কালো                            

                                         

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comচিলটা উড়ে এসে কার্নিশে বসেছে আবার। ভিজে জামা কাপড় শুকোতে দিচ্ছিল তিতাস। নিজের সায়া, ব্লাউজ, দুখানা কালো ব্রেসিয়ার, তমোঘ্নর মায়ের চারটে শাড়ি, দুটো হাউজ কোট। বৃষ্টি একটু ধরেছে। তিন দিনের কাচা আধশুকনো কাপড়চোপড়  থেকে ভ্যাপসা গন্ধ ছাড়ছে। ভালভাবে রোদ খাইয়ে নিতে হবে। ওয়াক তুলতে গিয়েও সামলে নিল। একটুতেই এখন বমি উঠে আসে তিতাসের। ঘৃণাবোধ আগে এতখানি প্রবল ছিল না। আচমকাই তিতাস নাইলনের দড়ির খোঁচা খেল আঙুলের মাথায়। থলথলে লইট্যাগুলো কুটতে গিয়ে অনামিকার মাথাটা বঁটিতে বসে গিয়েছে। কাটা জায়গাটা ফাঁক হয়ে আবার রক্ত বেরুচ্ছে। না, কোনও যন্ত্রণা ফুটে ওঠেনি ওর মুখে। মনে মনে হিসেব করছে তিতাস। দড়িটা বদলাতে হবে। একদিকের বাঁশও বদলে ফেলতে পারলে ভাল। সবই কেমন পুরনো হয়ে আসছে। কালো কালো! চিলের সঙ্গে হঠাৎই চোখাচোখি তিতাসের! মুহূর্তের জন্য আগুনের মত কিছু একটা দপ করে জ্বলে উঠেও মিলিয়ে গেল দুজনের চোখের ভেতর। পুজো করা মনসা গাছের পাশে কীসের যেন হাড় এনে ছড়িয়েছে পাখিটা। হাড় বজ্জাত! দাঁতে দাঁত ঘষল তিতাস। প্যারাপিটে ঠোঁট রেখেছে চিল।

“তোর জন্য কোনটা নেব তিতি? আমি কিন্তু সবুজটাই বেছেছি। নীল রংটা আবার ফর্সাদের মানায় ভাল।”

হোয়াটসঅ্যাপে দুটো সিল্ক ঢাকাইয়ের ছবি পাঠাল ননদ। এইমাত্র। গভীর করে ছুরির দাগ বসানো পমফ্রেটে আদা, রসুন, জিরে, হলুদের পেস্ট মাখাতে মাখাতে তিতাস নিজের হাতদুটো ভাল করে দেখছিল। না, ঠিক কালো তো বলা চলে না। মাজা মাজা রং। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা বলে যাকে। বড় ননদ তবুও কথায় কথায় খোঁটা মারে। রোগা, কালো, কপালটাও নাকি বেশ উঁচু! তিতাস পাত্তা দেয় না। সুন্দরী আর ফর্সা তো রিমিতাও ছিল। কী হল? বিয়ের সাড়ে ছ’মাসের মাথায় বাড়িসুদ্ধ সকলের জন্য বিরিয়ানি রাঁধতে গিয়ে হঠাৎ কাপড়ে আগুন ধরে যায়। সেভেনটি পার্সেণ্ট পুড়ে গিয়েছিল রিমিতা। মারা যাওয়ার আগে নাকি একবার আয়না দেখতে চেয়েছিল মেয়েটা। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই অলোকেশ আবার একটা বিয়ে করে নিয়েছে। গতবছর শীতে ওদের ইকো পার্কে দেখেছিল তিতাস। খুব হাসছিল আলকেশের নতুন বউ। বাদাম খেতে খেতে বারবার লুটিয়ে পড়ছিল বরের গায়ে। তিতাসকে চিনতে পেরেও কথা বলেনি অলোকেশ। অবশ্য বললেই ও অবাক হত বেশি।

বছর খানেক আগেও শনিবার শনিবার বাইরে খাওয়াতে নিয়ে যেত তমোঘ্ন। পিটার ক্যাট, আমিনিয়া কোনও কোনওদিন দাদা-বউদির বিরিয়ানি। তারপর ভবঘুরের মত খানিক ঘুরে বেড়িয়ে একে অন্যকে জাগাতে জাগাতে ফিরে আসা। এই ছিল ধরাবাঁধা রুটিন। রবিবারগুলো নিজেদের ভেতরে বুঁদ হয়েই কেটে যেত দিব্য। দুপুরের আশেপাশে সকাল হলে, ক্লান্তিতে একে অন্যকে জোঁকের মত জড়িয়ে জোম্যাটোতে খাবারের অর্ডার দেওয়া হত। চাটনি মাখামাখি দইবড়ার দই তিতাসের গলায় বুকে মাখিয়ে কতবার যে জিভ দিয়ে চেটে নিয়েছে তমোঘ্ন! আজকাল শনিবার করে বাড়িতে মাছ আসছে খুব। কাঁটাওয়ালা, বেশি আঁশের অথবা মৌরলা, পুঁটি, শুঁটকি, চিংড়ি। তিতাসের শাশুড়ি পছন্দ করেন সেইসব মাছ, সময়ের গল্প জড়িয়ে থাকে যাদের সঙ্গে। তমোঘ্ন একদম সময় পায় না। সত্যি নয়, ওটা আসলে অজুহাত। সময় শব্দটাকে ভারি অদ্ভুত লাগে তিতাসের। দুনিয়াসুদ্ধ লোকের যার যা হচ্ছে বা হচ্ছে না কমবেশি সবাই এই সময়কেই বলি কা বখরা সাজিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। কী জ্বালা বলুন তো দেখি? আচ্ছা কার যমজ বাচ্চা হবে আর কার বউ অ্যাকাউন্ট সাফ করে বয়ফ্রেন্ড নিয়ে ব্যাংকক কেটে পড়বে, সেটা কি আর সময় জানে নাকি? তমোঘ্ন হাড়ে হাড়ে ভয় পায় তার মাকে। গত জুলাইতে তিতাসের শাশুড়ি পাকাপাকিভাবে রাজারহাটের ফ্ল্যাটে চলে এলেন। দেশের বাড়িতে ছেলের জন্য মনটা নাকি বড্ড কাঁদে! তারপর থেকেই তমোঘ্নর বদলটা লক্ষ করছে তিতাস। আজকাল তো বন্ধ দরজার আড়ালে বউকে আদর করতে গিয়েও ঠিকমত মনোযোগ দিতে পারে না। তিতাসের অবশ্য তেমন কোনও অভিযোগ নেই। দুপুরের সময়টুকু দরজায় ছিটকিনি তুলে সে দু’হাতে পর্ণ সাইট ঘাঁটে। দুজনের সঙ্গে ফোনে কথাও হচ্ছে নিয়মিত। না, দুজন নয়, মোট তিনজন রয়েছে ওর। তিন নম্বরটা আনকোরা নতুন, কিন্তু এক্কেবারে তিতাসের মনপসন্দ। তার সঙ্গে একবার ডেটও করেছে। চোখদুটো অবিকল ওই চিলটার মত লালচে আর গভীর। আগুন আগুন! একবার ছুঁয়ে দিলেই গলগল করে গলে যাবে যে কেউ! ও যখন খুব কাছ থেকে দেখে, তিতাসের ভারি বুকের ভেতরটা শুকিয়ে যায়।

দুধে আলতা জবার কলিগুলোতে সাদা সাদা তুলোর মত পোকা। খুব জ্বালাচ্ছে। একটা করে কুঁড়ি ফুলে ফেঁপে বড় হয় আর খসে যায়। কাছে এলেই তিতাস এই গাছটার কান্না শুনতে পায়। অসুখটার নাম জানা নেই  ওর। তবুও মালির কথামত দু চিমটে লাল পাউডার আর দু চিমটে সাদা পাউডার এক বোতল জলে ঝাঁকিয়ে গুলে তিতাস মন ভরে নাইয়ে দেয় গাছটাকে। বিকালের হালকা রোদে ঝলমল করে ওঠে যুবতি জবার পাতা, কাণ্ড, মনও।

“কত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেলি বল তো! এই তো গেল বছর এতটুকু একটা বাচ্চাকে কিনে আনলাম। তোকে কোলে নিয়ে গাড়িতে বসেছিলাম জানিস! আর আজ দেখ, তোর গা ভরতি কুঁড়ি!”

পরম স্নেহে জবার গায়ে হাত বোলায় তিতাস। মেয়েদের শরীরের বাড় লাউডগার মতই। গাছের পাতাগুলোতে তিতাস আলগোছে চুমু খায়। লজ্জা পেতে শিখেছে আবার! থিরথির করে কাঁপে জবা! ফ্ল্যাটবাড়ির কমন ছাদের একটা অংশ তিতাসদের। সেইখানেই প্রাণের সুখে বাগান করেছে ও। খুব চেনা ভঙ্গিতে থুঃ থুঃ করে জবার গায়ে একটু থুতু ছিটিয়ে পিছন ঘুরেই দেখে শাশুড়ি দাঁড়িয়ে। চমকে ওঠে তিতাস।    

“এ গাছটা আর রেখে লাভ নেই গো বৌমা! ফুল ধরে না। কিস্যু না। ওই টবে বরং অন্য কিছু লাগাও। এমন গোলাপি জবা কত পাওয়া যায়!”

তিতাসের বুকের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠে। একটা জীবনকে উপড়ে ফেলবে? খুন করবে? তা কি হয়? কুঁড়ি ঝরে যায় কি মায়ের দোষে? ওটা তো অসুখ। ট্রিটমেন্ট চলছে জবার। ভিটামিন, আয়রন, ফলিক অ্যাসিড, ইউ এস জি, ডায়েট মেনে খাওয়া দাওয়া। হ্যাঁ, তিতাসেরও চিকিৎসা চলছে বটে! এই নিয়ে তিন তিনটেবার তিনমাস পেরোতে না পেরোতেই রক্ত হয়ে বয়ে গিয়েছে ওরা। তিতাসের কিন্তু কোনও ভুল ছিল না। তমোঘ্নও দোষ দেয়নি। বাথরুমে গিয়ে তাজা রক্ত দেখে ওইখানেই মাথা ঘুরে গিয়েছিল শেষবার।

“তুমি তো কোনও ভুল করনি। কাঁদছ কেনও তিতাস? নিজেকে সামলাও লক্ষ্মীটি!”

কেবল শাশুড়ির চোখে মুখে মাংসলোভী একটা বিড়ালকে দেখতে পায় তিতাস। এক একদিন ঘুমের মধ্যে মনে হয় বুকে চেপে বসে গলায় কামড় লাগিয়েছে বিড়ালটা। তিতাসকেও কি কোনওদিন উপড়ে ফেলবেন শাশুড়ি? এমন শ্যামলা মেয়েও তো কত আছে দুনিয়ায়! তাই না?

“একজোড়া ব্ল্যাক মুর দেবেন। ও…ওই যে, যে দুটো লুকোচুরি খেলছে ওদের তুলুন। হ্যাঁ হ্যাঁ।”

খুব সাবধানে জলের ভেতর ছোট্ট নেটটা ডুবিয়ে মাছ দুটো তুলে নিল লোকটা। লম্বা পলিথিনের মুখে রাবার ব্যান্ড জড়াতে জড়াতে তিতাসের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল,

“সঙ্গে দুটো রেডক্যাপ দিয়ে দিই ম্যাডাম? দেখতে ভাল লাগবে।”

“না। না। শুধু কালোই রাখি আমি।”

টেবিলের নিচে ঝুঁকে পড়ে ছোট্ট লাল সুইচ টিপে দিতেই ঘুমন্ত জগৎটা ধীরে ধীরে জেগে উঠল। নীল জলে কালো কালো মাছ। খেলছে, ঘুরছে। খুনসুটি করছে। আজ আরও দুজন নতুন বন্ধু এসেছে ওদের। অ্যাকোয়ারিয়ামের ঢাকনা খুলে তিতাস খুব ধীরে ধীরে পলিথিনের প্যাকেটটা জলের মধ্যে উপুড় করে দিল। লাল নীল হলুদ সবুজ কিছু দানা জলে ভাসিয়ে কাঠের চেয়ার টেনে নিয়ে এইবার ও গালে হাত দিয়ে বসবে।

“মাটির সরার ওপর একটা গোটা পান পাতা রাখবি। তার ওপর সিঁদুর আর  সরিষার তেল দিয়ে “ল” লিখে, আগুনে লাল করে পোড়ানো কালো মাছটাকে শুইয়ে দিবি। মাছের গায়ে দিবি তেল সিঁদুরের তিনটে ফোঁটা। বার বেলায় তিন মাথার মোড়ে রেখে আসতে হবে সরাটা। কিন্তু সাবধান! পিছন ফিরে দেখা চলবে না। মনে থাকবে তো?”

“আমাদের সব সমস্যা মিটে যাবে তো বাবা? যা চাই তাই পাব তো?”

“বিশ্বাস আন মনে। সব সমস্যার সমাধান মিলবে।”

তিতাসের খুব ভয় করছিল। শাশুড়ি চোখ বুজে গলায় কাপড় দিয়ে ঝুঁকে পড়েছিলেন মোটা লোকটার পায়ের ওপর। তিতাস খেয়াল করেছিল লোকটার দুপায়েরই কড়ে আঙ্গুল সবচেয়ে লম্বা। অন্ধকার ঘরে লাল মোমবাতির আলোয় কপালে সিঁদুর মাখা লোকটাকে ভয়ানক একটা রাক্ষসের মত দেখতে লাগছিল। শাশুড়ি যতবার তুকতাক করতে চেয়েছেন, বাধা দিয়েছে তিতাস। গালে হাত রেখে বসে কালো কালো মাছেদের খেলা দেখতে বড় ভালবাসে ও। একটা কালো মাছকে জ্যান্ত পুড়িয়ে ফেললেই ও মা হতে পারবে? বিশ্বাস করে না তিতাস।

“তোমার বাড়িতে কে কে আছে?”

তিতাসের রোমহীন ডান পাটায় ঠোঁট ঘষতে ঘষতে ঝাঁকড়া চুল সামলে ওর তিন নম্বর বলল,

“মা, আর দিদি। দিদির ব্লাড ক্যান্সার। আর তোমার?”

“আমার? আমার বাড়িতে… একটা মেনি বিড়াল, একটা শামুক আর অনেক অনেক কালো মাছ।”

ছেলেটা তখন থাই বেয়ে বেশ খানিকটা ওপরে উঠে এসেছে। কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ছে তিতাসের কোমরে। অনেকদিন পর আবার ভেতর থেকে তাগিদ অনুভব করছে ও। আড়চোখে তাকিয়ে দেখে নিয়েছে তিন নম্বর গনগনে লোহার রডের মত হয়ে রয়েছে। শরীর থেকে ধোঁয়ার মত ভাপ বেরুচ্ছে। হঠাৎ একটু থেমে তিন নম্বর হাঁপাতে হাঁপাতে তার ক্লায়েন্টকে জিজ্ঞেস করল,

“বিড়াল আর মাছ একসঙ্গে?”

“সেইটাই তো ভয়!”

ভয় বলতেই হ্যাঁচকা টেনে তিতাসকে বুকে নিয়ে ফেলেছে সে। তারপর চরম আশ্লেষে একে অন্যকে চুমু খেতে খেতে তিন নম্বর ছেলে আর তিতাস নিজেদের মাছ ভাবতে শুরু করে দিল। হোটেলের ঘর ভর্তি নীল জল। পা ডুবে যায়, গা ডুবে যায়, লেজের আগায় ঢেউ থইথই ভাব! একটা ডুবুরি মুখ থেকে বাতাস ছেড়ে বুদবুদ বানাচ্ছে অনবরত। চরম লাস্যময়ী মৎস্যকন্যা শ্বেত পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রয়েছে দুহাতে ভরা যৌবন সামলে। তিতাস আর তিন নম্বর তার চারধারে এক পাক ঘুরে বালি ছিটিয়ে ছুটে গেল ডুবুরির গা ঘেঁষে। কখনও পাথরের দুর্গে, কখনও ঘাসের ওপরে, কখনও জলের নীচে ডুবে থাকা চেয়ার, টেবিল, সোফায় মাখামাখি আদরে, কখনও দংশনে দংশনে, নখের টানে ছিটকে পড়ল একটা দুটো আঁশ! সন্ধ্যায় ফেরার সময় কুড়িয়ে নেওয়ার কথা আর মনে রইল না কারও। তিন নম্বরের সার্ভিস সত্যিই দারুণ। আবার আসবে ওর সঙ্গে। এখন তো আর আপনিও বলছে না। তিতাসের বন্ধু হয়ে গিয়েছে। অর্পিতা যতবার স্পা করানোর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেবে তিতাস ততবার একটু একটু করে জীবন কিনে নেবে।

সেদিন রাতে খেতে বসে হঠাৎই শাশুড়ির ভুরুতে ভাঁজ।

“এ কী গো বৌমা, তোমার নাকছাবিটা গেল কোথায়? ভরা অমাবস্যায় সোনা হারালে? কী অলুক্ষুণে ব্যাপার! মা গো!”

বুকদুটোর ভয়ার্ত ওঠানামা টের পেল তিতাস। কোথায় খুঁজবে হিরের নাকফুল? নীল জলের ভেতর সোনার গুঁড়োর মত বালি। সেখানেই হয়ত…।

তমোঘ্ন বিশেষ পাত্তা দিল না মায়ের কথায়। তার মতে ওরকম চার পাঁচ হাজার অনেক যায় এদিক ওদিক। ওই নিয়ে আলোচনার দরকার নেই। অফিসে প্রেসার বেড়েছে। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ঠায় দাঁড়িয়ে কালো মাছগুলোকে বিষ নজরে দেখেছিলেন তিতাসের শাশুড়ি। কালো মাছ অপয়া। ওরা আসতে না আসতেই সোনা গিয়েছে! ওদের রাখলে আরও যে কত কী হবে ছেলের সংসারে? তারপর “মাথা ঝিমঝিম করছে” বলে গজগজ করতে করতে ঘরে ঢুকে দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করে দিলেন।

রাত দুটো নাগাদ খুটখাট শব্দে তিতাসের ঘুম ভেঙে গেল। শাশুড়ি ভয়ে চেঁচাচ্ছেন। কাঁচা ঘুম ভেঙে যেতে তমোঘ্নর মাথায় আগুন।

“সারাদিন বসে বসে সিরিয়াল গিলবে আর তিতাসের খুঁত ধরবে। এখন আবার বলছো চিল এসে ঠুকরে দিয়েছে।”

“হ্যাঁ রে। বিশ্বাস কর। বিশ্বাস কর।”

“শোন মা, আমার মনে হয়, দেশের বাড়িতেই তুমি ভাল ছিলে।”

অদ্ভুত একটা নীরবতা ছড়িয়ে পড়ে তমোঘ্নদের ফ্ল্যাটে।

ঠুক…ঠুক…ঠুক…ছাদের দিক থেকেই আসছে শব্দটা। টপ ফ্লোরে থাকলে এই এক সমস্যা! কেউ ছাদে গেলেই ঘুমের বারোটা বাজে। দুষ্টু বাচ্চাকাচ্চা এসে অনেক সময় গাছের ডালপালা ছেঁড়ে। শাশুড়ি ছিলেন যখন তিতাস মন দিয়ে বাগানের দেখভাল করতে পারত না। সারাক্ষণ কোনও না কোনও কাজ দিয়ে রাখতেন। গত মঙ্গলবার তাঁকে দিয়ে এসেছে তমোঘ্ন। কেউ ছাদে গেলেই তিতাস দেখতে যায় এখন। আবার আগের মত।

বিরাট ছাদের কোণে আজও চিলটা বসে রয়েছে। তিতাসের মায়া হল। এক পা এক পা করে সেদিকে এগিয়ে ও দেখল চিলের চোখ দুটো চকচক করছে আনন্দে। তিন নম্বর বুকে চেপে ধরলেও তো তিতাস ঠিক এইরকম আলোই দেখতে পায় তার চোখে। ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক করে পালকে মুখ মুছে নিল চিল। তার ঠোঁটে, পায়ে, বুকের কাছে শুকনো রক্ত লেগে রয়েছে।

“এতদিন আসিসনি কেনও?”

চিলের মাথা নিচু। তিতাস হাত মেলে দিতেই কাঁচা মাংসের গন্ধ নিল চিল। ওর বাহু আঁকড়ে বসে কানের লতিতে, গলা ছুঁয়ে বুকের ভাজে মাথা ঘষতে শুরু করল। ফিসফিস করে তিতাস বলল,

“একটু তাড়াতাড়ি। আজ অনেকদিন পর বাইরে ডিনার করতে যাব আমরা।”

তিতাস টের পেল ওর ঠিক পিছনেই উল্লাসে দুলে উঠছে জবা।

 

 

 

 

 

 

  

   

   

   

  

     

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত