| 21 এপ্রিল 2024
Categories
প্রবন্ধ সাহিত্য

শহীদুল জহিরের গল্পে জাদুআবহ ও কয়েনেজসমূহ । মাজুল হাসান 

আনুমানিক পঠনকাল: 13 মিনিট
অনেক ভেবে, শহীদুল জহিরের গল্পবয়ান-কৌশলকে আমার কাছে মনে হয়েছে বানরের তেলপিচ্ছিল বাঁশ বেয়ে ওপরে উঠার মতো। আসলে, জহির গল্পকে এগিয়ে নেন কতগুলো ঘাত-এ। ধাক্কায় ধাক্কায়। বানর যেমন তিন মিটার উঠে আবার এক মিটার নেমে যায়, সে রকম জহির এক ধাক্কায় কিছু দূর এগিয়ে একটু পিছিয়ে পড়েন অথবা আরেকটু উপর থেকে শুরু করেন। অর্থাৎ একটি ঘাত শেষ হবার পর ধারাবাহিকতার ক্রমটাকে ভেঙে দেয়া। ফলে এক ধরনের বিভ্রম তৈরি হয়। তৈরি হয় ঘোর। ঘোর মানেই কালহীন পরিভ্রমণ–তালগোল পাকিয়ে যায় বর্তমান-অতীত-ভবিষ্যৎ। তার ‘ধুলোর দিনে ফেরা’ গল্পে এই টেকনিক পরিষ্কার বোঝা যায়। সেই সাথে ভাষার একটি ঘোর তৈরির চেষ্টা সবসময় জহিরের গল্পে থাকে, যেখানে দেখা যায় অনিশ্চিয়ত্মক ডায়ালোগের ফুলঝুরি।
 
জহিরের গল্প-যাত্রাকে মোটা দাগে ২ ভাগে ভাগ করা চলে। প্রথম বই ‘পারাপার’-এর রিয়েলেস্টিক ধারার গল্প আর তার পরের জাদুবাস্তবতার আখ্যান। পারাপারে জহির অনেক বেশি ট্র্যাডিশনাল, যেখানে গল্প একটি বক্তব্য বা অদেখা বিষয়কে সামনে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন তিনি। পারাপার, মাটি ও মানুষের রং, তোরাব শেখ প্রভৃতি গল্পে ঘটনাই মুখ্য। অন্যদিকে পরবর্তী গল্পগুলোতে এক ধরনের বয়ান-কৌশল বা ভাষাগত যাত্রা মুখ্য হয়ে ওঠে, যেখানে গল্প আর সোজাসাপটা থাকে না, সোজা কথাও কেমন যেন অচেনা করে বলার চেষ্টা দেখা যায়। এখানে গল্পের বয়ান-কৌশল নিয়ে তাকে বেশ নিরীক্ষা করতে দেখা যায়। তবে জহিরের অনিশ্চায়ত্মক বাক্যগঠনের প্রবণতা তার প্রথম গল্পগ্রন্থ থেকেই চোখে পড়ে।
 
হয়তোবা তারা খুব বেশি ভাল মানুষ ছিল, নয়তো তারা কেউই কাউকে বিশ্বাস করতে পারত না মনের কপাট খুলে বুকের পাটটা দেখাতে। আনন্দপাল লেনের এই মানস চেহারাটা পাল্টে দেবার জন্যই যেন লোকটা এসে গেড়ে বসল পাড়ায়।
 
‘ঘেয়ো রোদের প্রার্থনা নিয়ে’ গল্পের এই অংশে একটি অব্যক্ত অর্থ, বিমূর্ত বিষয় উপস্থাপন করতে লেখক দুটো অপশন খোলা রেখেছেন–হয়তোবা তারা খুব বেশি ভাল মানুষ ছিল, নয়তো তারা কেউই কাউকে বিশ্বাস করতে পারত না। এই অনির্দিষ্টতা-প্রীতি আরো বেড়েছে পরবর্তী সময়ে লেখা গল্পগুলোতে। অর্থাৎ কালে কালে জহিরের অনির্দিষ্টতা আরো বহুবিধ জটিল হয়েছে, রূপান্তরিত হয়েছে অনির্দিষ্টতার সিরিজে।
 
সে বলে যে, তার পরিচিত গ্রামের লোক হলে এ ধরনের অস্পষ্ট আলোতেও সে তাকে চিনতে পারত; কিন্তু লোকটির চেহার স্পষ্ট দেখতে না পেলেও তার মনে হয় যে, এই লোকটি এই গ্রামের নয়, এই লোকটিকে সে চেনে না, তখন সে তার ছাপরা মুদির দোকানের ভেতর থেকে হাঁক দেয়, কেডা রে বাপু, যায় ক্যাডা?……। সে বলে যে দিনের আলো হয়তবা তখনও কিছুটা ছিল, হয়তোবা ছিল না, হয়তোবা বাতাসে ঝুলে থাকা ঘন ধুলোর কারণে সে আব্দুল ওয়াহিদের চেহারাটা পরিষ্কারভাবে দেখতে পায় নাই। তারপর সে যখন হাঁক দিয়ে ওঠে, সে বলে যে, তার হাঁক শোনার পরও লোকটা থামে না, মনে হয় যেন তার চিৎকার সে শুনতে পায় নাই। ধুলোর দিনে ফেরা বরাবরই, একটি ইমেজ না দিয়ে পাঠককে অনেক অনির্দিষ্টতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন জহির। আর তার কথক আমরা অনেক বেশি ফ্লেকজিবল, কেওয়াটিক বিভ্রম তৈরিতে জুতসই। এই ‘আমরা’ একসাথে শিশু-যুবক-বৃদ্ধ (তবে তা পুরুষবাচক)। ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’ গল্পের কথাই ধরা যাক :
 
আমরা তরমুজ কিনে ঘরে ফিরি এবং এই ফল দেখে আমাদের স্ত্রীরা বমি করে ফেলে, ফলে তখনতখন মন্দিরের রোয়াকে বসে থেকে আমরা বিরক্ত হয়ে উঠি, আমাদের বারবার পেশাব চাপে, দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে হাফপ্যান্টের ফাঁক দিয়ে তিনবার পেশাব করার পর আমাদের চুপ করে বসে থাকতে হয়।
 
এই গল্পে দেখা যায় কয়েক লাইন আগে কথক ‘আমরা’ সদ্য কুল ছেড়ে দিচ্ছে, মুখশ্রীতে সবে ফুটে উঠছে গোঁফের রেখা; আবার পরক্ষণেই কথক ‘আমরা’ বদলে গিয়ে অন্য ‘আমরা’য় রূপ নিচ্ছে যাদের একহাতে দুই নাম্বার ভেজাল তরমুজ, অন্যহাতে স্ত্রীর স্তন।
জহিরের গল্পে অনেকক্ষেত্রে একটি সিম্বল বেছে নেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কখনো এই সিমবল ডুমুর, কখনো কুয়ো, কখনো তরমুজ। অথবা এসবের বাইরে থাকে দাঁড়কাক, থাকে শেফালি অথবা নয়নতারার নেত্রবিভ্রম। প্রতীকের মাধ্যমে গল্প বলার প্রবণতা পৃথিবীর আদি গল্প বলার ধরনে বিদ্যমান। আমাদের গল্পে হিরামন পাখি, বেহুলার দুর্গতির কারণ সাপও সিম্বল অর্থে ধরে নেয়া যায়। পিঠাগাছের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। সেখানে একটি সিম্বলকে ঘিরে গল্প এগোয়। সিম্বলটা আহা-মরি কিছু না হয়েও মানুষের ভাগ্য ও কর্ম-নিয়ন্তা হয়ে পড়ে। তবে সবকিছুর আগে-পরে একটি ধারাবাহিকতা ধরে গল্প এগিয়ে চলতো তখন। কিন্তু জহিরের গল্পে সিম্বলের পাশাপাশি অন্যান্য অনুষঙ্গগুলো প্রতিনিয়ত সিম্বল হয়ে ওঠে। এই প্রতীকায়ন কখনো মূল গল্পের অনুগামী, কখনো তা একটি নিছক জাদুময় রূপক মাত্র, যাকে শেষ পর্যন্ত পুরো উদ্ধার করা যায় না।
 
খ.
 
গল্পে মূল ‘সাবজেক্ট’-কে কী করে প্রতীকায়নের ফ্রেমে আনা যায় সে বিষয়ে জহিরের নিরীক্ষা অতুলনীয়। ‘কাঁটা’ গল্পটির কথাই ধরা যাক। যেখানে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে ‘কুয়ো’র প্রসঙ্গটি। গল্পে দেখা যায়, ভূতের গলির বাসিন্দারা বেশ বিভ্রান্ত। আজীজ ব্যাপারীর বাড়িতে বারবার ভাড়াটে হয়ে আসে সুবোধচন্দ্র ও স্বপ্না নামের এক হিন্দু দম্পতি। সুবোধের একটা ছোট ভাই থাকেযার নাম পরান। বাড়ির কুয়োতে তাদের বারবার মৃত্যু হয় সুবোধ-স্বপ্নার। একাত্তরে চার কলেমা শিখেও মিলিটারির উৎপাতে তাদের জড়াজড়ি করে পড়ে থাকা লাশ পাওয়া যায় কুয়োর ভেতরে। এরপর বাবরি মসজিদ ভাঙার ডামাডোলে আবারো মৃত্যু হয় তাদের, কুয়োর পানিতে ডুবে। এই যে বারবার সুবোধ-স্বপ্না দম্পতির কুয়োতে ডুবে মরা বেশ সিম্বলিক। এখানে একটি ইতিহাস ভ্রমণের ব্যাপার আছে। এই কুয়োটি যে সাম্প্রদায়িকতার কূপ তা বুঝতে পাঠকের আর বাকি থাকে না। তাই গল্পে কুয়োটি বন্ধ করার জন্য এলাকাবাসীকে প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে দেখা যায়, যা ইতিবাচক।
বিষয়টা এভাবে শেষ করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু জহিরের গল্প বলে কথা তার প্রতীক তো নানামুখী অনিশ্চয়তার কথা বলবেই। ভূতের গলির লোকেদের কেন বারবার সুবোধ-স্বপ্নার মৃত্যুরহস্য নিয়ে আলাপচারিতা করতে হয় ইওর চয়েস সেলুনে বসে? সবকিছু জানার পরও, তাদের তো জানা সে আজীজ ব্যাপারীর বাড়ি আবার ভাড়াটে আসবে, যাদের নাম হবে সুবোধচন্দ্র-স্বপ্না, তারা ডুবে মরবে কুয়োর জলে। তারপরেও কেন তাদের বাঁচাতে পারে না এলাকাবাসী? এর উত্তরও হতে পারে–কুয়ো–কুয়োটা যে বাড়ির মধ্যে। মুখে অভয়ের বাণী শোনালেও আমরা আসলে সাম্প্রদায়িকতার বীজ ধারণ করি মনে! আবার অন্যভাবে দেখলে, গল্পে কুয়োটাকে নষ্টের মূল হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়, যেন কুয়ো আছে বলেই মারা পড়ে সুবোধ-স্বপ্না। বস্তুতপক্ষে কুয়ো বন্ধ করার জন্য এলাকাবাসীর তোড়জোড় দেখে তাই মনে হয়। মনে হয়, তারা তাদের অক্ষমতার একটি সুবিধাজনক সান্ত্বনা খুঁজছে। তাই, সুবোধ-স্বপ্নাকে যারা বারবার কুয়োতে ফেলে দেয়, একাত্তরে যেমন ফেলে দিয়েছিল রাজাকার আবু বকর মওলানা, তাদের রুখে দেবার কোনো লক্ষণ এই গল্পে দেখা যায় না। প্রশ্ন ওঠে, আমরা কি এতটাই মেধাশূন্য ও রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্ত? জহিরের ‘কুয়ো’ তো সেই কথাই বলে।
 
কাঁটায় যে-রকম ‘কুয়ো’, তেমনি ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’ গল্পের প্রায় জায়গা জুড়ে রয়েছে তরমুজ-এর সিম্বল। তরমুজ বিক্রি নিয়ে দক্ষিণ মৈশুন্দি মহল্লার লোকেদের অযাচিত মাছির বিড়ম্বনার পাশাপাশি তরমুজ রসালো লাল হবে কি-না সেই সমস্যা এক জীবন-মরণ প্রশ্নের আকারে উত্থাপিত। তরমুজকে নানাভাবে ফ্যান্টাসাইজ করা হয়েছে। তরমুজের বিচি ক্যান কালা, এগুলো আসলে তরমুজ গাছের ডিম কি-না। পুলিশকে জিঞ্জেস করা : ‘ভাই তরমুজ কি ভেজাল হবার পারে?’ এসব নিত্য ঝামেলার ও হুদাহুদি আকাশ-কুসুম কল্পনার মাত্রা আরো বাড়ে হাজি আব্দুর রশিদের তরমুজ সংক্রান্ত জটিলতায় : তরমুজ খেয়ে পেট ব্যাথা, পেটব্যাথাজনিত অবসর, এই অবসরে শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠার ছক কষা। গল্পের শেষে দেখা যায়, শেফালি ফুলের গন্ধ বিকিয়ে শুরু হচ্ছে তরমুজ প্যাকেটজাতকরণের কারখানা প্রতিষ্ঠার আত্মঘাতী প্রচেষ্টা। বিষয়টা তখন এমন দাঁড়ায়: গাছের গোড়া কেটে আগায় জল ঢালার মতো। কারণ, আমরা তো আমাদের নিজস্ব শিল্পকে (এখানে রূপক হিসেবে ধরে নিতে পারি তরমুজের উৎপাদন খরচ, ট্রাকভাড়া বেড়ে যাওয়ায় তার সাপ্লাই অপ্রতুল হয়ে পড়াকে) বাঁচাই না কখনো। তাই এখন সোজা পথ বাদ দিয়ে আমাদের খেতে হবে প্যাকেটজাত তরমুজ। আবার তরমুজ উপরে চকচকে সবুজাভ হলেও ভেতরে কিন্তু রক্তাভ লাল, সেই লালও সাদা হয়ে যাচ্ছে, হয়ে যাচ্ছে পানি! অবাক হতে হয়, জহিরের রূপকের বহুমাত্রিকতা কী রকম সুদূর প্রসারী, তা দেখে।
 
গ.
এসবের বাইরে ‘কোথায় পাবো তারে’ গল্পে প্রতীকায়নের ধরন আবার ভিন্ন। এখানে সরাসরি প্রতীকের ব্যবহার নেই। কিন্তু সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত গল্পটি একটি রূপক হয়ে ওঠে যা লালনের ‘আরশিনগর’-এর সমগোত্রীয়, লেখক গল্পের নামকরণেই তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। গল্পে দেখা যায়, জনৈক আব্দুল করিম বলে বেড়ায় সে মৈমনসিং যাবে। এই যাওয়া নিয়ে তার নানান প্রচারাভিযান দেখা যায়। ডালপুরি খেতে গিয়ে মনে হয় দোকানি পুরিতে ডালের বদলে আলু পুরে দিয়েছে। বাজার-বাড়তির এই সময় ডালের যোগান কৈ পাওয়া যাবে? উত্তর দেয় আব্দুল করিম : মৈমনসিং। দোকানিকে সে মৈমনসিং গেলে ডাইল কিনে এনে দেয়ার প্রস্তাব করে। এরকম আরো অনেক বিষয়কে আব্দুল করিম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায় মৈমনসিং-এ। এই মৈমনসিংস যেন সব পাওয়ার দেশ! গল্প যত এগুতে থাকে, দেখা যায়, মৈমনসিং যেতে চাওয়ার পেছনে বয়েছে এক ‘বন্দু’র টান। কে এই ‘বন্দু’? কোথায় থাকে? সে ব্যাপারে পুরোপুরি কোনো স্থির ধারণা পাওয়া যায় না গল্পে। কেবল জানা যায় তার ‘বন্দু’ এক মেয়ে, নাম মোছাঃ শেপালি বেগম / ফুলবাইড়া/ মৈমনসিং/ ঢাকা মহাখালি বাসস্ট্যান/ মৈমনসিং শহর, গাঙ্গিনার পাড়।
 
এই মৈমনসিং গাঙ্গিনার পাড় যাবার পথটিও এক গোলক ধাঁধা। এই বিভ্রান্তিকর অনির্দিষ্ট যাত্রাপথের বর্ননা দিয়েছেন জহির এই ভাবে:
 
আকুয়া হয়া ফুলবাইড়া বাজার, থানার সামনে/ উল্টা দিকে হাঁটলে বড় এড়াইচ গাছের (কড়ই গাছ) সামনে টিএনউ আপিস/ টিএনউ আপিস সামনে রাইখা খাড়াইলে, বামদিকের রাস্তাথ নাক বরাবর/ হাই স্কুল ছাড়ায়া বরবর সুজা, ধান ক্ষেত, কাঁটা গাছ, লাল মাটি,/ বামে মোচর খায়া নদী আহাইলা/আখাইলা/আখালিয়া নদী/ নদী পার হয়া ব্রিজ পিছন দিয়া খাড়াইলে দুপুর বেলা যেদিকে ছেওয়া পড়ে তার উল্টা দিকে,/ ছেওয়া না থাকলে, যেদিকে হাঁটলে পায়ের তলায় আরাম লাগে সেইদিকে/ নদীর পাড় বরাবর এক মাইল হাঁটলে দুইটা নাইরকল গাছ/ দুই নাইরকল গাছের মইদ্দে খাড়ায়া গ্রামের দিকে তাকাইলে/ তিনটা টিনের ঘর দেখা যাইব/ তিনটা ঘরের একদম বাম দিকের ঘরের পাশ দিয়া যে রাস্তা গেছে/ সেই রাস্তা ধইরা/ আগাইলে চাইর দিকে ধান ক্ষেত, পায়ে হাঁটা আইলের রাস্তা/ দূরে চাইর দিকে আরো গ্রাম/ ক্ষেতে পাকা ধান যেদিকে কাইত হয়া আছে, সেই দিকে,/ অথবা, যুদি ধানের দিন না হয়,/ যেদিকে বাতাস বয় সেই দিকে গেলে পাঁচটা বাড়ির ভিটা দেখা যাইব,/ তিনটা ভিটা সামনে দুইটা পিছনে,/ পিছনের দুইটা বাড়ির ডালিম গাছওয়ালা বাড়ি।
 
এত যদি, সাপেক্ষ ও বিভ্রান্তির বেড়াজাল টপকে একবারে শেষ মুহূর্তে (?) ‘বন্দু’কে না দেখে আব্দুল করিমের ফিরে আসার আগের দৃশ্য বর্ণনাটি বেশ শাদামাটা। আব্দুল করিম অনেকটা এগিয়ে মোচড় খায়া নদী আহাইলা/ আখাইলা/ আখালিয়া নদী পার হয়া ব্রিজ পিছন দিয়া দাঁড়ায়। এরপর খাড়াইলে দুপুর বেলা যেদিকে ছেওয়া পড়ে তার উল্টা দিকে, ছেওয়া না থাকায় যেদিকে হাঁটলে পায়ের তলায় আরাম লাগে সেইদিকে নদীর পাড় বরাবর এক মাইল হাঁটার প্রস্তুতি নেয়। পায়ের তলায় মাটি নরম কি-না, তা বুঝতে জুতো খুলতে গিয়ে আব্দুল করিম ফিতায় বিষ-গেরো লাগিয়ে ফ্যালে। কিন্তু বিষ-গেরো খুলে জুতো খুলতে সক্ষম হলেও সে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ফিরে আসে।
 
এখানে ‘বিষ-গেরো’ শব্দটা একটা রূপক অর্থে ধরে নেয়া যায়। সংসার তো বিষ-গেরোই! এত কিছুর পর তার টান উপেক্ষা করা যায় না। তাহলে প্রশ্ন আসে, এত কিছুর ভোগান্তি পোহানোর পর কি আব্দুল করিমের ‘বিষ-গেরো’র টানই প্রবল হয়ে ওঠে, না-কি লালনের আরশিনগরের পড়শির মতো ‘বন্দু’র দেখা পাওয়া যাবে না বলে তার বোধোদয় হয়েছিল? এর কোনো জবাব নেই। জহিরের অনির্দিষ্ট ও রহস্য তৈরির মানসিকতা এখানে পাঠককে এক অনাবিষ্কৃত পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আর সবকিছুর মধ্যে লুকিয়ে থেকে একটি বিষয় ফুটে ওঠে বারবার, তা হলো‘যাত্রা বা খোঁজ’। সাথে সাথে উঠে আসে এক জীবন সমান হাহাকার। কোনো রকম জটিল প্রতীক বা বুদ্ধিবৃত্তিক আবহ তৈরি না করে কেবল ভাষার টানে একটি অসাধারণ গল্পের নমুনা ‘কোথায় পাবো তারে’, যা বাংলা সাহিত্যে অনন্য।
 
ঘ.
অন্যদিকে, কাঠুরে ও দাঁড়কাক গল্পে প্রতীক হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে দাঁড়কাক। এই দাঁড়কাকের কারসাজিতে সিরাজগঞ্জের আকালু ও তার বৌ টেপিকে পাড়ি জমাতে হয় শহরে। তাতেও থেমে থাকে না কাকের দৌরাত্ম্য। নিঃসন্তান টেপি কাকের সাথে কথা বলে, তাকে জলপানি দেয়। কিন্তু আকালুর মনে হয় কাকের কারণে তার দুর্ভোগ। দেখা যায়, সেরকমই হচ্ছে, সৌভাগ্য আসবে আসবে করলেও শেষে আসে নিত্য নতুন ভোগান্তি। এই অবস্থায় কাক হয়ে ওঠে অপশক্তির প্রতীক, যেমনটা গ্রামদেশে ধরে নেয়া হয় এখনো। কিন্তু গল্প যত এগুতে থাকে এই প্রতীক খোলস বদলাতে থাকে। দেখা যায়, কাকের ডিম খেয়ে আকালু ও টেপি বাড়ির ভেতরেই দিন কাটিয়ে দিতে সমর্থ হচ্ছে। শেষে উত্তেজিত মহল্লাবাসী যখন তাদের বাড়ি ঘিরে রাখে, তখন কাকের দল আকালু ও টেপিকে দল বেঁধে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যে কাক ছিলো তাদের দুর্ভাগ্যের প্রতীক, তাই তাদের রক্ষা করে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে ল্যাটিন গল্পকার হোর্সে আমাদো’র ‘পাখি বিষয়ক অলৌকিকতা’ গল্পটির কথা। অই গল্পটিতেও নায়ক উবালদো কাপাদিচিও’র হালকা নাইটি ধরে তাকে আকাশে উড়িয়ে নিয়ে যায় অসংখ্য কবুতর, থ্রাশ, ওরিয়োল, কার্ডিনাল, ক্যানারি আর ছোট ছোট টিয়ে পাখিরা। আর সমস্ত উড়াল-প্রক্রিয়াটিতে পথপ্রদর্শকের মতো সামনে ছিল বারোটি ম্যাক পাখি। এভাবে উড়িয়ে নিয়ে পাখিরা উবালদোকে রক্ষা করে খুনী রিনদোলফো ইজোকয়েল’র হাত থেকে। একইভাবে ‘কাঠুরে ও দাঁড়কাক’ গল্পে আকালু ও তার স্ত্রী টেপিকে উত্তেজিত মহল্লাবাসীর হাত থেকে রক্ষা করে ঝাঁকে ঝাঁকে দাঁড়কাক। উবালদোর মতো দাঁড়কাকেরাও তাদের উড়িয়ে নিয়ে যায়। পুরো বিষয়টা শেষ পর্যন্ত অতিপ্রাকৃত ঘটনার মতো মনে হয়। এখানে এসে প্রতীকের সাধারণ ধর্ম পরিবর্তিত হয়ে যায়। ছক মেলাতে হিমশিম খায় পাঠক, জমাট কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না। ফলে গল্পটা একটি নিছক ম্যাজিক, ঘোর বা ফ্যান্টাসি বা ইলিউশনে রূপ নেয়।
 
এই যাত্রায় আলোচনা হতে পারে ‘মহল্লায় বান্দর, আব্দুল হালিমের মা এবং আমরা’ গল্পটির ওপর। এখানে ‘বান্দর’ সিম্বলটিও বেশ কনফিউজিং। সত্যিকারের বান্দরের সাথে লেখক প্রায় সিম্বলিক বান্দরকে ওভারলেপ করে ফেলেন। গল্পে দেখা যায়, একাত্তরের যুদ্ধের ডামাডোলে ভূতের গলিতে আবারও বান্দরের উৎপাত শুরু হয়েছে। গল্পে জহিরীয় অনিশ্চয়াত্মক বাক্যের ঘনঘোরে পাঠক নিমজ্জিত হলেও কিছুক্ষণের মধ্যে সচেতন পাঠকমাত্রই এই বান্দর যে রাজাকার ও শান্তি-কমিটির লোকজন, তা ধরে ফেলেন। ঘটনাগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে, প্রথমে রান্নাঘর থেকে হাড়িসুদ্ধ ভাত চুরি, তারপর ঘড়ি চুরি… তারপর অন্যান্য উপদ্রব। পুরো বিষয়টি বুঝতে লোকজনের সময় লাগে ঠিকই, কিন্তু বান্দরের পুনরায় ফিরে আসার বিষয়টি তারা ঠিকই উদ্ঘাটন করতে পারে। কিন্তু ততদিনে বান্দর কোনো এক বাড়ির ছাতে আস্তানা গেড়ে জেঁকে বসে। এই বান্দর বাচ্চাদের ভেংচি কাটে, আবার কামড়েও দেয় মানুষকে। তারপর একদিন বান্দরের হাতে চলে আসে অস্ত্র! এসব বিষয়ই ‘বান্দর’ শব্দটিকে প্রথাগত সরল অর্থের ঊর্ধ্বে তুলে আনে। কিন্তু গল্পের শেষে প্রকাশ পেতে থাকে অন্য বান্দরের কথা, যারা সংখ্যায় মাত্র দুই, একজন মাদা, অন্যজন মাদি। শেষে, এমদম গল্পের শেষে, আব্দুল কুদ্দুসের স্ত্রী মনোয়ারাকে বান্দরের রমণদৃশ্য দেখতে দেখা যায়। মনোয়ারার মনে হয়, সরে যাওয়া উচিত, কিন্তু সে সরে না। বিষয়টা কি এরকম: আমরা বান্দরের বান্দরামি দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি? এরকম প্রশ্নের মুখে ‘বান্দর’ আবারও নিজের প্রথাগত সরল অবস্থান থেকে রূপকের কাতারে উন্নীত হয়। তবে এখানে কোনো ফ্যান্টাসি তৈরি করেন নি লেখক।
 
এর বিপরীত ঘটনা ঘটতে দেখি ‘ডুমুর খেকো মানুষ’ গল্পে। গল্পে জনৈক মোহব্বত আলী পাড়ায় পাড়ায় জাদু দেখায় আর ডুমুর বিক্রি করে। প্রথমে ফ্রি দিয়ে যে ডুমুর বিক্রি শুরু হয় ক্রমেই তা অমূল্য হয়ে ওঠে। বেশি দামে বিক্রি করলেও মোহব্বত তার গ্রাহকদের বলে, মজা হলেও এই ডুমুর জুগিয়ে খাওয়া উচিত, যাতে শেষ জীবন পর্যন্ত চলে। ডুমুরকে যৌবনের প্রতীকও মনে হয়। কারণ বুড়ো ও বয়স্করা এই ফল বারবার খেতে আগ্রহ প্রকাশ করে। মোহব্বত ডুমুর বিক্রি করলেও ডুমুরের গাছ বিক্রি করতে রাজি হয় না। এমন পরিস্থিতিতে পাঁচজন ডুমুরাসক্ত মানুষ যখন মোহব্বত আলীর প্রাসাদে গিয়ে তাকে হত্যা করে সব ডুমুরগাছের দখল নিতে চায় তখন ঘটে এক অতিপ্রাকৃত ঘটনা:
 
মৃদু চিরচির শব্দ করে একটি ডিমের খোসার মতো ইমারতটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। এই ভাগ হয়ে যাওয়া খোসার ভেতর হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর বাইরে বের হওয়ার জন্য তারা উল্টো দিকে দৌড়ায় এবং যখন ইমারত ত্যাগ করে তখন সিংদরজার নিকটে চলে আসে তখন মনে হয় তারা সম্বিৎ ফিরে পায় এবং তারা পিছনে ফিরে কোনো সোনালী গম্বুজওয়ালা অট্টালিকার চিহ্ন দেখতে পায় না কোনো মাঠ কিংবা সিংদরজাও দেখে না, তারা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে পানির কিনারায় এক কাঠচেরাইয়ের কারখানার পাশে নিজেদের আবিষ্কার করে; তারা প্রথমে ভাবে যে, এতক্ষণ যা কিছু ঘটেছে তা স্বপ্ন ছিল, কিন্তু তখন তারা নিজেদের হাতে লোহার রড ও খঞ্জর এবং নিজেদের গায়ের জামা রক্তরঞ্জিত দেখতে পায়।
 
এখানে এসে জাদুবাস্তবতা রূপকথায় পর্যবসিত হয়। এটাকে হয়তো ইলিউশন বলাই বেশি যুক্তিসঙ্গত। এই গল্পে ‘ডুমুর’ প্রতীকটি যে গতি বা সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলো, তা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ তা আর প্রতীকায়নের নির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশের বাহন হয়ে থাকে না।
 
কবি বিনয় মজুমদারের যজ্ঞ ডুমুর’-কবিতার সাথে কোথায় যেন জহীরের এই গল্পের মিল পাওয়া যায়। তবে তারও চেয়ে বড় বিষয়, এই গল্পটি সম্পর্কে নব্বুই দশকের গল্পকার রবিউল করিমের ইন্টারপ্রেটেশনটি স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলছেন :
‘পাঠক যদি তার গল্পপাঠে একটু নিবিষ্ট হন তাহলেই অনুমান করতে পারবেন যে সেই রহস্যময় মানুষটি (মোহব্বত আলী ) হলো আমাদের দেশেরস্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ মানুষকে স্বপ্ন দেখান এই জনপদের শারীরিক মানসিক ভাবে রুগ্ন, অসুস্থ জাতির সামনে। সেই ভরাপূর্ণিমার মতো রূপসী মাইয়া মানুষটি হলো আমাদের সুজলা সফলঅ বাংলাদেশ। ১১ জন মারুষের কথায় মনে হয় তার ১১ দফার কথা, যা একসময় স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল চাবিকাঠি ৬ দফঅ। আর তিনি যে ৬টি ডুমুর থোকা বিক্রি করেন সেই ৬টি ডুমুর মানে ৬টি মৌলিক চাওয়া পাওয়া–খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা। কিন্তু কতিপয় অবিবেচক, স্বার্থপর, লোভী, হিংস্র মানুষের হাতে তাকে প্রাণ হারাতে হয় সপরিবারে। গল্পে জাদুকর মোহব্বত আলীকে হত্যঅ করে ৫ জন(!)। যতদূর জানা যায় বঙ্গবন্ধুকে যখন হত্যা করা হয় তখন ৫ জন তাকে ঘর থেকে বের করে আনে। বঙ্গবন্ধুর হত্যামামলার বিবরণীতে জানা যায় যে, ঐ হত্যাকাণ্ডে মেজর হুদা, মেজর পাশা, মেজর নূর, রিসালদার মুসলেমউদ্দিন এই ৫ জন নেতৃত্ব দেয়।
 
রবিউল করিমের এই ইন্টারপ্রেটেশন আমার কাছে বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। তবে কিছু জায়গায় খটকা লাগে, যেমন : রবিউল করিম বলছেন ৫ ডুমুরাসক্ত মানুষ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর খুনী। যদি ডুমুর যৌবন ও স্বাধীনতার প্রতীক হয়, তবে খুনী কি করে ডুমুর আসক্ত হয়? আর তারা খুনী না হলে, তা বঙ্গবন্ধুর হগত্যাকাণ্ডকে রিপ্রেজেন্ট করে কীভাবে?
 
তবে, আমি মেনে নিচ্ছি লেখকের ফিকশানের স্বাধীনতাকে, পুরো সত্য ঘটনাকে একটু টুইস্ট করা বা তাকে তার গতিতে চলতে দেয়া, এগুলো গল্পকার করতেই পারেন। ‘ডুমুরখেকো মানুষ’-এ জহীর হয়তো বঙ্গবন্ধুকে উপজীব্য করে একটি ফিকশান লিখেছেন, যাতে পুরো ইতিহাস বা সত্য নয়, আছে মিশেল বা ইমাজিনেশানের খাঁত। আবার, যদি জীবন-জীবিকা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের সবপ্নে বিভোর একদল মানুষ প্রাসাদে ঢুকে নেতাকে খুন করছে এইটা ধরে নেয়া হয় তবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডকে লেজিটেমিসি দেয়ার বিপদজনক ইন্টারপ্রেটেশন তৈরী হয়।
 
এই যে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে গল্পটি পাঠ করার সুযোগ সেটি না নিলেও গল্পের টেস্টে বা নতুন ইন্টারপ্রেটেশনের পথে তেমন কোনো অন্তরায় তৈরী হয় না। সেক্ষেত্রে তৈরী হয় ভিন্ন প্রেক্ষিত। তৈরী হয় এক অব্যাখ্যেয় জগৎ, যেখানে সার্বিক প্রতীকায়নের পরম্পরা থাকলেও গল্পটি হয়ে ওঠে রিয়েল ফিকশান। এই যে বর্ণণা :
“মৃদু চিরচির শব্দ করে একটি ডিমের খোসার মতো ইমারতটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। এই ভাগ হয়ে যাওয়া খোসার ভেতর হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর বাইরে বের হওয়ার জন্য তারা উল্টো দিকে দৌড়ায় এবং যখন ইমারত ত্যাগ করে তখন সিংদরজার নিকটে চলে আসে তখন মনে হয় তারা সম্বিৎ ফিরে পায় এবং তারা পিছনে ফিরে কোনো সোনালী গম্বুজওয়ালা অট্টালিকার চিহ্ন দেখতে পায় না কোনো মাঠ কিংবা সিংদরজাও দেখে না।”
 
সেটা কিন্তু তখন উদ্ভটত্ব নয়, বরং হয়ে ওঠে অব্যাখ্যেয়। কোথায় যেন অনুরণন ওঠে তীব্র মাত্রায়। জহিরের গল্প লোকে পছন্দ করে হয়তো এই সাবলীল অথচ অব্যাখ্যেয় ঘোরের কারণে। কে না জানে সোনার ডিম দেয়া সেই হাসের গল্প: একদিনে সব সোনার ডিম সংগ্রহের আশায় তার মালিক সেটাকে হত্যা করেছিল; যার পরিণতি হয়েছিলো ‘আমও গ্যালো ছালাও গ্যালো’র মতো। ‘ডুমুরখেকো মানুষ’ গল্পের শেষেও সেরকম ভাবে ডুমুরখেকো মানুষদের আক্ষেপ করতে দেখা যায়।
 
প্রায় কাছাকাছি মাত্রার রূপকায়ন দেখা যায় ‘আমাদের বকুল’ গল্পে। এখানে গল্পের শেষে বলা হয় বকুলকে লাল পিঁপড়া খেয়ে ফেলেছে। পুরো গল্পে বকুলের মায়ের শরীরের প্রতি সবার যে লোলুপ দৃষ্টি তা সদ্যযুবতী/ কিশোরী বকুলের বেলাতেও ঘটে। লোকে তাকে তার মায়ের সথে তুলনা করে, যে মা একদিন কোনো কারণ ছাড়াই নিখোঁজ হয়ে গেছে। তারপর কিশোরী বকুল বড় হয়ে ঋতুমতী হবার খবর পাই। আর তারপরই কোনো রকমের বর্ণনার ধার না ধেরে লেখক বলে দেন, বকুলকে লাল পিঁপড়ায় খেয়ে ফেলেছে। এখানে এসে ঘটনার আকস্মিকতায় পাঠক ভ্যাবাচ্যাকায় পড়ে যায়। পাঠকের মনে কতগুলো প্রশ্ন ওঠে লাল পিঁপড়া আসলে কে? গ্রামের হাড়-জিরজির মানুষগুলো, মিয়াবাড়ির কর্তারা, না-কি আরো বড় কোনো অপশক্তি? বকুলের মাকেও কি লাল পিঁপড়ায় খেয়ে ফেলেছিলো?
লেখক নিরুত্তর।
 
ঙ.
মোটা দাগে রূপকাশ্রয়ী গল্প ও জাদুবাস্তব গল্পে ফারাক আছে। ফারাকটি হলো ইনটেনশনে। রূপকের মাধ্যমে বক্তব্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থাকে, যেমনটা দেখা যায় ঈশপের গল্পে অথবা আমাদের ভারতীয় পৌরাণিক গল্প যেমন : ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’তে। আর জাদুবাস্তব গল্পে বাস্তবতার কথা বলা হয় একটু অতিপ্রাকৃত ঢঙে। বিষয়টি অস্বাভাবিক হলেও তার একটি অনায়স বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়। আধুনিক জাদুবাস্তব গল্পের পুরোধা মার্কেজ সরলা এরিদান্দারা গল্পে জাদুবাস্তবতা তৈরী করেছেন এভাবে : দেখা গ্যালো যুবতি প্রেমে পড়েছে, এবার সে যদি হাত দিয়ে পানির গ্লাস ধরে তবে গ্লাসের পানি নীল বা অন্য রঙের হয়ে যাবে। তাই দাদি দেখে বলবে কী পানির রং নীল হয়ে গ্যাছে! তবে মুখপুড়ি তুই ঠিক প্রেমে পড়েছিস। বিষয়টা এরকম: গ্লাসের পানির রং বদলে যাবার বিষয়টা অস্বাভাবিক, অসম্ভব; কিন্তু প্রেমে পড়লে মানুষের মধ্যে আচরণে এমন কিছু পরিবর্তন আসে, যেটাকে সিম্বলাইজ করা হচ্ছে পানির রং বদলে যাবার মাধ্যমে। এক জাদুময় আবহ তৈরী হলেও মূল বিষয়টি ধরতে পাঠকের কোনো অসুবিধে হয় না।
 
জহিরও সেরকম বারবরই জাদুর সাহায্য নিয়েছেন। এতই তার স্বাচ্ছন্দ্য। তার ‘ধুলোর দিনে ফেরা’ গল্পে আব্দুল ওয়াহিদ ও নূরজাহানের মধ্যে ময়নাপাখি বিষয়ক ক্রিয়াকলাপ তাই প্রেমের নামান্তর। না-হলে আব্দুল ওয়াহিদ নূরজাহানকে ময়না পাখির বদলে শালিক পাখি দিয়ে গেলেও কেনইবা নূরজাহান সেটাকে ময়নাজ্ঞানে কথা শেখানোর চেষ্টা করবে? কেনইবা গ্রামে ফিরে এসে সত্যিসত্যি ২টা ময়না পাখি কিনে আনবে আব্দুল ওয়াহিদ? এ কি পুরনো প্রেমের টান নয়? একই গল্পে এক ধরনের গোলাপ গাছের বর্ণনা আছে, যে গাছে সহসা ফুল ফোটে না, ফুল ফোটানোর জন্য সেই গাছের সাথে কথা বলতে হয়! সেই গোলাপ গাছের আছে ‘মানুষের কথার শব্দ শোনার স্মৃতির নেশা’। আব্দুল ওয়াহিদ এরকম এক গোলাপ গাছের সাথে যখন নিয়মিত রুটিন করে কথা বলে, তখন পুরো বিষয়টি ওয়াহিদের মানসিক একাকিত্ব; একই সাথে নকশাল আন্দোলনের তথা নিন্মবর্গের মানুষের সুদিন ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা বলে মনে হয়।
 
ফুল নিয়ে ফ্যান্টাসি আরো অনেকখানেই করেছেন জহির। বলা যেতে পারে ‘আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নাই’ গল্পটির কথা। তবে ‘এই সময়’ গল্পে ফুলকে ঘিরে পঁচিশ বছরের অনিন্দ্য সুন্দরী শিরীন আকতার ও অনাথ কিশোর মোহাম্মদ সেলিমের মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা অন্য সব কিছুকে ছাড়িয়ে যায়। প্রতিদিন শিরীন আকতারকে ফুল দিয়ে আসতে আসতে এক সময় খরা শুরু হয়ে যায়। এই খরা কেন? বিষয়টাকে যদি এভাবে দেখি: কিশোরসুভল সরলতায় যৌবন এসে উঁকি দিচ্ছে, তবে কি ভুল বলা হবে!
 
আমরা দেখি খরার মধ্যেও একটি মাত্র গাাঁদা ফুলের কুড়ির দিকে তাকিয়ে সেলিম দিন কাটিয়ে দিচ্ছে। মার্কেজের সরলা এরিন্দারা গল্পটির কথা এখানে মনে পড়ে যায়, যেখানে প্রেমে পড়া এরিন্দারা গ্লাশ স্পর্শ করার সাথে সাথে তার রং বদলে যায়। এখানে সেলিম বসে থাকে এই একটি কুঁড়ি ফোটার অপেক্ষায়। গল্পের জাদুময় আবহের কারণে এরশাদ সাহেব, মওলানা ইলিয়াছ অথবা তিন ভাই–আবু, হাবু ও শফির কাজকর্ম মাঝে মাঝে খাপছাড়া মনে হলেও বর্তমান ক্যাডার-নির্ভর নষ্ট রাজনীতির বিষয়টি পাঠকের কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠতে সময় লাগে না। আর গল্পের শেষ দিকের সিনেমাটিক বয়ান : শিরীন আকতার ও মোহাম্মদ সেরিমকে তিন ভাইয়ের চুম্বনরত অবস্থায় আবিষ্কার করা, সে রাতেই আবু’র সাথে কবুল না করা সত্ত্বেও শিরীন আকতারের বিয়ে, সেলিমকে শাসানো, ‘মান্দার পোলা এইটা তোর মা লাগে, যা সালাম কর’ বলে শিরীন আকতারকে সালাম করতে বাধ্য করা, পরদিন লাইনপোস্টে সেলিমের মৃতদেহ উদ্ধারসহ অন্যান্য বিষয়ের সিনেমাটিক বয়ান বর্তমান গ্রহণকালের সব গুমর ফাঁস করে দেয়। ফিল্মি ফিল্মি আবহে চেনা বিষয়কে ভিন্ন মাত্রা দেবার চেষ্টা করেছেন জহির। আর তেমটি করেছেন জাদুময় আবহ তৈরীর জন্যই।
 
ব্যতিক্রম কেবল ‘ইন্দুর বিলাই খেলা’ গল্পটি। এটি রূপক গল্প। সমাজের নানা স্তরে, ইতিহাসের নানা পর্যায়ে দুর্বল ও সবলের মধ্যে অথবা সুযোগ-সন্ধানীদের মধ্যে যে টানাপড়েন জহির তার নাম দিয়েছেন ইন্দুর বিলাই খেলা। গল্পের শেষে সেটা খোলাশা করেছেন তিনি নিজেই:
 
এই খেলার শেষ নাই, খেলোয়াড়ের শেষ আছে, খেলোয়াড় খেইল ছেড়ে চলে যায়, কিন্তু খেইল জারি থাকে।…. কেবল বিলাইরা ইচ্ছা করে খেলা ছেড়ে যেতে পারে, ইন্দুররা পারে না; বিলাই খেলতে চাইলে ইন্দুরকে খেলতে হবে।
 
চ.
একটি সাধারণ ঘটনাকে নানাভাবে রহস্যময় বা জাদুবাস্তব করে তোলা যায়। প্রথমত : পুরো প্রতীকায়নের মাধ্যমে যেখানে কোনো বিশেষ ঘটনা বা বস্তুকে তার গুণাগুণ বা বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়ে চিহ্নিত করে এর ধারাবাহিকতা টেনে নিয়ে যাওয়া এবং শেষে একটি ইঙ্গিত সূত্র পাঠককে দিয়ে দেয়া। অন্যটি হতে পারে সাধারণ বর্ণনার মধ্যে কিছু উদ্ভট ঘটনা বা জাদুময় ঘটনা ঘটিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বা পাঠকের রিয়েলিস্টিক চিন্তা-প্রবাহকে ধাক্কা দেয়া যাতে পাঠক বিভ্রমে পড়ে যায়। আরেকটি হতে পারে পুরো একটি জাদুময় পরিস্থিতি তৈরি করা যার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতীকায়ন বা ব্যাখ্যাসূত্র লোপ করে দিয়ে তাকে রূপকথার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া। জহির এই তিনটি টেকনিকই ব্যবহার করেছেন (যে গল্পে যেটি প্রয়োজনীয় মনে করেছেন)। তাই আমার কাছে জহিরের গল্পে জাদু বা প্রতীকায়ন বহুমাত্রিক, কেবল প্রতীকের স্বরূপ উন্মোচনের চেষ্টায় অনেক সময় তাকে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। (যদিও তার এই জাদুময় বয়ান-কৌশল ও জাদুবাস্তবতার প্রয়োগ বাংলার আবহমান গল্প বলার ধারার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, না-কি বিদেশ থেকে আমদানি-করা চটকদার মালমশলা মাত্র তা নিয়ে বিস্তর কথা চলছে। অনেকে বলছেন জহিরের উপর ল্যাটিন প্রভাবের কথা। প্রশ্ন উঠছে, আমাদের বাংলার গল্প বলার ধরনটা আসলে কেমন তা নিয়ে? প্রশ্ন উঠছে, আমরা কেমন করে গল্প বলি? একটা গল্পে কি শুধুই বাস্তবতা থাকে, না-কি সেখানে মিশেল থাকে রহস্য-রহস্য ফে­বার, টিপ্পনীসহ অন্যান্য নাটকীয়তা? সেই বিচারে জহির কতটুকু স্বদেশী? সেসব প্রশ্নের জবাব দেবার জন্য এই লেখা নয়। )
 
আমার মনে হয়, গল্পে এমন এক আবহ তৈরি থাকতে হবে যাতে শ্রোতার/ পাঠকের শোনার আগ্রহ এবং রোমাঞ্চবোধ শেষ পর্যন্ত অটুট থাকে। অর্থাৎ গল্পে থাকতে হবে গতিশীলতা। সেই গতিশীলতা শহীদুল জহিরের গল্পে সদম্ভে উপস্থিত। তবে তিনি বলেন একঘেয়েমি, পুনঃপৌনিক, চক্রাকার, নিরুপায় মানুষ ও সমাজের কথা। এক্ষেত্রে গল্পহীন (আসলে সব কিছু বলা হয়ে গেছে, যেমনটি বলেছিলেন ‘গড অব স্মল থিংস’-এ অরুন্ধতি রায়) গল্পগুলোকে নতুন আঙ্গিকে প্রকাশ করা ছাড়া উপায় নেই। নইলে বিষয়টি পুনরাবৃত্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কায় থাকে। কে জানে সেজন্যই হয়তো জহির তার ভাষাটাকে করেছেন অনিশ্চয়াত্মক আর গল্পে ঘটিয়েছেন রূপ-রূপক ও কয়েনেজের বিপুল সমাবেশ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত