অতীত থেকে অতীতে

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comএকটা কথা বলা হয়নি, আমার মনে হয়, আমি পুনর্জন্ম পেয়েছি। জমিদার বাড়ির কোনো পাইক পেয়াদা গোছের কিছু ছিলাম বোধহয় আগে, নাকি খোদ জমিদারই কে জানে, পুরোনো আমলের বাড়ি দেখলেই জমে যাই। কী যে হয়ে যায় ভেতরে আমার, বলতে পারব না, শুধু মনে হয় বাড়িটা আমাকে ছাড়ছে না। ঘুরে ঘুরে দেখি, ফিরে ফিরে দেখি। যতজনের কাছে যত গল্প আছে বাড়িটা নিয়ে, শুনি। ব্যাপারটা আমার কাছে নেশার মতো অনেকটা। কোথাও বেড়াতে গেলে আগে সেখানে পুরোনো কোনো স্থাপনা আছে কি না জিজ্ঞেস করতাম একসময়। শেষে এমন হলো, পুরোনো বাড়িঘর আছে কি না জেনে তবেই কোথাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতাম।

হাসিবের বাড়িতে সেবার এভাবেই যাওয়া। ওদের ওখানে এক জমিদার বাড়ি আছে। দেখব, ঘুরব, ফিরব। দিন পাঁচেকের সফর। তা, গিয়ে বসতে না বসতেই, দুপুর রোদে, বন্ধু বলল চলো! বললাম একটু থিতু হই, পরিবেশটা বুঝি, তোমাদের নদীটা দেখি আগে তারপর না হয়…। তা না, তার বাই উঠেছে, তখনই যেতে হবে। এতদূরের পথ পাড়ি দিয়ে যাওয়া, ক্লান্ত পা দুটো উঠতে চাইছে না, তবু বাড়িয়ে দিলাম। অবশ্য গিয়ে আর মনে থাকলো না ক্লান্তির কথা।

দোতলা বাড়ি, নিচতলাটা সম্পূর্ণই মাটির নিচে প্রায়। দরজা জানলার উপরিভাগ দেখা যায় কেবল। উঁকি দিয়ে আছে যেন। এমন একটা বাড়ির কথা আমার কোনো একটা গল্প না উপন্যাসে যেন লিখেছি। যাহোক, বাড়িটা দেখে আমার কী যে ভালো হলো বলে বোঝাতে পারব না, লিখতে হলে তো আরও না। পাগলের মতো ঘুরতে লাগলাম চারপাশে। মাটির নিচ থেকে জানালার পর জানালা উঁকি দিচ্ছে। আহা রে, এই জানালা ধরে কতজনই না বিকেল সন্ধ্যা কাটিয়েছে। কত গল্প গাথা জন্ম নিয়েছে এই জানালার বাইল ধরে। দরজার পর দরজা দেখি আর ভাবি কত মানুষ ঢুকত এই ঘরগুলোয়। কত মানুষ হাসত কাঁদত খেলত সারা ঘরে। ভাবি, আর হাহাকারের চিকন সেতার বাজে। বুকের ভেতর সেই বাজনা আমায় বাজিয়ে নিয়ে বেড়ায়। আমি ঘুরতে থাকি। ঘুরতে ঘুরতে দেখি একাই ঘুরছি আমি। হাসিব নেই সাথে। কোথায় গেল? পরেরবার ঘুরতে গিয়েই অবশ্য পেয়ে গেলাম উত্তর। এবং বুঝলাম ওর তাড়াহুড়ার কারণ। বড় বাড়িটার পেছন দিকে একটা ছোট্ট বাড়ি, ভেঙে পড়েছে প্রায়, তার ভেতরে প্রেম ভাজছে গাধাটা। একটা নারী অবয়ব দাঁড়িয়ে রয়েছে সামনে, একটু ভেতর ঘেঁষে, দূর থেকে যেন ঠাহর করা না যায়। কাছে যেতেই পরিচয় করিয়ে দিলো। কী যে স্নিগ্ধ মেয়েটা! পরনে শাড়ি, পুরোনো ধাচে পরা। ব্লাউজের হাতায় ফুলকুচি। পদ্মফোটা ঝিলের মতো চোখ, ভুরুর ফাঁকে দুরুদুরু কাঁপছে কাজলটিপ। আন্তরিক চাহনী, আর পালাই পালাই অভিব্যক্তি। দেখে যেন প্রেমেই পড়ে গেলাম। ডুব দেওয়া হলো না যদিও, গরমচোখে তাকিয়ে আমায় তাড়ানোর ব্যবস্থা করল বন্ধু। তা দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল মেয়েটা। সে হাসি ফেলে আসা কি চাট্টেখানি কথা? তবু, আসতে হলো। এসেই হলো লাভ। বের হতেই এক দাদুর সঙ্গে দেখা। ওপাশে তার ফলের বাগান, চুরির পাঁয়তারা করছি ভেবেই পাকড়াও করেছিল প্রথমে। পরিচয় দিলাম, উদ্দেশ্য জানালাম। কথা বার্তা বলতে বলতে পরে জমেই গেল।

বাড়িটার শুরু কবে কে করেছিল, জানেন না তিনি। তবে শেষটা সবাই জানে। গোপাল ডাক্তার নামকরা লোক ছিলেন এ অঞ্চলে। ডাক্তারিতে হাতযশ তো ছিলই, ছিল দানের হাতও। দু’পাঁচ গ্রামের বহু মানুষ তার দয়াদানে বেঁচেবর্তে ছিল। এমনই একজন হাসমত, গোপালের প্রতিবেশী। তিনিই মানুষ করেছেন ছেলেটাকে। নিজের সন্তান নেই, বালকটাকে পেলে পুষে হয়তো অতৃপ্তি ঘুঁচাতেন। ঘরের পেছনে একটা দালানও তুলে দিয়েছিলেন তাকে। তবে মাথা ছিল গরম ছেলেটার; হুটহাট রেগে যেত, মারামারি বাঁধাত। মানুষ নালিশ করত, মারতে আসত; তবে গোপাল তাকে সামলাতেন ভালোবাসায়। তার বুদ্ধি পরামর্শ আর সাহ-সাহচর্যে ছেলেটার মেজাজ যত কমলো, ততই সে হয়ে উঠল ক্ষুরধার। গোপাল তা নিয়ে গর্ব করতেন খুব, অসম্ভব কোনো রোগীকে সারিয়ে তুললে একজন ডাক্তার যেমন হন।

তীক্ষ্ণ বুদ্ধির সেই হাসমতই হয়ে উঠেছিল ডাক্তারের ডানহাত। ছিল বিশ্বস্ত, ছেলেরই মতো। তার হাতেই ছিল জায়গা জমির হিসাবের ভার। নিজে দেখেশুনে তার বিয়ে দিয়েছিলেন গোপাল। সারাদিন হাসমত থাকত গোপালের সঙ্গে, আর বউ রাবেয়া থাকত গোপালের স্ত্রীর সঙ্গে। ফাইফরমাশ খাটত, নিঃসঙ্গ জীবনে সঙ্গের সুখ দিত। সবকিছু ভালো মন্দে চলছিল ভালোই। হঠাৎ তার মধ্যেই প্রকট হয়ে উঠলো বহুদিন ধরে ঘন হতে থাকা ভাঙনের সুর। দাঙ্গা হাঙ্গামার খবর পাওয়া যেতে লাগলো। জমিদারেরা তো বটেই, স্থানীয় মানুষজন অধিকাংশই ছেড়ে যেতে লাগল দেশ। তবে গোপাল বলতো, যত যা-ই হোক, সে যাবে না। দু’দশ গাঁয়ের যত মানুষ, প্রায় সবাইই তার চিকিৎসা নেয়, তাকে মান্যগন্য করে, অস্ত্র তাকে ছোঁবে না। ছুঁলেও বাবা-মায়ের স্মৃতি আর দাদা পরদাদার সম্পত্তি ফেলে তিনি যাবেন কীভাবে? সবাই তাই ধরেই নিয়েছিল, তিনি থাকছেন। এমন সময় বেইজ্জতি ঘটে গেল একটা।

রাবেয়ার সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল বেশ। ব্যাপারটা নাকি আড়ালপথেও গভীর। বলা হতে লাগলো হাসমতের যে ছেলেটা হয়েছে কদিন আগে, সেটা নাকি গোপালেরই। কানকথা হলেও লোকজন নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে, ছোটটা তো তারই সন্তান, বড়টাও হতে পারে। অনেকে ভেবেছিল, হাসমতের শিকড় বেয়ে এবার তার পুরোনো স্বভাব ফিরে এলো বলে। কিন্তু না, বিজ্ঞজনের মতোই শান্ত ছিল সে। তবে টালমাটাল তার বউ। দুরবস্থার শেষ নেই রাবেয়ার। গোপালের বিরুদ্ধে বলার সাহস হচ্ছে না, এলাকার কাঠমোল্লারা তাই মুন্ডুপাত করছে মেয়েটার। তাকে গ্রামে থাকতে দেওয়া হবে না, হুলিয়া তুলেছে। আরে ঠারে গোপালের দিকেও ছুটে আসছে বিষোদগার। ঘরে বাইরে এমন অপদস্থ হতে হতে, গোপাল সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি বিনিময়ই করবেন। এই অকৃতজ্ঞ মানুষের গ-গ্রামে আর না। কিন্তু তার আগেই এক রাতে নিখোঁজ হলেন তিনি। ডাক্তারের সঙ্গে তার প্রিয় রোগী রাবেয়াকেও খুঁজে পাওয়া গেল না। 

তারপরই প্রকাশিত হলেন গোপালের স্ত্রী। শোনা গেল, গোপালের অঢেল ধন সম্পত্তির কিছুই তার না, সব এই মানুষটার। একজন ধনাঢ্য নিঃসন্তান নারী যতটা পাথরকঠিন হতে পারেন, ইন্দুমতিও ঠিক তেমনই ছিলেন। রাবেয়ার সঙ্গে গোপালের সম্পর্ক নিয়ে কানকথা রটতেই তিনি ত্যাগ করেছিলেন তাদের। বরের সঙ্গে কথাও বলেননি আর। কিন্তু সেই বর নিখোঁজ হলেন যখন, মানুষ বলল হয়তো তাকে খুন করেছে কেউ, তিনি বিশ্বাস করলেন না। তার ধারণা ছিল, রাবেয়ার জন্য কোনো আশ্রয় ঠিক করতে গেছেন গোপাল, কাজ শেষে ফিরে আসবেন। তার আগে তিনি নড়বেন না এই বাড়ি থেকে। কেউ বলে স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি দিতে তিনিই নাকি সাজিয়েছিলেন সব। তবে এই বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি পাওয়া যায় না খুব একটা।

এ কারণে যে কথাটা শোনা যায় সবচে জোরেশোরে, তা হলো: পুরো ব্যাপারটা নাকি হাসমতেরই সাজানো ছিল। সে জানত, বিনিময় করে গোপাল যদি চলে যায়, তো আর এক পরিবার এসে রাজ করবে গোপালের সম্পদে, হাসমত  তাহলে থেকে যাবে যে হাসমত সে-ই। ফলে তাকে এমন ব্যবস্থা করতে হয়েছিল যাতে গোপাল না যায়, আবার না থাকে! কিন্তু সব সম্পন্ন হওয়ার পর যখন সে দেখলো মালিকানা সব ইন্দুমতির, বাধ্য হয়েই তাকে চালিয়ে যেতে হলো অভিনয়। চালিয়ে নিতে হলো আরো বছর তিনেক। ততদিনে পড়–টে হয়ে পড়লেন ইন্দুমতি। আর তাতেই, পরিকল্পনা করুক বা না করুক, কল্পনা বাস্তব হতে লাগলো হাসমতের। সবকিছুর দখল পেতে বেশিদিন আর বাকি ছিল না। সে তাই ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিচ্ছিল জাল। কিছুদিন পরই তার পূর্ণ হলো ষোলোকলা। ইন্দুমতি মরতেই সে কায়েম করে বসল দখলদারিত্ব। যদিও তার কপাল খারাপ, ভোগ করতে পারেনি কিছুই। কিছুদিনপরই, ওই বাড়িতেই, তার মেয়েটা মারা গেল অপঘাতে। ছোট ছেলেকে তো রাবেয়াই নিয়ে গিয়েছিল পালানোর সময়। দুই বাচ্চা আর বউকে এভাবে হারিয়েই হয়তো বিগড়ে গেল হাসমত। পাগলের মতো ঘুরে বেড়াতে লাগলো সে। এখানে সেখানে পড়ে থাকত, মাটি খেত আর বিড়বিড় করত। তারপর আর হদিস মেলেনি। অনেকেই তারপর বাড়িটায় থাকতে চেয়েছে, উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সফল হয়নি কেউই। রাবেয়া নাকি সারারাত ঘুরে বেড়াত নতুন বউয়ের মতো, চপল চঞ্চল। যারা দেখেছে, তারা বলে অমনই দেখতে ছিল সে বিয়ের সময়। কেউ বলে, ঘুরে ঘুরে মেয়ের খোঁজ করত সে, লাঠি নিয়ে বরের খোঁজ করত, আর হেসে উঠত খিলখিল!

বহুক্ষণ ধরে এই খিলখিল হাসিটা বাজতে লাগলো কানে। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে একেবারে নদীর ধারে চলে এসেছি, খেয়ালই করিনি। আকাশে আকাশে তখন ঝগড়া করছে মেঘ। বিকেল বেলাকেও মনে হচ্ছে ভরসন্ধ্যা। গল্প শুনতে শুনতে প্রশ্ন জেগেছিল কিছু, জিজ্ঞেস করব দাদুকে, তা ঝড়ের ভয়ে তিনি বিদায় নিলেন দ্রুত। জানতে চাইলাম পরে আবার কোথায় পাবো তাকে। হদিস দিয়ে তিনি পা চালালেন বাড়ির পানে। তার সঙ্গে ফিরে যাবো, না হাঁটব একা, ভাবতে ভাবতেই ফোন করলাম হাসিবকে। তা গাধাটার কামলীলা হয়তো শেষ হয়নি তখনও, ধরল না ফোনটা। ততক্ষণে ঝড় উঠে গেছে। ছোটবেলায় একবার আমের ডাল ভেঙে পড়েছিল মাথার ওপর, সেই থেকে ঝড়ের ভয় আমার। ভয়ে সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে আছি এক বড় গাছের নিচে। ডুবে আছি ডাক্তার আর রাবেয়ার রহস্যে। মনটা বিষণ্ন, ধাঁধায় পড়ে আছে। ঝড়ের তেজ বাড়ছে। ঢেউয়ের জোর বাড়ছে। হঠাৎ একটা আম পড়ল কাঁধে। দেখি টুপটাপ আম পড়ছে চারপাশে, অমনি আমার কু ডাকলো মনে। আবার ঝড়, আবার আমগাছ! দ্রুত নেমে গেলাম পারের দিকে, ফাঁকা জায়গায় থাকতে চাই। পেছনে হৈচৈ শুনতে পেলাম, বাচ্চারা ছুটে এসেছে কুড়োতে। ওদের মধ্যে আমিও হয়তো আছি। ঢালে পড়া কিছু আম গড়িয়ে যাচ্ছে, আমাকে ডিঙিয়ে পড়ে যাচ্ছে পানিতে। সেদিকে তাকিয়েই দেখি একটা নৌকা। নৌকায় কেউ নেই। ঢেউয়ে ঢেউয়ে যেন বেওয়ারিশ ভেসে আসছে।

নদীধারের মানুষের কাছে একটা নৌকা মানে বিরাট কিছু। এই ঝড়ের মধ্যে খোলা থাকলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। নিরাপদে ওটা বেধে রাখার কোনো ব্যবস্থা কি করা যায় না? ছুটে গেলাম কাছে। নৌকা ততক্ষণে ডাঙার দিকে চলে এসেছে আরও। গোড়ালি ডুবল, তবে বড় বড় ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিলো হাঁটু অবধি। অবশ্য বৃষ্টি আসার আগে কাজটা শেষ করতে না পারলে পুরোটাই ভিজে যাবো। গলুইয়ের গলা ধরে তাই দ্রুত টানতে চেষ্টা করছি নৌকাটাকে। দেখছি সেখানে দড়ি এক গাছা। যাক, এটা দিয়েই বেঁধে রাখা যাবে। ঝড় থামলে নিশ্চয়ই যার গরু, সে ছুটে আসবে পাচন নিয়ে। ভাবতে ভাবতে দড়ি বাঁধছি গলুইয়ে, কোনো একটা গাছের গোড়ায় বা খুঁটো মুটো পেলে বেঁধে দেবো। চোখ বুলাতে একটা ইট দেখা গেল, লম্বালম্বি যার অর্ধেক মাটির নিচে পোঁতা। যাক, ওটায় গিয়ে আটকানো যাবে দড়িটা। সেদিকে যাবো, দড়ি গুছাচ্ছি, এমন সময় চোখ গেল নৌকার মাঝবরাবর। সেখানে একটা কাপড়ের পুঁটলা। তার মধ্যে বাচ্চা। নড়ছে! কী বলে!

দড়ি ফেলে আগে উঠতে হলো নৌকায়, ছুটতে হলো বাচ্চাটার দিকে। আহা রে! কার কোল খালি করে এলি বাছা তুই? একটু দেখে বুঝে কোলে তুলে নিলাম। আচমকা তখন বৃষ্টি শুরু হলো। খেয়াল হয়নি যে, বাতাসও দিক বদলেছে এর মধ্যে। গতি এখন তার উল্টো দিকে। এবং সবচেয়ে খারাপ খবর হলো, ভেসে যেতে শুরু করেছে নৌকাটা। ডাঙা থেকে বেশ দূরে তখন আমি। বড় বড় ঢেউগুলো আমাদের নিয়ে চলেছে মাঝনদীতে। গ্রামের ছেলে। জন্মের পর থেকে সাঁতার কেটে মানুষ। পানিতে ভয় বিশেষ পাই না। নেমে পড়লেই হয়, কিন্তু বাচ্চাটা হাতে নিয়ে সাঁতরাব কী করে। তাছাড়া এত বড় বড় ঢেউয়ের সাথে এক হাতে কুলিয়েও কি উঠতে পারব? নিজেকে তাই সঁপে দিলাম নৌকার মতি আর বাতাসের গতির কাছে।

তেরছা হয়ে পড়ছে মোটা দানার ফোঁটা। পানিতে বৃষ্টিফোঁটা পড়লে যে ক্ষণিক ফুলের সৃষ্টি হয়, ফুল না, আজ যেন তারা রাজমুকুট, এত বড় হয়ে ফুটছে। উল্টোদিকে পিঠ করে বসে আছি। গায়ের জামা খুলে বাচ্চাটাকে আড়াল করছি। আগলে রেখেছি শরীর দিয়ে। বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু পারছি না। চুল বেয়ে যে জল পড়ছে টপটপ, বেশ যেন তা গরম গরম। সারাদিন পথে পথে কেটেছে, শরীর মাথায় তাপ ছিল জমে। কিছুক্ষণ ভিজে তাপটুকু ধুয়ে যেতেই কেমন শীত শীত করতে লাগলো। পিচ্চিটাও দেখি কাঁপছে। তবে কাঁদছে না। বড় বড় চোখ মেলে তাকাচ্ছে আমার দিকে। তাকিয়ে আছে কপালের টিপটাও। যেন আমি চেনা খুব তার। দেখতে দেখতেই খেয়াল হলো গায়ের জামাটা অদ্ভুত এর। মানে আমার পাড়ায় তো অন্তত পাঁচটা বাচ্চা আছে ওর বয়সী, কারোর গায়েই এমন জামা দেখিনি। নৌকাটাকেও ঠিক চেনা ধাঁচের মনে হচ্ছে না। গলুয়ের মাথা সুচালো হয় সচরাচর, এটার দেখছি উপরের দিকে বাঁকানো। রাজরাজড়াদের পানসি ডিঙার মতো করে বানানো। এসব দেখতে দেখতে খেয়াল করতে পারিনি কোন দিকে যাচ্ছি। খেয়াল হয়নি পৌঁছে গেছি পারে। হঠাৎ এত জোরে নৌকাটা আছড়ে পড়ল, উল্টে প্রায় পড়েই গেলাম। বাচ্চাটাকে কোলের মধ্যে রেখেছি, সেভাবেই চেষ্টা করলাম সামলাতে। তবু চোট বোধহয় লাগল খানিক। চিঁহি করে উঠলো। কান্না থামানোর চেষ্টা করতে করতে তাড়াতাড়ি নেমে পড়লাম ডাঙায়।

কাছাকাছি একটা পিটুল গাছ, তার তলায় আশ্রয় নেবো। তা গিয়ে দেখি সে আশার গুড়ে বালি। শুয়ে আছেন একজন নারী। কাছাকাছি অন্য কোনো গাছও নেই। বাধ্য হয়েই দাঁড়াতে হলো ওখানেই। পিচ্চিটার কান্না তখন বাড়ল আরও। হাত পা ছুড়ছে জোরে। যেন পারলে লাফ দেবে কোল থেকে। আমি লোক আনাড়ী, হাত নাড়ি পা নাড়ি, কিন্তু বাচ্চা থামে না। তখনই ভাবনাটা এলো, মহিলা মানুষ, চাইলে উনি নিশ্চয়ই সামলাতে পারবেন। তাই ডাকলাম বার তিনেক। কাজ হলো না। হয়তো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তিনি। গায়ে যে ছাঁট পড়ছে, ভিজে জবজবে হয়ে গেছে শাড়ি, সেদিকে খেয়াল নেই। ব্লাউজ নেই, ফলে সাবধানে তাকাতে হলো। কিন্তু আমার বয়সী ছেলের জন্য সেটা একটু কঠিনই। তার চেয়ে খানিক দূরে চলে যাওয়াই শ্রেয়। উপায় খুঁজতে খুঁজতেই দেখি বাচ্চাটার হাতপা ছোড়া আর হাম হাম মাম মামের পরিমাণ বাড়ছে। বাধ্য হয়েই আলতো ধাক্কা দিয়ে ডাকতে হলো মহিলাকে। দু’বার। তিনবার। চতুর্থবারেই তিনি নড়ে উঠলেন। উঠতেই হলো জাদু। ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিলেন বাচ্চাটাকে। আর কান্না জুড়লেন হাওমাও। চুমুর পরে চুমু খেলেন বাচ্চাটার মুখে বুকে চোখে। আর এমনভাবে তাকালেন আমার দিকে, যেন আমিই কেড়ে নিয়ে গিয়েছিলাম তার বাচ্চাকে, বহু খোঁজাখুঁজির পর এখন সেটা উদ্ধার করলেন তিনি!

বাচ্চাটাও ভীষণ শান্ত হয়ে থাকলো বুকে তার। তবে তখনো অস্থির হয়ে আছে বৃষ্টি। পিটুল গাছের ডাল আর ঢাল হতে পারছে না। পাতায় যে পরিমাণ পানি জমছে, তা ঢলে পড়তেই মনে হচ্ছে মগ মগ পানি ঢেলে দিচ্ছে কেউ। বেশিক্ষণ এখানে থাকলে ঠা-া লেগে যাবে। কিছু দূরে বড় এক কাঁঠাল বাগান। একটা ছাউনি নজড়ে এলো, পাহারার ব্যবস্থা হয়তো। সেদিকেই দৌড়াতে থাকলাম আমরা। তা, ছাউনিতে যদি পাহারাদার থাকে? কীভাবে কী করব ভাবতে ভাবতেই গিয়ে দেখি, সব ফাঁকা। হয় পাহারাদার আসেইনি এখনও, নয় ঝড়ের ভয়ে পালিয়েছে। যা-ই হোক তুমুল বৃষ্টি ধারা বাইরে ফেলে আমরা ঢুকে গেলাম ভেতরে। বাঁশের চটার খাট, তার ওপর গুছিয়ে রাখা বালিশ কাঁথা। পাশে একটা বেঞ্চ, বাঁশের চটারই। বাচ্চাটার কাপড় জামা খুলে ফেললেন মহিলা। বালিশ কাঁথা বিছিয়ে দিয়েছি ততক্ষণে। শুইয়ে দিলেন পিচ্চিটাকে। তার কান্না থামছে না। বললেন, ‘খিদে লেগেছে। খাবে।’ আমি বললাম ‘তাই হবে হয়তো। বহুক্ষণ খায়নি তো।’ বলে দাঁড়িয়েই থাকলাম গাছের মতো। মহিলা দেখি ইতস্তত করছেন। খেয়াল করতেই বুঝতে পারলাম বোকামিটা। বেরিয়ে এলাম দ্রুত। আসতেই কিছুক্ষণের মধ্যে থেমে গেল কান্নার আওয়াজ।

অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। যেদিকে তাকাচ্ছি সেদিকেই ভয়ের আবহ। ভয়কাতুরে লোক, ভয়ে ভয়ে আছি। আমি নিশ্চিত, ঘরে বসে এসব কল্পনা করতেও সাহস পেতাম না। কল্পনা বদলে ঠিকই অন্য কাউকে নিয়ে আসতাম পাশে। বাস্তবেও করতে হলো সেটাই।

‘কিছু যদি মনে না করেন, কীভাবে কী হলো? বাচ্চাটা ভেসে গেল কী করে?’

কোনো কথা নেই। বাতাসে পাতায় পাতায় ঘষা আর তার ওপর বৃষ্টি পড়ার শব্দ ছাড়া নীরব সবখানে। গলা খাকারি দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করতে হলো প্রশ্নটা। তবে এবার একটু ঘুরিয়ে। ‘ঘটনা কী, বলা যাবে আমাকে?’

আরও খানিকটা রয়ে সয়ে মুখ খুললেন তিনি। এ দিককার সবচেয়ে ধনী লোকের স্ত্রী। তবে ধনী হলে কী হবে, মানুষটা বর ভালো ছিল না। পরপর দুই মেয়ের জন্ম দিয়েছেন বলে সহ্য করতে পারত না বউকে। তার লাঞ্চনা গঞ্জনা সইতে না পেরেই তিনি পালিয়েছেন বাড়ি থেকে।

কী বলে! আমরা কি এখনো সেই আগের মতোই আছি? ছেলে আর মেয়ে ভেদ করতে করতে সন্তানকেই অস্বীকার করার সেই সময় কি পার হতে পারিনি এখনো? ভাবছি, ওদিকে মহিলা বলেই চলেছেন তার গল্প। গৃহস্থালী অত্যাচারের বর্ণনা সেসব। কিন্তু আমার তাতে আগ্রহ কম।

‘একা একাই বের হয়ে গেলেন, নাকি সাথে ছিল কেউ?’

‘একা বের হইনি তো। বাচ্চাটার বাপও ছিল সাথে।’

এইবার বেশ ধন্ধেই পড়লাম। বাচ্চার বাপের অত্যাচারে পালাচ্ছে, আবার বাচ্চারই বাপ সঙ্গী, এ কেমন পালানো! খোলাসা করলেন তিনিই। বাড়ির এক কর্মচারি, নাম হাসু, খুব আন্তরিক ছিল তার প্রতি। বেশ ঘনিষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন তারা। তাদেরই সন্তান এই পিচ্চি। ব্যাপারটা জেনে ফেলেছিলেন বর।

‘সেই পালাতে গিয়েই ভুলটা বুঝতে পারলাম। হাসুর কথামতো বেরিয়ে এসেছি। নদীর কাছাকাছি যখন, দেখলাম, মণির বাপ ছুটে আসছে পেছন পেছন। হাসু আমাকে বলল নৌকোয় উঠতে। ঝড় উঠে গিয়েছিল, ভাসতে ভাসতে নৌকা যখন বেশ কিছুটা দূরে, দেখলাম হাসু আর তার লোকজন মিলে মারতে লাগল খুকির বাপকে। না পারলাম বাচ্চা ফেলে যেতে, না পারলাম চলে আসতে। নৌকোয় তখন তড়পাতে লাগলাম আমি, আর কানতে লাগলো বাচ্চাটা। ওকে মেরে হাসু এগিয়ে এসেছিল আমার দিকেও, হাতে রক্তাক্ত হেসো। গালাগাল দিয়ে ডাকছিল, ধরতে পারলে আমারেও মারত হয়তো। তা, সেটাই কি ভালো হতো না?’

‘মরার ভয় যখন নেই, তখন ফিরে যান না কেন? মানুষের কাছে বিচার দিলেও তো পারেন।’

‘চাই তো, কিন্তু আমারে কে যেন যাইতে দিতে চায় না। ধরে বেঁধে নিয়ে আসে আবার।’

নিশ্চয়ই মহিলা বানিয়ে বানিয়ে বলছে সব। না হলে তার মাথার ঠিক নেই। আবার অবিশ্বাসও করতে পারছি না। মানে কত অবিশ্বাস্য ঘটনাই তো ঘটে চারপাশে। যদিও বেশি ভাবতে পারছিলাম না, আমার তখন খিদে পেয়েছে খুব। কিন্তু খাওয়ার কি উপায় হবে সহসা? না, এখানে পড়ে থেকে লাভ নেই। ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করি। পা বাড়াতেই আবার মনে হলো, এই নারী হয়তো মানসিক ভারসাম্যহীন। তাকে এমন নির্জন দ্বীপে ফেলে রেখে যাওয়া কি ঠিক হবে? বুঝতে পারছি না। এই অবস্থায় তাকে কিছু জিজ্ঞেস করতেও মন করল না। এদিকে চোঁ চোঁ করছে পেট। আর নাকে আসছে দারুণ এক সুবাস। কাছেরই কোনো গাছে হয়তো পেকে আছে কাঁঠাল।

এত মিষ্টি বাস, খোঁজ না করে পারলাম না। সামনেই দুই সারি পরের একটা গাছের কাছে নিয়ে গেল ঘ্রাণটা আমাকে। ছোট্ট একটা কাঁঠাল। চার নম্বর ফুটবলের আকৃতির চেয়ে বড় হবে না। হাত দিতেই বসে যাচ্ছে আঙুল। আর তাতেই যেন পাকিয়ে উঠল খিদেটা আরও। খিদে-পেটে ফল খেতে হয় না, মা বলতেন। কিন্তু কিছু না খেলে তো টলেই যাব পড়ে। কাঁঠালটা ছিঁড়ে নিলাম তাই। বাচ্চাটার খাওয়া শেষ হলে ছাউনিতে যেতে পারি। গেলে মহিলাটাও একটু খেতে পারে। কিন্তু খাওয়া হয়েছে কি না জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। আবার আমার তর সইলেও খিদে সহ্য হচ্ছে না। ফলে গাছের ওখানে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই ভেঙে ফেললাম সেটা। বাড়িতে কাঁঠাল ভাঙতে গেলে সরষের তেলে জবজবে করে হাত দিই নইলে আঠা লেগে থাকে, অসহ্য লাগে। আজ আর তার পরোয়া করার সুযোগ নেই। একটা কোয়া নিতেই দেখি, প্রিয় জামরুল কোয়া কাঁঠাল পড়েছে হাতে। মাঝে মাঝে বিদ্যুচ্চমকের আলোয় আবছা যতটা দেখতে পারছি, তাতেই বুঝতে পারছি, সিঁদুরের রঙ মেখে কোয়াগুলো অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। মুখে দিতেই চোখ বুজে এলো তৃপ্তিতে। এমন মজার কিছু খেতে খেতে চোখ খোলা রাাখলে তৃপ্তিটা সম্পূর্ণ হয় না। ফলে এক একটা কোয়া মুখে দিচ্ছি আর আপছেই বুজে আসছে চোখ। এমনই বোজা চোখ একবার খুলতেই ছাৎ করে উঠল বুকের ভেতর।

দেখি উবু হয়ে বসে আছে একটা ছায়া। আমার ভয় কাটাতেই হয়তো বিদ্যুৎ চমকালো আবার। দেখলাম ওই মহিলাই। তৃপ্তিভরে মুখে দিচ্ছেন মধুস্বাদের কোয়া। খেতে খেতেই আবার কাঁদতে লাগলেন তিনি। জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে।

কিন্তু স্বরটা বেরুলো না, নাকি দেয়া ডাকার শব্দে সেটা চাপা পড়ে গেল জানি না, আমি শুনতে পেলাম না। তবে মহিলা ঠিকই উত্তর দিলেন। ‘ইন্দুমতির কথা মনে পড়ছে খুব। আমার বড় মেয়ে।’ বলে কি! দুইটা বাচ্চার মায়ের মতো বয়স তো এ মহিলার না! নিশ্চয়ই খুব বাচ্চাকালে বিয়ে হয়েছিল। ভাবতে ভাবতেই মনে হলো সেই বাচ্চাটা বোধহয় এই কাঁঠাল পছন্দ করত খুব। তাই খেতে খেতে এই কান্না। জানতে চাইলাম, ‘ও বাড়ির খবরাখবর কিছু পেয়েছেন?’

‘খবর আর কী? শুনেছি, ছেলে গোপালের সাথে আমার ইন্দুমতির বিয়ে দিয়েছে হাসু। দখল নিয়েও অবশ্য বেশিদিন ভোগ করতে পারেনি। গত বছর নাকি সাপের কামড়ে মরেছে পাষন্ডটা। এখন আমার ইন্দুমতি আর গোপালই দেখছে সব। গোপাল বাবাজি ওর বাপের মতো না, ভালো। ডাক্তারি করে বেড়ায়, ওর সুনাম শুনি কত। মেয়েটাও সুখে আছে।’

এই পর্যায়ে এসে নিশ্চিত হলাম, মহিলার মাথাই গেছে সত্যি। তবু বললাম,

‘সে তো তাহলে বহু আগের ঘটনা…’

‘কই, এই সেদিনের কথা না? মাত্র ক’বছর আগের ব্যাপার। ওই তো বাংলা ভেঙে যাওয়ার পর আবার জোড়া লাগলো, আর আমার ভেঙে গেল সংসার।’

বঙ্গভঙ্গ রদের কথা বলছে নাকি সে! ইন্দুমতি গোপালের কাহিনী শেষ হয়েছে সেই কবে, তাদের মা তাহলে বেঁচে থাকে কী করে? নাহ, এ হতে পারে না। ভাবছি আর শুনছি তার কথা। ‘ভাঙলো আমারই দোষে। আর আমার পাপের ভার বয়ে বেড়াচ্ছে আমার মেয়েরা। তাই ভেবে আজ আবার নৌকোয় উঠেছিলাম।’

তবে পৌঁছতে যে পারবেন না, তা নাকি জানাই ছিল তার। ‘যখনই নৌকোয় উঠি, তখনই ঝড় ওঠে। আর ঘুরে ঘুরে এপারেই চলে আসে নৌকা। যতবার ওমুখো হই, পথ ততবার এদিকেই ফিরে আসে।’ তবু তিনি বেয়ে যাচ্ছিলেন বৈঠা। সে কারণেই নাকি আরো জোরে উঠেছে ঝড়। নৌকাও ভেসে গেছে ঢেউয়ের তালে। আর অসাবধানে তিনি পড়ে গেছেন পানিতে। মেয়েটা তো থেকে গেল নৌকায়! কী হবে এখন? পাগলের মতো সাঁতরাতে শুরু করেছিলেন, নৌকাটা ধরবেন, মেয়েকে নিয়ে যাবেন বাপের ভিটেয়। কিন্তু টিকতে পারেননি বেশিক্ষণ। বহুদিন পর সাঁতার কাটতে গেলে হাতটা অবশ হয়ে আসে সহসাই। হাল ছেড়ে দিয়েছেন যখন, ঢেউই তাকে ফিরিয়ে এনেছে আবার। তারপর ক্লান্ত শরীর, কান্নাকাটি করতে করতে মূর্ছা গেছেন, আমি ভেবেছি ঘুম।

শুনছি আর অবিশ্বাসের মাত্রা বাড়ছে। অবশ্য একেবারে সব উড়িয়ে দিতেও পারছি না। হঠাতই একটা কু ডাকলো মনে। আচ্ছা, ইনি যদি থেকেই থাকেন, হাসিবের সঙ্গে যে মেয়েটাকে দেখলাম, সেও অমন কেউ না তো? হাসমতের বউ নাকি ঘুরে বেড়াত ওই বাড়িতে। এমন কি হতে পারে যে, মেয়েটা সে-ই! হাসিবকে সাবধান করতে হবে তাহলে। কল দিতে গিয়ে দেখি, মোবাইল অফ হয়ে আছে। জীবনীশক্তি শেষ হলে কিছুই তো থাকে না আর। ভাবতেই আবার বদলে গেল মন। অস্বীকার করতে শুরু করলাম সবকিছু আবার।

একবার সত্য আরবার মিথ্যা বিচার করতে করতে আমি আর খেতে পারছিলাম না। তবে খাওয়া থামছে না তার। এমন হাপুস হুপুষ করে খাচ্ছেন তিনি, মনে হচ্ছে কতদিন যেন না খেয়ে ছিলেন। তাছাড়া তার ওই কেঁপে কেঁপে ওঠা ফুঁপিয়ে কান্না আর একটার পর একটা কোয়া মুখে দেওয়ার দৃশ্যে হয়তো অবাক হওয়ার কোনো বীজ লুকিয়ে ছিল। বীজটা পড়েছেও একেবারে জায়গামতো। অবাক হয়েই দেখছি আর শুনছি তাকে। ‘আমার দোষেই ভাঙল সোনার সংসার আমার। আমারই দোষ। আহারে সোনার মেয়েটা আমার ইন্দুমতি। বাচ্চা একটা মেয়ে, বাপ মা কাছে নেই, শত্রুর ঘর করছে। কত গঞ্জনাই না পোহায়। আমার জন্যই হলো সব।’

খুব মায়া হচ্ছে মানুষটার জন্য। কী যন্ত্রণা সহ্য করেই না মরেছে সে! এমন সময় বিদ্যুৎ চমকালো জোরে। অন্যবারের তুলনায় বেশিক্ষণ থাকল আলোটুকু। তাতেই দেখলাম পাশের গাছের একটা ডালে আঁচল বেঁধে ঝুলে পড়ছে মহিলা। দৌড়ে তাকে ধরতে যাব, ছাউনির ভেতরে তখন তীব্র গ্লানিভরা কণ্ঠ তার। ‘এই শুয়োরটা না হলে সবই ঠিক থাকত। এই শুয়োরের জন্যই আজ এই দশা আমার।’ তার মধ্যেই থপ করে শব্দ হলো ছাউনির ভেতরে। চিৎকার করতে করতে বাচ্চাটা গড়াগড়ি খাচ্ছে মেঝেয়। এবং আমার সামনে তখনও বসে আছে এক মহিলা, গপাগপ কাঁঠাল খাচ্ছে। তার মানে, আমার ডানে বাঁয়ে এবং সামনে তিনজন নারী, তিনজনই তারা একজন! কীভাবে সম্ভব? মুহূর্তের ভেতরই গুলিয়ে উঠল সব।

ভোরের দিকে সজাগ হয়েছিলাম তারপর।

শুয়ে আছি ছাউনিতে। কাঁথা বালিশ একাকার কাদায়। গায়ে পায়ে শুকিয়ে সাদা হয়ে আছে ধুলো। বেরিয়ে দেখলাম পায়ের ছাপ বহু। আর কিছুদূরে পড়ে আছে আধ-খাওয়া কাঁঠাল। চার নম্বর ফুটবলের আকার তার। আমি এবং ওই মহিলা দু’জন মিলে অতগুলো কোয়া খাওয়ার পরও এইটুকুন কাঁঠাল শেষ হলো না! মহিলা এবং বাচ্চাটা বা মহিলারা নেই কোথাও। আমার শরীরটা খুব দুর্বল, গায়ে ব্যথা। টলতে টলতে নদীর পারে এলাম। দেখি সেই নৌকাটাই সেখানে দাঁড়ানো। মনে হলো, উঠে পড়ি, বৈঠা আমায় নিয়ে যাক ওপারে। কিন্তু সাহস হলো না। উঠলেই যদি ঝড় উঠে যায়, আর নৌকাটা ঘুরে আসে এদিকে আবার?

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত