Śāmīma rējā’ra ēkaguccha kabitā

শামীম রেজা’র একগুচ্ছ কবিতা

Reading Time: 8 minutes
আজ ০৮ মার্চ কবি, কথাসাহিত্যিক ও অধ্যাপক শামীম রেজা’র শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।

    এমন পাগলা বয়স   এমন পাগলা বয়স, ঘুমরাত্তিরে মাটির বাঁশিবুকে ঘুমাইতে পারি না, পাপ স্পর্শ করে না চোখের পাতা পানশালায় সাতাইশ বছর পইড়া আছি, বেহায়া বাতাস পিছন ছাড়ে না- অনুভূতির রহস্য আছড়ে পড়ে বুকে, দুঃখের দেয়ালে ধাক্কা মারে-; পৃথিবীর বুকে ঘুট-ঘুটে আন্ধার নিয়া অনিচ্ছায় শুইয়া থাকি কত কত বছর; চোখের লাই ভাঙে না পুঁথির গয়না পরি সাঁঝবেলায়, শামুকের ভিতর দীঘির ঢেউ গুণি; ইন্দ্রপাশা গ্রামের মেলায় পাশা শিকারীদের সঙ্গে পাশা-পাশা খেলি, ঘুম আসে না; ধূলামাখা চাকতির মতো শবরীর স্তন, সবই কলকব্জা মনে হয়, ছেউরিয়ার ঘাটে সিকিচাঁদ পইড়া থাকে দীঘল দৃষ্টির আড়ালে এসব আমার চোক্ষে ধরে না। ময়নামতির বৃক্ষ-ডালেমধুরাত্তিরে, জলপ্রণয়ী পাখিসাঁতারও ভালো লাগে না; লাঙলের ঘষা খাওয়া রেখাহীন হাত দেইখা- দেইখা মানুষ-জন্ম ভুইলা যাই, আদি-আদিম একই ঘৃণা কামশ্বাস কোথাও ভালোবাসা নাই। পদ্মা-সুরমা-কুশিয়ারা- আগুনমুহা কত কত নদী নাম বুকে বাজে না, ঘুম আসে না; একবার কমলদহে প্রিয়তমার শরীর দাহ হলে কমলারঙের আগুন ছড়ায়েছিল পূর্ণতোয়ার জলে; আর আমি সেইদিন থেইকা সাঁতার কাটছি আগুন-জলের ভিতর, তাতেও মৃত্যু আসে না। এমন পৃথিবীতে ঘুম আসে না মৃত্যু আসে না।         স্ক্যান্ডাল কত কত গুজব তোমায় নিয়ে, কত শত স্ক্যান্ডাল তোমার চাঁদ দুটো নিয়ে অনেক গল্প ছড়ালো পাড়ায় পাড়ায়, মাঠে চাঁদ কেমন কেমন জোছনা ছড়ালো একা একা; সবুজ মায়া… তোমায় নিয়ে পুরাকালে মূর্তি বানানো ছিলো সে সব মূর্তি দেখে কেউ কেউ বললো, এ-তো রাধার, গোপন শৃঙ্গারমূর্তি কেউ বললো অষ্টাদশী নয়, এ তো কিশোরীলো পহেলা শ্রাবণী, কেউ বললো মা-কুমারেশ্বরী এসো তোমায় প্রণাম করি, কেউ বললো ওকে তো চন্দ্রিমা উদ্যানের মূল ফটকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি… আরে ওতো আমার সাধিকা কেউ কেউ বললো, ওতো পদ্মাপাড়ের মেয়ে জেলেদের ঘরেই বেড়েছে, দেখছো না? নাকছাবি প্রবাস থেকে কে একজন চিনে ফেলেছে তোমাকে! সে নাকি দেখেছে লেক অন্টারিয়র পাড়ে একা, .                                      …বিষণ্ণ একা। একজন এসে দাবী করে বসলো, সে তোমার আপন মানুষ; তোমাকে নিয়ে অনেক কথাই হলো অনেক ভালোবাসাবাসী হলো; পাহেল গাঁও থেকে অচেনা এক পাখি এসে জানিয়ে গেল তুমি কে আমার। তুমি একটুতে ভেঙে পড়, একটুতে জল কলঙ্ক গাছের দিকে তাকাতে ভয় চেয়ে দেখো কলঙ্ক গাছেতে ওই ঝুলে আছে, বেহেস্তি-ফল। তোমাকে নিয়ে অনেক কথাইতো হবে অনেক কথাই হয়, অনেক অনেক কথা… তাকিয়ে দেখো তোমার এক বুকে মধুমতি অন্য বুকে জ্বলে সন্ধ্যাতারা।       তোমার তখন পনের ছুঁই ছুঁই   তোমার তখন পনের ছুঁই ছুঁই আমি কেবল সতের ডুব দেই দোলপূর্ণি রাতের শেষে ঝড় মনের গাঁয়ে উড়ছে কবুতর পাছে দোলক দুলছে চারিবেলা কে জানতো সেই দূরাগতের খেলা সেইতো প্রথম নদীর প্রেমে পড়া সেইতো প্রথম মায়ের হাত ধরা সেইতো প্রথম জোয়ার ভাটায় নামা সেইতো প্রথম উজানী গান শোনা সেইতো প্রথম পাহাড় ছুঁয়ে দেখা সেইতো প্রথম সঙ্গী থেকেও নিঃসঙ্গ একা সেইতো প্রথম একলা-দোকলা চলা সেইতো প্রথম নীরব অবহেলা প্রেমের কোনো তীর থাকে না জানি তীরের দিকে সাঁতরে যাওয়া ভুল প্রেম নদীতে সাঁতরে দেখি, তীর নেই এক চুল সাঁতরে গেছি অক্ষরেখা ছেড়ে নিরাবরণ হৃদয় সমুদ্দুরে আসলে কি এমন প্রেমের সাঁতার জানে কেউ হৃদয়ে শুধু আছড়ে পড়ে অনন্তেরই ঢেউ।       আবার নালন্দা অমরত্বেরও মৃত্যু হবে নালন্দা, জোছনার জলজ-অন্ধকারে। সোমরস পান করে ঈশ্বর নামছেন সোমেশ্বরী জলে আমি দশমাস আরাধনায় জাইগা থাকবো সোমপুরে, সোমেশ্বরী থেকে দূরে; তুমি আসবে তন্দ্রায়, চন্দ্রা নদীর ওপারে; আমি ঘুম-মন্দিরায় সুর তুলবো বাকি কয়মাস টেরাকোটার শিল্পিত খোদাইয়ের মাঝে। পোষ না-মানা পড়শি-সকাল ঝুইলা থাকবে পাকুড়-শাখায় আমারও ইচ্ছে হীরক-লকেট হয়া ঝুইলা থাকবো তোমার স্তনের গলিপথে, আরো নিচে আলো-অন্ধকারে। মধুকর মুখ রাখে গর্ভকেশরে ঝিঙার কুসুমে; আমার ঈর্ষা হয় নালন্দা ঈর্ষায় পুইড়া যায় ভিতরের মৌতাত; কুয়াশার ঘুম ভাইঙা গেলে, দেখি, সূর্য ঝুইলা আছে উঠানের আঁড়ায় ছুঁইতে গেলে হাত পুইড়া যায় পোড়াগন্ধে নেশা চাপে আমার; তখন ভিখারির করুন চোখ দেখলে ক্ষেইপা যাই, জানি না, আমি কি তোমার কাছে করুণা ভিক্ষা চাই? ঝাউয়ের পর্দা সইরা গেলে রনটা উধাও; তুমি পউড়া ফেলবে পাখিছানার মতো ছানাবড়া চোখ আমার। বারবার ব্যবহৃত হওয়া নদীর কিনারে যাই, মনে হয় বাদার-জলে আটকে যাওয়া নিশ্চিন্তে হারানো একাকী মাছ। হননচিন্তা মাথায় চাপে, সমুদ্রশকুন ওড়ে ঘনিষ্ঠ ঘ্রাণে কাহুজেপোকা খাইয়া চলে ফুসফুসের প্রিয় অক্ষর বিষাক্ত ছোবল ছাড়াই ঘায়েল আমি এক জীবিত প্রবাল! মৃত্যুর সাথে মুখোমুখি কত-কত বার, এ শরীর শুয়োপোকা হবে গুবরেপোকায় হবে রূপান্তর ছাইজ্বলা ধুলা হয়ে উদ্ভিদে দেবে সার, জাইনাও, নতুন-পুরানো সংরাগে, জিহ্বায়-জিহ্বায় জড়াজড়ি… শৃঙ্গার-নৃত্যে চন্দ্রায় ঢেউ উফবে আমার আরাধনায় তুমি আসবে তন্দ্রায়, চন্দ্রা নদরি ওপারে; আমি ঘুম-মন্দিরায় সুর তুলবো বাকি ক’মাস টেরাকোটার শিল্পিত খোদাইয়ের মাঝে।       হীরামন পাখি   শুষ্ক কাঠের মতন ঠোঁটখানা কেন মেলে দিলে গোপনে, কৃষ্ণনদের দুপাড়ে সবুজের জোয়ার তখন; ভাইসা যাচ্ছে সময়, ভেসে যাচ্ছে অনন্ত, টিনএজ সময়ের অন্তরালে শীতলক্ষ্যা জলে ওদিকে অচ্ছুত বৃষ্টিজল গায়ে মেখে হীরামন পাখি ওড়ে, কবির অন্তরে; কখনো কখনো ভাবি রূপকথা নয়, ট্রোজান যুদ্ধে হেলেনের ঠোঁটে যেন প্রশান্ত মহাসাগর, অশান্ত হয়ে দোলে এশিয়া মাইনর হয়ে হস্তিনাপুরে দ্রৌপদীর আঁচলে; ও ঠোঁট তোমার লক্ষ যুগের আধিয়ার।   চোখ খোল মেঘ, দেখোতো চলন্ত ট্রেনের শব্দের ভেতরে, পূর্ণিমা তিথি হয়ে মনে হীরামন ওড়ে শেষ বিষে দুলছি তুমি আমি হাস্যকর পুতুল তবু অচেনা নদীতে নামি, অন্তিম আলোর খোঁজে।       কীর্তনীয়া নদী কীর্তনখোলা মৃতদের পাঁজরের দাঁড়টানা বাতাসে কীর্তনীয়া নদী কীর্তন খোলা ওঠে উত্তাল ঢেউ আমরা কেউ বলি নদীর দীর্ঘশ্বাস, কৃষ্ণপক্ষে রাধার নৃত্য নাচন বলি কেউ; সময় জানে মাছেদের তীর্থ যাত্রাকালে মুহ্যমান নদী কেমন শান্ত হয়ে চলে অন্তঃসত্ত্বা জারজজলের প্রলয় নৃত্যে ভাঙে অবলা মৃত্তিকার দুইধার…ভাঙনের কবলে মাটির রেণুকণা ভাসে যেন বিধবার শাড়ির শাদাপাড় মৃতরা দাঁড় বায়…আর গুণটানো কত শত কঙ্কালের হাড় অসীমের সাথে ঘর বান্ধে কীর্তনীয়া কোন জন? আমি কি কীর্তনীয়া নদী কীর্তনখোলা যিনি প্রতিদিন পায় ভাঙনের হাজারটা সমন       স্মৃতিতে আগুন নাই এই বিলাপ রাতের, এই বিলাপ অন্ধকারের! স্মৃতি বারবার ঘুরে এসে পরিত্যক্ত লঞ্চ জেটির মতো অবহেলায় কাতরায়, আমার নদী প্রান্তরে; বরফ কুচি ফুল পাপড়ি হয়ে খোঁচায় হৃদয়ে। দেশান্তরি বাতাসের মতো অনেক দূর থেকে তুমি মরা জোছনার আলো গায়ে মেখে, সাপের মুখেই ব্যাঙের শেষ নিঃশ্বাসের মতো গোঙাচ্ছো রুশবাই দেখো উত্তর মহাদেশ ঘুমিয়েছে তোমার বাহুতে; আর বর্ষা বরফ হয়ে জমে আছে আমার মগজে ভীতু সরীসৃপের মতন এ কেমন পথচলা। দেব সভার নর্তকী ছিলে না, তবু নৃত্যে প্রার্থনা সঙ্গীত বেজে উঠতো, ছিল খোপায় বৌদ্ধ বিহার। ও নৃত্যের তালে প্রেমের আহাজারি নয়, আগুন; যে স্মৃতিতে আগুন নাই, সে স্মৃতিতে প্রাণ কোথায়?       সঙ্গম দৃশ্য   হাতের স্পর্শে মৃগনাভিতে ফুটেছে নীলপদ্ম নীলপদ্মের চোখে উদ্বাস্তু রাতের দীঘল ছায়া ছায়ার আড়ালে প্রেম খুঁজে খুঁজে মনের মাটিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রাতের তারারা ক্ষয়ে ক্ষয়ে ভালোবাসার অক্ষরের মতো আমার ক্ষত মনে জ্বলছিল সংগোপনে। তোমার মধুমাখা চুমুতে নরম বৃষ্টি ঝরে, তুমি দেখতে পাওনি প্রিয়ন্তি; বুকের নরম স্বর্গদুয়ার, যেন দূরের বাতিঘর। এ নরম স্বর্গ আমার ভালোবাসার আবাদি জমিন অচেনা লোকের কোলে মিথ্যে মন্ত্র পড়ে যাবে চলে ওই বাতিঘরে অন্য কোনো লোকে বাতি জ্বেলে দিলে স্মৃতিবৃক্ষ কেটে আমি তোমার বাসরের খাটিয়া হয়ে, মৃত কাঠের রূপে তোমাদের সঙ্গম দৃশ্য   দেখবো, তুমিই হেসে উঠবে, অস্ফুট বেদনায়।     বিদেশি মেলায় পূর্ণিমা চুরি করে আঁচলে বেঁধেছিল যেই মেয়ে বসন্ত লুকিয়ে মনে, পথ চলে শ্রাবণে শ্রাবণে তাকে দেখেছি লেক অন্টারিয়র জলে বিদেশ বিভুঁইয়ে জলের কান্নার মধুর শব্দটি বলেছে গোপনে। ওগো মাধুরিমা, চোখেতে গড়েছি আমি খেলাঘর আমার মনবন কেন কাঁদে, হৃদয় পুড়ে যায় হৃদয়ে কথা হৃদয়ে ধরি, তবু কেন তুমি পর অকারণ করুণায় কেন মাধু ডাকে যে আমায় ফুটিতে দেখেনি মেয়ে নীলপদ্ম এতটা বেলায় গরিব দেশের মেয়ে সন্ধ্যা সাঝে নাচে ন্যুড বারে তারই মৌবৃন্তে ফুটে ফুল অচেনা বিদেশি মেলায় বিকালের অবকাশে কোন রোদ কার গায়ে চড়ে। স্বরলিপি লিখে আমি হৃদয়ে এঁকেছি তার গান ছায়াবৃষ্টি শেষে বিদেশেতে হারিয়েছে যেই প্রাণ।       হৃদয়লিপি দুই দুখজাগানিয়া নারী তুমি আলোর দুয়ার খোলো হৃদয়ের বীজ পুতেছি তোর জীবন প্রতিমায় ভিতরে লুকানো অপমৃত্যুর দায়, কে নেবো বলো মাটি জলে নয়, শিকড় লুকানো আছে যে হৃদয়। কাদের নন্দনে খুঁজে পাবো নতুন যুগের মাপ সাধারণ চোখে খুঁজো না তুমি নির্জনতার আলো খোয়ানো প্রেমের রণে এঁকেছো হৃদয়ের সন্তাপ পারদের মতো হৃদয়াবেগ ওঠানামা করা ভালো। ভুলে গেছি অন্তহীন যুদ্ধে প্রিয়তমারই নাম সূর্যের মত ডালিয়া হাসে বুকের উপর পাশে রতির কালে কার দেহ ভাসে, কাকে করি প্রণাম হারানো জলের প্রদাহ প্রবাহ হয়ে মনে ভাসে। যে হৃদয় হারিয়েছে সেই পেয়েছে শাশ্বতের খোঁজ পৃথিবীতে এই লোকসানে লাভ জোটে রোজ রোজ।   তিন   নগ্নিকা ঈশ্বরী তুমি সিজদায় থাকো দেবতার? দেবতারা নপুংসক কেন তাতে মাতো যে কুমারী নাভির অতল বেয়ে শেষ রাত নামে যে তোমার দেহে দেহ রেখে কে-না কেঁপেছে প্রথম ও হে নারী। বৃক্ষের নিঃশ্বাস যেই মানব বুঝতে নাই পারে নিথর পাথরে কী করে প্রাণ দিবে বলো সুন্দরী শিল্পী ছাড়া কে-বা হৃদয়ের মূল্য এঁকে দিবে তোরে নিষিক্ত ভূমিতে তোর রুয়ে দেবো স্বপ্নের মঞ্জরি। পূর্ণতাভরা চোখের গভীরে যে কল্পনা ধরেছি আমিতো পোড় খাওয়া লোক, ভালবেসে বেঁচে আছি বেহেস্ত দোজখ মানুষের তৈরি জেনেছি মানসী আফিম ঘুমেতে যারা তারা ভুলে আত্মাকে বেঁচেছে কামকম্পিতা কুমারী নারী যে বুকে গঙ্গার ঢেউ ধর্ম-ভয়ে ভালবাসা ছেড়ে অরণ্যে যেও না কেউ।     যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে-১ এমন পাগলা বয়স, ঘুমরাত্তিরে মাটির বাঁশিবুকে ঘুমাইতে পারি না, পাপ স্পর্শ করে না চোখের পাতা— পানশালায় সাতাইশ বছর পইড়া আছি, বেহায়া বাতাস পিছন ছাড়ে না—অনুভূতির রহস্য আছড়ে পড়ে বুকে, দুঃখের দেয়ালে ধাক্কা মারে—; পৃথিবীর বুকে ঘুট-ঘুটে আন্ধার নিয়া অনিচ্ছায় শুইয়া থাকি কত কত বছর; চোখের লাই ভাঙে না-পুঁথির গয়না পরি সাঁঝবেলায়, শামুকের ভিতর দিঘির ঢেউ গুনি—; ইন্দ্রপাশা গ্রামে মেলায় পাশা শিকারীদের সঙ্গে পাশা-পাশি খেলি, ঘুম আসে না; ধূলামাখা চাকতির মতো শবরীর স্তন, সবই কলকব্জা মনে হয়, ছেউড়িয়ার ঘাটে সিকিচাঁদ পইড়া থাকে দীঘল দৃষ্টির আড়ালে—এসব আমার চোক্ষে ধরে না। ময়নামতির বৃক্ষ-ডালে মধুরাত্তিরে, জলপ্রণয়ী পাখিসাঁতারও ভালো লাগে না; লাঙলের ঘষা খাওয়া রেখাহীন হাত দেইখা-দেইখা মানুষ-জন্ম ভুইলা যাই, আদি-আদিম—একই ঘৃণা কামশ্বাস—কোত্থাও ভালোবাসা নাই। পদ্মা-সুরমা-কুশিয়ারা-আগুনমুহা কত কত নদী নাম বুকে বাজে না, ঘুম আসে না; একবার কমলদহে প্রিয়তমার শরীর দাহ হলে কমলারঙের আগুন ছড়ায়েছিল পূর্ণতোয়ার জলে; আর আমি সেইদিন থেইকা সাঁতার কাটছি আগুন-জলের ভিতর, তাতেও মৃত্যু আসে না। এমন পৃথিবীতে আসে না—মৃত্যু আসে না।     যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে-৭ যখ রাত্তির নাইমা আসে শিলিগুড়ি পাহাড়ের ধারে, উৎসবহীন ঈদ নামে আমাদের নগরে, সেই একবার কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে হাঁটতে গিয় মনে হইছিল খুব সুরত আমার পৃথিবীর, এমন সুন্দার বুঝি আমাগোরে ডাকে। আর একবার মঙ্গার বাড়ি গিয়া অনাহারী দুইশো একটা লাশ দাফনের কালে কাফনের মইধ্যে খুঁজে পায়াছিলাম বীভৎস সুন্দরেরে; ঠিক তার পরের বছর গাইয়া-গাইয়া চেহারা লইয়া জীবনবাবু আইসা দাঁড়ায়ে ছিলেন মৃতপ্রায় ধানসিড়ি নদীটার ধারে, যখন কি-না লাবণ্যরা হারাইতে থাকে দুল ক্যাসিনোর সিপসি আঁধারে। চে’র ছবি আঁকা খণ্ডিত মুখ বুকে আঁইকা তরুণী হাঁইটা যায় টিভির পর্দায় কিংবা আজিজ সুপারে, উরুসন্ধিতে চিচিঙ্গার ঘ্রাণ। ডাক দিয়া বলি জীবনবাবুরে, আহাজারি করো না, তোমার বনলতা সেন নাটোরের কোত্থাও থাকে না। দেখে যাও এই যে তোমার প্রিয়তমা রূপসীয়া গ্রাম! মাধুরী আর নাদিয়াদের এই বালাখানা, এখানে অঘ্রানে বালাম ধান ওঠে না, অর্ধেক লোক থাকে অনাহারে আর আমরা বেজোড়া প্রতিবেশী—কতক বাটাজোড়ে।     যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে-৪০ আমার পরানি দক্ষিণদুয়ারি দূল দেশেতে বাসম, পশুর নদী লেইখা রাখছে, দুঃখের অভিলাষ! অথচ দুঃখ, বন্ধ্যা সমুদ্রে আমার দ্বীপের নাম; দুঃখ, বুইড়া কালো ঘোড়ার কেশর-চোয়া ঘাম; দুঃখ, ডানায় পচনলাগা ঘাস ফড়িংয়ের বাঁচা-বাঁচা খেলা; দুঃখ, আপন চিবুকের কাছে অচেনা-অবহেলা। পরানি আমার দক্ষিণদুয়ারি বৈদেশেতে বাস; প্রাচীন সকল আসমানী আর জমিনি কিতাবে আঁইকা রাখছে ভালোবাসার চাষ; ভালোবাসা, অলেখা সব জীবনের পদাবলি; ভালোবাসা, রাত্তির নাইমা আসা কুহক-অঞ্জলি; ভালোবাসা, ধড়-কাটা কবুতরের ছটফটানি! আমার পরানি দক্ষিণদুয়ারি জুদি পর্বতে থাকে; যেথায় পাথর-বর্ষণ শেষে লুত জনপদ উল্টে গেছিল বাঁকে; উথলিয়া উঠিল উনুন, পরানি দেখিলো ইলাহা তাহার শুইয়া আছে অ্যাঙ্গোলার কফিক্ষেতে, ঘূর্ণিঝড়ের সমান্তরাল একটি লাটিম ঘোরে, ইলাহার চারিপাশে; ইলাহা তবু ঘুমায় বালিকার ক্লান্ত জলজ চোখে; ইলাহা, আরবের তেলকূপে বাঙালি শ্রমকির কাষ্ঠমাখা হাসি; ইলাহা, চানন নদীর জলে ভাইসা থাকা এক টুকরা চান; ইলাহা, না দেখা প্রেমিকার সাথে ঘুইরা বেড়ানো আমার সাম্পান; ইলাহা আমার পরানির মতো পড়শিবাড়ি থাকে, ধাঁধাময় এক সুরকাহিনীর গাঁয়; ধেয়ান সাগর পাড়ে জলপরীদের ঘরে—মনঘুড়ি উড়ায়; ইলাহা, আমার বাঙালকুমারী সবার অন্তরে বাস, জানি না কো তূণে গোপন রাইখা শিকার করবে হৃদয়ের কারুকাজ।     যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে-৫০ বধূয়া আমার সান্ধ্যপাখির দলে, ধাঁধাময় পাহাড়ে থাকে, পথের বাঁশি হৃদয় মাঝে কাঁপে কোপাই নদীর বাঁকে। রাত্রি শাখায় গোপন মন্দিরা বাজে, চাল রক্তে শরীরখানি তাতে; বধূয়া শোনে, কীর্তিনাশা ছিল না তার সাথে, তবু কেন পিষ্ট হয়াছে এমন বিলাতি রথে, আহা জনপথ! আগাছার তোরে আবাদী জমি কমে। একটা ছোট্ট পাখি উইড়া যায় ওপাড়ে স্বপ্নভূমে. একটা ছোট্ট খরগোশ পালায় গভীর-গহীন-বন; চোয়ালের খুব কাছে, মৃত্যু শুকায় শুক-সংক্রান্তিরাতে, কে-না জানে কীর্তিনাশা জলে, এসব কথা লেখা আছে গাভীনরাত্রি তলে। বধূয়া আসে সান্ধ্য পাখি মেলায়, সদ্যমৃতের নিঃশ্বাস ঘোরে খোলায়, কোপাই নদী থিরথির কইরা কাঁপে, বিলাতি রথ থাইমা গেছে নব্য রথের কলায়; কবিতার বদলে, শ্রমিক ধমনিতে চণ্ডাল রক্ত ফোঁসে, রাত্রি-পরান সুর তোলে মালকোষে। যদিও বধূয়া মুক্ত পাখির দলে, তবু কেন পচন ধইরাছে পাখে, খাঁচায় থাকা পাখির স্বভাব বসে না মগডালে, রক্তে বহে অধীনতা, কথিত মুক্ত হাওয়ায়; সেইদিন থেইকা বধূয়া আমার সান্ধ্যপাখির দাওয়ায়, ধাঁধাময় পাহাড়ে থাকে, পথের বাঁশি হৃদয় মাঝে কাঁপে—কোপাই নদীর বাঁকে।       হৃদয়লিপি-১ আগুন নিয়ে খেলি খেলতে খেলতে কত পুড়েছি মন ঘুমের ভেতর কারা জেব্রারক্ত ঢুকায় শরীরে তুমি কি জানো্ওি মন, দেশলাই জ্বালিয়েছো কখন; ইচ্ছা করে দৌড়ে যাই তোমার ভূমি থেকে প্রান্তরে। তোমার কফিতে চুমু, এ বছর বৃষ্টি হবে খুব তোর মনকে কখনো দুর্গম দুর্গ দ্বার মনে হয় আমাদের স্বর্গ এই দেখো সেনেটোরিয়ামে চুপ ভিতরে ঢুকতে গিয়ে গলিতে থেমে যায় সময়। জোছনার পায়ে চুমু খেয়ে তোকে ভাবিযে বিস্ময় পুরানো বুটজুতার মধ্যে জন্মেছে সাদা ইঁদুর ভিখিরি মতো রহস্যহীন কেন করি অভিনয় মগজে বেঁধে বাসা কলোনির কতিপয় চতুর। অন্তর দিয়াই বলি প্রেমিক প্রেমিকাদের শোনো ঠোঁট যে ঠোঁটকে করে না বিশ্বাস কখনো কখনো।                  

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>