স্পর্শ

গ্রীষ্মের তপ্ত দিন হলেও অন্য দিনের চেয়ে গরম হাওয়ার আনাগোনা আজ কিছুটা কম। আকাশের কোলজুড়ে কাশফুলের মতো সাদা মেঘ হেলেদুলে দোল খাচ্ছে। সবুজ পাতাদের সঙ্গে রোদ এসে নীরবে খেলছে। সবুজের শরীরে রুপোলী রোদের আঁকিবুঁকি!অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।

শরৎকাল সন্নিকটে। প্রকৃতিতে ষড়ঋতুর কথা উল্লেখ থাকলেও বর্ষার দেখা তেমন মেলে না এই শহরে৷ গ্রীষ্মের পরেই শরতের আনাগোনা চোখে পড়ে। গ্রীষ্মকালীন উষ্ণতা কেটে প্রকৃতি শীতল অনুভূতিতে জেগে উঠছে। পাশের বাসার কার্ণিশে গা ঘেঁষে জোড়া ঘুঘু এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। ঝলমলে রোদের চিকমিকি শরীরজুড়ে কত প্রজাপতি উড়ছে। বাতাসের মৃদু ফিসফাস শব্দে কল্পনায় মন হারিয়ে যায় কাশফুলের বোনে। ইচ্ছে করে এমন দিনে গলা ছেড়ে গাইতে, পাতার বাঁশি বাজাতে। ইচ্ছে হয় সমস্ত পৃথিবীজুড়ে ফুলের বাগান করতে। সমস্ত ভীতি, অমানিশা কেটে যেন চারপাশ ভরে উঠে ফুলের সৌরভে।

ডাঙায় ঘুঘু ভালোবাসছে, মনের গহীনে পাতার বাঁশি বাজছে! এমন দিনে ঘরের কোণে থাকা দায়। মন বলছে বাঁধা নিয়মের সমস্ত শৃঙ্খল ছিন্ন করে এমন সুন্দর সময়কে উদযাপনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যেতে অজানার পথে।

মন যা চায় মানুষ তা করতে পারে না সবসময়। পান্নাও পারে না, মন কে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে ও। মন এমন ব্যাকুল হলে পৃথিবীর স্বাভাবিক সময়ে ও ছুটে যেত সমুদ্র কিংবা পাহাড়ের কাছে। এখন পৃথিবীর শরীর খারাপ। বাইরে যাওয়া তো দূরের কথা, পৃথিবীর এমন মুমূর্ষু অবস্থায় মানুষ বাতাসে শ্বাস নিতেও ভয় পায়। করোনা ভাইরাসের ভয়াল থাবায় মৃত্যু পুরীতে রুপান্তরিত হয়েছে কোলাহলের নগরী নিউইয়র্ক শহর। লকডাউনে এই শহরের জনজীবন স্থবির হয়ে আছে অনেকদিন ধরে। যে শহরের রাস্তায় রাতদিন চব্বিশ ঘন্টা জনস্রোত বয়ে যেত, সে শহরের পথঘাট আজ জনশূন্য। রাস্তায় যানবাহন নেই, মানুষ নেই। আছে শুধু এমবুলেন্সের সাইরেন আর লাশবাহী গাড়ীর গগনবিদারী করুণ শব্দ।

পান্নার অস্থির লাগে। ও ঘড়ির দিকে তাকায়। ধবধবে সাদা দেয়ালের বুকে রোমান নম্বর খচিত কালো ফ্রেমের ঘড়িটা, কয়েক মাস আগেও ওর খুব প্রিয় ছিল। এই ঘড়ির সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টার কাঁটা জানে পান্নার বুকের ধুকপুকানির কথা। এই ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে ও মাহমুদের আগমনের জন্য অপেক্ষা করতো। জীবনে তখন দুর্বার গতি ছিল বলে ঘড়ির অবিরাম ছুটে চলাও ভালো লাগতো। বর্তমান গতিহীন জীবনে ঘড়ির গতি ওর একদম ভালো লাগে না। ওর ইচ্ছে করে ঘড়ির ছুটে চলা থামিয়ে দিতে। ঘড়ি তো মানুষের জন্য, মানুষের গতি থেমে আছে যেখানে, ঘড়ির গতি সেখানে অসহ্য লাগে। যেন ক্ষতস্থানে লবণ -মরিচের মতো। ঘড়ির এই ছুটে চলা শুধু শুধু যেন জীবনের ক্ষত জাগিয়ে তুলছে।

সময় তো প্রকৃতির নিয়মেই চলে। প্রকৃতির গতি রোধ করার ক্ষমতা নেই পান্নার। ও অপলক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবছে – ছোট্ট এই জীবনের সুন্দর সময়গুলো আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যাচ্ছে, শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে মাহমুদ কে ছাড়া। ওর বুক কষ্টে ভারী হয়ে উঠে।

না গরম না ঠান্ডা। আজকের মতো সেদিনের আবহাওয়াও বাংলাদেশের মতো নাতিশীতোষ্ণ ছিল। বাতাস ছিল ভেজা ভেজা। পার্থক্য শুধু আকাশের সীমানায় আজকের মতো সাদা মেঘেদের জায়গায় ছেঁড়া ছেঁড়া কালো মেঘ ছিল। বৃষ্টি আসবে আসবে মনে হলেও, আসছিলো না। সন্ধ্যার আকাশে ঝুলে ছিলো গোল থালার মতো চাঁদ। অফিস থেকে বেরিয়ে কিছু পথ পায়ে হেঁটে এসে ট্রেন স্টেশনে পান্না চুপচাপ অপেক্ষা করছিলো ট্রেনের জন্য। নীরবে মানুষ দেখা এবং পড়া পান্নার অন্যতম শখ। ট্রেন স্টেশনে কত রঙের মানুষ। কিন্তু আজ ও মানুষ দেখছে না, চাঁদ দেখছে। অপূর্ব সুন্দর চাঁদ আজ ওর পুরো মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে। চাঁদের দিকে মুগ্ধতায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর গন্তব্যের ট্রেন এসে চলে গেলো। ট্রেন ছেড়ে দেয়ার পর শূন্য প্লাটফর্মে সম্ভিত ফিরে পেয়ে নিজের উপর রাগ না হয়ে হাসতে লাগলো।

ছোটবেলা থেকেই পান্না কিছুটা উদাস প্রকৃতির। শীতকালে ঘাসের উপর পড়ে থাকা শিশির দেখতে দেখতে ওর সকাল পেরিয়ে যেতো। স্কুলে যেতে দেরি হতো। বিকেল বেলায় নীড়ে ফেরা পাখীদের গুনতে গুনতে ওর সন্ধ্যা নামতো। বৃষ্টিদিনে আকাশের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে স্কুলব্যাগ ভিজে বইপত্র সব ভিজে যেত। পাঠ্যবই ভিজে গেলে বাড়ী ফিরে মায়ের কত বকাঝকা শুনতো। স্টেশনে একা দাঁড়িয়ে পান্না ফেলে আসা জীবনের কথা বিড়বিড়িয়ে ভাবছে আর আপনমনে হাসছে।

অতিরঞ্জিত কোন কিছুই ভালো না, পান্না জানে। তবুও মুগ্ধতা কেমন করে যেন ওর স্নায়ুকে বিবশ করে তুলতো। ফলশ্রুতিতে ও ছিটকে পড়তো অনেক দূরে বাস্তবতা থেকে। প্রায়শই ও অন্যমনস্ক হয়ে পড়তো বলে স্কুল থেকে শিক্ষকরা নালিশ পর্যন্ত জানিয়েছে বাবা-মায়ের কাছে। গুরুজনের চোখ রাঙানি খেয়ে, চেষ্টা করেও পান্না জীবনের বেশীরভাগ সময়ে জাগতিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে পারতো না।

আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। কখন যে ট্রেন এসে চলে গেলো ও টেরই পেলো না। চাঁদ ছোটবেলা থেকেই পান্নার মনে একটি রহস্যময় ভাবনা হিসেবে ঠাঁই করে নেয়। দেশ ছেড়ে বিদেশে আসার পর প্রযুক্তির নিত্য নতুন চোখ ধাঁধানো, মন কাঁপানো উন্মাদনার হাতছানির মধ্যেও চাঁদের আলোর নিখাঁদ সৌন্দর্য উপভোগ করে ও প্রাণভরে। দীর্ঘ কর্ম ক্লান্ত দিন শেষে শ্রান্ত শরীরে বাসায় ফেরার পথে আজ চাঁদ ওকে আটকে দিলো, দেরি হয়ে গেলো পথে। অবশ্য এই দেরি হওয়ায় ওর মন খারাপ হয় নি। ছোটবেলার মতো আজ ও মনভরে চাঁদের আলোয় স্নান করছে, মুগ্ধতায় তাকিয়ে রয়েছে চাঁদের পানে।

জনশূন্য ট্রেন স্টেশনে একলা পান্না সঙ্গে চাঁদ। পরের ট্রেন আসবে আরো ১০ মিনিট পরে। ঠিক সে সময় মাহমুদ আসে ট্রেন স্টেশনে। যদিও পান্না খেয়াল করে নি মাহমুদকে, ও তো ডুবে আছে চাঁদের বুকে। পৃথিবীর উষ্ণতা আরো কমে গেছে। ভেজা বাতাসের শীতলতা এসে লাগছে ওর গায়ে।

‘চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে উছলে পড়ে আলো, ও রজনীগন্ধা তোমার গন্ধ সুধা ঢালো’ ভেজা হাওয়ার স্পর্শে চাঁদের ভালোবাসায় ডুবে পান্না গলা ছেড়ে গাইতে থাকে। কি আশ্চর্য! গান শেষ না হতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে! এরমধ্যে ট্রেন এসে পড়ে। এবার আর পান্নার ভুল হয় না। ও তড়িঘড়ি করে উঠে পড়ে ট্রেনে।

– বাহ! আপনার গানের গলা তো বেশ মিষ্টি! কী যে ভালো লাগলো শুনতে! কী নির্মল সুরে গাইলেন! আকাশের দিকে তাকিয়ে কান পেতে গান শুনছিলাম!

ঘাড় ঘুরিয়ে পান্না মাহমুদের মুখের দিকে তাকায়। দু’জনে চুপ। কিছু সময় চুপ থেকে মাহমুদের ঢেউ খেলানো চোখের দিকে তাকিয়ে পান্না হাসিমুখে ধন্যবাদ জানায়।
কিছু সময় পর নীরবতা ভেঙে মাহমুদ আবার কথা বলতে থাকে।
– আপনার নাম কি?
– পান্না।
– আপনার ?
– মাহমুদ।

– আপনার গান শুনতে শুনতে চোখের সামনে ফেলে আসা জীবনের কত কত স্মৃতি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বৃষ্টিভেজা দিন, কাক ভেজা দুপুরবেলা, ফুল-পাখী-লতাপাতা, সবুজ ঘাসের মাঠ, কাদা মাখা পথ, ছায়াঘেরা বাড়ী, শেষ বিকেলের আলো, রাখালের বাঁশি, ঘরে ফেরা পাখী, আকা বাঁকা নদী, দোয়েলের শিষ, জলময়ূরের নাচ, কলসী ভরা জল, জোড়া কবুতর, জলে ভেজা বুক।
আহা! কত তৃষ্ণা জাগিয়ে দিলেন প্রাণে! ভালো থাকুক দেশ, ফেলে আসা সোনালী দিন রঙিন আদরে!

দেশকে নিয়ে মাহমুদের এমন হৃদয়গ্রাহী স্মৃতিচারণ পান্নার খুব ভালো লাগে। ওর বুকের ভেতর ভালোলাগার অচেনা একটা কাঁপন জাগে। মনের দুয়ার খুলে কথার প্লাবন উঠে, কিন্তু বলার ভাষা খুঁজে পায় না। অনুভূতিদের শব্দ-বাক্যে রুপান্তর ঘটিয়ে পান্নার কিছুই বলা হয় না প্রতি উত্তরে মাহমুদকে। ও আবারো নীরব তাকিয়ে থেকে ধন্যবাদ জানায়। যেন ধন্যবাদ ছাড়া আর কোন কথাই জানে না ও। ওই ধন্যবাদের মধ্যেই পান্নার নির্ধারিত গন্তব্য এসে যায়। পান্না নীরবে নেমে পড়ে।

বাসায় ফিরে পান্না ফ্রেশ হয়। ঘরের নিয়মানুসারে একসঙ্গে রাতের খাওয়া সেরে বাবা-মায়ের সঙ্গে টেলিভিশন দেখতে বসে। এ সময়টা একান্ত পরিবারের। সবাই মিলে গল্প করে। গোটা দিন কার কেমন কাটলো, একে অন্যের সঙ্গে শেয়ার করে। মোদ্দা কথা এটি ঘরের নিয়ম।

পান্না আজ পারিবারিক গল্প, আলোচনা, আড্ডায় মন দিতে পারছে না। কানের মধ্যে অনবরত খৈ ফোটার মতো মাহমুদের কথাগুলো বেজে চলছে। চোখের তারায় মাহমুদ ভাসছে। কোন কিছুতে মনের দেয়াল থেকে ওকে সরাতে পারছে না। পান্না অবাক হয়। এত অল্প সময়ে কেমন করে অচেনা, অজানা একজন মানুষ ওর মনের ঘরে জায়গা নিয়ে নেয়! ওর চিরচেনা পরিবার, চারপাশের পরিবেশজুড়ে মাহমুদের আনাগোনা দেখে পান্না আরো বিস্মিত হয়! বই পড়ায় মন দিতে গিয়েও ওকে মাথা থেকে সরাতে পারছে না। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, পান্না ওড়না দিয়ে দ্রুত মুছে নেয়। নিজের এমন বেসামাল অবস্থা লুকাতে পান্না ঘরের সবাইকে শুভ রাত্রী বলে বিদায় নিয়ে ঘুমাতে রুমে চলে যায়। অন্যদিন মাথা বালিশে রাখতেই ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালেও আজ ওর ঘুম আসছে না। এলোমেলো ভাবনা। মাহমুদের পদধ্বনি বুকের জমিনে, মন শাসন মানছে না। কয়েকঘন্টা আগে ঘটে যাওয়া সময়ে ও অনর্গল হাবুডুবু খাচ্ছে। মাহমুদ যেন একটি কথার বাগিচা। ওর বাগিচা ভর্তি দেশের কথা, দেশের সবুজ গন্ধ আর জল কাদা। পান্নার চোখ বুঁজতে দেয় না মাহমুদ।

অচেনা একজন মানুষ কেনইবা হুট করে মনের ঘরে ঢুকে পড়লো? দূরের একজন মানুষকে কেন এভাবে মনে পড়ছে? অজানা একজন মানুষের কথা কেন এভাবে কানে বাজছে? এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে একসময় ক্লান্ত পান্না ঘুমিয়ে পড়লো।

পরের দিন আবার একই ট্রেন স্টেশনে একই সময় ওদের দেখা হয়। এরপর থেকে কোন এক অজ্ঞাত কারণে মাহমুদ ও পান্নার প্রায় প্রতিদিনের ট্রেনের সময় এক হতে থাকলো। অসংখ্য মানুষের ভীড় ঠেলে ওদের দেখা হয় প্রতিদিন, কিংবা ওরা স্বেচ্ছায় খুঁজে নেয় একে অপরকে। ওদের দেখা হওয়ার স্বাক্ষী হয়ে থাকে বোবা ট্রেন স্টেশন, আকাশ, বাতাস আর সবুজ বৃক্ষ। ওরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে ওই মানব দ্বয়ের একজন আরেকজনের জন্য অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকার নিগুঢ় রহস্য উম্মোচনের জন্য। ওদের সম্পর্কের চারাগাছটি সময়ের হাত ধরে আলো বাতাসে আস্তে আস্তে ডালপালা বিস্তৃত হয়ে ক্রমশ বড় সবুজ বৃক্ষ হয়ে উঠে। ওদের আলাপচারিতায় জীবনের গল্প গাঢ় হতে থাকে। মনের ক্যানভাসে রঙ, তুলিতে একে অন্যের ছবি আঁকতে শুরু করে।

ওদের বুকপকেটে মুগ্ধতা ঘণ হতে থাকে। ওদের চলার পথে দু’জনের প্রিয় রজনীগন্ধা- বেলি ফোটে। ওদের নির্ভরতা দিন দিন বেড়ে চলে। স্বপ্নের মানচিত্র একইরকম হতে থাকে। ওদের প্রত্যাশা, সুর, ছন্দ এসে মিলিত হয় একই বিন্দুত । ওদের সূর্যদয়, সূর্যাস্ত হয় একইসঙ্গে। ওরা জড়িয়ে পড়ে মাকড়সার জালের মতো একে অপরের জীবনের অংশ হয়ে।

ক্লান্তিকর দিন শেষে ওরা নিজেদের আবিষ্কার করে নির্জন নদীর তীরে, অথবা জনসমুদ্র ফেলে কোন সবুজ অরণ্যে। ছুটির দিন সকাল কাটে ওদের পাবলিক লাইব্রেরিতে, সাথে থাকে ফ্রুট কেকের সঙ্গে হ্যাজেলনাট কফি। ওরা একসঙ্গে মুভি দেখে। শিশুদের মতো গান, কবিতা, গল্প খেলায় মেতে থাকে। একে অপরের পছন্দের বই পাঠাতে থাকে। এই মধুর খেলায় জগতের সেরা সুখী মানুষ হয়ে উঠে ওরা। মাঝেমধ্যে এটা-ওটা নিয়ে ওরা বাজি ধরতো শর্তসাপেক্ষে। হেরে যেত শর্ত ছেড়ে। ওরা যুক্তি-তর্কে একে অন্যকে জর্জরিত করতো, কিন্তু কোন স্বার্থ থাকতো না সেখানে। টক-ঝাল-মিষ্টি দুষ্টামিতে ওরা চঞ্চল হয়ে উঠলেও, ওদের স্বভাব ছিল সারল্যে ভরা। সবচেয়ে বড় কথা একে অন্যকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে শুরু করে।

সময় যত এগোতে থাকলো ওদের পথ তত মিলেমিশে একই বৃত্তে এসে মিলিত হতে লাগলো। অতঃপর, অসীম এই অন্তরীক্ষে ওদের হাতঘড়ি চলতে থাকে একই সময়, পরস্পরকে ছুঁয়ে।

মাহমুদ-পান্নার কাছে আসার গল্পটা ছিল গতানুগতিকতার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। ভালোবাসার চেয়েও ওরা মায়ায় জড়িয়ে পড়েছে বেশি। আদতে ভালোবাসার চেয়ে মায়া মানুষকে বেশি আটকে ফেলে। এই মায়া বড্ড কঠিন জিনিস।

একে অপরের খুব যত্ন নিতো। মায়ার বশে দিনভর অফিস শেষে ক্লান্তিতেও ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতো অপেক্ষায়। একদিন দেখা না হলেই ওদের বুকের ভেতরটা যন্ত্রণায় হু হু করতো। যা পরস্পরের কথায় ফুটে উঠতো। কোন কারণে মাহমুদের মন খারাপ হলে পান্নার চোখ ভিজে আসতো, একইভাবে পান্নার মন আকাশে মেঘ জমলে মাহমুদের মনের ঘরে অন্ধকার নামতো। বন্ধুত্বের গণ্ডীটা যে পেরিয়ে এসেছে বহুদিন আগে দু’জনে তা বুঝতো। কিন্তু প্রকাশ করতো না।

“ভালোবাসি” এই শব্দটা কেউ কাউকে মুখ ফুটে না বললেও, একের সান্নিধ্যে অপরের বুকে ধুকপুকানি অনুভব করতো। চোখের আড়াল হলে একজনের জন্য অপরজনের বুকে বজ্রপাত ধ্বনিত হতো।

আসলে ভালোবাসা বোধ হয় এমনি, বলে কয়ে প্ল্যান করে হয় না। না বলে না কয়ে অজান্তে হুটহাট হয়ে যায়। ওরা একসঙ্গে ভিজতো, হাসতো, গাইতো, তবে কেউ কারো সঙ্গে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়নি। সারাজীবন একসঙ্গে পথ চলবে এমন কথাও দেয় নি।

মাহমুদ কখনো চা এর মধ্যে পরোটা ভিজিয়ে না খেলেও পান্নার জন্য অভ্যাস করে। পান্নার ভোরে উঠার অভ্যাস না থাকলেও, কাক ডাকা ভোরে উঠে অফিসে যাওয়ার আগে মাহমুদের পছন্দের পায়েস রান্না করে সঙ্গে নিয়ে যায়। ভালোবাসলে দু’জনের পছন্দগুলো খুব মিলে যায় বা মিলিয়ে নেয়, এটা প্রকৃতির নিয়ম।

অবশেষে ওদের মুখফুটে বলতে না পারা ভালোবাসার উপসংহার টানে দুই পরিবার মিলে। পরিবারের ইচ্ছেতে ওদের দুই পৃথিবী এক হয় গত ফেব্রুয়ারী মাসে। ঘরোয়া পরিবেশে আটপৌরে ভাবে বিয়ের কাজ সুসম্পাদিত হলেও, কথা ছিল শীত শেষে বসন্তের শুরুতেই ঘটা করে ঝাঁকঝমক পূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠান হবে।

বসন্ত ষড় ঋতুর শেষ ঋতু। ঋতুরাজ বসন্তের বর্ণনা কোন রঙ-তুলির আঁচড়ে শেষ হয় না। বসন্ত ভালোবাসা অনুভবের ঋতু। নবদম্পতি মাহমুদ-পান্না বসন্তের রস-রুপ-গন্ধে বিমোহিত হয়ে, একই ছাদের নিচে স্বর্গ রচনার জন্য যখন তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো অপেক্ষায় দিন গুনছে, ঠিক তখুনি পৃথিবীকে ঘিরে ধরে অদৃশ্য অণুজীব করোনা ভাইরাস। করোনার কাছে বন্দী হয়ে পড়ে মানুষ। করোনা পৃথিবীর সমস্ত হিসেব বদলে দিয়েছে। ধীরে ধীরে বদলে যায় মানুষের জীবন এবং যাপনের নৈমিত্তিক কড়চা। মানুষ থেকে মানুষ দূরত্বে চলে যায়। বদ্ধঘরে মানুষের গন্তব্য গিয়ে ঠেকে জানালায়। করোনা মানুষের মাঝখানে অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়। দেয়ালের এপাশে পান্না ওপাশে মাহমুদ। ওরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েও একসঙ্গে আর পথচলা হয় না। ওদের অপেক্ষার দৈর্ঘ শুধু বাড়তে থাকে। এই অপেক্ষার শেষ কবে ওরা কেউ জানে না। ওদের সব স্বপ্ন থমকে দাঁড়ায় অবরুদ্ধ জীবনে। ওরা পড়ে থাকে স্পর্শের বাইরে।

মাহমুদের আসতে দেরি হলে ট্রেন স্টেশনে পান্না যেভাবে অপেক্ষা করতো নির্ধারিত ট্রেন চলে যাওয়ার পরও, একইভাবে আজো অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে জানালার পাশে। একদিন দেখা না হলে কি ছটফট করতো, সেখানে আজ কয়েকমাস মাহমুদের সঙ্গে দেখা হয় নি। ঝড়-ঝঞ্ঝা, তুষারপাত ওদের দেখা সাক্ষাৎ আটকাতে না পারলেও, একটি ন্যানো ভাইরাস আজ ওদের আটকে রেখেছে। মানুষ সব পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়। মানুষ নিয়তির কাছে বন্দী। সময় মানুষকে বদলে দেয়। পান্না জানে- মানুষ ভাগ্যের অধীন, ইচ্ছের অধীন নয়। সব জেনেও ওর মন অঝোরে কাঁদছে মাহমুদের জন্য। বসন্তকাল শেষের পথে, ওদের সমস্ত সাধ, স্বপ্ন বিবর্ণ হয়ে আছে মহামারী করোনার ছোবলে।

মাহমুদের কথা ভাবতে ভাবতে ওর ফোনকল আসে। থেমে থেমে ওদের কথা হয়। টেলিফোনের দু’প্রান্তে দীর্ঘশ্বাস। দু’জনে চুপচাপ অবস্থায় কখন যেন টেলিফোনের লাইন কেটে যায়। কেউ আর পুনরায় কল করে না।

পান্না উদাস আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। চারপাশে এত এত আলোর বন্যা বয়ে যাচ্ছে, তাও ওর মনের ঘর অন্ধকার হয়ে আছে প্রিয়জন থেকে দূরে থাকার অব্যক্ত বেদনায়। আসলে পান্নার চোখজোড়ার আলো তো সে কবেই হয়ে গেছে মাহমুদ। ওকে ছাড়া জগতের সব আলো পান্নার চোখে ধোঁয়ার মতো লাগে।

নিঝুম দুপুর। মাহমুদের ব্যবহৃত সাবান, তোয়ালে হাতে পান্না স্নানঘরে পা বাড়ায়। প্রতিদিন এই একই সাবান, তোয়ালে হাতে ও বাথরুমে যায় ঠিকি কিন্তু ব্যবহার করে না, মাহমুদের ঘ্রাণ ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়ে। অন্য সাবান, তোয়ালে ব্যবহার করে।

পান্না নিশ্চিত নয় আবার কবে মাহমুদের সঙ্গে দেখা হবে, ওর ঘ্রাণ নেবে বুকভরে।
পান্না ভীষণ গন্ধ প্রিয়। ও চোখ বুঁজে প্রাণভরে প্রিয় গন্ধ শুঁকতে পারে সতেজ ভাবে। মাহমুদের সাবান, তোয়ালে পান্নার কাছে এখন মহামূল্যবান সম্পদ।

শাওয়ার হেড ছেড়ে দীর্ঘসময় পান্না চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। এই সময়টা ওর খুব প্রিয়। কারণ এ সময় জগতের অন্য কোন শব্দ কানে আসে না। পান্না ভেসে যাচ্ছে জলে আর মাহমুদের বুকের নেশা ধরা ঘ্রাণে।

দীর্ঘ সময় ধরে জলের নিচে দাঁড়িয়ে থেকে পান্নার শীত শীত লাগছে। চুলের তোয়ালে সরিয়ে ও মাহমুদের দেয়া ছাই রঙের তোয়ালে জড়িয়ে নেয় শরীরে। দুপুরের বারান্দায় তখন ওর কিছুটা ভালো লাগছিলো।

মাহমুদের অকৃত্তিম ভালোবাসা, যত্ন ওকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে, ওর ভাবনার সবটুকু দখল করে নিয়েছে। মানুষ বাঁচে ভালোবাসায়। মাহমুদের ভালোবাসায় করোনাক্রান্ত এই শ্বাসরুদ্ধকর সময়েও পান্নার মনে হয় জীবন সুন্দর। পৃথিবীর এই দুর্দিনে পান্না বেঁচে আছে ভালোবাসায়।

শেষ কবে আয়না দেখেছে পান্না মনে করতে পারছে না। আজ ওর সাধ জাগে সাজতে, আয়না দেখতে। মাহমুদ ওকে আত্মা দিয়ে ভালোবাসে। মাহমুদ পান্নার শরীর জানার আগে মন জেনেছে, শরীর ছোঁয়ার আগে মন ছুঁয়েছে। পান্নার মনে হয়, ও সাজলে মাহমুদ নিশ্চয়ই দেখতে পাবে। ওর আত্মা উড়ে এসে দেখে যাবে।

অনেকদিন পর পান্না আয়নার সামনে সাজতে বসেছে। আজ সে ধীরেসুস্থে সময় নিয়ে মাহমুদের জন্য সাজবে। মাহমুদ অবশ্য খুব গাঢ় সাজসজ্জা পছন্দ করে না।

ও অনেকবার পান্নাকে বলেছে, ‘তুমি যেমন আছো তেমনটাই সুন্দর! তুমি অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করতে থাকো আমার চোখে।’

তবুও পান্না আজ সাজবে, ওর খুব মন চেয়েছে। ওয়ারড্রব খুলে মাহমুদের দেয়া গোলাপি রঙের শাড়ীটা টেনে বের করলো। শাড়ীটার উপরে সাদা সুতার কাজ করা। গোলাপি রঙের শাড়ীর সাথে ফুলহাতা কালো রঙের ব্লাউজ পরলো। গভীর কাজল টেনে দিলো চোখে। গোলাপি রঙের গোল টিপ পরলো কপালে। ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপ গ্লস। চুলে গুঁজে দিলো মাহমুদের পছন্দের ফুল বেলি।

পান্নার সবকিছু জুড়ে প্রাধান্য পায় মাহমুদের পছন্দ। ব্যপারটা এমন নয় যে মাহমুদের চাপানো কিছু, পান্নার ভালোলাগে ওর পছন্দে নিজেকে সাজাতে। কেউ যখন মিশে যায় অস্তিত্বের সঙ্গে, বুকের বাতাসে, তখন তাকে ছাড়া অন্য কিছু আর ভাবনায় আসেও না

সাজসজ্জা শেষে পান্না আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখছে। অপরাহ্নের নরম আলোয় খুব সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে। কাঁধের দু’পাশে তখনো কিছু ভেজা চুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। চুল থেকে দু’ এক ফোটা জল চুঁইয়ে পড়ছে অধরে। সূর্যের আলো এসে সে জলের উপর হীরের মতো চিকচিক করছে। বাতাসের একটা আদুরে ঝাপ্টা এসে ওর চোখেমুখে লাগে। এমন স্নিগ্ধতায় ওর বেশ প্রশান্তি লাগে। পান্নার মনে হয়, এ বাতাস নয় মাহমুদের স্পর্শ।

পান্না বারংবার আয়নায় নিজেকে দেখতে থাকে। নিজের মুখের দিকে নিজেই অপলক চেয়ে থাকতে থাকতে চারপাশ কেমন কুয়াশাবৃত হয়ে আসে।

– অপূর্ব সুন্দর লাগছে তোমাকে !

পান্না স্পষ্ট মাহমুদের গলা শুনতে পায়। ওর ঘ্রাণ পায়। ওর পদধ্বনি পান্নার চেনা। কোথায় মাহমুদ! ও হন্যে হয়ে এ ঘর হতে ও ঘর উম্মাদের মতো মাহমুদ কে খুঁজতে থাকে। কোথাও ওকে না পেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।

মাহমুদ কে না পেয়ে পান্না আবারো বিমর্ষ হয়ে পড়ে। হতাশার সাগরে ডুবে যেতে থাকে। হাহাকার ঘিরে ধরে। দু-চোখ বেয়ে অশ্রুজল গড়িয়ে পড়ে। ওর চিবুক বেয়ে কাজল ভেসে যায় সে অশ্রুজলে।

শেষ বিকেলের হলুদ আলোয় পা ডুবিয়ে পান্না ব্যালকনিতে এসে বসে থাকে চুপচাপ একাকী। বাড়ীর সামনের আঙিনায় ফুটে থাকা হরেক রকমের ফুলের ঘ্রাণ ভাসছে বাতাসে। ওর বাড়ী থেকে কয়েক হাত দূরে, বরাবর সামনের বাড়ীর আঙিনায় চোখ যায়। আইরিশ এক বৃদ্ধা সাজি হাতে ফুল তুলছে। ফুলের বাগানটা বেশ গুছানো। তাঁর বাগানে অপরুপ হাইড্রেনজিয়া, লিলি, আজালিয়া ফুটে আছে। বৃদ্ধা ফুল তুলছে আর ঝিরিঝিরি হাসছে, যে হাসি ফুলের সুভাসের মতো ছড়িয়ে পড়ছে বন-বনান্তরে। বৃদ্ধার সহজ হাসি, ফুল বাগানের গুছানো এমন নিখুঁত সৌন্দর্যেও পান্নার মন স্থির হয় না। ইদানীং পান্নার স্বাভাবিক গুছানো কিছুই ভালো লাগে না। ওর শুধু মনে হয় মানুষের সাজানো জীবন যেখানে বিপন্ন, সেখানে মানুষবিহীন সাজানো প্রকৃতি দিয়ে কী হবে? প্রকৃতির খেলা বোঝা দায়! প্রকৃতিকে বুঝবার বা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা মানুষের নেই।

রাজার মতো বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাক বড় গাছটির দিকে তাকায় পান্না। সবুজের ফাঁক গলে পাখীদের গান ভেসে আসছে। আকাশের শরীরজুড়ে এখনো কাশফুলের মতো সাদা মেঘেরা দুলছে। এমন নিপুণ আল্পনা আঁকা দিন মাহমুদ কে ছাড়া পান্নার কাছে ধূসর লাগে। অসাড় লাগে সবকিছু।
ব্যালকনি থেকে উঠে এসে রুমে গিয়ে ঝাপ্সা চোখে পান্না দিন-পঞ্জিকা দেখে, গুণতে থাকে কতদিন মাহমুদের স্পর্শ পায় না।

সন্ধ্যাকালীন আবছা আলোটুকুও হারিয়ে যায় রাতের অন্ধকারে। রাত পান্নার কাছে এখন এক গভীরতম বেদনার নাম। পান্নার মনে প্রশ্ন জাগে, করোনা ঘরবন্দী করেছে তবে প্রাণটাকে কেন বন্ধী করলো না? স্পর্শ, সোহাগ কেড়ে নিয়েছে তো অনুভূতি, বোধ কেনো কেড়ে নিলো না? বুকের ভেতর কান্না জমে জমে বরফ হয়েছে। পান্না জানে না কবে এই বরফের পাহাড় ভাঙবে মাহমুদের স্পর্শে !

ডিম লাইটের মৃদু আলোয় ধোঁয়া উড়া ব্লাক কফির সঙ্গে পান্না ওর ডায়েরি নিয়ে বসে। প্রতিদিন ডায়েরি লেখা পান্নার অভ্যাস। ও প্রতিদিন মাহমুদের জন্য মনের কথাগুলো গুছিয়ে লিখে রাখে ডায়েরির পাতায়।

পান্না আজ ডায়েরি খুলে লিখতে থাকে, ‘আর কতদিন তোমাকে ছাড়া সয়ে যেতে হবে এই দহন? আমাদের মাঝখানের দূরত্ব কবে ঘুচবে? আমার খুব কষ্ট হচ্ছে মাহমুদ! স্পর্শ ছাড়া মানুষ কেমন করে থাকে? প্রিয়জনের স্পর্শ ছাড়া কী মানুষ বাঁচে!’

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত