| 15 এপ্রিল 2024
Categories
এই দিনে কবিতা সাহিত্য

ইরাবতী এইদিনে : সেবন্তী ঘোষের একগুচ্ছ কবিতা

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট
আজ ১৯ মার্চ কবি সেবন্তী ঘোষের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার কবিকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

শামুকেরা

কতো চক্কর দিয়েছি, কতো ছটফট!

ফুলদানির ভিতর জল ছিল তাজা, চোখটি সরস

নরম জামার ঙিতর ঘামে ভেজা স্তন

সমভাবনায় ঢেকে যেত রাতভোর।

খাট ভঙ্গুর এখন, বিবর্ণ বিছানা চাদর-

ভ্যাপসা দুপুর অলস বেড়ালের মতো,

শুধু নিজের ভিতর গুটিসুটি মেরে আনে।

একেকটা দিন শামুকের জলছাপ যেন,

মন্থর, দাগ না রেখে হেঁটে চলে আনমনে।

 

 

 

 

বরফ বিষয়ে

 

বরফের ভিতর একটা অতীত ভরা আছে

সে টাটকা ও জীবন্ত ভাবে সংরক্ষণ করে

কটা জিভ, কৃমির ক্ষুদ্রান্ত্র, প্রেমিকার পাঁজর

সে পোষ্য বা মা বোনের মৃতদেহ দীর্ঘদিন

স্মৃতি ও শরীরসহ সামান্য কুঁচকে রেখে দেয়,

পরিচ্ছন্ন ও স্পষ্টতার সঙ্গে সে ঐতিহাসিক বীর্য

সংরক্ষণ করে তুলে দেয় হিংসার উত্তরাধিকার

বরফ সাধারণত পাথরের মতো ভাবলেশহীন,

হর্ষ বিষাদ মিলনের আকাঙ্ক্ষায় কাতরও কখনো,

বরফ মানুষের মতো কখনো রোমাঞ্চকর-

ভাপ বেয়ে উঠলে সাড়া দেয় উরু বেয়ে তরলতায়-

এই স্খলন বাসী রক্তকে তাজা করে বাষ্প হয়ে

উড়ে যায় শ্রমণের মতো পিছুটান ধুয়ে মুছে।

বরফের কোনো ভবিষ্য নেই যতটা অতীত থাকে!

 

 

 

 

রাজপথ

কনকনে ঠান্ডায় তুমি যখন
দুটি কম্বলে না কুলিয়ে,
রুম হিটারে সেঁকে নিচ্ছ আরাম,
হোস পাইপের তীব্র ঘৃণার জলে,
রাজপথে তোমার গমের দানা,
জোয়ার বাজরা, তিল, তিসি ধুয়ে মুছে সাফ!
ভোরের কাগজে, ফোনের খবর স্ক্রোল করে,
তুমি অস্বস্তিতে চা খাচ্ছ আরেক কাপ।
ততক্ষণে দীর্ঘ, দীর্ঘ ভারত বেড় দেওয়া
কিলোমিটার জুড়ে মিছিল বাড়ছে,
তোমাকে বাদ দিয়েই,
তোমার মাপা জলের পরোয়া না করেই!
নামহীন কতগুলি হাত, কড়া পরা শক্ত বড়োই,
চড়া সুর, ট্রাক্টর, ওড়না ওড়া সর্ষেখেতের,
বলিউডি ছবি এফোঁড়-ওফোঁড় করে,
ঘিরে ফেলছে শহর, নিড়ানির রঙে।

 

 

 

দেবী

পেঁয়াজ আলু হিমঘর ঠেলে
রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছে দেবী।
কখনও তার মুঠোয় বরাভয়, সন্তানের।
কখনও ক্রোধ, ঘৃণা, প্রতি জলকামানের।
দেবী পুরুষ না নারী তার কে বা জানে!
মাটির গন্ধ বুঝে নিতে তার ওড়ানো কুন্তল
কোনও স্পর্ধাকেই আমল দেয়নি কখনও।
প্রতিটি শস্যদানায় নিষেধের কামান গর্জালে,
দেবী বুক চিতিয়ে রুখে দাঁড়াবেই
এ ঘোর অমানিশা কালে।

 


আরো পড়ুন: সেবন্তী ঘোষের গুচ্ছকবিতা

 

অন্নপূর্ণা

বৃষ্টির ফোঁটার নিচে শুয়ে থাকার মজা এ নয়।
আমাদের ফুল্লকুসুমিত “চাষি ভাই আয়”,
এ গান আজ নয়!
প্রতিটি রুটির ফুটে ওঠা ভাপে ঘাম লেগেছে আবার।
প্রতিটি ধানের ছড়ায় চুম্বন রক্তিম, প্রণয় আমার।

 

 

আমি

না জমি গচ্ছিত নেই।
দুধেলা গাই আছে শিঙে তেল মাখানো।
বিস্তর ফেনা ওঠা গরম গ্লাসে চুমুক দিয়ে
চারপাইয়ে বসে হিসেব দেখি।
গত ফাল্গুনের তিসির দামে
এবারে কড়াই বুনেছি বিঘে খানেক।
দুবেলা দুমুঠো খাওয়া মাত্র নয়,
আমার ধান আমি নিজেই মজুত করব।
আমার বাজরা মুজরো করবে না অন্যের উঠোনে।

 

 

মাটি

মাটির ঘ্রাণ বিষয়ে তোমার ধারণা বৃষ্টিপাত।
গাড়ির খোলা জানলা অথবা,
ভ্রমণ হেতু আবেগকম্পন।
মাটির গোলায় কর্দমাক্ত পাগুলি
তোমার দেখতে ভারী বয়েই গেছে!
খড়ের গাদায় উষ্ণ চুম্বনের স্মৃতি সেলুলয়েডের,
যেখানে খলনায়ক রিরংসায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে
যত সারল্যে মোড়া কুল কামিনীর!
বৃষ্টি ছাড়া এ দেশে এখনও পাত্র ভরে না শস্যের!
পোয়াল গাদা মাত্র শয্যা বহু মানুষের,
রক্ষক এখন যে ভক্ষক—
সূর্য উঠার মত সত্য মনে করে,
টিপছাপ দিয়ে যাও তার নাকচ দলিলে।

 

 

পথ

ওই পথ তোমাকে ডাক দিয়েছে।
তুমি শ্যাম কুল দুই রেখে,
ঘূর্ণায়মান মাটির হৃদস্পন্দন শুনবে বলে,
আলের কিনারে এসে দাঁড়ালে।
আল হাসতে হাসতে ঠেলে ফেলে দিল
কাদা চটকানো খেতে,
কখনও বা না কাটা দাড়ির মতো
ধানের গোড়ায়।
তুমি তালকানা!
গাছ পোড়ানো ধোঁয়ায় আরও দিকভ্রান্ত!
কাকে নোটিশ ধরাবে?
যে উপায়ান্তরহীন,
নাড়ার বিলি বন্দোবস্তে?
না, একটা সুলভ ব্যবস্থা চাষির হাতে না দিয়ে
মেশিনগান চালিয়ে দেয় হাসতে হাসতে?

 

 

 

সরল কবিতা

 


শিখে নিতে হবে।
ওই রৌদ্র জলে,
শিখে নিতে হবে
প্রাচীর ভাঙা পথে
শিখে নিতে হবে
ইঁদুর বেড়াল ভাম
শিখে নিতে হবে
হিংস্রের পাশে ঘুম
শিখে নিতে হবে
মানুষেরা মরে গেলে
শিখে নিতে হবে
শান্ত জানোয়াররা
শান্তিতে বেঁচে থাকে
এই শিখে নিতে হবে!

 


সরলের জয় নেই!
ভাঙা হাত, ওপড়ানো আঁখি
বুদ্ধের পাথুরে শরীর ঘিরে
উঁই বাসা বেঁধে যায়
কেউ কথা বলে
কেউ কথা বলেও ছুরি!
খর সূর্যের মতো চমকায়
পথে নয়, ঝোপের আড়ালে
থাবা চাটে, জিভে শান দেয়।

 


তোমার আমার
টাটকা বমির ওপর
মাছি বসে, মাছি উড়ে যায়
শাণিত ফলার মতো
শব্দ বাক্য রোষ
সংক্রামক ভাষা বিশারদ
উড়ে বসে, নষ্ট করে
আমাদের যত শান্ত ক্রোধ!

 


ছুরি কাঁচি কাঁটা-চামচেরা
যা যার প্লেট ও ভদ্রতা ছেড়ে
নেমে এসেছে মাঠে-ময়দানে
লরি ও ম্যাটাডোর ভরা
শান্তি সেনার মতো ফালতু অস্ত্র যারা
এতদিন সহবত শেখালো সম্ভ্রমে
মাটি জল জঙ্গল কাঁপাল হুঙ্কারে
কে না জানে সঙ্গ দোষে পণ্ড হয়
ডাকাতেরও সাধু সেবা নেশা!
কাঁটা-চামচ আর চামচেরা গলির দখলে
নেমে যায়, ছুটে যায় হাস্যকর ঢঙে

 


জামা উড়ছ হ্রস্ব
ই বা উ লিখো না ওরা হ্রস্ব!
পোশাক পোশাক পোশাক—
তুমি ইতোর কেন না তুমি হ্রস্ব!
সময় তুমি হ্রস্ব হয়ে এসেছ ক্রমশ
ইতর হয়ে আসবে জানেন নমস্ব—

 


অপছন্দ আর অ্যাসিড
এই শব্দদুটিকে আমি
পরপর রেখে এসেছি।
‘অ’-এর পর বর্ণপরিচয়ে ‘আ’ হবে
‘অ্যা’ বলে অ্যাসিড শব্দটি
নিজে নিজেই গায়ের জোরে
‘আমি’ ‘আম্রা’-কে ঠেলে
ঢুকে পড়েছে গ্রাম শহর মফস্বলে
‘স’ অনেক পরের বর্ণ যে সম্মতি!
আমি বাধা দিলেই ‘অ্যা’ অ্যাসিড হয়ে
তালগোল পাকানো রক্ত ফুল হয়ে
ঝরে পড়ছে মুখে চোখে গলায়
যতই বর্ণপরিচয় মানো না কেন
ওই হামলার মুখে আমরা
নতুন করে শব্দপরিচয় লিখছি
প্রতিদিন একটু একটু করে মরছি।

 


চন্দ্র সূর্য সাক্ষী
দাসীই থাকতে চেয়েছিলাম
অনুগত, পদপল্লবে চুম্বনরত,
জলের ফুল, লতানে নতমুখী।
চ্যালাকাঠ ভাঙল পিঠে।
তপ্ত খুন্তি ছ্যাঁকা চড় থাপ্পড়।
মেঘমালার মতো চুলে জুঁইমালা নয়
হ্যাঁচকা টানে তালু অবধি খুলে আসা
চাঁদ সুয্যি সাক্ষী
রানিই হলাম আমি
ঘোড়ার পিঠ থেকে সওয়ার ছিটকে
মুছে দিয়ে লজ্জা ঘৃণা জয়
প্রজা ততদিনই রাজার
রাজা যখন যুদ্ধে জিতে যায়
সূর্য আর গাধা সাক্ষী
এমন রাজাকে চুনকালি দিয়ে
উল্টোমুখে ছুঁড়ে
রানিকেই রাজা হতে হয়।

 


গালি আমিও জানি!
কত যেন অক্ষর?
মা-মাসি-মেয়ে-ভাগ্নী
খুকি হাসতে হাসতে দেখে
কাগজের নৌকা জলে ভাসে
কাত হয়ে থেঁতলে মণ্ড
এসবের বিপরীত শব্দেরা
কেবল যে গালির অন্য নাম
এখনও সেখেনি সে
বিটুইন দ্য গালির মাঝে
যে ইঙ্গিত
তাকে ছক্কা হাঁকাতে
এক আবপরিভাষা-কোষ
অভিধান দেওয়া যায়
ব্দলে তাকে ঝুঁকে
আরেকটা নৌকাও
বানিয়ে দেওয়া যায়

 


কোট পরবো
টাই পরবো না খোলা গলা
মোজা থাকবে কি থাকবে না
ওজন বাড়বে কি বাড়বে না
বর্ষবরণে টলবো কি টলবো না
চাকরির পয়সায়
নিজের বাপ মা না অন্যের
একা বাঁচবো না দুজনে
বাচ্চা থাকবে কি থাকবে না
খিস্তি শিখবো কি শিখবো না
লং ড্রাইভে কে পাশে থাকবে
মার খেয়ে দেবো কি দেব না
ঘর মোছার টাকায়
বাচ্চা পড়াবো কি পড়াবো না
ধান বেচবো না চায়ের দোকান
খেতিবাড়ি না একশো দিন
বন্ধু নারী না উভকামী
এসব না হয় আমার থাক
তুমি বরং দেখো
আমি এগোতে চাইলে
কেউ যেন কুচি না টেনে ধরে
ওড়নায় ফাঁস না দেয়
মাঝরাতে দরমার বেড়া না ভাঙে
কালোপর্দার আড়ালে
ঢেকে না দেয়।
এর বেশি আমার
চাইবারই বাঁ কী আছে!
তোমার দেওয়ারই বাঁ কী আছে!

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত