সেই সব মানুষ (পর্ব-৩)

    জ্যৈষ্ঠের  ঝড় এলো কলকাতায়  

১৯২০ সালের জানুয়ারি মাসের শেষদিক। শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কলকাতার আস্তানায় হাজির হলেন সৈনিকের পোশাকপরা একটি মানুষ। আসবার কথা ছিল। চিঠি দিয়ে জানিয়ে রেখেছিলেন। মনে মনে প্রস্তুত ছিলেন শৈলজা। নজরুলের হেঁড়েগলার ডাক শুনে বেরিয়ে এলেন তিনি। জড়িয়ে ধরলেন সৈনিক বন্ধুকে। হেসে-খেলে কেটে গেল সারাদিন। বিকেলে নজরুল বললেন, চলো যাই এবার।

শৈলজা বললেন, কোথায়?

-কেন, কলেজ স্ট্রিট! ভুলে গেলে এরমধ্যে ! ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে।

মনে পড়ল শৈলজার, ও হ্যাঁ। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে। যেখানে আছে তোমার না-দেখা বন্ধ।

-দেখা হয়নি, আলাপ হয়নি, একথা ঠিক। কিন্তু প্রাণের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে প্রাণ। না দেখেও আমি মুজফফর আহমদকে দেখে নিয়েছি।

নজরুল এলেন ৩২নং কলেজ স্ট্রিটে। এটা ছিল শীলেদের দুই-তিন মহলওয়ালা বাড়ির দোতলার সামনের দিককার অংশ। রাস্তা থেকে উপরে উঠে আসার সিঁড়ি আছে। সামনের দিকের দুখানা ঘরের একটা মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিস, আর একখানা ঘর ‘মোসলেম পাবলিশিং’এর আফজালুল হক সাহেবের।

দেখা হল দুই না-দেখা বন্ধুর। মুজফফর দেখলেন নজরুলকে : সুগঠিত দেহ, বাবরি চুলের বাহার, প্রাণখোলা হাসি, বড় বড় ভাসা ভাসা চোখ। নজরুল দেখলেন মুজফফরকে : শীর্ণকায়, মর্মভেদী দৃষ্টি, অপ্রগলভ আর স্থিতধী।

সাহিত্য সমিতির অফিসটি খুব পচ্ছন্দ নজরুলের। বলেই ফেললেন সে কথা, পল্টন যদি ভেঙে যায়, চলে আসব তাহলে, উঠব এখানেই।

মৃদু হাসেন মুজফফর, তাই নাকি!

-হাসবেন না। সত্যি বলছি। এরকম ছোট একটা আস্তানা হলেই চলে যাবে মুসাফিরের।

– এসে তো পড়ুন আগে। যাহোক ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে।

‘এসে তো পড়ুন’ কথাটা কানে বাজতে লাগল নজরুলের। ছোট্ট সেই কথাটার মধ্যে কোন ফাঁক ছিল না।

সেবার গেলেন বটে, কিন্তু মাস-দুয়েকের মধ্যে এসে পড়তে হল নজরুলকে। কলকাতা থেকে করাচি গেলেন, কিন্তু  কিন্তু গিয়ে দেখলেন ভেঙে দেওয়া হয়েছে ৪৯ নং বেঙ্গলি রেজিমেন্ট। হাওড়া স্টেশনে তাঁকে নিতে এসেছিলেন শৈলজানন্দ। বন্ধুর সঙ্গে তাঁর বাদুড়বাগানের মেসে গিয়ে উঠলেন নজরুল। বাদুড়বাগানে বাদুড় না থাকলেও সেই মেসে ছিল বাদুড়ের দল। একে বন্ধু হুল্লোড়বাজ তায় আবার বন্ধু মুসলমান। হিঁদুদের মেসে মুসলমান কেন! মানুষ-বাদুড়ের দল শৈলজাকে বলেন, আপনি মশায় মুখুজ্জে বামুনের ছেলে হয়ে লেড়ের হাতে বোনকে দিতে পারেন তাতে কিছু বলার নাই, কিন্তু আপনি আমাদের জাতি-ধর্ম নষ্ট করার কে?

শৈলজা বললেন, কেন কি করেছি আমি ! নজরুল আমার বন্ধু। সে থাকবে আমার সঙ্গে। ব্যস।

বেধে গেল তর্ক-বিতর্ক। এ রকম অপ্রীতিকর পরিবেশে থাকবেন কি করে নজরুল! বন্ধুকেও ফেলা হবে বিপদে। তাই ৩২নং কলেজ স্ট্রিটে ফিরে এলেন তিনি। শেরওয়ানি, ট্রাউজার্স, কালো উঁচু টুপি, বাইনোকুলার, মাসিক পত্রিকা, কবিতা-গল্প লেখা খাতা, রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি, উর্দু আনুবাদসহ দীওয়ানে হাফিজ আর ‘ব্যথার দানে’র উৎসর্গের কাঁটা নিয়ে নজরুল উঠলেন মুজফফরের ঘরে।

মুজফফরের মুখে মৃদু হাসি, এলেন তাহলে !

-এলাম তো।

-আমি অপেক্ষা করেছিলাম।

হা হা করে হাসেন নজরুল, জানি। তাই না এসে থাকতে পারলাম না।

সন্ধেবেলায় আফজালুলসাহেবের ঘরে বসল গানের আসর। নজরুল গাইলেন : পিয়া বিনা মোর জিয়া না মানে বদরী ছায় রে।

রাতের বেলা খাওয়া-দাওয়ার পরে মুজফফর জানতে চান. বাড়ি যাবেন না? চুরুলিয়া?

-যাব একবার।

চুরুলিয়া গিয়েছিলেন তিনি। ফিরে এলেন কোন এক গভীর অভিমান নিয়ে। কেন অভিমান, কার প্রতি অভিমান খুলে বলেন নি তিনি। জানতে চান নি মুজফফরও। শুধু বুঝতে পেরেছিলেন নজরুলের নরম বুকে কেউ দিয়েছে হাতুড়ির ঘা। আর কোনদিন চুরুলিয়া ফিরে যান নি নজরুল। তবে জননী আর জন্মভূমির উপর যেটুকু অভিমান নিয়ে ফিরে এলেন তিনি, অচিরেই তা কেটে গেল হাসি আর গানের অবিরল বন্যায়।

পল্টনের বন্ধুরা আসতে লাগলেন ৩২নং কলেজ স্ট্রিটে। তাঁদের পায়ের দাপাদাপিতে, চিৎকারে, নাচে, নজরুলের উচ্চকণ্ঠ গানে কাঁপতে লাগল সে বাড়ি, কাঁপতে লাগল কলেজ স্ট্রিট, যেন খুলে গেছে রুদ্ধ প্রাণের উৎস অকস্মাৎ।

করাচি থেকে পাঠানো গল্প-কবিতা প্রকাশ করে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ নজরুলের একটা পরিচয়লিপি তুলে ধরেছিল বাংলা সাহিত্য জগতে, সেই পরিচয়কে সুপ্রতিষ্ঠা দিল ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকা।

শান্তিপুরের কবি মোজাম্মেল হকের পুত্র আফজালুল হক ‘মোসলেম ভারত’ প্রকাশ করেন। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকেই প্রকাশিত হয় নজরুলের পত্রোপন্যাস ‘বাঁধনহারা’। তারপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘কোরবানী’ , ‘বাদল প্রাতের শরাব’, ‘মোহররম’ , ‘শাত-ইল-আরব’, ‘ফতেহা-ই-দোয়াজদহম’, ‘আবির্ভাব’, ‘বিরহবিধুরা’ কবিতা ; হাফিজের গজল, রূপক গল্প ‘বাদল বরিষণে’; ‘মরমী’ ও ‘স্নেহভীতু’ গান।

এই গানগুলি দেখে মোহিনী সেনগুপ্তা বুঝতে পেরেছিলেন সম্ভাবনার কথা। তিনি নজরুলকে গানগুলি নিয়মে বাঁধার পরামর্শ দিয়েছিলেন। নজরুলের কবিতা পড়ে মোহিতলাল মজুমদার ‘মোসলেম ভারতে’ লিখলেন চিঠি : ‘ যাহা আমাকে সর্বাপেক্ষা বিস্মিত ও আশান্বিত করিয়াছে তাহা আপনার পত্রিকার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি-লেখক হাবিলদার নজরুল ইসলামের কবিতা।…. বহুদিন কবিতা পড়িয়া এত আনন্দ পাই নাই, এমন আবরগ অনুভব করি নাই।’

নজরুলের মধ্যে যে কবিত্বশক্তি আছে, সে কথা বুঝেছিলেন মোহিতলাল। একদম ঠিকই বুঝেছিলেন। কিন্তু একটা ভুল করে ফেললেন । তিনি নজরুলের উপর গুরুগিরি করতে গেলেন। নজরুলের উদ্দাম কবিত্ব শক্তিকে তিনি ব্যাকরণের শাসনে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে গেলেন। চাইলেন স্বভাবকবি সিদ্ধকবি হোক। কিন্তু নজরুল যে নদী আপনবেগে পাগলপারা। তিনি যে বিদ্রোহী। কোন বন্ধন মানেন না তিনি।  তাই মোহিতলালের বন্ধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে দেরি হল না নজরুলের।

কলকাতায় আসার মাত্র এক বছরের মধ্যে নজরুল কাঁপিয়ে দিলেন কলকাতাকে। কলকাতার সঙ্গে গোটা বাংলাকে । এ যেন এলাম, দেখলাম, জয় করলাম।

১৯২১ সালের শেষ দিক। মুজফফর আহমদের সঙ্গে নজরুল তখন থাকেন ৩/৪সি তালতলা লেনে। একদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে মুজফফর দেখেন তাঁর আগেই উঠে পড়েছেন নজরুল। কিন্তু কেমন যেন লাগছে তাঁকে। মনের ভেতরে কিসের যেন ঘোর আলোড়ন। উদ্বিগ্ন হন মুজফফর। তাহলে কি কোন কারণে ঘুম হয়নি নজরুলের!

নজরুল বলেন, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল।

-কেন ?

– কি জানি । অস্থির অস্থির লাগছিল।

-শরীর খারাপ হয় নি তো!

এবার হাসেন নজরুল, হাবিলদারের শরীর এত সহজে খারাপ হয় না।

-তবে?

এবার নজরুলের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন মুজফফর। নাঃ, রাত্রি জাগরণের ক্লান্তির চিহ্ন নেই।বরং একটা উদ্দীপনার আভাস আছে।

নজরুল এগিয়ে আসেন বন্ধুর দিকে। তাঁর হাতে একটা কাগজ। তাতে পেন্সিলে কিছু লেখা বলে মনে হচ্ছে। নজরুল বলেন, শুনবে!

-কিছু লিখেছ নাকি !

-হ্যাঁ ।

– কিন্তু পেন্সিলে কেন ?

-কথাগুলো মনের মধ্যে এমন ঠেলা মারছিল যে দোয়াতে বারবার কলম ডোবাবার সময় হত না । সেসব বাদ দাও । শোন কবিতাটা।

চড়া আবেগে পড়তে লাগলেন নজরুল :

বলো বীর

বলো উন্নত মম শির

শির নেহারি  নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির !

নজরুল মাথা দুলিয়ে পড়ে যাচ্ছেন কবিতাটা। বাহ্যজ্ঞানহারা। প্রচণ্ড একটা শক্তির আবেগে কাঁপছেন তিনি। মুজফফর তাকিয়ে আছেন বন্ধুর দিকে।

আমি  চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,

মহা   প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস,

আমি  মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর!

        আমি দুর্বার,

আমি   ভেঙে করি সব চুরমার!………..

কবিতা পড়া শেষ করে নজরুল যেন একটু শান্ত হলেন। বন্ধুকে বললেন, কেমন লাগল?

-ভালো।

শুধু ভালো? এইটুকু মাত্র! বন্ধুর উপর অভিমান হল। তারপরে বন্ধুর স্বভাবের কথা মনে পড়ায় সে অভিমান দূর হবে গেল। একটু বাদেই এলেন  আফজালুল হক সাহেব। তিনি ‘মোসলেম ভারতে’ ছাপবেন বলে কবিতার একটা কপি করতে বললেন।  ‘বিদ্রোহী’ প্রধম ছাপা হল ‘বিজলী’তে । এই একটা কবিতার ধাক্কায় নড়েচড়ে বসল বাঙালি। এ দেশের বামপন্থী আন্দোলনের মূল সুর ধরিয়ে দিল এই একটি কবিতা :

মহা-বিদ্রোহী রণক্লান্ত

আমি সেইদিন হব শান্ত,

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে

                   ধ্বনিবে না,

অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না,

বিদ্রোহী রণক্লান্ত

আমি সেই দিন হব শান্ত।   

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত