বিজেপি, বিসর্জন, বাঙালি, ও বায়োস্কোপ। শেষ প্রশ্ন

Reading Time: 2 minutes

অনেক কথা লেখা হলো। অনেক আলোচনা। ভোট নিয়ে। সন্ত্রাস ও দেশপ্রেম নামক গভীর তত্ত্ব নিয়ে। হিন্দু মুসলমান নিয়ে। এক্সিট পোল নিয়ে। অর্থনীতি নিয়ে। গঙ্গাদূষণ নিয়ে। স্টক মার্কেট নিয়ে। মোদী, শাহ, গুজরাট, বাবরি নিয়ে। অনেক লিখলাম। অনেকে পড়লো। অনেকে বাহবা দিলো। অনেকে ভদ্র সমালোচনা করলো। অনেকে আবার চরম অশ্লীলতায় ভরিয়ে দিলো মন।

আগামীকাল ভারত নামের দেশের আগামীকালের ইতিহাস লেখা হয়ে যাবে। তারপর, হয়তো আমরা যারা বুদ্ধিজীবিতা, শিক্ষকতা, বিশ্লেষণ, বিচার ও প্রথাগত রাজনীতি ও মিডিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানাবার দায়িত্ব নিয়েছি নিজের দায়িত্বে, তারাই ইতিহাস হয়ে যাবো। একভাবে, নয়তো অন্যভাবে।

একশো কুড়ি কোটি মানুষের, তাদের সন্তানদের, তাদের জলবায়ু, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সমাজ, শান্তি, পরিবার, রুটি রুজি বাসস্থান, সঞ্চিত সামান্য অর্থ, মানুষের অধিকার, নারীস্বাধীনতা — সবকিছু হয়তো চিরতরে ধ্বংস হবে। নয়তো, মানুষ বেঁচে থাকার, নিঃশ্বাস নেওয়ার একটু অক্সিজেন খুঁজে পাবে।

রাজনৈতিক বক্তৃতা অনেক দিলাম। ফেসবুক। ব্লগ। ইউটিউব। দেশে ও বিদেশে। নিজের পরিশ্রমে ও অর্থে নতুন তৈরী করা মিডিয়া হিউম্যানিটিকলেজ ডট অর্গ।

একটু অন্যভাবে লিখি। আপনারা পড়ুন। ভাবুন। প্রশ্ন করুন।

বিসর্জন নামক সিনেমায় পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলি বাংলাদেশ ও ভারতের হাজার বছরের এক মিলিত ইতিহাস দেখিয়েছেন। এক মুসলমান যুবক ইছামতী নদীর অপর পাড়ে আশ্রয় নিয়েছে এক হিন্দু বিধবা যুবতীর বাড়ি। মুসলমান যুবকের অভিনয় করেছেন এক হিন্দু। আর হিন্দু যুবতীর অভিনয় করেছেন এক মুসলমান।

পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ছবিতে আমরা পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের কখনো অভিনয় করতে দেখিনি। এবং তা নিয়ে প্রশ্নও কখনো করিনি। কেন তাঁরা অনুপস্থিত, আমাদের মনে এই প্রশ্ন কখনো জাগেনি। যেটুকু মুসলিম শিল্পীদের উপস্থিতি আমরা দেখেছি উল্লেখযোগ্যভাবে, তার মধ্যে হাতে গোণা ঋত্বিকের তিতাস একটি নদীর নাম, আর সত্যজিতের অশনি সংকেত। দুটো ছবিতেই বাংলাদেশের শিল্পীদের আশ্চর্য অভিনয়। আর গৌতম ঘোষের ল্যান্ডমার্ক সিনেমা মনের মানুষ — লালন ফকিরের জীবনকাহিনি। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত।

আর এই কৌশিক গাঙ্গুলির সিকুয়েল বিসর্জন ও বিজয়া। বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমান সমাজের এক কোমল, শৈল্পিক, বাস্তবসম্মত, এবং দরদী চিত্রায়ন।

না, এ লেখা আমার আর একটা ফিল্ম রিভিউ নয়। নায়ক কেন কাঠের পুতুলের মতো, আর নায়িকা কেন অস্কার পুরষ্কার পাওয়ার মতো, অথবা, কালিকাপ্রসাদের মৃত্যু বাংলা গানের জগৎকে চিরকালের মতো কেমন করে দেউলিয়া করে দিয়ে গেছে, তার সেন্টিমেন্টাল আলোচনাও নয়। নায়ক ও নায়িকার মিলনদৃশ্য কেন এতো কৃত্রিম অথবা আরোপিত — সে বিতর্কও এখানে নয়।

এখানে আলোচনাটা অনেক বেশি গভীর। আপনারা ভেবে দেখুন।

এইভাবে বাঙালির হাজার বছরের অতি পরিচিত, অতি সদৃশ একাকার ইতিহাস ও জীবনচর্যা বাঙালি সিনেমা, শিল্প, নাটক ও সাহিত্যে আর কি দেখাতে দেওয়া হবে? বাংলা ভাষার কোমলতা, সৌন্দর্য আর কি এমন করে আমাদের কাছে তুলে ধরা হবে? ঋত্বিক, সত্যজিৎ, মৃণাল, তপন, গৌতম, অপর্ণা, কৌশিক, অনীক, অতনু, অনিরুদ্ধ, তারেক মাসুদ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত — এঁরা কি বেঁচে থাকবেন আমাদের নতুন প্রজন্মের বাঙালির মনে? দুঃখ, বেদনা, বাস্তব জীবনের বাস্তব সংগ্রামের, প্রতিরোধের, পরাজয়ের গল্প আমাদের কি আর বলতে দেওয়া হবে?

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সারা ভারতবর্ষের বিধবাদের ওপর ধর্মান্ধ, সামন্ততান্ত্রিক, গোঁড়া, রক্ষণশীল সমাজের অত্যাচার বন্ধ করেছিলেন। কুলীন ব্রাহ্মণদের অর্থলোলুপতা, লালসা, কুমারীবিবাহ ও গৌরীদানপ্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। অসহায় বিধবার বাকি জীবনের যন্ত্রণার কিছুটা লাঘব করেছিলেন তাদের পুনর্বিবাহের আইন পাশ করে। বিসর্জনের পদ্মা তাই আবার একটু বাঁচলো শয়তানদের হাত থেকে।

বিধবাদের ওপর আবার কি নতুন করে অত্যাচার নেমে আসবে? বাঙালি মেয়েরা কি আবার নতুন করে হিন্দু ও মুসলমান ধর্মান্ধতা ও প্রাগৈতিহাসিক সমাজব্যবস্থার শিকার হবে?

বাঙালি কি বাংলা বই আর পড়বে? বাঙালি কি বাংলা বর্ণমালা নিয়ে গর্ববোধ করবে? বাঙালি কি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, বিভূতিভূষণ, শামসুর রাহমান, বুদ্ধদেব বসু, লীলা মজুমদার, মুজতবা আলীর নাম মনে রাখবে?

বাংলা ভাষায় দুই বাংলার হিন্দু মুসলমানের জীবন নিয়ে ভালোবাসার কাব্য কি আর কখনো লেখা হবে?

বিসর্জন সিনেমা নয়। বাঙালিত্ব ও বাঙালির জীবনের বিসর্জনের মুখোমুখি আমরা।

বিজেপি শুধু নয়। বাঙালি।

আর কিছু লেখার নেই আমার।

নিউ ইয়র্ক ২২শে মে, ২০১৯

.

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>