তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা

আবু আফজাল সালেহ

‘পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে জ্বলন্ত ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে/ নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক/ এই বাংলায় তোমাকে আসতেই হবে হে স্বাধীনতা।’ (তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা) শামসুর রাহমানের কবিতাংশ। কবি শামসুর রাহমানের সাহসী ও দৃপ্ত উচ্চারণ এটি। আমাদের মুক্তি আকাঙ্খার প্রতিধ্বনি হয়েছে এখানে। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবিদের একজন।

অনেক কবির কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে। অনেক কবিতায় ৯ মাসের যুদ্ধকালীন করুণ কাহিনি উঠে এসেছে। আবার অনেক কবিতায় মুক্তিকামী মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কথা উঠে এসেছে কবির কণ্ঠে। অনেক কবির কণ্ঠস্বর হয়েছে মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠস্বর; মুক্তিকামীদের কণ্ঠস্বর। আর একটি বিষয় সে সময়ের কবিতায় প্রবলভাবে এসেছে; যা হচ্ছেÑ অসাম্প্রদায়িক মনোভাব। এ অসাম্প্রদায়িক মনোভাবই শেষ পর্যন্ত আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে ভূমিকা রেখেছে। রণাঙ্গনের যুদ্ধকালীনের আগে থেকেই বর্বর পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছিল। ১৯৪৭ সালের পর থেকেই বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব পড়ে। ভাষা আন্দোলন থেকে ছয় দফা, উনসত্তরের নির্বাচন, মুজিবের ভাষণ ইত্যাদির সিঁড়ি বেয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধ। তাই বলা চলে, বাঙালি সমাজকে মুক্ত করার জন্যই অনেক কবিতা রচিত হয়েছে। যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রেরণা দিয়েছে এসব কবিতা বা সাহিত্যকর্ম।

বিশ্বসাহিত্যে অনেক দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে সে দেশের কবি-সাহিত্যিকরা সাহিত্য রচনা করেছেন। বিশেষ করে কবিতা সাহিত্যে মুক্তযুদ্ধ প্রবলভাবে উঠে এসেছে। আধুনিক বাংলা কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় রয়েছে বাংলাদেশের সুদীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। বাংলা কবিতার চিরায়ত ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত কবিতাগুলো দলিল হিসেবে থেকে যাবে। এসব কবিতায় নিখুঁত বর্ণনা অবাক করার মতো। আর অনেক কবিতার মান অনেক উন্নত। বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের কবতা লিখতে গেলে এসব কালজয়ী কবিতা অনুসরণ করি আমরা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রখ্যাত গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার লিখেছিলেন, ‘শোনো একটি মুজিবুরের থেকে /লক্ষ মুজিবুরের কণ্ঠ /স্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি /আকাশে বাতাসে ওঠে রণি।’

মুক্তিযুদ্ধকালীন কবিতাগুলো আমরা ভাগ করতে পারি তিন ভাগে। মুক্তিযুদ্ধ, পূর্ববর্তী ও পরের। মুক্তিযুদ্ধের আগের কবিতাগুলো বীর বাঙালির প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করেছে। বিশ্বের মুক্তিকামীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সহায়তা করেছে। বাঙালির মনে অত্যাচারের বিরুদ্ধে জাগরিত করে একতাবদ্ধ করেছে। ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’ কবিতায় যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অবস্থা তুলে ধরেছেন রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এভাবে, ‘তাঁর চোখ বাঁধা হলো। /বুটের প্রথম লাথি রক্তাক্ত /করলো তার মুখ। /থ্যাঁতলানো ঠোঁটজোড়া লালা /রক্তে একাকার হলো, /জিভ নাড়তেই দুটো ভাঙা দাঁত /ঝরে পড়লো কনক্রিটে। /মা… মাগো.. .চেঁচিয়ে উঠলো সে। /পাঁচশো পঞ্চান্ন মার্কা আধ- /খাওয়া একটা সিগারেট /প্রথমে ম্পর্শ করলো তার বুক। /পোড়া মাংসের উৎকট গন্ধ /ছড়িয়ে পড়লো ঘরের বাতাসে। /তার শরীর ঘিরে /থোকা থোকা কৃষ্ণচূড়ার মতো /ছড়িয়ে রয়েছে রক্ত, /তাজা লাল রক্ত। /তার থ্যাঁতলানো একখানা হাত /পড়ে আছে এ দেশের মানচিত্রের ওপর, /আর সে হাত থেকে ঝরে পড়ছে রক্তের / দুর্বিনীত লাভা’।

কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের আর এক সাহসী উচ্চারণ। ‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই,/ আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি,/ ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে/ এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?’-(বাতাসে লাশের গন্ধ)

হুমায়ূন আজাদের অমর পঙ্ক্তিমালা- ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?/ তেমন যোগ্য সমাধিকই? মৃত্তিকা বলো, পর্বত বলো /অথবা সুনীল-সাগর-জল- /সবকিছু ছেঁদো, তুচ্ছ শুধুই! /তাইতো রাখি না এ লাশ আজ /মাটিতে পাহাড়ে কিম্বা সাগরে, /হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই।’ (এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?)

‘আসাদের শার্ট’ কবিতায় শামসুর রাহমানের দৃপ্ত উচ্চারণ- ‘গুচ্ছ গুচ্ছ রক্ত করবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের/ জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট/ উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।/বোন তার ভায়ের অম্লান শার্টে দিয়েছে লাগিয়ে /নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম কখনো /হৃদয়ের সোনালি তন্তুর সূক্ষ্মতায় /বর্ষীয়সী জননী সে-শার্ট /উঠোনের রৌদ্রে দিয়েছেন মেলে কত দিন স্নেহের বিন্যাসে।’

আল মাহমুদের ‘ক্যামোফ্লাজ’ কবিতার কিছু অংশ তুলে ধরা যেতে পারে- ‘যেনো, শত্রুরাও পরে আছে সবুজ কামিজ/ শিরস্ত্রাণে লতাপাতা, কামানের ওপরে পল্লব /ঢেকে রাখে /নখ /দাঁত /লিঙ্গ /হিংসা /বন্দুকের নল /হয়ে গেছে নিরাসক্ত বিষকাঁটালির ছোট ঝোপ’।

পঁচিশে মার্চের কালরাত সত্ত্বেও ছাব্বিশে মার্চ থেকেই শুরু হয়েছিল প্রতিরোধ আন্দোলন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যাতে এগিয়ে যেতে না পারে, সেজন্যে পথে পথে তৈরি হয়েছিল ব্যারিকেড। রাজনৈতিক কর্মী ও ছাত্র-যুবা, নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ যুক্ত হয়েছিল সেই প্রতিরোধ সংগ্রামে। শহীদ কাদরীর কবিতায় তা পেয়েছে প্রতীকী ব্যঞ্জনা- “মধ্য-দুপুরে, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে, একটা তন্ময় বালক/ কাচ, লোহা, টুকরা ইট, বিদীর্ণ কড়ি-কাঠ,/ এক ফালি টিন,/ ছেঁড়া চট, জংধরা পেরেক জড়ো করলো এক নিপুণ/ ঐন্দ্রজালিকের মতো যতো/ এবং অসতর্ক হাতে কারফিউ শুরু হওয়ার আগেই/ প্রায় অন্যমনস্কভাবে তৈরি করলো কয়েকটা অক্ষর/ ‘স্বা-ধী-ন-তা’।” (নিষিদ্ধ জার্নাল)

হুমায়ূন আজাদের কবিতায়- ‘… সারা বাংলা রক্তে গেছে ভিজে। / যে নদীতে ভাসতো রাজহাঁস সেখানে ভাসছে শুধু নিরীহ বাঙালির লাশ।/ সূর্য আর নক্ষত্রের সারাবেলা মানুষের,/ সেখানে প্রাগৈতিহাসিক পশুরা সে মানুষ নিয়ে করে বর্বরতা খেলা/ তারপর এলো নতুন বন্যা… সূর্যসংকাশ/ ভেসে গেল জন্তুরা, জন্তুদের সকল আভাস।’ (খোকনের সানগ্লাস, অলৌকিক ইস্টিমার)

কবি রফিক আজাদের ‘একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মসমর্পণ’ কবিতায় বীরোচিত মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে- ‘তোমার মুখে হাসি ফোটাতে দামি অলঙ্কারে সাজাতে/ ভীরু কাপুরুষ তোমার প্রেমিক এই আমাকে/ ধরতে হলো শক্ত হাতে মর্টার, মেশিনগান-/ শত্রুর বাংকারে, ছাউনিতে ছুড়তে হলো গ্রেনেড/ আমার লোভ আমাকে কাপুরুষ হতে দেয়নি’।

সিকান্দার আবু জাফরের কবিতায় পাওয়া যায় চরম উচ্চারণ, অত্যাচারী পাকিস্তানিদের প্রতি সাহসী প্রতিবাদ- ‘তুমি আমার বাতাস থেকে নাও তোমার ধুলো/ তুমি বাংলা ছাড়ো’।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বেশ কয়েকজন কবিতা বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত একটি কবিতা হচ্ছে ‘যশোর রোডে সেপ্টেম্বর’। মার্কিন কবি অ্যালান গ্রিন্সবার্গ লেখেন। তাঁর লেখায় বলিষ্ঠভাবে ফুটে ওঠেছে স্বাধীনতাকালীন ভয়াবহতা-

(Millions of souls nineteen seventy one/Homeless on Jessore road under grey sun/A million are dead, the million who can/Walk toward Calcutta from East Pakistan.) অর্থাৎ ‘লক্ষ লক্ষ আত্মা উনিশ শ একাত্তর / যশোর রোডে ঘরহীন উপরে সূর্য ধূসর / দশ লক্ষ মারা গেছে আর যারা পারছে / পূর্ব পাকিস্তান থেকে কলকাতার দিকে হাঁটছে।’ আমাদের একজন অকৃত্রিম বন্ধু- স্বাধীনতার বন্ধু জর্জ হ্যারিসন। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বন্ধু-শিল্পী জর্জ হ্যারিসনের ‘ও বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ’-এর গানে ভয়াবহতায় নিমজ্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের মৃত্যুঞ্জয়ী আত্মত্যাগ ও মহিমা ফুটে উঠেছে। ‘হাজার হাজার সহস্রলোক/ মরছে ক্ষুধায়/ দেখিনি তো এমন নির্মম ক্লেশ/ বাড়াবে না হাত বল ভাইসব/ কর অনুভব/ বাংলাদেশের মানুষগুলোকে/ ও বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ/ এত দুর্দশা/ এ যন্ত্রণার নাই কোনো শেষ/ বুঝিনি তো এত নির্মম ক্লেশ’।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখলেন অমর কবিতা- “… জানি, সেদিনের সব স্মৃতি মুছে দিতে/ হয়েছে উদ্যত কালো হাত।/ তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ /কবির বিরুদ্ধে কবি, /মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ, /বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল, /উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান, /মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ। /… জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা- ;/কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী? /গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শুনলেন তাঁর /অমর কবিতাখানি : /‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, /এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।” (স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো, নির্মলেন্দু গুণ)

‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় শামসুর রাহমানের স্বাধীনতার স্বরূপ তুলে ধরলে- ‘স্বাধীনতা তুমি /গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল, /হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম। /স্বাধীনতা তুমি /খোকার গায়ের রঙিন কোর্তা, / খুকীর অমন তুল তুলে গালে /রৌদ্রের খেলা। /স্বাধীনতা তুমি /বাগানের ঘর, কোকিলের গান, /বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা, /যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।’

নির্মলেন্দু গুণ স্বাধীনতাকে পর্যবেক্ষণ করলেন এভাবে-‘জননীর নাভিমূল ছিঁড়ে উলঙ্গ শিশুর মতো /বেরিয়ে এসেছো পথে, স্বাধীনতা, তুমি দীর্ঘজীবী হও।… হে আমার দুঃখ, স্বাধীনতা, তুমিও পোশাক পরো; /ক্ষান্ত করো উলঙ্গ ভ্রমণ, নয়তো আমারও শরীরী থেকে /ছিঁড়ে ফেলো স্বাধীনতা নামের পতাকা। /বলো উলঙ্গতা স্বাধীনতা নয়, /বলো দুঃখ কোনো স্বাধীনতা নয়, /বলো ক্ষুধা কোনো স্বাধীনতা নয়, /বলো ঘৃণা কোনো স্বাধীনতা নয়। /জননীর নাভিমূল ছিন্নকরা রক্তজ কিশোর তুমি/ স্বাধীনতা, তুমি দীর্ঘজীবী হও। তুমি বেঁচে থাকো /আমার অস্তিত্বে, স্বপ্নে, প্রেমে, বল পেনসিলের /যথেচ্ছ অক্ষরে, /শব্দে, /যৌবনে, /কবিতায়’।- (স্বাধীনতা, উলঙ্গ কিশোর)

কী লিখলেন কবি আবুল হাসান তাঁর ‘উচ্চারণগুলি শোকের’ কবিতায়। মুক্তিযুদ্ধের স্বজনহারানোদের কষ্ট। ‘… তবে কি বউটি রাজহাঁস /তবে কি শিশুটি আজ সবুজ মাঠের সূর্য, সবুজ আকাশ? /অনেক যুদ্ধ গেল /অনেক রক্ত গেল /শিমুল তুলোর মতো সোনা-রুপো ছড়াল বাতাস। /ছোট ভাইটিকে আমি কোথাও দেখি না, /নরম নোলক পরা বোনটিকে আজ আর কোথাও দেখি না।’

কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে ‘স্বাধীনতা’ বড় হয়ে গেল। কষ্ট বেদনা ভুলে তাকে নিয়েই উদ্যাপন। আবুল হাসানের ‘উচ্চারণগুলি শোকের’ কবিতার পরের অংশ দিয়েই শেষ করি। যেন সবার ভাবনাই ছিল এমন- ‘কেবল পতাকা দেখি, কেবল পতাকা দেখি, স্বাধীনতা দেখি!’

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত