সৌম্য দে-র পাঁচটি কবিতা

 

সবাই ছুটছে

যে যার যার মতো ছুটছে
আমাকে বলছে অপেক্ষা করো।
তখন এপাড়ায় দাহ্য চলছে
অথচ শীত ঘুরতে গেছে সাইবেরিয়া
বার্তা পাঠিয়েছে ঘুরে এসে শীতলতা দেবে। 
এই তকতকে দুপুরে ফুলেদের কোলাহল চাইছি খুব
শিউলি সুঘ্রাণ।
সেও রেখেগেছে ভোরের প্রতীক্ষা। 
একদল শ্বেতশুভ্র ময়ূর
নীলাভ ময়ূরীর পালকে নৃত্যের শিহরণ রেখে যায়
এখানেও প্রতীক্ষায় রেখেছে আষাঢ়।
ঘুম চোখের ঈশ্বর
শিশুদের ক্ষুধা দেখতে পাননি
নইলে রাজমহল থেকে ছুটে আসতেন পাইক বরন্দাজ
আর খবর নিতেন কে কে তোমরা অভুক্ত আছো !
ঈশ্বর প্রতীক্ষায় রেখেছেন মৃত্যুর।
খালি পেট, ছেঁড়া চটি, উষ্কখুষ্ক চুলের একটি লোক
হৈ হৈ অট্টহাসিতে কুকুরের সাথে বসে গেছেন ডাস্টবিনে।
ইষ্টানিষ্ট বড়ো সাহেব গাড়ি থামিয়ে বলেন
“আমরা সবাই রাজা”।
আমি দেখছি আর দেখছি।
বয়সের ভারে ন্যুজ্ব হতে হতে
আমার চোখে ঘুণ ধরেছে
মৃত্যু বলেছে অপেক্ষা করো
আমি সময়ের প্রতীক্ষায় আছি।

 

ঘর

দৃশ্যপট আঁকতে গেছে তুলি
রঙ খুঁজছে ভিটে বাড়ি চর
এমন করেও ভাবতে পারো তুমি
যোজন পথে আমার প্রিয় ঘর।

ছেলে বেলায় অঙ্ক কষার ছলে
আঙুল ধরতো তোমার দুটি হাত
পাঠশালাতে প্রিয় পাঠ্য তুমি
আকাঙ্ক্ষাতে অমরাবতী রাত।

জানলা পাতে মুখের উপর রোদ
অন্তরালে আনমনা সেই স্মৃতি
এক গুচ্ছ আকাশ দেখি ভোরে
তোমায় খোঁজে তোমারি আকৃতি। 

 

ফিরে যাও জুঁইফুল

তোমাকে আমায় ভুলতেই হবে প্রিয়তমা
আমাকেও তোমার।
আমার দিকে তাকিয়ে আছে রক্তচক্ষু ক্ষিদে, ভেড়িবাঁধের মতো দায়িত্ব, বিপদগ্রস্ত প্রলোভন।
আমাকে দেখে দুটি জোড়া শালিক হেসেছিলো উপেক্ষায়।
কয়েকটি বুনো ষাঁড় তেড়ে এসেছিলো।
বৃষ্টিহীন চন্দ্রমল্লিকা ক্রোধে ক্ষোভে আত্মহত্যা করেছিলো টবের ভিতর। 
আমার কাঁধে লবনাক্ত ঝড়
উঠোনে সমস্ত ঝরাপাতাদের শোরগোল।
বন্য কিছু শুকর গিলে খেয়েছে আমার সমস্ত ঋতু।
আমাকে ভুলে যাও।
ক্ষমার কাছাকাছি গিয়ে একটি যুদ্ধ যেমন প্রকটে ফিরে আসে… তেমনি বিব্রত কিছু আপোষ ফিরে গেছে ব্যারাকে।
আবার যুদ্ধ, তুমুল রক্তপাত হবে এবার
হয় মুদ্রাস্ফীতি কমে গিয়ে শিল্পন্নোতি
নতুবা চিরতরে নিষিদ্ধ করে যাবো প্রেম।
তোমার হাতে চুড়ি প্রিয়তমা, কপালে গোধূলি আলোর মতো টিপ, তোমার চোখে একটি বাসর রঙের স্বপ্ন ভর করে আছে।
আমাকে ভুলে যাও। 
দেখো তোমার হৃৎপিণ্ডে একটি গন্ধহীন নাকফুল ফুটে আছে।
যার সুবাসে হুমনা হুমনা পালকির গন্ধ।
তিমিরে আমার গ্রাম ভেসে যায়,উপকূলে নিরাশ্রয় ময়ূর।
আমাকে ভুলে যাও

 

 

পরিভ্রমণ

পথ হাঁটছে,
তার বুকে পরিক্রমা এঁটে দিয়েছে
পোয়াতি দুঃখ…
সার্বজনীন সুখের সামনে
ভাসান দর্পণ।
হাসতে হাসতে কে যেন বলে গেছে ” বিদায় “
আগুনের আঁচ লেগে যে কলসটি
ভেঙে গেছে
তার নাম শূণ্যতা।
কাশ বাগান ফেলে
এক ঝাঁক শরৎ উড়ে যায় অবিরাম।
বিদায়ের বর্ণমালায় মুখ মুছে
ঘুমিয়ে পড়ে আগমনী।
অনাথ শিশুর হাসির মতো
মলিন একটি প্রদীপ জ্বলছে
নিভুনিভু ভয়ে।
ভরা মাঠে হঠাৎ শূন্যতা
লম্বা একটি বাঁশির ফুঁ বলে গেছে
খেলা শেষ।

 

জীবন যেভাবে দেখি

এই দেখো কনিষ্ঠ আঙুলে করে
জীবন নিয়ে এসেছি।
কুমোরটুলিতে বেড়ে ওঠা জীবন
চোখ আছে, অথচ দৃষ্টিহীন।
ভীতু একটি পা’ও আছে।
মসৃণ হাতে ঘষা শুকনো পাতার মতো
মচমচে জীবন।
রাতের চেয়েও অন্ধকারে
হাস্নাহেনার সুগন্ধী নিয়ে শুয়ে থাকা জীবন।
ভাঙা পিরিচে টুকরো বিস্কুটের মতো
আহ্লাদ,
পাহাড়ে ঠেস দিয়ে আকাশ দেখার প্রত্যয়
আর,
মাঠের সবুজ দেখে হাসতে থাকা জীবন নিয়ে এসেছি।
ঘ্রাণ নিগড়ে জলের উপর
বেড়ে উঠেছে পদ্মফুল
তার উপরে ভ্রমর
সেই ভ্রমরের আল খাওয়া জীবন।
নিঃশ্বাসের মতো একা, একটি দাগহীন ঠোঁটে
তুমি স্পন্দন লেপ্টে দাও।
বিষ খেতে খেতে নীল মৃত্যু থেকে
বাঁচিয়ে তোলো হৃদয়।
চক্ষু ছোঁও, কপালে স্নেহ বোলাও,
বুকে রাখো আবার সেই মসৃণ হাত।
ঠিক দেখতে পাবে বেঁচে থাকাটা কতো যৌক্তিক হয়ে উঠতে পারে।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত