শাপলা সর্পযিতা’র কবিতা

Reading Time: 3 minutes

আজ ০৬ অক্টোবর কবি ও কথাসাহিত্যিক শাপলা সর্পযিতা’র জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


জলে,আয়না

ঘুরে ফিরে তোমার কাছেই আসি । ভোরবেলা ফুল নেই – চুল বাঁধি। প্রভাতের শিউলি দুষ্প্রাপ্য এই বিরল শহরে পুকুরের এপাড় খুঁজি। ওপার দেখি না । জঙলার ধার, সর্পিল পায়ে চলার পথ দীর্ঘ মানুষ সরে সরে যায় দূ-রে একপায়ে তালগাছ, প্রসারিত সবুজের মাঠ, সুবিশাল স্কুল বিল্ডিং পেরিয়ে ময়নামতির চুড়ায় দাঁড়ালে নিচে–জলে পড়েছিল কার যেন ছায়া ! ধীরে রৌদ্র বেড়েছে, প্রখর হয়েছে ঝড়, বৃষ্টি ছেয়েছে বসন তারও বেশি মন । অনাগত আত্মজ ফিরিয়ে নিয়েছে সোনা সোনা মুখ জলে কার যেন ছায়া পড়ে আছে!

মন নিয়ে কারবার। ডুবে যাই তাই নিত্যই গভীরে যেখানে একার ঘরে বাস। খুঁজি–হাতের শাখায় কি রয়েছে কোনো ফাঁটলের দাগ। সিঁদূরে দুঃশাসনের প্রতিহিংসা বস্ত্রে কি কখনো পড়েছিল কুন্তির স্নেহ ক্ষুরধার? ঘোড়ার খুঁড়ে উড়ছে ধুলি–কর্ণ কি পেল খুঁজে মায়ের মুখ! রাজমাতার ছায়া ভেসে যায় ভাগিরথীর জলে। হায় হায় হায়! জলে কার যেন ছায়া ভেসে চলে যায়!! কি বিষাক্ত মুখগুলি ভেসে ওঠে রৌদ্রআকাশ, কাজলচোখ নিয়ত পুড়ে পুড়ে ম্লান। তবু ঘুরে ফিরে তোমার কাছেই আসি কি যেন লুকানো আছে এখানে, জলের অতলে। আমার ছায়া ছায়া শান্ত বাতাস, জলে ভেসে যাওয়া মুখ উড়াল্ পাখির প্রাণ, নিভে যাওয়া প্রদীপের ঘ্রাণ খুঁজে পাই

তোমারই মুখের আলোতে জ্বলে জ্বলে পরশ করেছে আমার সকল ।

মাতাল রাত

বিশ্বাস করুন প্রিয় পাঠক । আজ এই মধ্যরাত অবধি গিলিনি একটি পেগও। তবু কেন যে নেশায় বুঁদ হয়ে আছি। উপুড় সুরাপাত্র পড়ে রয়েছে লেখার টেবিলে, বেদনায়। নিষিক্ত চরাচর। ম্ল্যান মৌন অহোরাত্র আমার। চিঠি শুরু হয়েছিল। আহ হা কী সে দারুণ গোপন। বাতাসে বিজনে কত যে স্বপ্ন। কত যে নিলাজ কথন। মাইরি বলছি, লিখবো না। ফেলবো না আর একটি চিঠিও ডাকে। চোখের কাজল নেমে গেছে নোনাজলে। দিগন্তে প্লাবন-অদ্ভুত এক আঁধার। লিখে যাব আজ তার সব অভিমান। যে জন্ম দিয়েছে অজ্স্র অজস্র আজ নামালো ধারাজল। জানে না ঐ শঙ্খচিল আমার, কালো রাত্রের আঁধার। ডানায় আকাশ বেঁধে উড়েছে চরাচর, যে আলোর পাখিরা তার পায়ে মৌনমুখর শেকল। বুকের নিভৃতি আমার। হায়, আত্মজ মরে গেছে তার ছায়া লয়ে । ফিরে আসে নিশান্তে মৃত শেকড়ের ডালে নিজস্ব প্রাণ আর দেহ। তার ছায়া। অবারিত প্রেম বেদনার গহ্বরে। একা । সাকি, ওগো সাকি? অহ হো সাকি, নীলাকাশ–কোথায় সুরার পাত্র আমার! এই যে তুমুল নিঃসঙ্গে একায়। হলে পেগ দুই কি তিন। মন্দ নয়। আহ হা, বিভোর সাকি – নেশায় ঢুলুঢুলু আজকে তাহারও মায়াবী ওই নয়ন।

রোমান্সে সোনামবুলো

শ্রান্ত প্রহরী। রাত্রির ঘন্টা বাজে। সূর্য্ অবসানে গেছে বেশকিছু কাল। আমি ঘন্টা থেকে খুলে নেই মিনিট। মিনিট থেকে সেকেন্ড। অতঃপর সেখানে পৌঁছে যাই। যে এককে মৃত্যুগুলো সাজিয়ে রেখেছে – তুমি আছ তুমি নেই – আমার সে অপরূপ জীবন। আমি যেন লোরকার হাতে গড়ে উঠছি। পুরোটাই ‘রোমান্সে সোনামবুলো’ এক। আমার গায়ে গায়ে সবুজ জিপসী মেয়ে। জীবনের পরতে পরতে জেগে থাকে অপরূপ ঘোরসওয়ার। মৃত্যু মুখে ছুটে চলেছে যে কেবল এক অধরা জীবনের পথে। প্রতিক্ষিত যুগ যুগান্তর। পৃথিবী জানে, তারে দেবেনা কোনোদিন ভালোবাসবার প্রসন্ন প্রহর। বুকে শত জনমের প্রেম, অব্যক্ত ক্ষুধা – নিয়ত হেমলক ঢালছে জোৎস্নায়, বাঁকা চাঁদ। যখন সচেতন আক্রোশে ছিঁড়ে গেল জটাজাল। তখন বাইরে দারুণ জলের আবাহন । জলের অতলে মারমেইড। বুকে লাল ক্ষত। সে ঘোরসওয়ার যখন পৌঁছেছে জিপসী মেয়ের কাছে। তখন অধরা জীবন। দেখা হবে আমাদের মরণের ওই পারে।

গল্পটি আমাদের

আমি নির্বিকার। লিখে যাই অনায়াসে তোমার মুখ আর ছায়া। লিখি পাতাগুলি। আলো করে রাখে। লিখি হৃদয়ে জলের ঘ্রাণ। অধরা নিশা। লিখি জনপদ রাজপথ কাঁটা। রক্তাক্ত পায়ের চিহ্ন। লিখে যাই দারুণ জ্বলন্ত দাবানলে বনোভূমি। ভীষন নীরব। নিষিক্ত। নিশা। লিখি প্রবঞ্চকের স্বপ্ন। অংশীদারের কান্না আর দিশাহীন পথ। লিখে চলি আমি নির্বিকার – টাকার গন্ধ – মদ – মত্ত- নারী ও লেখকের ছায়াছবি। আমি লিখি আমাদের মত – গান্ধর্ব কি প্রজাপত্য। লিখি একটি মাত্র পথ পথের রেখা এবং লক্ষ্য চলমান শেষ বিন্দুতে এসে লিখি ‘তোমারেই ভালোবাসি ওগো প্রিয়’।

শরীর

ডানায় যেন ভর করেছে তার শরীর – অজস্র যৌবন। চোখগুলি বড় বড় টানে দ্যাখে স্লিভলেস হাত । হাতের মসৃণতা । ভুল বাক্য লেখা আছে তার মুখের প্রচ্ছদে। আমি তার চোখ পড়ে ফেলি। আর চোখের সুরঙ্গ বেয়ে ঢুকে পড়ি লুকানো ভেতর। মানুষের ভেতরে দেখি। মুখের ছায়ায় লেখা আছে যার সুশোভন সভ্যতা, দারুণ প্রজ্ঞা আর নির্লিপ্ত লোভ। কী দারুণ বিপরীতের দুরন্ত সহবাস। আশ্রয় করেছে এক কেবলই শরীর।

ছায়া ছায়া ভালোবাসা তবে চলো জলে ছায়া লিখি দু’জনে। কাকচক্ষু জলের উপর আমাদের ভালোবাসাবাসি জলের গভীরে তার কাঁপন আমি তার ছায়া লিখি। তুমি উড়ে চলো আকাশের গহীনে নীলে নীল মাখো এক উদভ্রান্ত প্রজাপতি এসে বসো আমার জলের কিনারে জীবনে তোলো ক্রমঅস্থির তরঙ্গ দুর্বার – আর আমাকে করো জলজ নীলাদ্র। আমি ছায়া লিখি আমার আমি ছায়া লিখি তোমার। তুমি যে জানোনা ছায়ার পুরাতন কিছু, অক্ষর, পড়া হয়ে ওঠেনা। তাই ছায়া ছায়া লেখা বোঝনা জানোনা আমার কোনো কবিতার ভাষা কিংবা ভালোবাসাও।   তুমি যদি রাখো বসন্তে আমায় ধ্রুব সত্যের উপর দাঁড়িয়ে অকারণ স্বপ্নহীন আমি। ঝুলে গেছি স্বপ্নের দড়ি গলায় জড়িয়ে। এ-কাল ও-কাল মহাকাল ব্যপ্ত। প্রতি পদে আর বোধে। বিহব্বল প্রতারক সময় আর বিলাসী জীবন। আমার উদয়অস্ত শ্রমশ্রান্ত শরীর তৃষার্ত মন উদভ্রান্ত নিশালোক। দিশাহীন পথরেখার শেষে-তোমার মুখ । চিরবিরহী বিজনে নামায় মধুর বরষা সজল। আসে গ্রীষ্ম এবং শীতও প্রবল। তুমি যদি রাখো চির বসন্তে আমায় বারোটি ঋতুই বুঝিবা এসে দিয়ে ফিরে নিয়ে চলে যায় আমার স্বপনও সকল।        

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>