-অনুসন্ধানে যথার্থভাবেই লক্ষ করেন যে, ধর্মতন্ত্রের শক্তি ও শোষকশক্তি সর্বদাই জোটবদ্ধ এবং তাদের প্রতিপত্তির কাছে নিম্নবর্গীয়রা চিরদিন অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণে বাধ্য। তবু তিনি জেরুজালেম নগরীর দাস সমাজের বঞ্চনার ব্যথাকে তুলে ধরে তাদের মুক্তির কথা ভাবেন। তিনি তাঁর লেখনীকে দাঁড় করান দাসতন্ত্র, ধর্মতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র, পুঁজিতন্ত্র, উপনিবেশতন্ত্র- এ সবকিছুর বিরুদ্ধে এবং সব কালের দলিত জনদের মুক্তির আকাক্সক্ষা নিয়ে তিনি এক নতুন জীবনভাষ্য রচনা করেন। এখানেই তাঁর ইতিহাস-অন্বেষার স্বাতন্ত্র্য। এখানেই তাঁর ঔপন্যাসিক সত্তা আধুনিকতায় মণ্ডিত হয়ে পড়ে। এখানেই তাঁর রাজনৈতিক বোধটি স্বচ্ছতা অর্জন করে। গত শতকের ত্রিশের দশকে মানবমুক্তির পথ হিসেবে তিনি মার্কসীয় ভাবাদর্শকেই সর্বোত্তম বলে বিবেচনা করেন এবং দেশ ও সমাজের শোষণমুক্তিকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য করে তোলেন। তাঁর পরবর্তী জীবন সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত হয় শোষিত-বঞ্চিত-অবহেলিত ও দলিত মানুষের মুক্তি কামনায়।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর মার্কসবাদী রাজনীতিকদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন তীব্রতর হলে সত্যেন সেনকে পরবর্তী ২৪ বছরের অধিকাংশ সময়ই কাটাতে হয় জেলের ভেতর। অতঃপর উপনিবেশবাদসৃষ্ট এ কারাগারকেই তিনি পরিণত করেন উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রামের মূল হাতিয়ারে। কারাগারের অখণ্ড অবসরে নিরবচ্ছিন্ন অধ্যয়নের পাশাপাশি মননশীলতা ও সৃষ্টিশীলতার চর্চার মাধ্যমে তিনি ওই পরাধীনতার নরককেই রূপান্তরিত করেন স্বর্গের উদ্যানে। রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠকের পরিবর্তে লেখকসত্তার জাগরণে তিনি উদ্ভাসিত হন নতুন পরিচয়ে। তাঁর বিজ্ঞানমূলক ইতিহাস-অন্বেষী রচনার বিষয় অবশ্য সীমাবদ্ধ থাকে ঔপনিবেশিক শাসকদের দ্বারা সরবরাহকৃত কারা-লাইব্রেরির গ্রন্থতালিকার ওপর। অন্যদিকে তাঁর উপন্যাসের কাহিনীতে নিজের জীবনাভিজ্ঞতার পাশাপাশি অন্বিষ্ট হয় কারাবন্দি মানুষগুলোর বৈচিত্র্যময় জীবনাখ্যান। শুধু রাজবন্দি নয়, চোর-ডাকাত-খুনি-পকেটমার-ধর্ষক কারো জীবনই সেই অন্বেষণে গুরুত্বহীন বিবেচিত হয় না। তার ‘সেয়ানা’ উপন্যাস এর বাস্তব সাক্ষী। এ উপন্যাসে বিন্যস্ত হয়েছে একজন পকেটমারের জীবনকাহিনী। এমন একটি নিম্নবর্গীয় চরিত্রকে নিয়ে গোটা উপন্যাস পরিকল্পনার মধ্যে লেখকের সাহসের পরিচয় আছে। এ উপন্যাসেও লেখক তাঁর মানবীয় যন্ত্রণার বিচিত্রমাত্রিক রূপই চিত্রিত করেছেন। উচ্চকিত করে তুলেছেন তাঁর মনুষ্যত্ববোধের নানা প্রান্তকে। দেশভাগের মতো রাজনৈতিক ঘটনা তার গোপন ব্যবসা-বৃত্তির পরিসরকে সংকীর্ণ করে তার জীবিকাকে কীভাবে সংকটগ্রস্ত করেছে তারও মর্মান্তিক আখ্যান হয়ে উঠেছে এই উপন্যাস। ব্যক্তির ক্ষুদ্র জীবন পরিসরে তিনি সন্ধান করেছেন বৃহত্তর রাজনৈতিক ঘটনার তাৎপর্যকে। তার মা উপন্যাস হয়ে উঠেছে এ দেশে বামপন্থি ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্যকার দ্ব›েদ্বর এক ঐতিহাসিক দলিল। এ দেশের সশস্ত্র স্বদেশিদের মধ্য থেকেই এক সময় মার্কসবাদে দীক্ষিত বামপন্থি কর্মীরা সৃষ্টি হয়। রূপান্তরের এ ঘটনা সাধারণত ঘটে জেলের ভেতর মার্কসবাদী বইপত্র পাঠের মাধ্যমে। মার্কসবাদীরা উপলব্ধি করে যে স্বদেশিদের সহিংস সশস্ত্রতার মধ্য দিয়ে শ্রমজীবীদের মুক্তি সম্ভব নয়। কেননা সশস্ত্র স্বদেশীরা প্রকাশ্যে জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসের পতাকাতলে সমবেত হয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনকে বেগবান করতে চায়। কংগ্রেসের রাজনীতিতে এ দেশের শোষককুল সক্রিয় থাকায় শ্রমিকস্বার্থ রক্ষাকারী বামপন্থিদের সঙ্গে তাদের বিরোধ হয়ে ওঠে অনিবার্য। মা উপন্যাস এই দ্বন্দ-বিরোধের আখ্যান হিসেবে তাৎপর্য অর্জন করেছে।

সত্যেন সেনের উপন্যাস সমগ্রকে তিনটি মোটা দাগে ভাগ করা সম্ভব- সামাজিক, রাজনৈতিক ও ইতিহাস-আশ্রয়ী। তবে স্মরণীয় যে উপরিতলশায়ী এই বিভাজনের অন্তরালে তাঁর সব উপন্যাসেই ফল্গুধারার মতো বহমান থাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা তাঁকে প্রবলভাবে দাঁড় করিয়ে দেয় উপনিবেশবাদের বিপক্ষে। ফলে তাঁর প্রতিটি উপন্যাসই হয়ে ওঠে একেকটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক আখ্যান।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত