Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,bangla sahitya separation-last-part

ধারাবাহিক উপন্যাস: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-৪)

Reading Time: 4 minutes

একটু আগে বাবা তো নিজেই আমাকে নাস্তা বানাতে বললো! অথচ এখন বাবার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সেটা যেন বাবাবেমালুম ভুলেই গেছে!

আরেকটা ব্যাপারও আমার কাছে খুব আজব ঠেকলো। বাবার কলিগ কেন জিজ্ঞেস করছে যে, বাবা তাকে চিনতে পারছে কী না? রোজ তো অফিসেই দেখা হয়! তাহলে এমন প্রশ্ন করতে যাবে কেন?

ঠিক তখনই বিদ্যুৎচমকের মতো মনে হলো, বাবা অন্য কাউকে আশা করছিল না তো! হয়ত সে আসেনি, এসেছে অন্য কেউ!

ছোটবেলা থেকে সংকটময় পরিবেশে থাকতে থাকতেই কী না কে জানে, এসব জিনিস চট করে আমার মাথায় চলে আসে। বাবাকে ভালোমত কিছুক্ষণ লক্ষ করে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হলাম, আগন্তুক বাবার কাঙ্ক্ষিত অতিথি নয়। তবে এই ভদ্রলোকটি সম্ভবত তার পূর্বপরিচিত। নইলে এমন তুই সম্বোধনে কথা বলতো না।

রান্নাঘরের দরজার কাছে দাঁড়ালে ড্রইংরুমের অনেকখানি চোখে পড়ে। আমি আর মা রান্নাঘরের দরজা থেকেই ড্রইংরুমের দিকে তাকিয়ে আছি। আমি অবাক হয়ে বাবাকে দেখছি। বাবার মুখের বিহ্বলতা যেন কাটছেই না!

আগন্তুক ভদ্রলোক কিছুটা আহত গলায় বলে উঠলেন, ‘কীরে মাহফুজ! সত্যিই চিনতে পারলি না? আচ্ছা চিনতে না নারিস না পার। আমাকে ভেতরে আসতে বলবি তো! আমাকে কি চোর ডাকাতের মতো দেখাচ্ছে নাকি বল তো…যে সাহস করে ভেতরেই ঢোকাতেই পারছিস না? উফ! যে হ্যাপা সামলাতে হলো তোর এই বাসা খুঁজে বের করতে! একসময় তো মনেই হলো যে, আর বুঝি পারবো না! পলাশকে কতবার যে ফোন দিয়েছি! তোকে দিইনি সারপ্রাইজ দিব দেখে! কিন্তু তুই তো একেবারে প্রস্তরমূর্তি হয়ে গেছিস!’

বাবা এবারে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে বললো, ‘আরে সোহানুর! তুই না বিদেশে চলে গিয়েছিলি! কবে ফিরেছিস? কিছুই তো জানি না! আয় ভেতরে আয়।’

সোহানুর সাহেব ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো, ‘জানবি কীভাবে! তুই কি আমাদের ফেসবুক গ্রুপে কখনো ঢুঁ মেরেছিস নাকি? কারো সাথেই নাকি যোগাযোগ রাখিস না শুনলাম! কেন রে? হঠাৎ এত বৈরাগ্য কীসের? আগে তো তাও কিছুটা কথাবার্তা বলতি সবার সাথে! আচ্ছা সে যাক…আমার কথা বলি। দেশে এসেছি ম্যালাদিন! ভেবেছিলাম আর ফিরবো না। ওখানেই সেটল করবো। এক বিদেশিনীকে বিয়ে করে…ওহ সেও তো লম্বা গল্প! তোর কী খবর বল! কিন্তু তার আগে বল, তুই এত ভেতরে বাসা নিয়েছিস কেন? পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিস নাকি? হা হা হা…’

ভদ্রলোক একের পর পর নানারকম কথাবার্তা বলে যেতে লাগলেন। আর খুব শব্দ করে হাসতে লাগলেন। বাবা কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তার বন্ধুটি দিব্যি ঘরে ঢুকে সোফায় বসে পড়েছে। ভাবভঙ্গিতে এতটুকুও জড়তা নেই। মনে হচ্ছে এই বাসায় সে বুঝি নিয়মিতই আসা যাওয়া করে। দীর্ঘদিন পরে বন্ধুর সাথে দেখা হচ্ছে, এমন কোনো ভাব তার মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে না।

কথা বলতে বলতে সোহানুর সাহেব এদিক সেদিকে তাকাতে লাগলেন। বার কয়েক কেশে নিয়ে স্পষ্ট গলায় বললেন, ‘তা মাহফুজ…খালুজানের সাথে সম্পর্কটা কি সত্যিই কাট করে ফেলেছিস? খালুজান শুনলাম মারা গেছেন। রফিক সজল এরা কয়েকজন তোদের বাসায় গিয়েছিল। অথচ তুই কী না ছেলে হয়ে…’

বাবা অস্বস্তিতে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়লো। এসব আলাপ এই বাসায় কেউ কখনোই করে না।

দাদাজানের মৃত্যুর দিন বাবা একেবারে ধম মেরে বসেছিল। মা ও তেমন একটা কথা বলছিল না সেদিন। নয়ন আর আমি বুঝতে পেরেছিলাম কিছু একটা হয়েছে। বাবার মুখটা থমথম করছিল। চোখ দুটোতে আশ্চর্যরকম বিষাদ। অচেনা লাগছিল বাবাকে। সেদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে মায়ের কাছ থেকেই শুনেছিলাম, আমাদের দাদাজান মারা গিয়েছেন। মৃত্যুর শেষ সময় পর্যন্ত তিনি নিজের ছোটছেলেকে স্মরণ করেননি তিনি। বংশগৌরব আর আভিজাত্যের মোড়ক থেকে শেষ মুহূর্তেও তাকে বের করা সম্ভব হয়নি।

বাবা গা ঝাড়া দিয়ে বলে উঠলো, ‘ওসব কথা থাক। তুই দেশে এসেছিস কতদিন আগে? কিছুদিন থাকবি নাকি একবারে চলে এসেছিস? বিয়েশাদী কোথায় করেছিস?’

বাবাকে সেই প্রথমবার কোনো এক বন্ধুর সঙ্গে সহজ গলাতে গল্প করতে শুনলাম। তার বন্ধুটি কিন্তু চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাসাবাড়ির অর্ধেকটা প্রায় জরিপ করে নিয়েছে। এক পর্যায়ে আমার আর মায়ের সঙ্গেও তার চোখাচোখি হয়ে গিয়েছে। মাকে দেখেই উচ্ছসিত গলায় বলে উঠলো, ‘আরে ভাবী নাকি? ওখানে কেন দাঁড়িয়ে আছেন? এখানে আসুন…আলাপ করি। মাহফুজ তো নিশ্চয়ই আমার নামই বলেনি আপনাদের কাছে! এজন্যই বলে, চোখের আড়াল হলে মনেরও আড়াল হয়ে যায়! একসময় কত গলায় গলায় খাতির ছিল আমাদের! ভাবী এদিকে আসুন তো। জমিয়ে গল্প করি! আরে এই খুকি…তুমিও এসো। কী নাম তোমার?’

আমাদের দমচাপা বদ্ধ ঘরে সেদিন যেন কীসের এক অন্যরকম বাতাস বয়ে যেতে লাগলো। খারাপ লাগছিল না আমার। হাঁসফাঁস করে ওঠা জীবনে এই বাতাসটুকুর জন্যই এতদিন আকুপাকু করে মরছিলাম। আমি হাসিমুখে সালাম দিলাম।

কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, মা কেমন একটু যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেল। নিজের পরনের শাড়িটার দিকে তাকিয়ে ছোট করে একটা নিঃশ্বাস ফেললো। ড্রইংরুমের দিকে পা বাড়িয়েও বিব্রতমুখে ভেতরের ঘরে চলে গেল। সম্ভবত শাড়িটা পাল্টানোর জন্যই গেল। যাওয়ার আগে আমার রান্না করা পাস্তার চেহারাটাও একবার পরখ করে নিলো। বিব্রত মুখে বললো, ‘আরেকটু ভালো কোনো নাস্তা বানাতে পারলি না? শুধু শুকনো খটখটে পাস্তা কি মেহমানকে দেওয়া যায়? তাও যদি একটু মাংসের কুচিটুচি মিশিয়ে দিতি! ফ্রিজে দেখ তো, কোল্ডড্রিংক্স আছে নাকি? থাকবে কীভাবে? ভালোমন্দ কিছু কেনে নাকি? তরমুজ কিনেছিলাম সেদিন। ওটা একটু কেটে দে। আচ্ছা থাক…তোকে করতে হবে না। আমি দেখছি।’


আরো পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-৩)

আমি হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মা অসাধারণ ক্ষীপ্রতায় ফ্রিজ থেকে অর্ধেক কাটা তরমুজ বের করে এনে ছোট ছোট কিউব করে কেটে ফেললো। তারপর বাসনকোসন রাখার আলমারিটা বহুদিন পরে খোলা হলো। মায়ের কেনা কিছু ‘এক্সক্লুসিভ’ বাসন সেখানে রাখা আছে। সেগুলো এই বাসায় কখনো বের করার প্রয়োজন পড়ে না। মাকে দেখতাম মাঝে মাঝে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে আবার যথাস্থানে রেখে দিতে।

আজ সেখান থেকে দুটো বড় বাটি আর সুদৃশ্য কিছু চামচ বের করা হলো। দুটো দারুণ ডিজাইনের গ্লাসও বের হলো। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। মা যে এত সুন্দর গুছিয়ে কাজ করতে পারে, সেটা আমার জানাই ছিল না! কী সুন্দর করে বড় বাটিতে তরমুজগুলো রেখে পাশে আরেকটা ছোট বাটিতে কিছু তরমুজ সাজিয়ে দিলো! চটজলদি লেবু আর তরমুজের শরবত বানিয়ে তাতে কিছু বরফকুচি মিশিয়ে দিলো। তারপর চলে গেল ভেতরের ঘরে। যাওয়ার আগে আমাকে বলে গেল, ‘ড্রইংরুমে গিয়ে বস। একটু কথাটথা বলতে শেখ! দিন দিন তো দুনিয়ার খ্যাত হচ্ছিস! এসবও কিছু কিছু শিখতে হয় বুঝলি?’

সেদিন বিকেলবেলা এসে সোহানুর আংকেল রাত প্রায় সোয়া দশটা পর্যন্ত আমাদের বাসায় থাকলেন। মায়ের আতিথেয়তা তাকে উঠতেই দিলো না! আমি আর নয়নও সেদিন বহুদিন পর অন্যরকম একটা পারিবারিক পরিবেশ পেলাম। আংকেল আমাদের চকলেট দিলেন। অনেক গল্পও করলেন পাশে বসিয়ে।

আমার আটপৌরে মা কী এক জাদুমন্ত্রে সেদিন দারুণ সুন্দরী আর আধুনিকা হয়ে উঠলো।

শুধু বাবাই যেন এই পরিবেশটাকে মেনে নিতে পারছিল না। বাবাকে দেখে আমারই কেমন অস্থির লাগছিল! মনে হচ্ছিলো, কেউ বুঝি জোর করে বাবাকে সেখানে বসিয়ে রেখেছে। বেচারা উঠে যেতে চাইছে। কিন্তু পারছে না। মায়ের প্রগলভতাও বাবাকে অশান্তির আগুনে পুড়িয়ে মারছিল, বেশ বুঝতে পারছিলাম।

কিছু সময়ের জন্য আমি একটু উঠেছিলাম। আমাদের ঘরে যাওয়ার সময় মনে হলো, বাবার মোবাইলটা ভাইব্রেট করছে। জরুরি ফোন হতে পারে ভেবে আমি ফোনটা বাবাকে দিয়ে আসতে গেলাম। তখনই দেখলাম মোবাইলে কলারের নামটা ফুটে উঠেছে, ‘জান’। কেমন যেন অদ্ভুত লাগলো। বাবা ‘জান’ নাম দিয়ে কার নাম্বার সেভ করে রেখেছে? আগপাশ চিন্তা না করেই ফোনটা রিসিভ করলাম। কিছু না বলে কানে ধরলাম। ওপাশ থেকে ভেসে এলো,

‘সরি জানু। আজ যেতে পারলাম না। একটু জরুরি কাজে ফেঁসে গেলাম। কাল ঠিক যাবো! হ্যালো…রাগ করেছো? কথা বলছো না কেন? হ্যালো…হ্যালো…’

আমি কেটে দিলাম ফোনটা। বুঝতে বাকি রইলো না, বাবা অতি আগ্রহ নিয়ে আজ এই অতিথির জন্যই অপেক্ষা করছিল!

       

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>