| 25 জুন 2024
Categories
ইরাবতীর বর্ষবরণ ১৪২৮

ইরাবতীর বর্ষবরণ গল্প : চৌখুপির আনন্দ । পলি শাহীনা

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট
বেশ কিছুদিন আগে অনামিকা একটা বেলি ফুলের গাছ এনে বারান্দার টবে লাগিয়েছে। বিক্রেতা খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিল, কয়েকদিনের মধ্যেই ফুল ফুটবে। বিক্রেতার কথা শুনে অনামিকা তো  মহাখুশি। পরিচর্যার কোন কমতি ছিলো না। কিন্তু ফুল ফোটেনি। অনামিকাও অনেকটা আশা ছেড়ে দিয়েছে। হঠাৎ একদিন সন্ধ্যাবেলার আলো-আঁধারিতে অনামিকা দেখে, গাঢ় সবুজ পাতার ফাঁক হতে ধবধবে সাদা বেলি ফুল ওকে উঁকি দিয়ে ডাকছে। ফুল ফুটেছে! ফুল ফুটেছে! অনামিকার ভারী আনন্দ হলো! ঘরে সন্ধ্যার আলো না জ্বালিয়ে ও অন্ধকারে চোখ বুঁজে মিশে থাকে ফুলের শরীরে, গাছের সঙ্গে। ও  ধীরে ধীরে ডুবে যেতে থাকে বেলি ফুলের গন্ধে। 
অন্ধকারের শরীর জুড়ে আচমকা অনামিকা একটা ফিসফিস ডাক শুনতে পায়। কে যেন কাঁপা কাঁপা গলায় নাম ধরে ডাকছে। ভালো ভাবে কান পাততেই হুড়মুড়িয়ে ধেয়ে আসে ছোটবেলা। 
‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’  – আনোয়ার চাচার সুরেলা কন্ঠের গান স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে অনামিকা।  ঝোলা ভর্তি ওর প্রিয় বেলি ফুল নিয়ে চাচা ডাকছে। সন্ধ্যায় ফোটা বেলি ফুল পরের দিন দুপুরে ঝরে যাওয়ার আগেই কাক ডাকা ভোরে চাচা ফুল নিয়ে আসতেন অনামিকার জন্য। উঠোনে দাঁড়িয়ে আদুরে গলায় নাম ধরে ডাকতেন। ঘরে তখনো সবার ঘুম ভাঙে নি। চোখ কচলাতে কচলাতে ঘর ছেড়ে উঠোনে নামতেই চাচার ঝোলা ভর্তি বেলি ফুলের ঘ্রাণে অনামিকার ঘুম উড়ে যেত দূর দিগন্তে। 
চাচার হাত থেকে বেলিফুল নিয়ে দু’জনে হেসে হেসে গল্প করতো। চাচা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো। বেলি ফুলের গন্ধ ততক্ষণে উঠোন পেরিয়ে পুরো বাড়ি জুড়ে ম ম করছে। চাচার কাঁধের ঝোলায় অনামিকার মা কিছু চাল-ডিম-আলু দিয়ে দেন। কখনো নারিকেল-সুপারিও দেন। মায়ের হাতের কাছে যখন যা থাকতো, তা দিতো। চাচাও যখন যা পেতেন তাতেই খুশি হতেন। চৌদিক আলো করে হাসতেন। চাচার হাসিতে অনামিকার গোটা দিনটি বেলি ফুলের মতো মিষ্টি হয়ে উঠতো। হাসতে হাসতে অনামিকার হাতে রঙিন কাঠির লজেন্স দিয়ে চাচা বিদায় নিতেন। অনামিকা তাঁর চলে যাওয়ার পথের দিকে অপলক চেয়ে থাকতো। 
আনোয়ার চাচা কোনদিন ‘ভিক্ষা চাই’ বলে কারো উঠোনে চিৎকার করতেন না। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফুলের বিনিময়ে যে যা দিতেন তা নিয়ে আনন্দে দিন কাটাতেন। 
অন্ধকারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সদ্য ফোটা বেলি ফুলের ঘ্রাণ তীব্র হয়ে উঠে। মনের আকাশ ভেঙে অনামিকার চৌখুপি জুড়ে নেমে আসে স্মৃতিঝড়। ঝড়ের বেগে অনামিকার চৌখুপিতে সবকিছু অন্যরকম, এলোমেলো লাগছে।
অনামিকা গ্রাম ছেড়ে ইট-কাঠের দেয়াল আর দেয়ালের ঠাসাঠাসি ভীড়ের চৌখুপির জীবন বেছে নিলেও গ্রাম ঠিকি রঙ-রুপ-গন্ধে ওকে প্রিয়জনের মতো আগলে রেখেছে। গ্রামের সহজ জীবন, অনিন্দ্য সুন্দর সব অনুভূতি ওকে সুখ দেয় এ চৌখুপিতে। ওর অনুভূতির উঠোন জুড়ে গ্রামের মমতাময় দৃশ্যগুলো ফুল হয়ে ফোটে, সুবাস বিলায়। জীবনের কাটাকুটি খেলায় অনেক বছর আগে গ্রাম ছাড়লেও, ফেলে আসা গ্রাম খানি চায়ে ভেজা বিস্কুটের মতো ওর বুকের গহীনে লেপ্টে আছে। এত এত বছর পরও এ অন্ধকার চৌখুপিতে অনামিকার গ্রাম কোজাগরী পূর্ণিমার আলো হয়ে কলকল করছে। 
মাথার উপরের চৌখুপির ছাদটিকে প্যারাসুটের মতো উড়িয়ে দিয়ে অনামিকার কল্পনা বিলাসী মন ওর গ্রামটিকে পরম আদরে ছুঁয়ে দেয়। গ্রাম ওকে শীতল ছায়া বাড়িয়ে দেয়, কড়ে আঙুল বাড়িয়ে কাছে ডাকে। অনামিকা আর ওর গ্রাম, পরস্পর পরস্পরকে ছুঁয়ে অনন্ত ভালোবাসায় ডুব দেয়। 
তপ্ত দুপুর গড়িয়ে নকশা আঁকা নরম বিকেল নামে। বিকেলের ভাঁজে ভাঁজে চালতা ফুলের সুবাস ওকে ব্যাকুল করে তোলে। অনামিকাদের বাড়ির দক্ষিণ দিকে বাঁশঝাড় পেরিয়ে ঘণ অরণ্য, তার মাঝখানে চালতা গাছ। কিন্তু ওই অরণ্যে যেতে কড়া নিষেধ আছে। চালতা গাছে নাকি ভূতপ্রেত থাকে। কে শুনে কার মানা! মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনামিকা ঠিক চলে যায় চালতা ফুলের কাছে। দীর্ঘ সবুজ পাতার আচ্ছাদন সরিয়ে বেলি ফুলের মতো সাদা নরম পাপড়ির চালতা ফুল নিয়েই তবে ও বাড়ী ফিরে। 
‘চালতা ফুল কি আর ভিজিবে 
না শিশিরে 
জলে নরম গন্ধের ঢেউয়ে?’
(জীবনানন্দ দাশ)
আহা! সে কোন ছেলেবেলায় ডুবে অনামিকা আজ আনন্দে ভেসে চলছে! 
আষাঢ়ের কালো আকাশের মত চৌখুপির মন কেমন করা বন্দি জীবনের থৈ থৈ অন্ধকার মুছে দেয় হোগলা বন। মাথার উপর পাখীর দল বৃত্তাকারে উড়ছে আপনমনে। পদ্মপাতায় টলমল করছে পানি। কলা গাছের ভেলায় চেপে হোগলা বন, পাগলা হাওয়ায় চুল উড়িয়ে, কচুরিপানা ডিঙিয়ে অনামিকা দূরন্ত উচ্ছ্বাসে এগিয়ে চলছে পদ্মফুলের দিকে। কী আনন্দ! কী আনন্দ! যে আনন্দ সমস্ত বিষন্নতা মুছে চৌদিকে  ছড়িয়ে পড়ছে। অলৌকিক এক ভালোলাগার  শিহরণে অনামিকা থরথর কাঁপছে। 
চৌখুপির গর্ভে প্রাণ যখন আকুলি বিকুলি করছে,  তখনই সবুজ মাঠ পেরিয়ে বুড়ো বটগাছটি অনামিকার কাছে চলে আসে। গাছটির নাম দিয়েছিল ও ঘুম গাছ। এ গাছের নিচে কাঁধের গামছা বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে দেখেছে কত চেনা অচেনা মুখ। একদিন আনোয়ার চাচাকে দূর থেকে ও দেখেছিল মকবুল চাচার সাথে উচ্চস্বরে কথা কাটাকাটি করতে। তাঁদের গলার শব্দ পাচ্ছিলো কিন্তু কী নিয়ে কথা বলছে তা পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিলো না। একটুখানি এগিয়ে যেতেই তাঁদের তর্কের বিষয়বস্তু জানা গেলো। আনোয়ার চাচা আর মকবুল চাচা তাঁরা প্রাণের দোস্ত। মকবুল চাচা গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যেতে চাইছে। তাঁর যুক্তি হলো, গ্রামে অভাবী মানুষের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। অনেকের ভিক্ষা দেয়ার সামর্থ্য নেই। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভিক্ষা চেয়ে তাঁদের বিরক্ত করতেও ভালো লাগে না। ভিক্ষা চাইলে ভিক্ষার পরিবর্তে দেখা যায় মানুষের অসহায় মুখ, দীর্ঘশ্বাস। মকবুল চাচার যুক্তি খণ্ডন করে আনোয়ার চাচার উত্তর হলো, ‘যতই অভাব থাকুক আমি গ্রামেই থাকবো। তুই যেখানে খুশি যা আমি গ্রামেই গেঁড়ে থাকবো। গ্রাম আমার স্বর্গ, গ্রাম আমার শান্তি। শহরে গেলে বেলিফুল, কাশফুল, ভাটফুল, মাটির গন্ধ কই পাবি? ইষ্টিকুটুম পাখির ডাক শুনবি কোথা থেকে? এ গ্রামের ছায়ায় কত পাখি ডাকে, ফুল ফোটে, পূর্ণিমার আলো ঝরে, পাতা উড়ে। গ্রামে অভাব থাকলেও মানুষের মন আছে, হাসিমুখে কথা বলে। শহরে শুনেছি কেউ কারো খবর রাখে না। সবাই খালি দৌড়ায়। পাশাপাশি থেকেও কেউ কাউকে চেনে না। কোথাও কোন বিষয়ে উনিশ থেকে বিশ হলেই মাথায় তুলে আছাড় মারে। আন্তরিকতা নেই বললেই চলে। আছাড় খাওয়ার জন্য তুই শহরে গেলেও আমি এই গ্রামের মায়ায়, বটগাছের ছায়ায় পড়ে থাকবো। শহরের লাল-নীল আলোতে নয়, গ্রামের জোনাকি পোকার আলোয় বাকি জীবন কাটিয়ে দেব।’
অতঃপর, ঠিক ঘুম গাছটির নিচে এসে দু’জনের তর্কের অবসান হয়। পরস্পর পরস্পরকে হাসিমুখে বুকে জড়িয়ে ধরে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। 
এ গাছটির নিচে বসলে অনামিকারও ঘুমে দু’চোখ জড়িয়ে আসতো। ওর অনেক খেলার সাথী ছিল। ওরা একসঙ্গে মাটি-কাদায় পা ডুবিয়ে দিনভর হৈ হুল্লোড় করতো, খেলতো। খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে সোঁদামাটির গন্ধ শরীরে মেখে একসঙ্গে বুড়ো বটগাছটির নিচে ঘুমিয়ে পড়তো। ঘুম ভেঙে করবীর কন্ঠে গান শুনতো। বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র করবী গান শিখতো। করবীর মিহিন গানের গলা ছিলো। ও মনের সবটুকু দরদ ঢেলে একের পর এক গান গেয়ে যেত। অনামিকা দেখেছে গীত বিতান সব সময় করবীর মাথার পাশেই থাকতো। বৌ চি, কুতকুত খেলার সময় ও সুর করে গান গাইতো। অন্য বন্ধুদের কেউ কেউ তখন বটগাছের ডালে বসে পা দুলিয়ে ওর গান শুনতো। মোহন বিকেলের শরীর জুড়ে করবীর সুর খেলে যেত। করবীর কন্ঠে রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল সংগীতের মূর্চ্ছনায় কখনো কখনো বন্ধুরা উদাস হয়ে পড়তো, কখনো বা খিলখিল করে হাসতো। 
তারপর অথৈ আঁধার নেমে আসার আগেই বিদায় নিয়ে যে যার গৃহে ফিরে যেত। 
জীবনের সমস্ত দায়িত্ব পালন করতে করতে অনামিকা এক যন্ত্র মনুষে পরিণত হয়েছে। ভুলে গেছে বন্ধুদের কথাও সেই কবে। বাস্তবতার ঘানি টানতে গিয়ে শৈল্পিক অনুভূতিরা ভোঁতা হয়ে পড়েছে। ক্লান্তি জমেছে আপাদমস্তক জুড়ে। বরফের মতো জমে যাওয়া ছোটবেলার সুর, কাঁচের মতো ভেঙে যাওয়া ছোটবেলার সম্পর্ক, অনামিকার চৌখুপির সব দীর্ঘশ্বাস মুছে সদ্য ফোটা বেলি ফুলের মতো দুলছে। বন্ধুদের নূপুরের ঝুমঝুম আওয়াজ বাজছে ফুসফুসের বাতাসে।
কত যে সুখস্মৃতি গল্প বলে যাচ্ছে। অনামিকা সুখ সাগরে সাঁতার কাটছে, গল্প শুনছে।
পূর্বের রাস্তা ধরে হেঁটে যেত পাশের বাড়ির মামুন। ও শহরে পড়াশোনা করতো। ছুটিতে বাড়ি এলে অনামিকাদের বাড়ি আসতো। মামুনকে অনেক দূর থেকেও আলাদাভাবে চিনতে পারতো অনামিকা। ক্যাসেট, বই উপহার হিসেবে মামুনের কাছ থেকে পেতো অনামিকা। বিষয়টি অনামিকার বড় ভাইয়ের দৃষ্টিগোচর হয়। সে থেকে মামুন বাড়ী এলে অনামিকার ঘরের বের হতে মানা। 
বসন্তের নরম রোদ জড়ানো বিকেল। জানালার পর্দার আড়ালে মামুনের মুখ, অনামিকা অপলক  ছায়া দেখে, জানালার পর্দা ছুঁয়ে দেয়, কত কথা বলে। হঠাৎ সমস্ত নজরদারি ফাঁকি দিয়ে জানালার পর্দা ভেদ করে একটা মিষ্টি বাতাস এসে অনামিকার গায়ে লাগে। ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে অনামিকার মন দোলে। 
অনামিকার এ অনুভূতির কথা কোনদিন মামুনের জানা হয় না। ফেলে আসা সময়ের সে বাতাস কোথা হতে হুড়মুড়িয়ে ভেসে এসে অনামিকাকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরেছে?কে জানে! ও দুলছে উচ্ছ্বাসে, ঠিক সেদিনের মতো। 
কী আশ্চর্য! বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধ, বটগাছটির ঝিরঝিরে হাওয়া, এ চৌখুপিতে এসে অনামিকার চোখের পাতায় দোল খাচ্ছে। ও দুলছে, নাচছে, আনন্দ উল্লাসে। দুধের মতো সাদা আকাশ ভেঙে অন্ধকারের পাহাড় ঠেলে ওর বন্ধুদের মধুর কন্ঠ ভেসে আসছে কানে। জগতের সমস্ত সুন্দর এসে ভীড় করছে যেন এ চৌখুপিতে। ওর বন্ধুরা নাম ধরে ডাকছে আর বলছে, চলো বেরিয়ে পড়ি অজানার পানে। ওরা গলা ছেড়ে গাইছে, জীবনের গান। গানের শরীর জুড়ে কত কত আদর, ভালোবাসা। 
আকাশচুম্বী দালানকোঠার ভীড়ে অনামিকার চৌখুপিটি কানায় কানায় ভরে উঠে সুখ সুখ গন্ধে। বেলিফুলের তীব্র ঘ্রাণ আর ছোটবেলার আস্কারায় ওর হাতদুটো যেন ডানা হয়ে উঠেছে। সুখের বন্যায় ও ডানা মেলে উড়তে থাকে মুক্ত আকাশে। ওর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়ছে লাল-সবুজ ঘুড়ি। ও উড়তে উড়তে চলে যায় আনোয়ার চাচা, আম্মা, মামুন, অরণ্য পেরিয়ে চালতা ফুল, হোগলাবন, পদ্মফুলের কাছে।
ফুলেল সুভাস, মুগ্ধতা ঘেরা সব দৃশ্য আর খাঁটি মায়ায় জড়ানো মানুষের ছায়ায় ঘেরা ছিল অনামিকার ছোটবেলা। মা – আনোয়ার চাচা আজ মনের দেয়ালে ছবি হয়ে আছে। ব্যস্ততার কাদাজলে নিমজ্জিত অনামিকার বহুদিন মায়াবী ছবিগুলোর সামনে দাঁড়ানো হয় নি। ছবির সামনে দাঁড়াতেই নিজেকে খুঁজে পায়, চোখ ভিজে আসে। মন খারাপের অন্ধকার সরিয়ে অনামিকার মনে হয়, ও যেন রুপোলী মায়ার চাদর জড়িয়ে চাচার গল্প শুনছে। মা ঠিক ওর পাশে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এইতো বেশ সুখ সুখ লাগছে। আনন্দ লাগছে। ছোটবেলায় যেমন করে সুঁই সুতো দিয়ে বেলি ফুলের মালা গাঁথতো তেমন করে ও আজ মা-চাচা- ফুল দিয়ে ভালোবাসার মালা গাঁথছে মনের ক্যানভাসে। কী যে ফূর্তি লাগছে! বাতাসের চেয়েও বেশি বেগে ওর মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ছে। অনাদি-অনন্ত ভেঙে এবার অনামিকার দু’চোখ ভেঙে ঘুম নামছে। 
কবুতরের বাসার মতো বিষন্নতায় ঘেরা চোখুপির জীবন আনন্দে ভরে উঠেছে। আহা! ভালোবাসা! স্মৃতিঝড়ে বিঃধ্বস্ত  অনামিকা হড়বড় করে চৌখুপির সবকটা জানালা খুলে দেয়। বাতাসের শরীর বেয়ে ঘরের মেঝেতে আনন্দ লুটোপুটি খায়। জানালার চওড়া কার্নিশজুড়ে সাজিয়ে রাখা মানিপ্ল্যান্ট সহ বিভিন্ন ফুলের টবগুলো বাতাসে কাঁপছে। কী অনাবিল সুন্দর! আরাম কেদারায় পা ছড়িয়ে দোল খেতে খেতে অনামিকা ওদের আলতো করে ছুঁয়ে দেয়। 
অনামিকা চৌখুপি থেকে কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি পেয়ে দুলছে আর বেলি ফুলের সুবাস শুঁকছে। কতদিন বদ্ধ এ চৌখুপিতে নিজেকে ছুঁয়ে দেখবার অবসর মেলে নি অনামিকার। বহুদিন পর নিজেকে ছুঁয়ে দেখার আনন্দ প্লাবনে ও ভাসছে। হিম হিম ঠান্ডায় বেলি ছুঁয়ে থাকে অনামিকাকে, আর অনামিকা ছুঁয়ে থাকে প্রিয়  বেলিকে। কী নিশ্চিন্ত ওরা পরস্পরকে ছুঁয়ে। 
ডোর বেলের অনর্গল বেজে চলা ঝাঁঝালো শব্দে অনামিকা যেন গতজন্মের ভেসে বেড়ানো চরাচর থেকে এক হেঁচকা টানে বর্তমানে ফিরে আসে। 
– দরজা খুলতে এত দেরি হলো কেন? 
– ডুবে ছিলাম। 
– কোথায়? 
– ছেলেবেলায়। 
উত্তর শুনে তমাল ভ্রু কুঁচকে তাকায়। অনামিকা আগেই জানতো, তমাল ওর অনুভূতিগুলোর কোন অর্থ বুঝবেনা। তবুও বলার জন্য বলে। তমালকে ফ্রেশ হতে বলে, ও চলে যায় রান্নাঘরে। মনের বারান্দায় একান্ত আনন্দগুলোকে থরে থরে সাজিয়ে, ও ব্যস্ত হয়ে উঠে টেবিলে রাতের খাবার সাজাতে। 
‘তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন, মন রে আমার। 
তাই জনম গেলো, শান্তি পেলি নারে মন, মন রে আমার। ‘
হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, কিছুই মানুষের আয়ত্বের মধ্যে থাকে না। অন্ধকার আরো গাঢ় হয়। অনামিকা রাতের আকাশের দিকে চুপচাপ চেয়ে থাকে। ঠিক তখনই কোন এক নাম না জানা রাত জাগা পাখী ইঁটকাঠের ফাঁকফোকর থেকে ডেকে উঠে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত