| 1 মার্চ 2024
Categories
উপন্যাস ধারাবাহিক সাহিত্য

ধারাবাহিক উপন্যাস: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-৭)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

মা-বাবার মধ্যে সেদিনের পর থেকে সবকিছু কেমন যেন অস্বাভাবিক রকম স্বাভাবিক হয়ে গেল।

প্রচণ্ড ঝগড়া হলো, একে অন্যের ওপরে অনেক রকম গালিগালাজ বর্ষিত হলো, জিনিসপত্র ছোঁড়াছুঁড়ি চললো। কিন্তু অনেক রাতে ঝড় থেমে গিয়ে সবকিছু অদ্ভুতরকম ঠান্ডা মেরে গেল। সন্ধার পর থেকে সেদিন আমার আর নয়নের ঘরে কোনো আলো জ্বলল না। চুলাতেও কোনো আগুন জ্বলল না। আমাদের বড় বিছানাটার একপাশে আমরা দুটি ভাইবোন চুপটি করে দীর্ঘরাত অব্দি বসে থাকলাম। যখন সবকিছু একদম শুনশান নিস্তব্ধ হয়ে গেল তখন নয়নের কাছে গিয়ে ওকে কাছে টেনে নিলাম। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম, ‘ঘুমিয়ে পড়…অনেক রাত হলো।’

আমরা দুজনেই শুয়ে পড়লাম। কিন্তু অনেক রাত পর্যন্ত নয়নের নাক টানার আওয়াজ শুনে বুঝতে পারলাম ও এখনো ঘুমায়নি। হয়ত কাঁদছে। আমার চোখ থেকেও ঘুম পালিয়েছে। কিন্তু আমি আজ ওকে কোনো অভয় দিতে গেলাম না। মিথ্যে অভয়বাণী শোনাতে শোনাতে নিজের ওপরে একরকম ঘৃণা জন্মে গেছে আমার।

জানালার ফাঁক করে রাখা পর্দাটা দিয়ে বাইরের দিকে অনেক রাত পর্যন্ত তাকিয়ে রইলাম। আকাশে মেঘমুক্ত চাঁদের ঝকমকে অবয়ব। প্রকৃতি চাঁদের সেই শুদ্ধ আলোয় মনের খুশিতে নিজেকে ধুয়ে নিচ্ছে। খুব ইচ্ছে করতে লাগলো, আমিও গিয়ে সেই আলোয় নিজেকে একবার ধুয়ে আসি। মনের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে। এই আলোতে কি মনটা শীতল হতে পারবে না?

 

ছন্দা নামের সেই ভদ্রমহিলা কিন্তুআমাদের বাসায় আর এলো না। মা-বাবার মধ্যে কী অঘোষিত চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো, আমরা জানতে পারলাম না। কিন্তু আমাদের বাসাটাতে দীর্ঘদিন পর একটু নিস্তরঙ্গ নীরবতা বিরাজ করতে লাগলো।

এটাকে শান্তি বলা যায় কী না জানি না, তবে আমাদের জীবনযাত্রা আর দশটা সুস্থ পরিবারের মতো আচমকাই যেন স্বাভাবিকে বদলে গেল। অনেকদিন পর্যন্ত ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করতাম, এই বুঝি আবার রণঝংকার বেজে ওঠে! প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত দুজন মানুষভয়ানক বিদ্বেষে একজন আরেকজনের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে! কিন্তু বেশ অনেকদিন আর কোনো ঝড় উঠলো না। সব কেমন চুপচাপ নিস্তরঙ্গ হয়ে গেল।

বাবা রোজ আগের মতোই নাস্তা খেয়ে অফিস চলে যায়। মা নিয়ম করে রান্নাঘরে ঢোকে। ঘরের কাজকর্ম করে। মোড়ের সব্জিওয়ালার কাছ থেকে দরদাম করে সবজি কেনে। কী আশ্চর্য এক শান্তি এখন খেলে বেড়ায় আমাদের বাসাটাতে! এখন আর হটহাট আমাকে রান্নাঘরে ঢুকতে হয় না।বাসায় কোনো অশান্তিই নেই, রান্নাবান্না বন্ধ হওয়ারও তাই প্রশ্ন আসে না।

 

কিন্তু কী একটা যেন হারিয়ে গেল আমাদের জীবন থেকে। আগে এই বাসাটাতে ঝগড়াঝাঁটি হলেও মাঝে মাঝে গুনগুন গানের কলি ভেসে আসতো। বিছানার নীচে ফেলে রাখা মায়ের বাবার বাড়ি থেকে দেওয়া ট্রাঙ্ক থেকে বের হতো সেলাইফোঁড়াইয়ের সরঞ্জামাদি। কাগজের ভাঁজে এঁকে রাখা ফুলেল নকশাগুলো কাপড়ে উঠতো মায়ের হাতের অপরূপ সূচিকর্মে। কিন্তু সেসব এখন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।

মায়ের মুখে আগে কখনো কখনো খুব আচমকা স্নিগ্ধ হাসি খেলা করতো। মন ভালো থাকলে আমাকে আর নয়নকে পাশে বসিয়ে গল্পও শোনাতো। যখন মা-বাবার সম্পর্কটা এমন ভয়ানক জটিলতায় রূপ নেয়নি, তখন মাঝে মাঝে আমরা এখানে সেখানে ঘুরতে বের হতাম। নয়ন তখন একেবারে ছোট্ট ছিল। আমিও ফ্রক পরা বাচ্চা মেয়ে। এক রিক্সায় চড়ে আমরা শিশুপার্কে যেতাম। বাবা আমাকে হাওয়াই মিঠাই কিনে দিত। আমাকে মজা করে খেতে দেখে নয়ন হাত পা ছুঁড়ে কান্নাকাটি জুড়ে দিত। মা বলতো, ‘উঁহু নীরা…বাবুকে দিস না। কী সব রঙ মাখিয়ে বিক্রি করে কে জানে! পেট খারাপ হবে নির্ঘাত। তুইও এত খাস না এসব!’

 

সেই সময়টা আমরা প্রাণভরে বাঁচতাম। আস্তে আস্তে সব কেমন বদলে গেল। দুজন মানুষের উষ্ণ সম্পর্কটা আমাদের সকলের অজান্তেই কেমন শীতল প্রাণহীন সম্পর্কে রূপ নিলো।বাবা অভিযোগ করে, মা বিলাসিতা খোঁজে। সাদামাটা জীবন তার পছন্দ নয়। অথচ কী এমন আহামরি পরিবার থেকে এসেছে! স্কুলশিক্ষক বাবার সংসারে কি সোনার চামচে করে ভাত খেত!

মায়ের অভিযোগের তালিকা তো বিশাল বড়! বাবার নাকি শুধু খুঁত ধরার স্বভাব। মায়ের সব কাজেই তার নাকি সবসময় বাগড়া দেওয়া চাই। দিনের পর দিন অভিযোগগুলো জমতে জমতে কেমন এক দুর্বোধ্য কুয়াশা জমে গেছে আমাদের পরিবারটির ওপরে।

 

সেদিনের সেই ঝগড়ার পরে সবকিছু শান্ত হয়ে এলো ঠিকই, কিন্তু কিছু কিছু জিনিস আর কোনোদিনই ফিরে এলো না। মায়ের মুখের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা সারল্যের এক চিলতে হাসিটাকে আর কোনোদিন খুঁজেই পেলাম না!

মা কিন্তু হাসতে ভুলে যায়নি! শুধু সেই হাসিটা কেমন যেন বদলে গেছে। সংসারের পঞ্চব্যঞ্জনে ব্যস্ত জীবনে জর্জরিত সেই চেনাজানা মাকেও কোথায় যেন হারিয়ে ফেললাম। মা’র অতি সাধারণ মোবাইল ফোনটাকেও আর দেখতে পেলাম না! এখন মায়ের হাতে ঝকঝকে দামি একটা মোবাইল সেট দেখি। একদিন অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এটা কবে কিনলে মা?’

মা কেমন অদ্ভুত চোখে তাকালো আমার দিকে। তারপর অপরিচিত গলায় বললো, ‘কেন আমার হাতে কি নতুন ফোন থাকতে পারে না? তোর বাবা তো কত নতুন জামা জুতো পরে! কখনো তো জিজ্ঞেস করিস না ওগুলো কবে কিনেছে! আমার হাতে নতুন কিছু দেখলেই এত অবাক হয়ে যেতে হবে কেন?’

মায়ের এমন অদ্ভুত প্রতিক্রিয়ার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না আমি। খুব সামান্য একটা প্রশ্নই তো জিজ্ঞেস করেছি! এত তীব্র প্রতিক্রিয়ার কী হয়েছে এতে?

 

আগে মাকে খুব কম সময়ের জন্যই ফোনে কথা বলতে দেখতাম। এখন মা ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনে কথা বলে। কার সাথে কথা বলে জানি না। কিন্তু মায়ের গল্প আর হাসি যেন ফুরোতেই চায় না তখন। ইদানিং মায়ের শপিংও যেন কেমন বেড়ে গেছে। প্রায়ই বিকেলবেলা সুন্দর করে সেজেগুজে মা বেরিয়ে পড়ে। যাওয়ার সময় ছোট্ট করে শুধু বলে যায়, ‘নাস্তা বানানো আছে। তোর বাবা এলে দিয়ে দিস। তোরাও খেয়ে নিস। আমার ফিরতে একটু দেরি হবে। কিছু কেনাকাটা করবো!’

ওহ হ্যাঁ, বাবার সেই বন্ধু সোহানুর আংকেল ইদানিং আমাদের বাসায় প্রায়ই আসে। তবে বেশিরভাগ দিনই বাবা বাসায় থাকে না। মায়ের সাথে গল্প করে। চা নাস্তা খায়। তারপর যাওয়ার সময় হাসিমুখে বলে, ‘ভাবী ব্যাচেলর মানুষটাকে তো সংসারের লোভে আটকায়ে দিচ্ছেন! ভালোই তো ছিলাম এতদিন!’


আরো পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-৬)

আমি এসব কথার গূঢ়ার্থ বের করতে যাই না। জীবনটা যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলতে দিতে চাই। শুধু ইদানিং মাঝে মাঝে শব্দের অভাবে ছটফট করি। উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার সাথে থাকতে থাকতে কেমন জানি এক অভ্যস্ততা চলে এসেছিল। উষ্ণ সেসব ঝগড়া থেমে গেছে ঠিকই, কিন্তু সম্পর্কের শীতলতাটা উষ্ণ হয়ে ওঠেনি।

মায়ের সাথে আমার সম্পর্কটা আগে থেকেই জটিল ছিল। দিনকে দিন সেটা কেমন যেন অদ্ভুতুড়ে হয়ে গেল। একেক সময় মনে হতো, আমরা বুঝি মায়ের কেউ নই। নেহায়েত অনাথ দুটি বাচ্চা আমরা পড়ে আছি এই বাসায়। মা-বাবার দয়া দাক্ষিণ্যে আমাদের দিন চলে। সেটুকু বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের কোথায় স্থান হবে জানি না।

বাবাও অফিস থেকে ফিরে নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। হয় টিভি দেখে, নয়তো সকালের খবরের কাগজটা নিয়েই আবার বসে পড়ে। একই খবর ঘুরে ফিরে দেখতে দেখতে আমাদের দিকে আড়চোখে দেখে। একদিন চোখাচোখি হয়ে যেতেই অপ্রস্তুত একটা হাসি দিয়ে বললো, ‘নীরা…তোর মা বেরিয়েছে?’

আমি এই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। মা যে এখন প্রায়ই বাইরে বের হয়…এই খবরটা তাহলে বাবার অজানা নয়!

 

তালগোলপাকানো আমাদের নিস্তরঙ্গ অনাড়ম্বর দিনগুলো এভাবেই অতীত হয়ে যাচ্ছিলো। আমি এসএসসি দিলাম। নয়ন ক্লাস ফাইভে উঠলো। কলেজে ভর্তির তোড়জোড় শুরু করার সময় একদিন রাস্তায় একেবারে আচমকাই আমার দেখা হয়ে গেল বড়মামার সাথে।

মামা আমাকে দেখে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলেন। কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই যে এ্যাই নীরা…আমি তোর সাথে দেখা করার জন্যই আজ এখানে এসেছি। তোর মাকে তো ফোন দিতে দিতে অস্থির হয়ে গেছি আমরা। তুই এত বড় একটা মেয়ে হয়ে আমাদের কিছু জানাতে পারলি না? নীরা…এসব কী শুনতে পাচ্ছি? তোর বাপ-মা নাকি সেপারেশনে যাচ্ছে? তোর মাকে নাকি কার সাথে ঘুরতে দেখা যায়? তোর বাবাও নাকি অফিসের কার সঙ্গে…ছি ছি ছি! আমরা কি মরে গেছি? তোরা কেউ আমাদের সাথে যোগাযোগ করিস না কেন? তুই জানিস কাঁদতে কাঁদতে মা মানে তোর নানীর কী অবস্থা হয়েছে?’

বড়মামা হড়বড় করে অনেক কথা বলতে লাগলো। আমার মাথার মধ্যে সব কথা ঢোকেনি। ইচ্ছে করছে মাটির ওপরেই বসে পড়ি। হয়ত বসেও পড়তাম। একসময় মনে হলো, বড়মামা আমাকে টেনে ধরে আছে। বিড়বিড় করে বলছে, ‘ছেলেমেয়ে দুটোর কথা ভাবলো না! এমন বাবা-মা দুনিয়ায় আছে নাকি?’

মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। আরো শুনতে পেলাম বড়মামা বলছে, ‘আজকেই আমি তোকে আর নয়নকে বাড়িতে নিয়ে যাবো। দেখি তোর গুণধর বাপ-মা আমাকে কীভাবে আটকায়!’

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত