| 3 মার্চ 2024
Categories
প্রবন্ধ সাহিত্য

বুকের ভিতরে বুক, আর কিছু নয় । শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়

 

আমি যখন অনঙ্গ অন্ধকারের হাত দেখি না, পা দেখি না

আনখশির রাজনৈতিক কাজেকর্মে ডুবে থাকা আমার যে বরিশালি বন্ধুটি ইদানীং চোখের সামনে চালশের চশমা ঝুলিয়েছে, এ তার সদ্য যুবকবেলার কথা। হৃদয়পুরের জটিলতা তখনও গোষ্ঠী সংক্রমণের মতো আক্রান্ত করত আমাদের গোটা বন্ধুদলকে। তেমনি এক সন্ধ্যায় যখন আমার ঘরে উপচে পড়ছে অ্যাশট্রে, সে একের পর এক আউড়ে গেছে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা। এ ঘটনা খুব আশ্চর্যের নয় যে পরাভূত মন লিরিকের আশ্রয় খুঁজবে। শক্তির কবিতার সিগনেচার টিউন: ‘যাব না আর ঘরের মধ্যে ওই কপালে কী পরেছ কখন যেন পরে’ কিংবা ‘মনে পড়লো, তোমায় পড়লো মনে’, অথবা তত বিখ্যাত নয় ‘অবশ্য রোদ্দুরে তাকে রাখবো না আর/ ভিনদেশি গাছপালার ছায়ায় ঢাকবো না আর/ তাকে শুধুই বইবো বুকের গোপন ঘরে/ তার পরিচয়? মনে পড়ে মনেই পড়ে’— এইসব উচ্চারণ খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সন্ধে শুধু এ সুরে গড়ায়নি। বন্ধুটি ক্রমেই এগিয়ে গেছে: ‘সমুদ্র কি জীবিত ও মৃতে/ এভাবে সম্পূর্ণ অতর্কিতে/ সমাদরণীয়/ কে জানে গরল কি না প্রকৃত পানীয়/ অমৃতই বিষ/ মেধার ভিতর শ্রান্তি বাড়ে অহর্নিশ’ থেকে ‘শাদা পাতা। আক্রমণ করো।/ তীর যোথো কাঠের ধনুকে,/ পুরনো বিষাক্ত তীরে আক্রমণ করো—’ কবিতাটি হয়ে ‘ছিলো অনেক রাজার বাড়ি/চকমিলানো হাজার গাড়ী/ এবং হ্রদে সোনালি অগণন/ হাঁসের দল দোলায় পাখা/ তবু তোমার সঙ্গে থাকা/ চমৎকার জুলেখা ডবসন’ পর্যন্ত। এতটাই আচ্ছন্ন ছিল সে, কবিতা যে ক্রমশ ছাপিয়ে যাচ্ছে তার তাৎক্ষণিক আবেগের পরিধি, পালটে যাচ্ছে মেজাজ, তাতে সে আদৌ অস্বস্তি বোধ করছিল না। আমার বন্ধুটি যে প্রবল স্মৃতিধর এমন নয়, তবে কবিতা সে মনে রাখত অনায়াসে। অবশ্য আমার আস্তানায় আর কিছু না থাক, শক্তির ‘পদ্যসমগ্র’ পরপর সাজানো থাকত। তখন খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশিত হচ্ছিল সে-বই। সপ্তমটি প্রকাশিত হয় দু-হাজার সালে। কিন্তু শক্তির কবিতা (না কি পদ্য) পূর্বাপর পড়ার যে-বাসনা সেসময় আমার মধ্যে সক্রিয় ছিল, তার অঙ্কুরে আছে বেশ খানিকটা লাঞ্ছনার ইতিবৃত্ত।

সেটা নিশ্চিত নভেম্বর মাস। মাত্রই কিছুদিন হল কলকাতার কলেজে পড়তে এসেছি। সেবছর মার্চের ২৩ তারিখ সকালে শান্তিনিকেতনে মৃত্যু হয়েছে শক্তির। তাই কলেজের প্রবেশিকা পরীক্ষার দিন দেখেছিলাম মহানগরের শিশুদের অভিভাবকেরা শেষবারের মতো মনে করিয়ে দিচ্ছেন খুব গুরুত্বপূর্ণ ‘টপিক’ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের যাবতীয় পয়েন্ট। আমি নালায়েক মফস্বলী প্রায় বিনা প্রস্তুতিতে পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে দেখি শক্তিময় হয়ে আছে কলেজের পোর্টিকো। সেদিন অবশ্য শক্তিকে নিয়ে কোনো প্রশ্নই আসেনি। কিন্তু ঘটনাচক্রে এই কলেজেই শক্তি আমাদের বঙ্গভাষা ও সাহিত্য বিভাগ আলো করে ছাত্র ছিলেন কিছুকাল। সুতরাং নভেম্বরে আমাদের বিভাগের ওপর মহৎ দায়িত্ব বর্তাল প্রাক্তন ছাত্র ও প্রবাদপ্রতিম কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন পালনের। পদার্থবিদ্যা বিভাগের ঐতিহ্যবাহী গ্যালারি ঘরে এক বিকেলে আয়োজিত সেই সভায় কিন্তু শ্রোতৃমণ্ডলীতে অধ্যাপকেরাই ছিলেন সংখ্যাগুরু। বিকেলের রোদ শুকিয়ে যাবার আগেই ছাত্রছাত্রীরা ছুটির ডানায় ভর দিয়ে গৃহের নিশ্চিন্ততায় আশ্রয় নিয়েছিল। সংকটে পড়েছিলাম আমরা তিনটি পথভ্রষ্ট প্রাণী, যারা তখন সবসময় একসঙ্গে ঘুরতাম। আমাকে বাদ দিলে বাকি দু-জনের মধ্যে আমার সহপাঠিনীর ভদ্রাসন দক্ষিণেশ্বরে এবং অন্য তরুণটি ততদিনে আমার জীবনে কলকাতার রাস্তাঘাটের কলম্বাস রূপে অবতীর্ণ। সংকট এই কারণে যে সেদিনের অনুষ্ঠানের প্রধান ও সম্ভবত একমাত্র বক্তা অমিতাভ দাশগুপ্ত বেজায় কুপিত হয়েছিলেন ছাত্রছাত্রীর একান্ত সংখ্যালঘিষ্ঠতায়। তাই হাতের কাছে, থুড়ি মুখের কাছে, আমাকে পেয়ে তিনি বাজখাঁই গলায় হুংকার ছুড়ে জানতে চাইলেন আমি আদৌ শক্তির কবিতা পড়েছি কি না। তখনও শক্তির সঙ্গে অমিতাভ দাশগুপ্তের বেজায় বন্ধুত্বের ইতিহাস আমি ঘুণাক্ষরেও জানি না। তাই ফাঁদে পা দিয়ে বলে ফেলেছিলাম শক্তির অনেক কবিতাই পড়েছি। অমিতাভ দাশগুপ্ত সে-কথার উত্তরে জানালেন তিনি না কি এক সন্ধেতে শক্তির কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করলে পরদিন সকাল পর্যন্ত অবিরাম চালিয়ে যেতে পারেন। এ অব্দি সব ঠিকই চলছিল। কিন্তু তারপরই তিনি বেমক্কা চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন আমার দিকে ফিরে, আমি কী পারব তেমন? বলাই বাহুল্য সেই নাদান বয়সেও এই সামান্য বুদ্ধিটুকু আমার ছিল যে এমন ক্ষেত্রে বোবার শত্রু থাকে না। তাই অমন আত্মঘাতী ডুয়েল অ্যাকসেপ্ট করিনি। তবু অতগুলো লোকের সামনে পাঁজরে খোঁচা খেয়েছিলাম। সে-খোঁচার শুশ্রূষায় নয়, হয়তো যে-বৃত্তে মেলামেশা ছিল তখন তারও একটা প্রভাব ছিল শক্তির কবিতা পড়ায় আমার এমন মিশনারিতুল্য উৎসর্গীকৃত হয়ে পড়ায়। ব্যাপারটা রীতিমতো আনুষ্ঠানিকও হয়ে পড়ছিল। আমার প্রয়াত বন্ধু সৌগত ঘোষ তখন সবে একখানি গল্প লিখেছে আনন্দবাজারের রবিবারের পাতায়। আমরা তুমুল আলোড়িত বন্ধুর গল্প নিয়ে। প্রায়ই তার আধপাতা কি পৌনে একপাতা লেখা শুনতাম ঢাকুরিয়া স্টেশনের লেভেল ক্রসিং থেকে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে উঠতে আধো অন্ধকার দোকানের পাশে পড়ে থাকা দুটো সিমেন্টের স্ল্যাবে বসে। ঢাকুরিয়ায় তখন আমাদের যাতায়াত ছিল আমাদের প্রিয় এক কবির কাছে। যিনি আবার ঘোরতর লিরিক-বিরোধী। তার কাছে আমরা তখন চিনছি নতুন বাংলা কবিতার মানচিত্র। কিন্তু ফিরতি পথে, রূপনারায়ণের পাড়ে জন্মানো সৌগত আমার কাছে খুব কাঁচুমাচু গলায় স্বীকার করে নিয়েছিল শক্তির লিরিকের ঢেউয়ে তার উথালপাথাল হয়ে যাওয়ার কথা, আর তারপর থেকে আমরা দেখা হলেই কয়েকছত্র শক্তির কবিতা বলে নিতাম। এ-অভ্যেস অবশ্য বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারিনি আমরা। কলকাতার রাস্তায়, রেলওয়ে স্টেশনে, কফিখানায়, গড়ের মাঠে দেখা হতে হতে বছরখানেকের মাথায় শুনলাম কালীঘাটের রাস্তায় একটা বাস পিষে দিয়ে গেছে সৌগতকে। সেদিন আমার যাদবপুরের ডেরায় ফিরে ক্লান্তিকর লেগেছিল সমস্ত দিনের কলরব। তারপর অনেক বার পড়েছিলাম ‘অন্তিম কৌতুকে’ —

কাঠগুলো শ্মশানে পুড়লে চিতা। কবে আমায় পোড়াবে
অমন রুপোলি স্রোতে। পুরুষেরা কখনো চণ্ডাল হয়।
ভালো। রাশি রাশি মহিলা, আমার চিতার
উপর বেঁধে তোমরা উল্লাস কোরো সমস্ত রাত।
জ্যোৎস্নার রেখাটি দ্যাখো দূরে অশ্রুবিন্দুর মতো কাঁপতে
লেগেছে। তোমরা আর কখনো জ্যোৎস্না দেখবে না জানো
আমার বন্ধুরা সব ছায়াহীন হেঁটে অন্য দেশে চলে গেল।।

তারপর থেকে এ কবিতাটি আমি তুলে রেখেছি শুধুই মৃত্যুর অনুষঙ্গে।


বহড়ুতে শক্তির বাড়ির পিছনের পুকুর

মানুষের মতো নয় রক্তে পিত্তে সৌভাগ্যে সরল

চব্বিশ পরগনার প্রত্যন্তের গ্রাম বহড়ু থেকে এক কাঙাল ঢুকে পড়েছিলেন কলকাতায়। সে গত শতকের কথা। বহড়ুর পানাপুকুর আর কলমির গন্ধের সঙ্গে নগর কলিকাতার দূরত্ব কোনোকালেই কমেনি। দু-শতকের ঔপনিবেশিক ললাটলিখন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের আধুনিকতাকে তিনি কেবলই প্রত্যাখ্যান করে গেছেন। লিরিকের তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন মধ্যবিত্ততার পাহাড়। শব্দকে আক্রমণ করেছেন, শাসন করেছেন— আবার শব্দের শাসনও মেনে নিয়েছেন কখনো। ‘বিপ্রকর্ষ তমোময় তুমি’ বলে যে কবিজীবনের সূচনা, তার আনাচে-কানাচে আছে শহরের প্রতিটি বেলোয়ারি সন্ধেয় পর্যুদস্ত হওয়া। তাঁর অলটার ইগো নিরুপম তাই পদ্যে নয়, গদ্যে আসে। বারবার (*)। ফিরে ফিরে আসে আর নির্মাণ করে প্রত্যাখ্যানের নিবিড় বকুলবীথি। এই নিরুপম কখনো স্মৃতিকাতর আবার কোনো সময় প্রবল ক্ষুধা তার। ক্ষুধার আক্রমণে গিলে খেয়ে নিতে পারে আস্ত কলকাতাটাই:

উত্তর দিকে কাগজের অফিস পড়ে। একদল পুলিশ রাস্তার ধার দিয়ে মার্চ করে যাবার সময় আওয়াজ দেয় ‘হল্ট’। চমকে থেমে একছুটে সে গিয়ে ঢোকে কাগজের অফিসে। খবরের কাগজ আগামীকাল তাকে নিয়ে হইচই ফেলে দেবে। ও কাঁধ থেকে জুতোজোড়া নামিয়ে ভদ্রভাবে দোতলায় চলে যায়। যেখানে যত কাগজের রিল ছিল, গুদোম থেকে গুদোম পর্যন্ত সব খেয়ে ফেলে। প্রত্যেক রিপোর্টারের হাত থেকে, সাবএডিটারগুলোর হাতের যাবতীয় ট্রানস্লেশন এবং এডিটোরিয়াল খেয়ে নেমে আসার আগে এক মহীন্দ্রবাবু হে হে করে তাকে অভ্যর্থনা করে। শাঁকালুর মতন পাঞ্জাবি পরা সেই মহীন্দ্র তার কবিতার নিন্দে করেছিল বলে এবং মহীন্দ্র নিজে কবি বলেও গপ করে ওকে মুখে পুরে দেয়। তারপর পুরো আতা গিলে কালো কালো বিচি বের করে ফুরফুর করে ছড়াতে ছড়াতে এবং শিস দিতে দিতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে। খাচ্ছি যখন তখন এমনভাবে খাওয়া যাক বলে একতলায় এক মাদ্রাজি বেয়ারাকে পথে নামার আগেই খেয়ে ফেলে। একটু টক লাগে। এতেই তার জিভের আড় ভেঙে যায়। সে আরও এবং অনবরত খাওয়ার জন্যে তেজস্বী হয়ে ওঠে। মনুমেন্টের তলায় গিয়ে যে রেলিং ভেঙে পড়েছিল তারই দুটো দু-হাতে নিয়ে দাঁতের ফাঁকের ময়লা তুলতে তুলতে জাহাজঘাটার দিকে এগোতে থাকে। . . .কয়েকজন কংগ্রেসি মন্ত্রী টুলের ওপর দাঁড়িয়ে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার স্বপ্ন নিয়ে বিতর্কের উত্তর দান করছিলেন। তাঁদের একে একে এবং আচমকা ধরে গিলে ফেলল নিরুপম। এতক্ষণে লালহৌসের অবিচলতা ভাঙল। নিরুপম ছুটল। রাস্তা ভিজুচ্ছে মেথরগুলো জল দিয়ে। নিরুপমের গরমবোধ হচ্ছিল। হাঁপিয়ে উঠছিল ছোটার জন্য। হঠাৎ মুখের সামনে দেখে মনুমেন্টের পাদদেশে মিটিং করার জন্য এক প্রসেশান— লাল ঝান্ডা, স্লোগান এবং কংগ্রেস সরকারের পতন হোক এবম্বিধ পোস্টার সমেত সেই কম্যুনিস্ট মিছিল। গিলে ফেলল নিরুপম সম্পূর্ণ সেই মিছিলটাকে তার ফ্ল্যাগ-ফেস্টুন সমেত। কোনরূপ রাজনীতি সে সহ্য করতে পারত না। (ক্ষুৎকাতর আক্রমণ)

বলাই বাহুল্য এ ক্ষুধা আখ্যানের আড়াল রাখা ক্ষুধা। বাস্তবে শক্তি (নিরুপমকে এই নামেই সবাই জানে) খাওয়াদাওয়ার শেষে পার্কের রেলিঙের লোহার শিকগুলোকে খড়কে কাঠির মতো ব্যবহার করতেন না। কিন্তু তার চেয়ে কম নাটকীয় নয় তাঁর জীবনকাহিনি। বহু মানুষ নানান রংদার রচনায় শক্তির কীর্তিকাহিনির কথা লিখেছেন। সে-লেখার পরিমাণ এত যে মাঝে মাঝে মনে হয় শক্তির কবিতা নিয়ে আলোচনাকে বুঝি বা কয়েক গোল দিয়ে এগিয়ে গেছে ব্যক্তি শক্তিকে নিয়ে লেখালেখি। নির্ভেজাল সখ্য আর দিনাতিপাতের বর্ণময় আলেখ্য। ১৯৭৫-এ তারাপদ রায় লিখেছিলেন:

শক্তি অর্থাৎ অস্ত্রের গৌরবহীন একা শক্তি চট্টোপাধ্যায়। শক্তিকে আজ-কাল কেউ কেউ ইংরেজিতে মি. পাওয়ার বলে, আমরা বাংলায় বলি বড়োবাবু। বাংলা সাহিত্যের এই নৈশ প্রহরী এখন প্রবাদ প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন, কিন্তু যারা গুজব রটান যে গৃহস্থ পরিবারে সূর্যাস্তের পর শক্তির নাম উচ্চারণ না করে তার বদলে লতা লতা বলা হয়, আমরা তাদের সঙ্গে একমত নই।

এই ছিল জীবিতাবস্থায় কিংবদন্তি শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে বন্ধুদের মত। আজ যদি মেনেই নিই শক্তির পদ্যে আমাদের অমোঘ আকর্ষণের পিছনে তাঁর জীবনযাপনকেন্দ্রিক কিংবদন্তিগুলিরও অনেক অবদান ছিল তাহলে বোধহয় খুব বালখিল্যতা হবে না। খালাসিটোলা, চাঁইবাসার থেকেও আমি বেশি আক্রান্ত ছিলাম মধ্যরাতের কলকাতা শাসনে। তাই মাঝরাতের পরে গোলদিঘির স্তব্ধ সুইমিং পুলের নেহাৎ পলকা রেলিং টপকে জলের প্রায় বুকে বসে ‘কোথায় যেতে চাই বা আর কোথায় যেতে চাই না/ এ নিয়ে মরি অসুখে সুখে— তোমায় কাছে পাই না’ আওড়াতে গিয়ে পুলিশের তাড়া খাওয়া কিংবা অতিক্রান্ত মধ্যরাতে একা যাদবপুর স্টেশনের প্রায় ওপরেই অতিকায় সুকান্ত সেতুর সবচেয়ে উঁচুতে দাঁড়িয়ে প্রথমবার যখন খানিক ছুঁতে পারলাম শক্তির বিষাদ—

উদ্ধার আমারো চাই, পড়ে আছি দুঃখের গভীর
আকাশের নিচে
অনন্ত সময় নিয়ে খেলা করে দুজন বালক
কথাহীন, শব্দহীন, প্রায় জনহীন বনান্তের
নিকটে, একজন ধরে অন্যকে নিশ্চিন্ত ছুটে ছুটে

কিছু কি প্রকৃত কথা নেই ঐ দুজন প্রাণের
দুঃখ নেই?
অন্তত শব্দের জন্যে নেই কোনো উজ্জ্বল কামনা?
আমার উদ্ধার নিয়ে কোন পথে চলে যেতে পারি?
(আমার উদ্ধার/কবিতার তুলো ওড়ে)

সেদিন কবিতার গোগ্রাস-পাঠকই শুধু বলা যেত আমাদের। সদ্য খসানো কৈশোরের খোলস তখনও টাটকা বেশ। মনের কোণে উঁকি দিয়ে যায় যত না-ফোটা ফুলের কুঁড়ি। সাইকেলের সামনের রডে বসা পাড়াতুতো দিদির রুখুচুলে ক্লিনিকপ্লাসের গন্ধ তখন কেমন জুড়ে যাচ্ছে শক্তির ‘কুয়োতলা’র সঙ্গে—

সবিতাদির কাছে অপরূপ কতগুনো গপ্প শুনেচে নিরুপম। দুপুরবেলা কোলের কাছে শুয়ে শুয়ে গপ্প শুনেছে, বিষ্টি দেখেছে বাইরে আর কানের লতি গরম আগুন, সমস্ত শরীর ঝামরে এসেছে জ্বর। সবিতাদি বলেছে, নিরু তুমি কোনোদিন বরিশালে যাও নি? আহা, যাবে কী করে? তোমরা তো এদেশের, তাই না?

বয়েস তোমার কত সবিতাদি?

বয়েসে কী হবে রে পাগল? বয়েস অনেক। চুল পাকবে এবারে।

নিরুপম কেমন যেন বুকের মধ্যে শুনলো, মায়া। কী কষ্ট হচ্ছে সবিতাদির জন্যে। অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে সত্যি। বোঝাতে পারছে না বলে বুক ফেটে যাচ্ছে।

তোমার বর আসে না কেন সবিতাদি? পচন্দ করে না তোমায়? কেন?

পাগল ছেলে, আসবে না কেন, আসবে। আসতে দেরি হবে বুঝলি? অনেক পথ। বুকের মধ্যে চেপে ধরলো ওকে তারপর।

বাবাঃ কি গরম। সবিতাদির নাকমুখ দিয়ে আগুন ছুটছে। জ্বলে যাচ্ছে নিরুপমের গলার কাছটা, কপাল, যেখানে সেখানে নিঃশ্বাস ছিটকে পড়ছে।

তুই যদি আমার বর হতি নিরু, আমার ছেড়ে যেতি না কোথাও। তাই না?

নাই-ই তো। তোমায় যদি ছেড়ে যাবো তবে তোমার বর কেন?

হাসতে হাসতে চুমো খেলেন সবিতাদি। পাগল ছেলে, তুই সত্যিই পাগল নিরু। তুই আমার বর হবি?

হুঁ।

কেমন করে?

কেমন করে আবার? টোপর কিনে দাও।

অনেক পরে যখন পড়েছি শঙ্খ ঘোষের ‘এই শহরের রাখাল’ তখন দেখেছি আমার এই আপ্লুত হয়ে পড়া, কবিতার ছত্রে-গদ্যের বয়নে ক্রমে জড়িয়ে পড়া বস্তুত একধরনের সেলফ আইডেন্টিফিকেশন। শঙ্খ ঘোষ লিখছেন:

যে-কোনো ছেলেরই হতে পারে এটা, অথবা যে-কোনো মেয়ের। এটা হতে পারে নিরুপমের কথা, অথবা অবনীর, অথবা ‘রক্তকরবী’র নন্দিনীর। আর নিশ্চিতভাবে এটা হতে পারে শক্তির— শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের— সমস্ত কবিতাপ্রবাহের একেবারে ভিতরকার কথা। গ্রাম দিয়ে তাঁর কবিতা ভেঙে দিতে চেয়েছিল শহর। প্রাণ দিয়ে তা ভেঙে দিতে চেয়েছিল মৃত্যু। বাল্য দিয়ে, বালক বয়স দিয়ে, তা ভেঙে দিতে চেয়েছিল বুড়ো-হয়ে-যাওয়া জীবন।

হরিণী, হে স্থিরচিত্র, মৃত্যঞ্জয় শিল্পীর তুলিতে

হাওড়ার এক ভিন্নরকম ভাবে সক্ষম যুবকের ছবির প্রদর্শনীর জন্য একটা ছোট্ট ফোল্ডার বানানোর দায়িত্ব জুটেছিল একবার। সাত্যকি বন্দ্যোপাধ্যায় নামে সেই ছেলেটি আড়াই বছর বয়সে দোতলার সিঁড়ি থেকে ছিটকে পড়ে যায়। সেই আঘাতে পর্যুদস্ত হয় তার শিশু-মস্তিষ্ক। যা আর কখনো স্বাভাবিক হয়নি। সময় অনেক ভাঙাচোরার দাগ মুছে দিলেও সে ক্রমেই দূরে যেতে থাকে সুসামাজিকের থেকে। বান্ধবহীন সেই বালক রঙ-তুলি হাতে নিয়ে হাড়-মাংসের পিণ্ডে পরিণত হওয়া থেকে ক্রমাগত নিজেকে পরিত্রাণ করে এসেছে। আমাদের আর্দ্র অবচেতনে প্রতি মুহূর্তে যে নিবিড় সৃজন-প্রক্রিয়া চলে, যা ক্রমশ ভেঙে দিতে পারে জীবনের সরলরৈখিক সীমা, সেই ভাঙনের পথেই হয়তো জন্ম নিতে পারে বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। খণ্ড খণ্ড শিল্পের পুনর্গঠনে যদি গড়ে ওঠে একখানি পরিপূর্ণ মানচিত্র, সেখানে মুহূর্তে টপকে যাওয়া যায় অপরিচয়ের যত পাঁচিল। সাত্যকি বা তার চিত্রকর পিতাকে আমি চিনতাম না। প্রদর্শনীর আগে দেখিওনি। আর সাত্যকির শক্তিকে পড়া তো অসম্ভব ছিল। আমি শুধু নন্দনের সবচেয়ে উঁচু ঘরটায় বসে জানলার সবটুকু হাওয়া মুখে নিয়ে সাত্যকির বেশ কিছু ছবির প্রতিলিপি দেখেছিলাম। সেই রাত্রে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার সময়েই মনের ভেতর পাক খাচ্ছিল কয়েকটা লাইন। ঘরে ফিরে আমার খুব প্রিয় কবিতার বই শক্তির ‘হেমন্ত যেখানে থাকে’-তে খুঁজে পেলাম—

কীসের নিশ্বাস লাগে আমার ছায়ায়?
সে কি এসে ফিরে গেলো অন্ধকার ঘর থেকে দূরে,
কাছে থাকে উপদ্রব— শেষে যাবে ছায়ার ভিতরে
কীসের নিশ্বাস লাগে আমার ছায়ায়—
পা বাড়ালে?

যদি পা বাড়াই
যদি জানলা বেয়ে নিচে নেমে যাই
তাহলে কীভাবে?
সে আমার সঙ্গে নিচে যাবে?
হাওয়ায় হাওয়ায়
এই অন্ধকার ঘর ফুলে ওঠে কীসের নিশ্বাসে
কাদের নিশ্বাস লাগে আমার ছায়ায়?

প্রদর্শনীর ফোল্ডারে ছেপেছিলাম শক্তির এই কবিতা। আর সেই ফোল্ডার যখন পৌঁছয় প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটে কবি প্রমোদ বসুর হাতে, তিনি খানিকক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন কবিতার লাইনগুলোর দিকে তাকিয়ে। ছবির নমুনা আর এই কবিতা— দুটো প্রায় ভিন্নগ্রহের মধ্যে ঝুলন্ত সেতু হয়ে প্রমোদ বসু তখন প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট টপকে পৌঁছে গেছেন আবহমানে। সেই প্রমোদ বসু যিনি জানতেন— ‘অমরত্ব ইচ্ছামাত্র / আসলে সে অবাস্তব জীবনপ্রবাহ’।

শিকড়বাকড় শিকড়বাকড় শিকড়বাকড়

শক্তির ‘পদ্যসমগ্রে’র ৫ম খণ্ডের সম্পাদক মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়, সে-বইয়ের শেষে সংযোজিত গ্রন্থপরিচয়ে ‘ও চিরপ্রণম্য অগ্নি’ বইটির ‘শিকড়বাকড়’ কবিতার প্রসঙ্গে লিখছেন— “ ‘শব্দের আড়ালে কিছু শব্দ ছিলো শিকড় জড়িয়ে’ শিকড়বাকড়— গাছ এবং শিকড়ের সঙ্গে তাঁর একাত্মবোধে সম্ভবত শতাধিক কবিতা আছে, বহু গদ্য লেখা হয়েছে। এই শিকড় খোঁজার প্রবণতার জন্যই সম্ভবত শক্তির কবিতা নিয়ে প্রথম আলোচনা গ্রন্থ ‘শিকড়ে শব্দের ঘ্রাণ’ — লিখেছিলেন প্রয়াত নারায়ণ ইন্দ্র।” শিকড়ের প্রতীক বড়ো প্রিয় ছিল শক্তির। শিকড়ের অনুসন্ধানেই যেন ব্যাপৃত ছিলেন জীবনভর। ফুলের মতো ফুটে ওঠা জীবন যেমন ছিল, তেমনি আকর্ষণ তাঁর শিকড়ে। খরায় ফেটে যাওয়া মাটির বুকে জলের রেখা দেখার মতো, জমির ওপর ঘেঁষটে চলা জীবনে শিকড়ের টান তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে কাঙ্ক্ষিতে বহুবার। কখনো প্রিয়জনের মধ্যেও দেখতে চেয়েছেন শিকড়ের প্রলম্বন। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর যেমন লিখেছিলেন :

এই তো সেদিনও ছিলে কত কাছাকাছি।
বাতাসের মতো ছিলে ফুসফুসের প্রাণ—
ধ্রুবতারকার মতো ছিলে না উত্তরে?
সকলের শুভ হয়ে স্বার্থবিরহিত
ছিলে, এই থাকাটুকু ভারি সুস্থ করে।
প্রকৃত অরণ্যে ছিলে সুদীর্ঘ মানুষ
গাছের মতন ছিলে মাটিতে শিকড়
ছিলে, এই থাকাটুকু বড়ো দীর্ঘ করে
আমাদেরও।
এই তো সেদিন ছিলে কত কাছাকাছি—
আজ নেই, কাছে-দূরে মানুষ, খর্বতা
দেখে মনে হয়, বুঝি গেলে অভিমানে—
কিন্তু, নীলকণ্ঠ তুমি। দীর্ঘ বৃক্ষ তুমি
অরণ্যের।

(নীলকণ্ঠ, দীর্ঘ বৃক্ষ। ‘ঘরোয়া’ দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যা, ২৭ এপ্রিল ১৯৭৯)

নীলকণ্ঠের উপমা আগেও ব্যবহার করেছেন শক্তি বিজন ভট্টাচার্যের প্রসঙ্গে ‘মানুষ বড়ো কাঁদছে’ বইতে। সেখানেও গাছ, মাধবীর লতা। ওই বইতেই ‘ও গাছ, আমাকে নাও’ কবিতায় লিখছেন— ‘হারিয়ে গিয়েছি/ কোনো শিকড়ের হাত ধরে যেতে চেয়েছি ভিতরে/— পথ আছে, পথিক একজন’। মানুষের অন্ধকার, তার ঘরবাড়ি, স্মৃতির পাথর সবটা জড়িয়ে নিয়েই শক্তি চট্টোপাধ্যায়। যে-মেয়েটির সঙ্গে অলৌকিক দুপুর কেটেছিল বেলডেভিয়ার রোডে, ন্যাশনাল লাইব্রেরির সিঁড়িতে, ২৩০ নম্বর বাসে— সে যে পরদিন একটিন বেগন স্প্রে খাবে, তার কোনো ইঙ্গিতও পাইনি। বুকে এমন বেদনা চেপে রেখে কেউ দুপুরের কলকাতায় চিৎকার করে আবৃত্তি করতে পারে ‘যাবই আমি যাবই ওগো, বাণিজ্যেতে যাবই/ তোমায় যদি না পাই তবু আর-কারে তো পাবই’? সে-কবিতার শিকড়েও এমন এমন মৃত্যুগন্ধ লেগে থাকতে পারে তা বোঝার ক্ষমতা আমার ছিল না। সম্পর্কের কোনো দাবি ছিল না। সেদিন পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছিল কলকাতা। এক বোতল ঠান্ডা জল ছিল, সে খায়নি। সঙ্গে ছাতা ছিল না। অনেক পরে শক্তির একটা কবিতার সামনে স্তম্ভিত হয়ে বসেছিলাম দীর্ঘক্ষণ—

তেমন কোনো কড়ার নেই, দেনাপাওনার কথা নেই— থোক হিসেব
দেখা হয়, দেখা না হলে দেখা হয় না
ঘরের মধ্যে বসে মনে হয় না ঘরে বসে নেই
চেয়ারে আচ্ছা করে চড়ে মনে হয় না চেয়ারের নিচেই লুটোপুটি খাচ্ছি
এমন অনর্থক কাণ্ড কেন যে হয় না— মাঝেমধ্যে নিজের ওপর
বিরক্ত হয়ে উঠি

হলে, তোমায় শোনাতে পারতাম
এর উত্তরে কিছু একটা বলতেই হত তোমাকে
শুধু কথাই— কথা ছাড়া মুখচোখের আভাস দেখার মতন নয়
দেখা যায় না— শুধু কথাই
ভেসে আসে, সুদেষ্ণা নেই
কেন? কাল তো ছিল?
কাল ছিল, আজ নেই— সুদেষ্ণা নেই
তেমন কোন কড়ার নেই, দেনাপাওনার কথা নেই— থোক হিসেব
দেখা হয়, দেখা না হলে দেখা হয় না।

শাশ্বতীকে শেষ দেখেছিলাম পঁচিশ বছর আগে। তারপর ওর বয়স বাড়েনি।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত